উচ্চশুল্কের বিদেশী মদ ও বিয়ার শুল্ক ফাঁকি দিয়ে বিক্রি করে তিনি নিজে একদিকে অকল্পনীয় ধনসম্পদের পাহাড় বানিয়েছেন, নামে-বেনামে অর্ধশতাধিক প্রতিষ্ঠানের মালিক হয়েছেন, অন্যদিকে তাকে সহায়তাকারীদের অনেকেই কোটিপতি হয়েছেন। গুলশানের এইচ কবীর ও ঢাকা ওয়্যারহাউস নামের কূটনৈতিক বন্ডেড ওয়্যারহাউস তার অবৈধ ধনসম্পদের প্রধান উৎস বলে অনুসন্ধানকারী টিম জানতে পেরেছে। কূটনীতিক ও প্রিভিলেইজড পারসনদের জন্য প্রতি বছর শত শত কোটি টাকার মদ-বিয়ার আমদানি করে এ দুটি প্রতিষ্ঠান। ভিয়েনা কনভেনশন অনুযায়ী কূটনীতিক ও প্রিভিলেইজড পারসনরা এ সুবিধা পেয়ে থাকেন। আর এ সুযোগেরই অপব্যবহার করে রানা সফিউল্লাহ হাজার কোটি টাকার ধনসম্পদের মালিক হয়েছেন বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট কিছু সংস্থার প্রত্যক্ষ যোগসাজশে ঢাকা ওয়্যারহাউস ও এইচ কবীর থেকে প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকার শুল্কমুক্ত সুবিধায় আনা মদ-বিয়ার পাচার হয় খোলাবাজারে। রাজধানীর প্রতিটি বার, গেস্ট হাউস ও অভিজাত ক্লাবে নিয়মিত উচ্চশুল্কের মদ-বিয়ার সরবরাহ হচ্ছে রানা সফিউল্লাহর মালিকানাধীন এ দুটি প্রতিষ্ঠান থেকে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অতি স্বল্প সময়ে রানার উত্থানও অবিশ্বাস্য। সাইকেলে ফেরি করে বাংলা মদ বিক্রি দিয়ে যার জীবন শুরু, সেই রানা সফিউল্লার বিত্তবৈভব রূপকথার গল্পকেও হার মানায়। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঢাকার বিভিন্ন বারে তিনি দেশে তৈরি মদ সরবরাহ করতেন। এরপর বিদেশ থেকে আনা লাগেজ ব্যবসা শুরু করেন। বিভিন্ন ধরনের ইলেক্ট্রনিক্স সামগ্রী এনে স্টেডিয়াম মার্কেটে বিক্রি করতেন। একই সঙ্গে কাস্টমসকে ম্যানেজ করে বিদেশী মদ আনা শুরু করেন। এভাবে জড়িয়ে পড়েন উচ্চ মুনাফার মাদক ব্যবসায়। অভিযোগ আছে, তিনি একপর্যায়ে হেরোইন ও সোনা চোরাচালানের সঙ্গেও জড়িত হন। এরপর তাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। অবৈধভাবে কোটি কোটি টাকা কামিয়ে এক সময় গুলশানের ডিপ্লোমেটিক বন্ডেড ওয়্যারহাউস এইচ কবীরের অংশীদার হন। পরে নিজেই প্রতিষ্ঠা করেন ঢাকা ওয়্যারহাউস। বর্তমানে তিনি ঢাকা ওয়্যারহাউসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক।
তার বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ, কূটনীতিক ও প্রিভিলেইজড পারসনদের জন্য শুল্কমুক্ত মদ-বিয়ার এনে কাস্টমস ও নারকোটিক্সের সহায়তায় তা কালোবাজারে বিক্রি করা। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের অধিকাংশ বার ও অভিজাত ক্লাবে শুল্কমুক্ত অবৈধ মদ-বিয়ারের সিংহভাগেরই জোগানদাতা গুলশানের ঢাকা ওয়্যারহাউস ও মেসার্স এইচ কবীর। একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র তা নিশ্চিত করেছে। ঢাকা ওয়্যারহাউস এবং এইচ কবীর কূটনীতিক ও প্রিভিলেজড (সুবিধাভোগী) পারসনদের কাছে শুল্কমুক্ত মদ-বিয়ার বিক্রির জন্য লাইসেন্সপ্রাপ্ত। কিন্তু শুরু থেকেই রানার নেতৃত্বে মাফিয়া সিন্ডিকেট কাস্টমস ও নারকোটিক্স কর্মকর্তাদের সহায়তায় শুল্কমুক্ত মদ-বিয়ার কালোবাজারে বিক্রি করতে শুরু করে। ঢাকার অধিকাংশ বার, ক্লাব, অবৈধ গেস্ট হাউসসহ সারাদেশের বারগুলোতে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে মদ-বিয়ার সরবরাহের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রক এই রানা সফিউল্লাহ। এসব বার ও ক্লাবে মদ সরবরাহ করেই আজ তিনি হাজার কোটি টাকার অর্থসম্পদের মালিক।
সংবাদের সূত্র ধরে দুদক অনুসন্ধান করে জানতে পেরেছে, রানা সফিউল্লাহ প্রতি মাসে ভোগবিলাসেই ব্যয় করেন কোটি কোটি টাকা। বিলাসবহুল লেটেস্ট মডেলের মার্সিডিজ বেঞ্জ, বিএমডব্লিউ, হ্যামার গাড়ি ছাড়া চলেন না তিনি। সঙ্গে থাকে একাধিক দেহরক্ষী। গুলশানের অভিজাত মার্কেট শপার্স ওয়ার্ল্ড, ফার্মগেটের আনন্দ-ছন্দ সিনেমা হল, একাধিক গার্মেন্টস, ডিপ্লোমেটিক বন্ডেড ঢাকা ওয়্যারহাউস এবং এইচ কবীর ছাড়াও আছে নামে-বেনামে অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, কয়েকশ’ বিঘা জমি, বারিধারায় বিশাল ডুপ্লেক্স, অভিজাত এলাকায় একাধিক বাড়ি ও ফ্ল্যাট। এছাড়া লন্ডন ও দুবাইয়ে রয়েছে ফ্ল্যাট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী জানা যায়, লাগেজ পার্টি রানা সফিউল্লাহ এখন হাজার কোটি টাকারও বেশি নগদ অর্থ আর ধনসম্পদের মালিক। তিনি অবকাশ যাপন করেন মুন্সীগঞ্জ জেলার টুঙ্গিবাড়ীর গ্রামে তার বাগানবাড়ির প্রাসাদসম অট্টালিকায়। নামে-বেনামে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন ব্যাংকে রয়েছে হাজার কোটি টাকা। এসবই হয়েছে বিদেশ থেকে শুল্কমুক্তভাবে আমদানি করা মদ কালোবাজারে বিক্রি করে। অথচ আয়কর বিবরণীতে তার সঠিক অর্থসম্পদের হিসাব নেই। স্ত্রী ও সন্তানদের নামে-বেনামে অকল্পনীয় অর্থ-সম্পদের পাহাড় বানালেও তা বেমালুম গোপন করছেন তিনি। তবে দুদকের অনুসন্ধানে সম্পদের ফিরিস্তি বের হচ্ছে বলে জানা গেছে। বারিধারায় মার্কিন দূতাবাসের পাশে ১০ নম্বর রোডের ২২ নম্বর বাড়ির মূল্য কেন আয়কর বিবরণীতে কম দেখানো হয়েছে তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আয়কর বিবরণীতে বাড়িটির মূল্য দেখানো হয়েছে মাত্র দেড় কোটি টাকা। কিন্তু বাস্তবে বারিধারার কূটনৈতিক এলাকার প্রতি বিঘা জমির মূল্যই কমপক্ষে ৪০ কোটি টাকা।
সংশ্লিষ্টরা জানতে পেরেছেন, রানার অর্থায়নে বিদেশ থেকে কম শুল্কের পণ্যের কনটেইনারে করে বাংলাদেশে মদ-বিয়ার আনা হয়। বিশেষ করে গত কয়েক বছর ধরে কমলাপুর আইসিডি দিয়ে ফ্রিজ ও এয়ারকন্ডিশনের চালানে শত শত কোটি টাকার মদ-বিয়ার আসছে। কাস্টমসসহ সংশ্লিষ্টদের ম্যানেজ করে বৈধ কনটেইনারে বছরের পর বছর অবৈধ মাদকের চালান এলেও তা কখনও ধরা পড়েনি। সূত্র জানিয়েছে, নকল হীরা আসল হীরার দামে বিক্রি করে তিনি ও তার সহযোগীরা কোটি কোটি টাকা হাতিয়েছেন।
যুগান্তর