Showing posts with label সরকার মাসুদ. Show all posts
Showing posts with label সরকার মাসুদ. Show all posts

Friday, July 08, 2011

শুধু বর্ষার কবিতা নয় - সরকার মাসুদ

মাথার ওপরকার মৃদু মৃদু গুড়গুড়
আর দূর জঙ্গলের ভেতর-আঁধারে পাখা মেলা ময়ূরের
রঙের ঝর্ণা_ তার হাসিখুশি মুড
আমাকে নিয়ে যায় ছেলেবেলার মাঠে;

Sunday, June 26, 2011

একটা অগ্নিদগ্ধ বাড়ি - সরকার মাসুদ

যে-রাস্তা দিয়ে প্রতিদিন হেঁটে যাই
তার মাথায় একটা অগ্নিদগ্ধ বাড়ি
বাড়িটার দরজা-জানালা ইট-কাঠ পুড়ে গেছে
কালো কালো লোহার বিম দাঁড়িয়ে আছে কেবল

একটা অগ্নিদগ্ধ বাড়ি - সরকার মাসুদ

যে-রাস্তা দিয়ে প্রতিদিন হেঁটে যাই
তার মাথায় একটা অগ্নিদগ্ধ বাড়ি
বাড়িটার দরজা-জানালা ইট-কাঠ পুড়ে গেছে
কালো কালো লোহার বিম দাঁড়িয়ে আছে কেবল

Saturday, July 04, 2009

কথাসাহিত্যিক আলাউদ্দিন আল আজাদ

সরকার মাসুদ
পঞ্চাশের দশকের শেষদিকে আজাদের শিল্পচেতনা উল্লেখযোগ্য মোড় নেয়। ফলে পাল্টে যায় তার লেখার বিষয় ও ভাবনারীতি। আর্তবিপন্ন মানুষের জীবনসংগ্রাম, মনোবিশ্লেষণ, ফ্রয়েডীয় যৌনতত্ত্ব, আত্মহনন, সুবিধাবাদী রাজনীতি, মানুষের নাছোড় উচ্চাশা, স্বপ্ন আর স্বপ্নভঙ্গের বেদনা বেশি করে জায়গা পায় তার গল্প-উপন্যাসে। উত্তরকালে শওকত আলী, হাসান আজিজুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, কায়েস আহমেদ, শহীদুল জহির প্রমুখ লেখক তাদের শিল্পরুচি ও সামর্থ্য দিয়ে বাংলা কথাসাহিত্যের যে উঁচু মান তৈরি করেছেন, তার পথনির্দেশক তো আজাদের মতো অগ্রজ লেখকরাই। পরের প্রজন্মের শক্তিমান লেখকরা যেমন তাদের শক্তিমত্তা দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়েছেন, তেমনি তাদের ভ্রান্তি থেকেও শিখেছেন অনেক কিছু।

ছাব্বিশ-সাতাশ বছর ধরে আলাউদ্দিন আল আজাদের সাহিত্যকর্ম পড়ে আসছি, বিশেষ করে তার উপন্যাস এবং ছোট গল্প। কিন্তু যখন থেকে আমরা তার রচনার সঙ্গে পরিচিত, তারও প্রায় ত্রিশ বছর আগে তিনি লেখাজোকা শুরু করেছিলেন। এখনো, এই বয়সেও অন্যূন ৭৫ বছর, তিনি লেখার ব্যাপারে উদ্যমী, নতুন পরিকল্পনার সূচক এবং সাধ্যমতো তার রূপায়ণকারী। তার সাম্প্রতিককালের কিংবা একেবারে এই মুহূর্তের লেখায় বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ কিছু নাও মিলতে পারে। কেননা শিল্পীর সৃজনসামর্থ্য সারাজীবন একইরকম থাকে না, বরং শেষ জীবনে তা অনেকটাই ক্ষয়ে আসে। ব্যতিক্রমীরা এ ক্ষেত্রে খুবই বিরল দৃষ্টান্ত। কিন্তু যে আগ্রহ তার শিল্পীজনোচিত আর্তি ও আকাক্সক্ষা এই লেখক তার ভেতরে জ্বালিয়ে রেখেছেন, আজো তা নিঃসন্দেহে শ্রদ্ধেয়।
সব্যসাচী লেখক পৃথিবীর সব ভাষার সাহিত্যেই বিরল। বাংলাদেশে বোধহয় বিরলতর। আলাউদ্দিন আল আজাদ সেই বিরল সাহিত্যিকদেরই একজন। শুধু তা-ই নয়, তিনি অগ্রগণ্য লেখকদের মধ্যে পড়েন। আজাদ লিখছেন অল্প বয়স থেকে। ছাত্রজীবনেই গল্প লিখে পাঠকের মনোযোগ কেড়েছিলেন। ছাত্রাবস্থায় প্রকাশিত হয় তার প্রথম গল্পের বই ‘জেগে আছি’। বইটি সে সময় যথার্থ প্রতিশ্রুতিবান তরুণ লেখকের সম্মান কুড়াতে সক্ষম হয়েছিল। তারপর থেকে সৃজনশীলতার সন্ধিৎসু আবেগে তিনি লিখে চলেন একটার পর একটা ছোটগল্প; খানিকটা পরিণত হয়ে উপন্যাস। আজাদ কয়েকটি নিরীক্ষাধর্মী নাটক এবং অসংখ্য কবিতাও লিখেছেন। কবি হিসেবেও তার অবস্থান স্পষ্ট। তিনি পঞ্চাশের দশকের কবিদের প্রথম সারির না হলেও দ্বিতীয় সারির প্রথমদিকের একজন বলে মনে করি।
লেখক জীবনের গোড়ার বছরগুলোতে কবি হিসেবে সুপরিচিতি পেলেও আলাউদ্দিন আল আজাদ পরবর্তী চার দশকে বিবর্তিত হয়েছেন একজন শক্তিমন্ত কথাসাহিত্যিক রূপে। তার ছোটগল্পের অনেকগুলোতেই ‘বিন্দুর ভেতরে সিন্ধু’ থিওরির প্রমাণ মিলবে; মিলবে ভাবের দিক থেকে, দৃষ্টিভঙ্গির আধুনিকতার নিরিখে। সমাজভাবনা, চরিত্রপাত্রের বিশ্লেষণ আর শিল্পোদ্বেগÑ এ তিনে মিলে তার ছোটগল্প হয়েছে আকর্ষণীয়। সেগুলোর আকর্ষণী হওয়ার পেছনে অন্য কারণও আছে। তা হচ্ছে ভাষার ব্যবহার। হ্যাঁ, আঠালো এবং বীক্ষণমূলক একটি গল্পভাষা আরো করেছিলেন তিনি, যা না থাকলে কাহিনীকার হওয়া সম্ভব, কথাশিল্পী নয়। আজাদের ‘বৃষ্টি’ নামে একটি গল্পের কথা বলবো। ষাট বছর বয়সী এক বৃদ্ধের তৃতীয় পক্ষের বাইশ বছরের স্ত্রীর সঙ্গে তার প্রথম পক্ষের ছেলের দেহমনের সম্পর্ক চিত্রিত হয়েছে এ গল্পে। জীবন বাস্তবতা আর অনতিক্রম্য মানস পরিস্থিতি দক্ষ হাতে রূপায়িত হয়েছে এখানে। মানব-মানবীর যৌন তাড়না, অবদমিত মনের ইচ্ছা এবং রহস্যময় পরিস্থিতি যথেষ্ট খোলামেলাভাবে হাজির করেছেন লেখক। বিষয়ের প্রতীকী ব্যঞ্জনা, প্রযুক্ত গদ্যভাষার ধরনটির অনিবার্যতা গল্পটিকে করে তুলেছে অসামান্য। তার গল্পে প্রাচুর্য আমাদের সমীহা জাগায়। একইসঙ্গে গল্পগুলোর ভেতরের ভাবস্বাতন্ত্র্যও আমাদের দৃষ্টি এড়াতে পারে না। তাই দেখা যায়, ভাষার প্রসাদ, কবিসুলভ কল্পনা, সৃজনী আবেগ, পরিপার্শ্বচেতনা, সমাজবীক্ষাÑ এ সবকিছু নিয়েও তার একটি গল্প আরেকটি থেকে কতো আলাদা। সেটা সম্ভব হয়েছে ট্রিটমেন্টের কারণে, কথাশিল্পীসুলভ অ্যাপ্রোচের কারণে। ‘অন্ধকার ‘সিঁড়ি’, ‘টেকনাফ’, ‘লাল জুতো’, ‘নীল জমিন’, ‘পতন’ নামের ছোটগল্পগুলোতে আমার এই বক্তব্যের সমর্থন মিলবে।
ছোটগল্প, গত শতাব্দীর বিখ্যাত ইংরেজ সমালোচক ডেভিড ডেইচেসের ভাষায় ‘ধ ংষরপব ড়ভ ষরভব’। কথাটির সূত্র ধরে আমরা বলতে পারি, জীবনের খুবই তাৎপর্যময় কিছু মুহূর্তের শৈল্পিক রূপায়ণ হচ্ছে ছোটগল্পের কাজ। তা ধারণ করে কোনো একটি ছোট ঘটনা কিংবা চিন্তাসূত্র কিংবা কল্পনানিবিড় মনের উদ্ভাস। তার ভেতর দিয়ে কেবল রচনাকর্মটির বৈশিষ্ট্যই নয়, লেখকমনের কাঠামোও পরিস্ফুট হয়। ক্ষমতাবান সাহিত্যিক অভিজ্ঞতার নির্যাস তুলে আনেন স্বপ্নের ছোঁয়ালাগা বাস্তবানুগ বর্ণনায়। সুতরাং গ্রহণ-বর্জনের বিষয়টি এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্ববহ। সচেতন অভিজ্ঞতাই একজন লেখককে আপাত অপ্রাসঙ্গিক, দূরবর্তী জিনিসকেও গল্পের প্রাসঙ্গিকতায় যুক্ত করতে প্ররোচিত করে। আবার বৃত্তান্তের বাহুল্য অথবা অনুষঙ্গের অতিরেক বিষয়েও গুণী লেখক সচেতন আজাদের বেশকিছু গল্পে (ইতিমধ্যে উল্লিখিত) প্রাগুক্ত গ্রহণ-বর্জনের ভারসাম্য সুন্দরভাবে রক্ষিত হয়েছে। তার ছোটগল্পের শিল্পসিদ্ধি সম্বন্ধে আরো দুটি কথা বলা প্রয়াজন। ‘বৃষ্টি’ গল্পের পটভূমি খরার সময়ে লেখকের গ্রামে সংঘটিত একটি সামাজিক ঘটনা। এটা খরার সময়ের গল্প, কিন্তু মানব-মানবীর যৌনক্রিয়া ও প্রজনন ক্ষমতার আইডিয়ার সঙ্গে উর্বরতার সূত্রটি (ঋবৎঃরষরঃু পঁষঃ) প্রতীকীভাবে ব্যবহৃত হয়েছে এখানে। গল্পের শেষে যে যুৎসই সংলাপ বক্রোক্তির বলিষ্ঠতা নিয়ে অস্তিত্বমান, তা ওই রচনাটির শক্তি বাড়িয়ে দিয়েছে অনেকখানি।
এবার আলাউদ্দিন আল আজাদের উপন্যাস নিয়ে কথা বলা যাক। স্বভাবের বিচারে তার উপন্যাসগুলো রোমান্টিক। একইসঙ্গে জীবনবাদী। লেখকের নিজের জীবন সম্বন্ধে বলা যায়, তা একইসঙ্গে জ্ঞানমুখী বিদ্যা ও কলাবিদ্যার পরিচর্যার শক্তি আর দুর্বলতাÑ দুয়ে মিলেই মোটামুটি সার্থক। এ পর্যন্ত ত্রিশটি উপন্যাস লিখেছেন আজাদ। তার মধ্যে আছে দৈনিক পত্রিকার ঈদ ম্যাগাজিনের জন্য লিখিত বেশ কয়েকটি উপন্যাস; যেগুলোকে উপন্যাস নয়, দীর্ঘ গল্প বললে সঠিক বলা হয়। ‘তেইশ নম্বর তৈলচিত্র’ তার জনপ্রিয় উপন্যাস। শিল্পীর অপূর্ণতাবোধ, বেদনা এবং অশেষ সৌন্দর্যতৃষ্ণা এ উপন্যাসের প্রধানতম থিম। ‘শীতের শেষ রাত বসন্তের প্রথম দিন’ও বেশ আলোচিত উপন্যাস। এর অন্যতম কারণ উপন্যাসে অবচেতনাগত লিবিডোচিত্রের প্রবল উপস্থিতি। এ দুটিই বই, পাশাপাশি আঞ্চলিক উপন্যাস ‘কর্ণফুলী’ এবং এপিক বৈশিষ্ট্যের ছোঁয়ালাগা উপন্যাস ‘ক্ষুধা ও আশা’ আজাদের লেখক ইমেজে পিলারের ভূমিকা রাখছে। উপন্যাস চতুষ্টয় যেন মজবুতভাবে তৈরি গৃহের চারটি স্তম্ভ। এগুলোই তার অগ্রগণ্য সাহিত্যকর্ম। এগুলোর ভেতরেই তিনি বেঁচে থাকার প্রেরণা খুঁজে পেয়েছেন। তার লেখাজোকার, বিশেষত গদ্যের অন্যতম চারিত্র হচ্ছে ভাবালুতাবর্জিত আধুনিক জীবনদৃষ্টি। বিষয়ভাবনা, লেখার স্টইল এবং চিন্তাচেতনার প্রগতিশীলতাÑ সব দিক থেকেই আজাদ একজন আধুনিক মানুষ। খোলা চোখ এবং সংস্কারমুক্ত মন নিয়ে, সেই মনে শিল্পীজনোচিত জিজ্ঞাসা ধারণ করে তিনি এখনো নিরলস লিখে চলেছেন গদ্য-পদ্য।
শিল্পীর মনের টানাপড়েন এবং নতুন ধরনের মূল্যবোধের কারণে ‘তেইশ নম্বর তৈলচিত্র’ প্রসিদ্ধ হলেও এ উপন্যাসের অন্য উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে এর নায়ক পরিকল্পনা। নায়কের পালাবদল ঘটেছিল সেই চল্লিশের দশকে, সমরেশ বসুর ‘বিবর’ উপন্যাসের মধ্য দিয়ে। তার আগে নায়ক বলতে আমরা বুঝতাম আদর্শবাদী চরিত্র। সমরেশ বসুই প্রথম একটি লম্পট ও প্রতারক চরিত্রকে নায়কের মর্যাদা দেন। দেশ ভাগ পরবর্তী বাংলাদেশের (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের) উপন্যাসে সৈয়দ শামসুল হক, আলাউদ্দিন আল আজাদ, রশীদ করিম প্রমুখের হাত ধরে এলো এমন নায়ক যিনি মধ্যবিত্ত শ্রেণীর প্রতিনিধি। তারা শুধু মধ্যবিত্ত নয়, একইসঙ্গে বাঙালি মুসলমানও। তা সত্ত্বেও বাবর আলী (উপন্যাস: ‘খেলারাম খেলে যা’, সৈয়দ হক), জাহেদুল ইসলাম (‘তেইশ নম্বর তৈলচিত্র’-এর নায়ক), কামাল (উপন্যাস: ‘শীতের শেষ রাত বসন্তের প্রথম দিন’, আলাউদ্দিন আল আজাদ) প্রমুখ ব্যক্তি আদর্শ ও মূল্যবোধের দিক থেকে প্রথাগত চরিত্র নয়। চিন্তাভাবনায় তারা আধুনিক ও উদারনৈতিক। ‘তেইশ নম্বর তৈলচিত্র’তে দেখা যাচ্ছে, জাহেদ স্ত্রীর তলপেটে বিয়ের আগে সন্তান ধারণের চিহ্ন দেখে মানসিক দ্বন্দ্বে জর্জরিত। কিন্তু অনেক দিন-রাত্রির মানসিক টানাপড়েনের পর শিল্পীশোভন ভালোবাসা আর মানবিকতার দ্বারা প্রণোদিত হয়ে সে ওই দুশ্চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দেয়। জয়ী হয় আধুনিক শিল্পীর মূল্যবোধ। কিন্তু এসবের ভেতর দিয়ে ঔপন্যাসিক মধ্যবিত্ত নাগরিক জীবনেরই বিশ্বাস্য ছবি এঁকেছেন।
‘শীতের শেষ রাত বসন্তের প্রথম দিন’-এও আমরা অল্পবিস্তর একই চিত্র পাই। তবে এটা আজাদের পরিণততর উপন্যাস। আগের মতো আদর্শবাদী রোমান্টিকতা এখানে নেই। আছে সামাজিক বাস্তবতার নিপুণ ছবি আর গ্লানিময় জীবনের অপ্রিয় সত্য। কাহিনীটা একটু বলি। স্বামীহীনা মধ্যবয়সী বিলকিস বানু দুই সন্তানের মা। মামাতো বড় বোনের (জেবু আপা) ছেলে কামাল কিছুদিনের জন্য থাকতে এসেছে তার বাসায়। কামালের প্রতি বিলকিস বানু আকর্ষণ অনুভব করে। কিছুতেই এ আকর্ষণ সে এড়াতে পারে না, বরং মানসিক দ্বন্দ্বে ভোগে। বিলকিস কামালকে বাস্তবে কাছে পায় না, পায় স্বপ্নে। স্বপ্নে তার সান্নিধ্যে আসামাত্র বিলসিক বানুর দেহে রোমাঞ্চ জাগে, মনে ঝড় ওঠে। পরমুহূর্তেই স্বপ্নটি ভেঙে যায়। জেগে ওঠে তিনি আবিষ্কার করেন, কামাল ও তারই মেয়ে পারভিন প্রেমের আলিঙ্গনে আবদ্ধ। বিলকিস বানুর এ উপলব্ধি হয় যে, তার জীবনে শখ-আহ্লাদের মৌসুম বিগতপ্রায়; কিন্তু পারভীন-কামালের মতো তরুণ-তরুণীর জীবনে বসন্ত সমাগত। এবং জীবনের স্বাভাবিক ধর্ম এটাই। বইটিতে প্রধান চরিত্রের যে আত্মসমীক্ষা এবং কেন্দ্রীয় চরিত্রে বিলকিসের যে আত্মোপলব্ধি পাওয়া যায়, তা লেখকের বিস্তৃত জীবনাভিজ্ঞতারই ফসল।
একাধিক সমালোচক ‘ক্ষুধা ও আশা’কে মহাকাব্যিক বলেছেন কেন? উপন্যাসটি আকৃতিতে ঢাউস বলে? নাকি লেখক বিস্তৃত পটভূমিতে জীবনের সমগ্রতাকে স্পর্শ করতে চেয়েছেন বলে? মহাকাব্যে একটি কাহিনী বয়ানের স্বার্থে কবিকে ‘অজস্র পঙ্ক্তি লিখতে হয়। সামর্থ্যবান ঔপন্যাসিকও একটি বড় বিষয়কে ধরার জন্য শত শত পৃষ্ঠা ব্যয় করেন। কিন্তু দেখতে হবে পৃষ্ঠাগুলো ব্যয়িত হয়েছে কীভাবে, কী রকম ভাষা ও জীবনপ্রত্যয়ের ভেতর দিয়ে অগ্রসর হয়েছে সেই উপন্যাস। মনে রাখা খুবই জরুরি যে, কেবল বিশাল পটভূমি অসংখ্য চরিত্রসমেত প্রলম্বিত কাহিনী আর ঘটনার প্রাচুর্যই নয়, বরং বড় ক্যানভাসে যুগধর্ম এবং জীবনদর্শনের সমন্বিত শিল্পরূপ এপিক নভেলের লক্ষ্যযোগ্য বৈশিষ্ট্য। মহাকাব্যিক উপন্যাস বেড়ে ওঠে সুনির্দিষ্ট থিম, ভাষা ও কুশীলবদের নিয়ে। তার ভাব ও বিশ্বাস অনেকখানি আদর্শায়িতও বটে। সন্দেহ নেই ‘ক্ষুধা ও আশা’ লেখকের সুপরিকল্পনা আর পরিশ্রমের ফসল।
সমকালের অনুভব রাশিকে চিরকালের তারে বেঁধে দেয়ার আন্তরিক প্রয়াসও এখানে লক্ষ্য করা যায়। এসব সত্ত্বেও আমার ধারণা, এপিক নভেলের উপযোগী ব্যতিক্রমী জীবনভাবনা ও আত্মদর্শন এখানে অনুপস্থিত। এই মোটা বই, অতএব, ঠিক মহাকাব্যিক উপন্যাস নয়। এটাকে বরং এপিক নভেলের কতিপয় লক্ষণে আক্রান্ত রচনা বলা যেতে পারে। আজাদের এই উচ্চাশী উপন্যাসে চল্লিশ দশকের বড় বড় ঘটনা আছে। দুর্ভিক্ষ, মহামারী, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, রাজনৈতিক আন্দোলন-অনশন… প্রায় সবই এতে উপস্থিত। বলা চলে, সমাজ বাস্তবতার বর্ণনায় তিনি নিখুঁত হতে চেয়েছেন। মানুষের সব প্রবৃত্তি এখানে প্রকাশিত। কিন্তু বেশিরভাগ চরিত্রকে বাস্তব মনে হয় না। কোথায় যেন একটা কমতি আছে। সে কারণে বইটি মনের মধ্যে প্রগাঢ় ছাপ ফেলতে পারে না।
‘কর্ণফুলী’ আলাউদ্দিন আল আজাদের অন্য উল্লেখযোগ্য উপন্যাস। এর পটভূমি চট্টগ্রাম। চট্টগ্রামের দুর্বোধ্য মুখের ভাষা এখানে অবিকল ব্যবহৃত হয়েছে। ভাষা ধারণ করে মনের আবেগ, হৃদয়ের অনুভূতি। সেদিকটা বিবেচনা করলে আঞ্চলিক ভাষার প্রয়োগ এখানে যথার্থ। ফর্ম কিংবা লিপিকৌশলের দিক থেকে ‘তেইশ নম্বর তৈলচিত্র’তে অভিনবত্ব নেই। কিন্তু থিমের বেলায় এর নতুনত্ব স্বীকার করতেই হবে। চিত্রশিল্পীর জীবন ও তার মানসিক দ্বন্দ্ব নিয়ে বাংলা ভাষায় আজাদের আগে কেউ উপন্যাস লেখেননি। সৃজনশীল মানুষের তাড়নাচ্ছিন্ন জীবন ও শিল্পকর্মের ভেতর একটি সমন্বয় স্থাপনের সৎচেষ্টা এতে লক্ষণীয়। আলাউদ্দিন আল আজাদ যে লেখক হিসেবে বৈচিত্র্যসন্ধানী, সেটা তিনি আরেকবার প্রমাণ করেছেন ‘কর্ণফুলী’ লিখে। কর্ণফুলী নদী তীরবর্তী এক বিশেষ অঞ্চলের ভূ-প্রকৃতি সেখানকার মানুষের প্রাত্যহিক জীবন, সেই জীবনের আশা-আনন্দ, বেদনা-বিষাদের বর্ণোজ্জ্বল একটি চিত্র পাওয়া যায় উপন্যাসটিতে। তারপরও প্রশ্ন থেকেই যায় আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার এবং বিষয়বস্তুগত আঞ্চলিকতা নিয়ে। এ দেশে একটি প্রবাদ সুবিদিত। তা হচ্ছে, এক জায়গার বুলি অন্য জায়গার গালি। ‘কর্ণফুলী’ পড়তে পড়তে কথাটির মর্মার্থ অনুভব করি। এ উপন্যাসে প্রযুক্ত ডায়ালেক্ট অকৃত্রিম। কোথাও কোথাও তা খাপও খেয়েছে চমৎকার; কিন্তু চট্টগ্রাম অঞ্চলের মানুষের মুখের ভাষা সম্বন্ধে সামান্য ধারণাও নেই, এমন পাঠকের কাছে কর্ণফুলীর অনেক চরিত্র সত্যিকার অর্থে দুর্বোধ্য ঠেকবে। এবার আঞ্চলিকতার প্রশ্ন। কোনো বিশেষ আঞ্চলকে পটভূমি করে রচিত হলেই তা প্রকৃত আঞ্চলিক উপন্যাস হয় না; দেখতে হবে তার আবেগ ও মূল সুরটি আরো অনেক অঞ্চলের মানুষকে স্পর্শ করছে কি না, অর্থাৎ শেষ বিচারে অনুভবের সর্বজনীনতাই আসল কথা। তা না থাকলে ‘আঞ্চলিক উপন্যাস’ শব্দবন্ধটির প্রয়োগ পাঠকের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়াবে শুধু। ইংল্যান্ডের একটি জনপদ সাসেক্সকে ভিত্তি করে রচিত টমাস হার্ডির ঞবংং ড়ভ ঃযব উ’ঁৎনবৎারষষবং, অদ্বৈত মল্লবর্মণের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ কিংবা অমিয়ভূষণ মজুমদারের ‘মহিষকুড়ার উপকথা’ বোধহয় সার্থক আঞ্চলিক উপন্যাসের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। কেননা এসব লেখার বিষয়বস্তু, উপস্থাপনা, সর্বোপরি জীবনদৃষ্টি সব দেশের সবকালের মানুষকে নাড়া দিতে সক্ষম। সে ধরনের সক্ষমতা কি ‘কর্ণফুলী’ ধারণ করে?
উপন্যাসটিতে লালন, ধলাবির মতো চাকমা ভাষায় কথা বলা চরিত্রও আছে, যাদের মুখের ভাষা সরাসরি ব্যবহার করা হয়েছে। চাকমা কিন্তু চট্টগ্রাম অঞ্চলের উপভাষা নয়। আদিবাসী চাকমাদের ভাষার চেহারা সম্পূর্ণ আলাদা। এ ভাষার শব্দাবলী আলাদা, ব্যাকরণ আলাদা। বাক্য গঠনরীতি বাংলা উপভাষা থেকে পৃথক। এতে আছে প্রধানত বার্মিজ (আরাকানি) শব্দে কিছু চট্টগ্রামি উপভাষার শব্দ আর যৎসামান্য বাংলা শব্দ। সে জন্য সাধারণ পাঠকের কাছে বইটির সংলাপমুখর অনেক অংশ দুর্ভেদ্য মনে হওয়া স্বাভাবিক। ঔপন্যাসিক যদি বইয়ের শুরুতেই চাকমা ভাষার এবং চট্টগ্রামের উপভাষার শব্দগুলোর (যেগুলো বইয়ে পৌনপুনিকভাবে ব্যবহৃত) একটা তালিকা দিতেন, তা হতো দূরদর্শিতার পরিচায়ক। সেটা না করে তিনি পাঠককে বিভ্রান্তিতে ভোগার সুযোগ করে দিয়েছেন।
আজাদ প্রথাগত রচনাশৈলীকেই তার কথাসাহিত্যে কাজে লাগিয়েছেন নিজের মতো করে। তার যা কিছু অর্জন তা প্রধানত বিষয়বস্তুভিত্তিক জীবনদর্শন ও শিল্পবিশ্বাসভিত্তিক।
পাঁচের দশকের কথাসাহিত্য প্রসঙ্গে দুটি দিক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এক. বাঙালি মুসলমান লেখকের আগমন। আর্থ-সামাজিক, ধর্মীয় ও শিক্ষাগত কারণে এ আগমন যথেষ্ট বিলম্বিত হয়েছিল। দুই. পাশ্চাত্যের ভাবধারা প্রভাবিত আধুনিক সাহিত্যের শক্ত ভিত স্থাপন। ভিত অবশ্য কিছুটা তৈরি হয়েছিল মুখ্যত সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, শওকত ওসমান, গৌনত আবু রুশদ, মাহবুবুল আলম, শাহেদ আলী প্রমুখের হাতে। পঞ্চাশের কথাকাররা তাতে বলিষ্ঠতা যোগ করেন। আলাউদ্দিন আল আজাদসহ তার প্রজন্মের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য ঔপন্যাসিকের বোঝার স্বার্থে, তাদের রচনাকর্মের উৎকর্ষ অনুধাবন এবং রস গ্রহণের সুবিধার্থে উপরের কথাগুলো মনে রাখা প্রয়োজন।
পাশাপাশি এটাও বিস্মৃত হলে চলবে না যে, সদ্য স্থাপিত পাকিস্তানের মুসলিম জাগরণবাদের যুগের আজাদ নৌকা বেয়েছেন স্রোতের উজানে। বাইরে থেকে চাপিয়ে দেয়া সস্তা ভাববাদ দ্বারা প্ররোচিত না হয়ে তিনি শিক্ষা নিয়েছেন জীবনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে। ওই নতুন অভিজ্ঞতা রসদ জুগিয়েছে নতুন যুগের বার্তাবহ নতুন সাহিত্যের। সে সময় মুক্তমনা আধুনিক ভাবুকদের মিছিলে শামিল হয়েছিলেন অনেকেই। কিন্তু আজাদ তাদের ভেতরেও ব্যতিক্রমী। কেননা সৃষ্টিশীল লেখালেখি ছাড়াও সাহিত্যের রূপ নির্মাণ ও রসনিষ্পত্তি বিষয়ে এবং নান্দনিকতার ব্যাখ্যার ওপর বেশকিছু প্রবন্ধ তিনি লিখেছেন। সেগুলো ‘শিল্পীর সাধনা’, ‘সাহিত্যের আগন্তুক ঋতু’ প্রভৃতি বইয়ে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
পঞ্চাশের দশকের শেষদিকে আজাদের শিল্পচেতনা উল্লেখযোগ্য মোড় নেয়। ফলে পাল্টে যায় তার লেখার বিষয় ও ভাবনারীতি। আর্তবিপন্ন মানুষের জীবনসংগ্রাম, মনোবিশ্লেষণ, ফ্রয়েডীয় যৌনতত্ত্ব, আত্মহনন, সুবিধাবাদী রাজনীতি, মানুষের নাছোড় উচ্চাশা, স্বপ্ন আর স্বপ্নভঙ্গের বেদনা বেশি করে জায়গা পায় তার গল্প-উপন্যাসে। উত্তরকালে শওকত আলী, হাসান আজিজুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, কায়েস আহমেদ, শহীদুল জহির প্রমুখ লেখক তাদের শিল্পরুচি ও সামর্থ্য দিয়ে বাংলা কথাসাহিত্যের যে উঁচু মান তৈরি করেছেন, তার পথনির্দেশক তো আজাদের মতো অগ্রজ লেখকরাই। পরের প্রজন্মের শক্তিমান লেখকরা যেমন তাদের শক্তিমত্তা দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়েছেন, তেমনি তাদের ভ্রান্তি থেকেও শিখেছেন অনেক কিছু।
বাংলাদেশের সামগ্রিক সাহিত্যরুচির বিচারে আলাউদ্দিন আল আজাদ একজন অগ্রণী লেখক। বলা উচিত, ষাটের দশকের প্রাগ্রসর গদ্যশিল্পীদের কাছাকাছি তার অবস্থান। গল্প-উপন্যাসে কবিত্বময় ভাষা, বাকনির্মাণের চমৎকারিত্ব যুগোপযোগী ভাবুকতা তাকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। খুঁটিয়ে পড়লে দেখা যাবে, তার কথাসাহিত্যে নানারকম ত্রুটি আছে। ত্রুটি-বিচ্যুতি কার লেখায় নেই? কিন্তু জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা, বিষয়ভাবনা আর লিপিকুশলতার সমন্বয়েই গড়ে উঠেছে তার ভাবমূর্তি। সেটা বহুদিন পর্যন্ত উজ্জ্বল থাকবে বলেই মনে হয়।


http://www.munshigonj.com/MGarticles/2009/SarkarAzad.html

Saturday, June 20, 2009

এলিস ওয়াকার উপন্যাসের নতুন ভুবন

সরকার মাসুদ
আফ্রো-আমেরিকান লেখা এলিস ওয়াকারকে কি আমরা নারীবাদী বলবো? তা হয়তো বলবো না। কিন্তু তিনি নারীর এমন কিছু সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে উপন্যাস লিখেছেন যা অনেক নারীবাদী লেখকেরও দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে। এলিস দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছেন কথাসাহিত্যের মাধ্যমে Mutilation (বিক্ষতকরণ)-এর বিরোধিতা করে। শুধু তাই না, আফ্রিকান নারীরা আরো যত রকমভাবে নিগৃহীত-নির্যাতিত হয়ে থাকে সেসবও উপজীব্য হয়েছে তার উপন্যাসে। বিষয়টি একটু পরিষ্কার করে বলা দরকার। আফ্রিকার আদিবাসীদের মধ্যে এই শতাব্দীতেও প্রাচীন বিশ্বাস এখনো অটুট যে, কাদার পি- থেকে মানুষরূপে প্রাণীর উদ্ভব। আদি পিতা বা বিধাতা কাদার পি- ছুড়ে মেরেছিলেন বিভিন্ন দিকে। এভাবে পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর ও দক্ষিণের সৃষ্টি হয়। সৃষ্টিকর্তা ‘আম্মা’ প্রথমে যে মানুষের শরীর সৃষ্টি করলেন তা একটি নারীর দেহ। দেহটি পিঠ মাটিতে রেখে চিৎ হয়ে শুয়ে থাকলো। ‘আম্মা’ দীর্ঘ দীর্ঘকাল একা ছিলেন। নিঃসঙ্গতা দূর করার জন্য তিনি রমণী শরীর সৃষ্টি করে তার সঙ্গে মিলিত হওয়ার চেষ্টা করেন। সঙ্গমের কাজে তিনি বাধাপ্রাপ্ত হন। তার কারণ নারীর যৌনাঙ্গে পুরুষসুলভ কিছু শক্ত ব্যাপার ছিল। ‘আম্মা’ তখন রমণীর যোনি থেকে কিছু কঠিন অংশ ছেঁটে ফেলে দেন। এভাবে নারীর যৌনাঙ্গ বিক্ষত করার প্রথাটি চালু হয়।

আফ্রিকার আদিবাসীরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে, কোনো পুরুষ অথবা নারী একসঙ্গে নারী-পুরুষ হতে পারে না। পুরুষকে পুরুষই হতে হবে এবং নারীকে তার সব বৈশিষ্ট্য নিয়ে নারী। ফলে পুরুষাঙ্গের অগ্রভাগের চামড়া এবং নারীর ভগাঙ্কুর ছেঁটে ফেলার প্রয়োজন দেখা দেয়। এভাবে পুরুষ যৌনতার ক্ষেত্রে তার নিজত্ব প্রতিষ্ঠিত করে। সুদীর্ঘকাল প্রথাটি চালু আছে আফ্রিকায়। কেবল সাধারণ মহিলাদের বেলায় নয়, এটি প্রযোজ্য হয়েছিল ক্লিওপেট্রা, নেফারতিতি প্রমুখ কুলীন নারীদের বেলায়ও। আজ যারা আফ্রো-আমেরিকান তাদের মধ্যেও প্রথাটি অস্তিমান। আফ্রিকা ও আমেরিকা ছাড়াও মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরোপের অসংখ্য নারী এই প্রথার কবলে পড়ে বিক্ষতযোনি হয়েছে। এর ফলে মাত্রাতিরিক্ত রক্তক্ষরণ কিংবা ইনফেকশনের কারণে লাখ লাখ নারী প্রাণ হারিয়েছে; হারাচ্ছে এখনো। গত শতাব্দীর আশির দশকে প্রথাটির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ অঙ্কুরিত হয়। ইউরোপে এখন এর প্রতিবাদ সোচ্চার। জাতিসংঘের বক্তব্যের সঙ্গে গলা মিলিয়ে সে অঞ্চলের মানুষ বলছে, নারী শরীরের নিজস্বতার ভেতর দিয়েই তার ব্যক্তিসত্তার ও আনন্দের প্রকাশ ঘটে থাকে। এটা তার একান্ত নিজের বিষয়। তার ওই নিজস্বতাকে বিকৃত করার অধিকার নেই কারো। ইউরোপের বাইরেও অগ্রসর মানবগোষ্ঠীর মধ্যে এই মত দ্রুত প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। Mutilation ইতিপূর্বেই প্রবন্ধের বিষয়বস্তু হয়েছে। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে কথাসাহিত্য প্রথম রচিত হয়েছে এলিস ওয়াকারের হাতে। এ বিষয়ে এলিস একাধিক উপন্যাস লিখেছেন। আমি তিনটির নাম বলবো
১. Possessing the secret of joy
২. The Color Purple
৩.The Temple of my Familiar.
প্রথম উপন্যাস ‘দ্য কালার পারপল’ দুটি পুরস্কার জিতে নেয়। একটি হচ্ছেÑ ‘আমেরিকান বুক অ্যাওয়ার্ড’ অন্যটি ‘পুলিৎজার প্রাইজ’।
Possessing the secret of joy সম্বন্ধে আলোচনা করা যাক প্রথমে। ইংরেজি নামটির বাংলা করলে দাঁড়াবে ‘আনন্দের রহস্যের অধিকার লাভ’। কথাটির দ্বারা লেখক কি বুঝিয়েছেন? দেহসম্পর্কিত পূর্ণ অধিকার থেকে একজন নারী যে অপরিসীম আনন্দ পায়, অন্য কোনো উপায়ে সে তা পায় না। নারীর আনন্দের এই অধিকার জন্মগত। সৃষ্টি প্রক্রিয়ার কারণে ঈশ্বর তাকে যেসব বিশিষ্ট অঙ্গের এবং রমণীসুলভ যেসব অনুভূতির অধিকারী করে তুলেছে তাকে বিকৃত বা নষ্ট করতে পারে না কেউ। নারীসুলভ সজীবতা আর রহস্য তার একান্ত নিজের জিনিস। এটাকে সংরক্ষণ করার অধিকার আছে বিশ্বের প্রতিটি নারীর। কিন্তু পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় পুরুষ যখনই তার নিজস্ব যৌনতার রূপ নির্মাণ করতে চাইলো, গোলমালটা লাগলো তখনই। কেননা নারী অঙ্গ বিক্ষত করার ভেতর দিয়ে নারীকে শারীরিকভাবে উপভোগের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। `Possessing the secret of joy’’ উপন্যাসে এলিস ওয়াকার তাশি নামের এক আফ্রিকান নারীর জীবন কাহিনীর ভেতর দিয়ে রমণীর এই অধিকারের কথা ব্যক্ত করেছেন। লেখক তাশিকে আফ্রিকা এবং ইউরোপের বিপরীতধর্মী দুই ধরনের সংস্কৃতি-সংস্কারের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন। তাশির শৈশব-কৈশোর অতিবাহিত হয় আফ্রিকার সংস্কারাচ্ছন্ন আদিম সমাজে। যৌবনের বেশিরভাগ সময় সে কাটিয়েছে উত্তর আমেরিকায়। জীবনের গোড়ার দিকে আফ্রিকায় থাকার ফলে সে দেশের সংস্কার ও প্রথার প্রতি তার অনুগত্য জন্মেছিল। সুতরাং যৌনাঙ্গ বিক্ষত করার বিষয়টি সহজভাবে মেনে নিয়েছিল সে। সে জন্য পরে অবশ্য তাকে অনেক ভুগতে হয়।

আফ্রিকায় যৌনি বিকৃত করার কাজে নিয়োজিত মহিলাদের বলা হয় ‘সুঙ্গা’। সুঙ্গার ধারালো চাকুর কাজটিকে মেনে নিলেও তাশির শরীরে ও মনে যে ভীতির সঞ্চার হয়েছিল তা থেকে সে নিষ্কৃতি পায়নি। `trauma’’-এর (দীর্ঘস্থায়ী মানসিক আঘাত) অভিজ্ঞতা তাকে বিপর্যস্ত করে তোলে। মাঝে মাঝে তাশি ভাবে, সে উন্মাদ হয়ে যাবে যদিও সে মানসিক ভারসাম্য শেষ পর্যন্ত হারায়নি। ইউরোপের উন্নত চিকিৎসা পদ্ধতির সুযোগ কাজে লাগিয়ে সে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে গেছে। এ ক্ষেত্রে মনঃসমীক্ষণ পদ্ধতিটি তার খুব কাজে লেগেছিল।

সুস্থ হওয়ার পর তাশি একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজেফেরে। কি কারণে নারীর যৌনাঙ্গ বিকৃত করার নিষ্ঠুর প্রথাটি প্রবর্তিত হয়েছিল আফ্রিকার আদিম সমাজে? সে প্রাচীন আফ্রিকার নানারকম মিথ-এর সন্ধান করতে থাকে। তাশির মন থেকে অবশেষে ভীতি দূর হয়, যখন সে এই প্রথার পেছনের কারণটি জানতে পারে। তার মধ্যে দার্শনিকসুলভ একটি বোধ জাগে। জীবন ও মৃত্যু সম্বন্ধে সে সচেতন হয়ে ওঠে। মৃত্যুচেতনা তার মধ্যে বরাভয়ের জন্ম দেয়। তাছাড়া তার নিজের ভাগ্যে এবং হাজার হাজার আফ্রিকান নারীর ভাগ্য অভিন্ন এমনটা ভেবে তাশি সান্ত¡না খুঁজে পায়। মৃত্যুর কাছাকাছি পৌঁছে যে উপলব্ধি করে তার মনে ভয়ের লেশমাত্র নেই।

তাশির শৈশব-কৈশরের শান্তি নিরুদ্বেগ ও মধুর ছবি এঁকেছেন এলিস। তার যৌবনকালের একটি বড় অংশ জিজ্ঞাসাদীর্ণ এবং বেদনাময়। জীবনের শেষ অধ্যায়টি শঙ্কামুক্ত ও প্রবোধনিবিড়। ছেলেবেলায় তাশির মা তাকে খুচরা পয়সা দিয়ে মহল্লার দোকানে পাঠাতো দিয়াশলাই কিনতে। কিন্তু প্রতিবারই সে দিয়াশলাই আনতে ব্যর্থ হতো, কারণ পয়সা হারিয়ে ফেলতো। আর মায়ের প্রহারের হাত থেকে বাঁচার জন্য পয়সা হারানোর রূপকথাসুলভ একটি গল্প বলতো। ক্রুদ্ধ মায়ের তিরস্কার থেকে অবশ্য সে রেহাই পেতো না। বকাঝকা খেয়ে তাশি কান্না শুরু করে দিতো। তার দুগাল বেয়ে ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু ঝরে পড়তো। দিয়াশলাই এবং অশ্রু এই উপন্যাসের দুটি শক্তিশালী প্রতীক বলে মনে হয়। তাশি আগুন জ্বালাতে পারেনি, বরঞ্চ নিজেই নিভে গেছে। সে কি পুরোপুরি নিভে গিয়েছিল, নাকি নিভু-নিভু অবস্থায় ছিল, এই প্রশ্নটি করা যায়। কেননা, ভেতরে যদি আগুন না-ই থাকবে, তাহলে সুঙ্গা মহিলাটিকে (যে তার ভগাঙ্কুর উচ্ছেদ করেছিল) খুন করলো কীভাবে? শৈশবের ওই যে কান্না, সেটাই যেন তাশির সারাজীবনের দুর্ভাগ্যের প্রতীক।

আমৃত্যু বঞ্চনার তিক্ত অভিজ্ঞতা বয়ে বেড়িয়েছে সে, তা সত্ত্বেও হাল ছাড়েনি; স্বপ্ন দেখার চেষ্টা করে গেছে।
পাঠকের মনে হতে পারে, তাশি খুন করতে গেল কেন। কিন্তু সংবেদি পাঠকের এও মনে হতে পারে যে, এছাড়া তার অন্য কোনো উপায় ছিল না। প্রতিশোধের উদ্দেশ্যে খুন করা অথবা উন্মাদ হয়ে যাওয়া, এর মাঝখানে আর কোনো বিকল্প ছিল না। গভীর মনোবেদনার জটিল আবর্তে ঘুরপাক খেতে খেতে তাশি এক সময় সুঙ্গা রমণীটিকে হত্যাই করে বসে। আসামি হিসেবে যে যখন বিচারের কাঠগড়ায় তখন সে বুঝতে পেরেছিল, তাকে মৃত্যুদ- দেয়া হবে। তাশি কিন্তু মৃত্যুভয়ে কাতর ছিল না আদৌ, বরং মনে মনে তৈরিই ছিল। এই প্রস্তুতির কথা সে কাউকে বলতে চাচ্ছিল, অথচ জীবিত কোনো ব্যক্তিকে তা জানাতেও পারছিল না। সে তাই একজন প্রয়াত ব্যক্তিকে বেছে নেয় যার উদ্দেশ্যে সে চিঠি লিখবে। এই মৃত ব্যক্তিটি তাশির বান্ধবী একমাত্র বান্ধবী লিসেথ। তার সম্বন্ধে তাশি চিঠির গোড়াতেই লিখেছে যে, মৃত্যুর পরে পরলোকে তার একজন সঙ্গীনীর প্রয়োজন পড়বে। সে জন্য সে আশা করে, লিসেথের সঙ্গেই তার দেখা হবে সেখানে। লিসেথই তো একমাত্র মেয়ে যার সঙ্গে তার প্রকৃত ঘনিষ্ঠতা ছিল এবং যাকে সে গভীরভাবে ভালোবাসতো।

মাধুর্য, বেদনা, স্বপ্ন ও কল্পনা এই চারটি জিনিস দিয়ে তৈরি হয়েছে তাশির প্রতিমা। শেষের দিকে স্বপ্ন-কল্পনাই হয়েছিল তার একমাত্র আশ্রয়। সে যে তার আহূত-বেদনার্ত মনের গোপন কথা খুলে বলার জন্য জীবিত কাউকে নয়, বরং মৃত একজনকে নির্বাচন করেছিল এবং তাকে লক্ষ্য করে চিঠি লিখেছে সেটা তো প্রচ- কল্পনাপ্রবণ মনের বহিঃপ্রকাশ ছাড়া অন্যকিছু নয়। চিঠিতে তাশি ইনিয়েবিনিয়ে অনেক কথাই বলেছে। সে লিখেছে ‘… আমার মায়ের নিজস্ব জিনিস যেভাবে বিকৃত করা হয়েছিল, আমার বেলায়ও তাই করা হয়েছিল। আমার বোন দুরা একজন সুুঙ্গার ছুরির ঘায়ে মারা গেছে, তার রক্তপাত বন্ধ করা যায়নি। মায়ের কষ্টটা আমি বুঝতাম। সে জন্য আমি সুঙ্গা নারীকে খুন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। সুঙ্গারা বিশ্বাস করে যে, তাদের ছুরির আঘাতে যেসব মেয়ের নিজস্বতা ক্ষুণœ হয় তাদের মধ্যে কেউ না কেউ তাদের (সুঙ্গা) মেরে ফেলবে। সে জন্য যে সুঙ্গার অস্ত্রাঘাতে আমার বোন মারা পড়েছিল এবং আমি চিরকালের জন্য নিঃসঙ্গ হয়ে গিয়েছিলাম তাকে আমি খুন করেছি। আমি অস্ত্র দিয়ে তাকে হত্যা করিনি। ঘুমন্ত অবস্থায় মুখে বালিশ চাপা দিয়ে শ্বাসরুদ্ধ করে মেরেছি। আমি যে তাকে শুধু আমার জন্য খুন করেছি তা নয়। বহু যুগ ধরে যেসব নারী তাদের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য হারিয়ে আনন্দের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছে তাদের সবার পক্ষ থেকে আমি এ কাজ করেছি। সে জন্য আমার অপরাধবোধ নেই। আমি জানি, আফ্রিকার নারীরা এক সময় কত স্বাধীন ছিল। তাদের দেহের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ওপর তাদের পূর্ণ অধিকার ছিল, নিজেদের শরীরকে তারা জানতো। কিন্তু পশ্চিমা জগৎ তাদের দাসিতে রূপান্তর করে আর তখনই নেমে আসে অভিশাপ। আমার বিশ্বাস আফ্রিকার নারীরাই বিশ্বের তাবৎ নারীর মাতা। রমণী হিসেবে যদি কোনো জাতির নারী খুব কষ্ট পেয়ে থাকে এবং অসম্ভব অসহায়তার শিকার হয়ে থাকে তাহলে তারা হচ্ছে আফ্রিকার নারী। আমাকে ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে নিয়ে যাওয়া হবে যখন, আমি আমার চোখ দুটি বাঁধতে দেবো না। জীবনের শেষ মুহূর্তে চারপাশটা তাকিয়ে দেখবো অনেক দূরে যে পাহাড়টা নীল মনে হবে তার সৌন্দর্য উপভোগ করবো আর সেই মুহূর্তটিই হবে আমার অনন্ত মুহূর্ত।’ (অনুবাদ : লেখক)।

উপন্যাস লেখার ক্ষেত্রে এলিস ওয়াকার বেশ কায়দা-কৌশল অবলম্বন করেছেন। কখনো ধারাবাহিকভাবে গল্প বলে গেছেন, কখনো আবার পারম্পর্য ভেঙে দিয়েছেন। আবার ভাঙা জায়গাগুলো জোড়া লাগিয়েছেন। একটি কথা বলতে বলতে এসে যাচ্ছে অনেক কথা। কাহিনীর ভেতর নানা অনুসঙ্গ এসে ভিড় করেছে। একবার স্মৃতিকথা, একবার সংলাপ, একবার মানসিক যন্ত্রণার ব্যাখ্যা-বয়ান, আবার লেখকের বিশ্বাসজাত প্রতিবেদনও আছে। সব মিলে উপন্যাসের যে রূপকথা নির্মিত হয়েছে এক কথায় তা অসাধারণ।
`The Color purple’ উপন্যাসটি বের হয় ১৯৮২ সালে। এলিস ওয়াকার প্রধানত এই বইটির জন্য ‘পুলিৎজার প্রাইজ’ পেয়েছিলেন। এটাই তার খ্যাতি দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেয়। বাংলা করলে বইটির নাম দাঁড়ায় ‘বেগুনি-লাল রঙ’। একজন বঞ্চিত-নির্যাতিত নারীর জীবনযন্ত্রণা এবং তা অতিক্রম করে যাওয়ার চেষ্টাই হচ্ছে এই উপন্যাসের প্রধান থিম। মহিলাটির নাম চেলি। অত্যন্ত কুশলতার সঙ্গে চেলির ভাগ্যবিড়ম্বিত জীবনের কথা বয়ান করেছেন লেখক। নানারকম বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছে সে। কৈশরের (১৪ বছর বয়সে) পিতা তাকে ধর্ষণ করে। এই দুর্ঘটনাটি তার কোমল মনে দূরবিসারী প্রভাব ফেলেছিল। সেই দুঃসহ স্মৃতি সে কোনোভাবেই মন থেকে মুছে ফেলতে পারেনি।

‘দ্য কালার পারপল’ পড়ার সময় একই সঙ্গে বেদনার ও আনন্দের অনুভূতি হয়। তিক্ততার অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে আছে এর পাতায় পাতায়। কিন্তু শত নিগ্রহ-অবমাননার পরেও লেখক জীবনকে অস্বীকার করেননি। উপন্যাসটি চিঠির আকারে রচিত। একটি নয়, একাধিক চিঠি পাওয়া যায়। বেশিরভাগই ঈশ্বরের উদ্দেশে লেখা। ঈশ্বরের উদ্দেশে কেন? কারণ ধর্ষিতা নারী তার মনোকষ্টের কথা পৃথিবীর মানুষের কাছে জানাতে পারেনি। পৃথিবীতে যা কিছু ঘটছে সবই ঈশ্বরের নখদর্পণে। কাজেই অসহায় রমণীরা কতটা বিড়ম্বনা ও আত্মগ্লানির মধ্যে দিনাতিপাত করছে তাও তার ভালো করেই জানা। তাছাড়া ঈশ্বরই তো সেই অস্তিত্বের নাম যার কাছে একান্তে প্রার্থনা করা যায়, নালিশ জানানো যায় এবং যার ওপর নির্ভর করা যায়। চেলি জানতো তার একটি চিঠিও ঈশ্বর মহাশয় পাবেন না; পাওয়া সম্ভব নয়। তা সত্ত্বেও সে চিঠিগুলো লিখেছে। এসব চিঠি সে পুরুষ তো দূরের কথা, কোনো নারীর কাছেও লিখতে পারতো না। কেননা সে এমন এক হতভাগ্য মেয়ে, যে তার পিতার দ্বারা ধর্ষিত হয়েছে। চিঠিগুলো লেখার ফলে চেলি অবশ্য একটা বড় উপকার পেয়েছে। আত্মদুর্দশার কথা প্রকাশ করতে পারায় মনোবেদনা লাঘব হয়েছে অনেকখানি।

সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশে চিঠি লিখতে লিখতে একটা পর্যায়ে চেলি শঙ্কামুক্ত হয়; সান্ত¡নার অনূভূতি জন্ম নেয় তার মনে। সেই সঙ্গে পৃথিবীর মানুষের ওপর আস্থা রাখতে শেখে ধীরে ধীরে। বোন নেটটিকে সে বিশ্বাস করতে শুরু করে। নেটটি তাকে চিঠি লেখে। সেই চিঠি তার বিক্ষিপ্ত মনে সান্ত¡না ও শান্তির সুবাতাস বইয়ে দেয়। সবকিছু স্বাভাবিক হতে আরম্ভ করে। নেটটির পাঠানো চিঠিগুলো কেবল সান্ত¡না আর বরাভয়ই তুলে ধরেনি, আদিম আফ্রিকার ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্কিত নানা তথ্যও পরিবেশন করেছে। ইউরোপ যখন নগর সভ্যতার পত্তন হয়নি তখন, হাজার বছর আগে, আফ্রিকায় গড়ে উঠেছিল বড় বড় শহর। মিসরের প্রাচীন মানুষদের দ্বারাই নির্মিত হয়েছে পিরামিড। সে সময় দাস হিসেবে কাজ করতো কৃষ্ণবর্ণ ইসরায়েলরা। ইথিওপিয়া আফ্রিকার একটি বড় দেশ। কিন্তু সেই প্রাচীন যুগে ইথিওপিয়া বলতে সাধারণভাবে আফ্রিকাকেই বোঝাতো। এরকম আরো অনেককিছু আমরা জানতে পারি ওইসব চিঠির মাধ্যমে।

‘দ্য কালার পারপল’ উপন্যাসের ভেতর দিয়ে এলিস ওয়াকার ঈশ্বরের প্রতি প্রগাঢ় আস্থা এবং গভীর জীবনবাদিতা ফুটিয়ে তুলেছেন। অন্তর্লীন বেদনা আর উত্তরণ-উন্মুখ আত্মজিজ্ঞাসার পাশাপাশি পরিপক্ব এক আধুনিক লিপিকৌশল বইটিকে দিয়েছে উচ্চ স্তরের সাহিত্যকর্মের মর্যাদা। শুধু বিষয়বস্তু নয়, আঙ্গিক নিয়েও এবং প্রকাশ ভঙ্গির বৈচিত্র্য নিয়েও এলিস চিন্তাভাবনা করেন মনে হয়। উপন্যাসে স্থান পাওয়া সর্বশেষ চিঠিটি কেবল ঈশ্বরকে লক্ষ্য করে রচিত নয়। আরো নানাকিছুকে উদ্দেশ্য করে তা লেখা হয়েছে; সম্বোধনও করা হয়েছে সেভাবেই ‘হে প্রিয় ঈশ্বর প্রিয় তারাম-লী, প্রিয় গাছপালা, প্রিয় আকাশ, প্রিয় মানবজাতি …।’ বইটি পড়া শেষ করলে সব দুঃখ-দুর্দশাবোধের পাশাপাশি পাঠকের মনে গভীর সহানুভূতি ও ভালোলাগার অনুভূতি জাগবে। অন্য একটি চিঠিতে চেলির উদ্দেশে নেটটি লিখেছেÑ ‘পৃথিবীর মানুষ আমাদের জানতে চায়, সব দেশের কালো মানুষরা চায় আমরা আলো-বাতাসের মধ্যে থাকি, আমরা যেন বড় হই। তাদের ইচ্ছা, আমরা অতীতের দাসত্বের অনুভব অতিক্রম করে যাবো। আমাদের যে সন্তানরা আছে, তাদের আমরা যেভাবেই পাই না কেন, তারা তো ঈশ্বরেরই সন্তান আবার আমাদেরও সন্তান। এখন তাদের স্বার্থেই আমাদের মনে রাখতে হবে যে, আমেরিকায় থাকলেও আমরা আফ্রিকার অন্তরে অবস্থান করছি’। (অনুবাদ : লেখক)

এই উপন্যাসে আমরা যেসব চরিত্রের মুখোমুখি হই তারা খুব জীবন্ত। কোনো সন্দেহ নেই, এলিস রূপ নির্মাণে সুদক্ষ শিল্পী। এমনভাবে, এমনই মুন্সিআনার সঙ্গে তিনি চরিত্র সব সৃষ্টি করছেন যেন আমাদের সামনে তারা হেঁটে বেড়াচ্ছে। কেন্দ্রীয় চরিত্র চেলি তো আছেই, তাছাড়া নেটটি, হাজেরা, দুরা, লম্পট আলবার্ট যে কি না চেলি ও নেটটি দুই বোনের কাছে সাক্ষাৎ আতঙ্কের নাম, প্রভৃতি চরিত্র খুব সফলভাবে চিত্রিত হয়েছে উপন্যাসে। এলিসের গদ্য উল্লেখ করার মতো চরিত্রপাত্রের ছবি আঁকতে আঁকতে কিংবা কোনো পরিস্থিতি বর্ণনা করতে করতে লেখক নিজের কথা বলার জন্য ঢুকে পড়েন। এবং এমন ভঙ্গিতে কথা বলেন যে, অনায়াসে সেসব কথা কাহিনীর মূল স্রোতের সঙ্গে মিশে যায়।

এলিস ওয়াকার পরিশ্রমী লেখক। প্রায় গবেষকের সন্ধিৎসা নিয়ে তিনি কথাসাহিত্য রচনা করছেন। `Possessing the secret of joy’ সম্বন্ধে এ কথা বেশি প্রযোজ্য। তার কারণ আফ্রিকার আদিবাসীদের ভেতর সৃষ্টিতত্ত্ব সম্পর্কিত ধারণার ঐক্য নেই। তাদের মধ্যে অসংখ্য গোষ্ঠী, উপগোষ্ঠী এবং এক জাতিসত্তার ভাবনা-কল্পনার সঙ্গে অন্য জাতিসত্তার চিন্তাধারার খুব কমই মিল আছে। যে কারণে নারীর যৌনাঙ্গ বিকৃত করার বিষয়টি সম্বন্ধে বিস্তারিত জানার জন্য লেখককে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। `The color purple’ উপন্যাসে চেলিকে লেখা চিঠির এক জায়গায় নেটটি লিখেছিল … ‘আমেরিকায় থাকলেও আমরা বাস করছি আফ্রিকার অন্তরে।’ এটা তো আসলে ঔপন্যাসিকেরই মনের কথা। তার লেখকসত্তা আফ্রিকার হৃদয়ে বাস করে বলেই এ জাতীয় উপন্যাস তিনি লিখতে পেরেছেন।