Friday, May 20, 2011

গৃহকর্মী গৃহশ্রমিক নয় কেন!

নূর কামরুন নাহার
শ্রমের ওপর দাঁড়িয়ে আছে সমাজ, অর্থনীতি ও জীবনব্যবস্থা। কিন্তু শ্রমিকের শ্রম, ঘাম, দাম নিয়ে কথা হয় খুব কম। কারণ সে সমাজের প্রান্তীয় মানুষ। কেন্দ্রে অবস্থানরত মানুষের কাছে শ্রমের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও শ্রমিক মূল্যহীন। সারা বছর তাই শ্রমিকের বিষয়ে কথা হয় না। কারণ তার শ্রমের কোন স্বীকৃতিই নেই। শ্রমিক নামক প্রানত্মীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যেও সে প্রান্তে অবস্থান করে। সে গৃহশ্রমিক তবে তার নামের সঙ্গে শ্রমিক শব্দটি নেই। সে সাধারণভাবে 'কাজের বুয়া', 'কাজের মেয়ে', 'কাজের লোক' ও চাকর। সমপ্রতি অবশ্য তারা 'গৃহকর্মী' নামক একটি শব্দ লাভ করেছে।

লেবার ফোর্স সার্ভে ২০০৬-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে গৃহকর্মে নিয়োজিত মোট শ্রমিক ৩,৩১,০০০ (১৫ বছরের উপরে)। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান বু্যরোর জাতীয় শিশুশ্রম জরিপ ২০১০ সালের তথ্য অনুযায়ী গৃহকর্মে নিয়োজিত মোট শিশু (৫-১৭) শ্রমিক হচ্ছে ১ লাখ ২৫ হাজার। এর মধ্যে শতকরা ৮০ ভাগ মেয়েশিশু। তবে বিলস এবং শৈশব বাংলাদেশের মতো গৃহকমর্ীদের নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠানের মতে, দেশে বর্তমানে ২০ লাখেরও বেশি শ্রমিক গৃহকর্মে নিয়োজিত আছে।

এই বিপুল পরিমাণ শ্রমিকের সুরক্ষার জন্য সরকার গৃহকমর্ী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতিমালা ২০১০-এর খসড়া তৈরি করেছে। নীতিমালায় গৃহকর্ম এবং গৃহকমর্ীর সংজ্ঞা হচ্ছে_

২.১ গৃহকর্ম বলতে গৃহস্থালির সব কাজ যার অনত্মভর্ুক্ত হবে : রান্না এবং রান্না সংশিস্নষ্ট আনুষঙ্গিক কাজ, কাপড় ধোয়া, বাজার করা, বাড়িঘরসহ বাড়িসংশিস্নষ্ট বিভিন্ন চত্বর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা, শিশু সনত্মানের লালন-পালন, প্রবীণদের যত্ন বা সেবা, প্রতিবন্ধী যারা বাড়িতে বসবাস করে তাদের যত্ন এবং পারিবারিক অন্যান্য কাজ যা সাধারণত গৃহঅভ্যনত্মরে এবং গৃহস্থালি কাজ হিসেবে স্বীকৃত। তবে নিয়োগকারীর ব্যবসার সঙ্গে সম্পর্কিত বা মুনাফা সৃষ্টি করে এমন কাজ এর অনত্মভর্ুক্ত হবে না।

২.২ 'গৃহকমর্ী' বলতে অন্যের বাড়িতে যিনি মৌখিক বা লিখিত যেভাবেই নিয়োগলাভ করম্নন গৃহকর্মের জন্য খ-কালীন অথবা পূর্ণকালীন নিয়োগকৃত ব্যক্তি বা কর্মী।

অথাৎ গৃহকর্ম হচ্ছে গৃহস্থালির সব কাজ যা ব্যবসা বা মুনাফার সঙ্গে জড়িত নয়। অর্থাৎ গৃহকর্ম হচ্ছে অনুৎপাদনশীল (?) কাজ এবং একাজে নিয়োজিত ব্যক্তিরা গৃহকর্মী। গৃহকর্মের মূল্য সমাজে সবচেয়ে কম। কাজের নিরাপত্তাও তাদের সবচাইতে কম। প্রকৃত অর্থে কর্ম নিরাপত্তা বলে যে কিছু একটা আছে তা তারা জানেই না। তাদের কাজের কোন চুক্তি নেই। এ বিষয়ে নীতিমালায় বলা আছে_

অভিভাবকের সঙ্গে চুক্তি
গৃহকর্মে কিশোর বা কিশোরী (১৪ থেকে ১৮ বছর) নিয়োগ করতে হলে অভিভাবকের সঙ্গে এবং প্রাপ্ত বয়স্ক হলে নিয়োগে ইচ্ছুক ব্যক্তির সঙ্গে নিয়োগকর্তার চুক্তি থাকতে হবে এবং উক্ত চুক্তিতে উভয়পক্ষের নাম ঠিকানা ও স্বাক্ষরসহ নিম্নোক্ত শর্তসমূহ উলেস্নখ থাকতে হবে।

১.১) নিয়োগের ধরন, ১.২) মজুরি, ১.৩) কর্মঘণ্টা, ১.৪) বিশ্রামের সময় ও ছুটি, ১.৫) লেখাপড়ার ব্যবস্থা, ১.৬) কাজের ধরন, ১.৭) থাকা-খাওয়া ইত্যাদি। উলেস্নখ্য যে, অভিভাবকহীন কিশোর-কিশোরীদের ক্ষেত্রে নিবন্ধন কতর্ৃপক্ষকে লিখিত অবহিতকরণ চুক্তি বলে গণ্য হবে।

মজুরি
গৃহশ্রমিকদের মুজরিরও কোন ভিত্তি নেই। তাই শ্রম বৈষম্য আর মুজরি বৈষম্যের শিকার সবচেয়ে বেশি গৃহশ্রমিকরাই। মুজরির ক্ষেত্রেও নীতিমালায় বলা আছে_ মজুরি নির্ধারণ না করে কোন গৃহকমর্ী নিয়োগ করা যাবে না। মজুরি অবশ্যই অর্থে নির্ধারিত হবে।

৪.১ মজুরি প্রদান : নিয়োগকারী কতর্ৃক গৃহকমর্ীকে মজুরিকাল শেষ হওয়ার পরবতর্ী সাত কর্মদিবসের মধ্যে মজুরি পরিশোধ করতে হবে। নিয়োগকারী গৃহকর্মীর জন্য উৎসবভাতা এবং বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির ব্যবস্থা করবেন। গৃহকমর্ী ব্যতীত অন্য কাউকে গৃহকমর্ীর প্রাপ্য মজুরি প্রদান করা যাবে না।

৪.২) পূর্ণকালীন গৃহকমর্ীর মজুরি : গৃহকমর্ীর জন্য সরকার কতর্ৃক নূ্যনতম মজুরি ঘোষিত না হওয়া পর্যনত্ম উভয়পক্ষের আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে মজুরি নির্ধারণ করতে হবে। প্রত্যেক নিয়োগকারী চুক্তিতে উলিস্নখিত মজুরি পরিশোধ করবেন। গৃহকমর্ী ব্যতীত অন্য কাউকে তার প্রাপ্য মজুরি প্রদান করা যাবে না। গৃহকমর্ীদের জন্য সরকার কর্তৃক নূ্যনতম মজুরি ঘোষিত হলে নিয়োগকারী তদানুযায়ী মজুরি প্রদান করবেন।
শ্রমিকের ভরণপোষণ, থাকা ও চিকিৎসা ইত্যাদি ব্যয় নির্ধারিত মজুরির অতিরিক্ত বলে গণ্য হবে।
মজুরি নির্ধারণের বিষয়ে বলা আছে_

মজুরি নির্ধারণ : সরকার গৃহকমর্ীর জন্য নূ্যনতম মজুরি ঘোষণা করবে এবং উক্ত মজুরি মাসিকভিত্তিতে নির্ধারিত হবে। প্রত্যেক গৃহকমর্ীর জন্য মজুরির পরিমাণ ও মেয়াদ উলেস্নখসহ একটি মজুরিকার্ড থাকবে। প্রতি বারে মজুরি প্রদানের সময় মজুরিকার্ডে শ্রমিক ও নিয়োগকারীর স্বাক্ষর থাকতে হবে

গৃহশ্রমিকের কাজের কোন সময় বাধা নেই। নেই নিদির্ষ্ট কর্মঘণ্টাও। বিশেষ করে যাদের প্রচলিত নিয়মে বাঁধা কাজের লোক বলে আখ্যায়িত করা তাদের কাজের পরিমাণের কাজের ধরনের যেমন কোন ঠিক নেই তেমনি তাদের কাজের নির্দিষ্ট কোন সময়ও নেই। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যনত্ম তাদের কাজ করতে হয়। খ-কালীন সাধারণভাবে যাদের ছুটা এবং পূর্ণকালীন সাধারণভাবে যাদের বাঁধা কাজের লোক বলে আখ্যায়িত করা হয় তাদের কারোই নেই সাপ্তাহিক কোন ছুটির দিন। খসড়া নীতিমালায় তাদের কর্মঘণ্টা, ছুটি ও বিশ্রামের বিধান নিম্নরূপ_

কর্মঘণ্টা, ছুটি ও বিশ্রাম
* প্রত্যেক গৃহকমর্ীর কর্মঘণ্টা এমনভাবে বিন্যসত্ম করতে হবে যাতে তিনি ঘুম ও বিশ্রামের জন্য রাতে নূ্যনতম আট ঘণ্টা ও দিনে কমপক্ষে ৪ ঘণ্টা বিশ্রাম ও বিনোদনের জন্য বিরতি পান।

* প্রত্যেক গৃহকর্মীকে সপ্তাহে কমপক্ষে একদিন ছুটি প্রদান নিশ্চিত করতে হবে।

* কোন গৃহকমর্ীকে সাপ্তাহিক ছুটির দিন কাজে বাধ্য করা যাবে না। গৃহকমর্ীর অভিভাবকেরও নিয়োগকর্তার অনুমতি সাপেক্ষে সাপ্তাহিক ছুটির দিন গৃহকমর্ীকে বাইরে যেতে দেয়া যাবে। তবে তা গৃহকমর্ীর ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল।

* গৃহকমর্ীর বার্ষিক ছুটি এমনভাবে বিন্যসত্ম করতে হবে যাতে স্ব স্ব ধমর্ীয় উৎসবসমূহ বা এর অব্যবহিত পরে প্রয়োজনে পরিবারে সদস্যদের সঙ্গে মিলিত হওয়ার জন্য বছরে মোট ২ সপ্তাহ (১৪ দিন) ছুটি ভোগ করতে পারে।

* গৃহকমর্ীর ঘুম ও বিশ্রামের জন্য নিরাপদ স্বাস্থ্যসম্মত স্থান নিশ্চিত করতে হবে।

বাসায় কর্মরত গৃহশ্রমিকদের সবচেয়ে সঙ্কটের সময় হচ্ছে গর্ভাবস্থা এবং প্রসবকালীন। কারণ এ সময় তার কর্মক্ষমতা হ্রাস পায়। ফলে পুরো পরিবার নিয়ে প্রচ- সমস্যা আর অভাবের মধ্যে দিন কাটাতে হয়। শুধু তাই নয়, পরিবারে খাদ্য যোগানের জন্য অসুস্থ শরীর নিয়ে কাজ করে অনেক কমর্ী নিজের এবং গর্ভস্থ সনত্মানের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি নিয়ে আসেন। নীতিমালা এদিকেও দৃষ্টি রেখেছে-

গর্ভকালীন ও প্রসূতিকালীন সুবিধা : গর্ভবতী নারী গৃহকর্মীকে তার গর্ভকালীন ও প্রসূতিকালীন মোট ১৬ (প্রসবের পূবে ৬ সপ্তাহ এবং প্রসবের পরে ১০ সপ্তাহ) সপ্তাহ সবেতনে মাতৃত্বকালীন ছুটি, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, ভারি কাজ থেকে বিরত রাখা এবং বিশ্রামের সুযোগ প্রদান করতে হবে। সরকারের এ নীতিমালা বাসত্মবায়িত হলে সন্দেহ নেই গৃহশ্রমিকদের শ্রম অনেক সুরক্ষিত হবে তাদের অনেক বঞ্চনার অবসান হবে। সবচেয়ে বড় কথা হাজার বছর ধরে অবমূল্যায়ন আর অবমাননার যে শ্রম অদৃশ্য হয়ে আছে, যে শ্রমের কোন স্বীকৃতি নেই সে শ্রমের স্বীকৃতি প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু তারপরও প্রশ্ন থেকে যায় নীতিমালায় বলা হয়েছে গৃহকমর্ী, গৃহশ্রমিক নয় কেন!

জাতিসংঘের সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণায় ২৩, ২৪ ও ২৫ অনুচ্ছেদে শ্রমিকের মানবাধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় সব কমর্ী বা শ্রমিকের সমমজুরি, বিশ্রাম, অবসর, যুক্তিযুক্ত কর্ম ঘণ্টাসহ শ্রমিকের স্বার্থ রক্ষার্থে সব অধিকার সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু অন্যান্য শ্রমিকের জন্য যে সব সুবিধা রয়েছে গৃহশ্রমিকদের জন্য তা নেই।
বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ অনুযায়ী_'শ্রমিক' অর্থ শিক্ষাধীনসহ কোন ব্যক্তি, তার চাকরির শর্তাবলী প্রকাশ্যে বা উহ্য যেভাবেই থাকুক না কেন যিনি কোন প্রতিষ্ঠানে বা শিল্পে সরাসরিভাবে বা কোন ঠিকাদারের মাধ্যমে মজুরি বা অর্থের বিনিময়ে কোন দক্ষ, অদক্ষ, কায়িক, কারিগরি, ব্যবসা উন্নয়নমূলক অথবা কেরানীগিরির কাজ করার জন্য নিযুক্ত হন। কিন্তু প্রধানত প্রশাসনিক বা ব্যবস্থাপনামূলক কাজে দায়িত্বপ্রাপ্ত কোন ব্যক্তি এর অনত্মভর্ুক্ত হবেন না।
গৃহকমর্ীকে শ্রমিকের এ সংজ্ঞার আওতাভুক্ত করা হয়নি। কারণ গৃহের শ্রমকে কোন শিল্প বা প্রতিষ্ঠানের শ্রম হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে না। একইভাবে কোন ব্যবসা বা উন্নয়নমূলক কাজের কারিগর বা কেরানীগিরির কাজ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে না। গৃহকমর্ী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতিমালা ২০১০-এর খসড়াতে গৃহকর্মের সংজ্ঞায়ও তবে নিয়োগকারীর ব্যবসার সঙ্গে সম্পর্কিত বা মুনাফা সৃষ্টি করে এমন কাজ এর অনত্মভর্ুক্ত হবে না। শ্রমজীবী মানুষের আইনি সুরক্ষা প্রদানের জন্য বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ বলবত রয়েছে। কিন্তু এ আইনে গৃহশ্রম এবং গৃহশ্রমিককে অনত্মর্ভুক্ত করা হয়নি।

অর্থাৎ গৃহকর্মকে ধরে নেয়া হচ্ছে মুনাফার সঙ্গে সংশিস্নষ্ট কোন কাজ নয়, অন্যভাবে এটি উৎপাদনশীল কোন কাজ নয়। গৃহের কাজকে এভাবে অনুৎপাদনশীল এবং মুনাফাহীন কাজ হিসেবেই চিহ্নিত করা হচ্ছে। কিন্তু প্রকৃত অর্থে গৃহের কাজও উৎপাদন ও মুনাফার সঙ্গে সম্পৃক্ত। প্রথমত, কর্মজীবী নারীর স্থলাভিষিক্ত হচ্ছে গৃহশ্রমিক ফলে নারীর উৎপাদনশীল কাজে সে ভূমিকা রাখছে। দ্বিতীয়ত, সাধারণভাবে গৃহে যে শ্রম প্রদান করা হয় এবং সে শ্রমের বিনিময়ে যা উৎপাদন করা হয় তার সবকিছুরই বাজার মূল্য বিদ্যমান। ফলে গৃহশ্রমকে অনুৎপাদনশীল কাজ হিসেবে চিহ্নিত করার কোন কারণ নেই।

আবহমানকাল থেকেই গৃহের শ্রমকে কোন শ্রম হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি। জিডিপিতেও অনত্মভর্ুক্ত করা হয়নি। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. আবুল বারকাত নারীর এ গৃহশ্রম ও পরিবারকে ভালবেসে যে শ্রম প্রদান করে তাকে 'ভালবাসার অর্থনীতি' আখ্যায়িত করে ভালবাসার অর্থনীতির আর্থিক মূল্য নির্ধারণ করেছেন প্রায় ২ লাখ ৪৯ হাজার ৬১৫ কোটি টাকা। জিডিপিতে এই মূল্যমান যোগ করা হলে জিডিপি বেড়ে দাঁড়াবে ৭ লাখ ১৭ হাজার ১২ কোটি টাকা। সে হিসেবে ভালবাসার অর্থনীতির আয়তন হবে বর্তমান জিডিপির ৫৩ শতাংশ। এ হিসেবের ভিত্তি হলো বাংলাদেশে ১০ বছর ও তদুর্ধ নারীরা গৃহস্থালি কাজে বছরে সময় ব্যয় করেন ১৬ হাজার ৬৪১ কোটি শ্রম ঘণ্টা।
গৃহশ্রমিকরা সাধারণত নিগৃহীত হয় গৃহকর্ত্রী দ্বারা। এ নিগ্রহের মূল কারণও হচ্ছে গৃহশ্রমের অস্বীকৃতি। গৃহশ্রমের স্বীকৃতি ও মূল্যায়ন না থাকায় গৃহকর্ত্রীও অবমূল্যায়িত। অবমূল্যায়নের ফলে তার ভেতর জন্ম নেয় ক্ষোভ এবং প্রতিশোধপ্রবণতা। সে অবমূল্যায়িত। তার গৃহশ্রমের যেমন স্বীকৃতি মেলে না। তার কাছে গৃহশ্রমিকও ন্যায্য ব্যবহার ও মূল্যায়ন পায় না। হাজার বছরের ধারণায় সে জানে এ কাজ মূল্যহীন এর কোন আর্থিক মূল্য নেই। তাই অর্থ দিয়ে কেনা শ্রমকে সে মূল্যায়ন করতে পারে না। তার কাছে মনে হয় সে শুধু শ্রম নয়, মানুষ কিনে নিয়েছে। গৃহশ্রমিক তার কেনা তার সঙ্গে যে কোন দুর্ব্যবহার করা যায়। আরও বিষয় হচ্ছে সমাজে গৃহবধূর অবস্থান দুবল। প্রায়ই তাকে নানা অন্যায্য বিষয়, অবিচার এবং অবদমনের সঙ্গে সমঝোতা করতে হয় এবং এর ফলে সমাজের প্রতি তার যে চাপা ক্ষোভ আর যন্ত্রণা তা মেটানোর জায়গা হিসেবেও সে দুর্বলতম গৃহশ্রমিককে বেছে নেয়। কোন ব্যক্তি বা কাজকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন না করা হলে, ন্যায্য প্রাপ্য প্রদান না করা হলে এবং ন্যায়বিচারের ঘাটতি হলে সেখানে নানা অন্যায় অনিয়মের জন্ম হয়। গৃহশ্রমকে ঘিরেও তাই হয়েছে। গৃহশ্রমিক যেমন নানা নিপীড়ন নির্যাতন বঞ্চনার শিকার হচ্ছে, তেমনি নিয়োগকর্তাকেও নানা সমস্যা মোকাবেলা করতে হচ্ছে। নাগরিক জীবন জটিল হয়ে উঠায় এবং কর্মজীবী নারীর সংখ্যা ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পাওয়ায় গৃহশ্রমিকের চাহিদা ব্যাপকহারে বেড়েছে। গার্মেন্টস খাতসহ অন্যান্য শিল্প খাতে নারী শ্রমিকের প্রচুর চাহিদা এবং বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে গৃহকর্মে নারী শ্রমিকের চাাহিদা থাকায় দেশে গৃহশ্রমিকের সঙ্কট রয়েছে। এ সঙ্কটকে পুঁজি করে অনেক সময় গৃহশ্রমিকরাও নানা সুযোগ নিচ্ছে এবং অরাজক পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটাচ্ছে। অনেক অন্যায় এবং গুরম্নতর অপরাধের জন্ম দিচ্ছে এবং অনেক দর্ুঘটনাও হচ্ছে। এসব কিছুর সমাধান অবশ্যই এ খাতটাকে নিয়মনীতির মধ্যে নিয়ে আসা, একটা জবাবাদিহিতা ও আইনের কাঠামোয় ভেতর একে নিয়ে আসা।

সেজন্য নীতিমালাকে অবশ্যই স্বাগতম। কোন অন্যায় এবং অসঙ্গতি দূর করতে হলে তাকে গোড়া থেকে উৎপাটন করতে হয়। রোগকে আগে সঠিকভাবে চিহ্নিত করতে হয় তারপর ওষুধের ব্যবস্থা। তা না হলে শুভ কিছু আশা করা যায় না। গৃহশ্রমের এত শোষণ অবমূল্যায়ন আর বঞ্চনার কারণ হচ্ছে এক শ্রম হিসেবে চিহ্নিত না করা, উৎপাদনে এর ভূমিকাকে অস্বীকার করা। নীতিমালায়ও গৃহশ্রমকে শ্রম হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়নি। গৃহশ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হলে গৃহের শ্রমকে শ্রমের মর্যাদা দিতে হবে। শ্রমের স্বীকৃতিই যদি সঠিকভাবে প্রতিষ্ঠিত না হয়, তবে শ্রম বিনিয়োগের ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা কি প্রতিষ্ঠিত হবে! তাই নীতিমালাই যদি করতে হয়, তাদের ন্যায্য পাওনাই যদি নিশ্চিত করতে হয় এবং গৃহশ্রম দেয়া এবং নেয়ার ক্ষেত্রে যদি একটা সুষ্ঠু প্রক্রিয়া ও জবাবদিহিতা তৈরি করতে হয় তবে অবশ্যই আগে একে শ্রমের মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।

সমাজ, সংসারের শৃঙ্খলা এবং শানত্মিপূর্ণ পরিবেশ এরং মৌলিক চাহিদার সঙ্গে গৃহশ্রম সম্পর্কিত। আধুনিক সমাজব্যবস্থায় এর গুরুত্ব খুব ভালভাবেই অনুভূত। গৃহকাজ কায়িক শ্রমনির্ভরও। গৃহশ্রমকে অনুৎপাদনশীল কাজের সংজ্ঞায় ফেলে এর শ্রমিকদের অবহেলার আর কোন সুযোগ নেই। তাই একে উৎপাদনশীল শ্রমে অনত্মর্ভুক্ত করে এর শ্রমিকদের অন্যান্য শ্রমিকের মতো সুযোগসুবিধা প্রদান করতে হবে। এ খাতের নিরাপত্তাহীন শ্রমিকদের নিরাপত্তা দিতে হবে। সেই সঙ্গে এর নিয়োগকর্তার নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে।

অদৃশ্য শ্রম আজ দৃশ্যমান। হাজার বছরের বঞ্চনা, অবমূল্যায়নের সামনে এখন আমরা দাঁড়িয়ে আছি। আমাদের যাত্রা সামনের দিকে। শুরম্ন করা এ যাত্রায় আবার ভুল করলে হবে না। গৃহশ্রমকে স্বীকৃতি দিতে হবে। সে শ্রম গৃহপরিচালিকাই দিক অথবা গৃহপরিচারিকাই দিক। আর এ শ্রমকে নির্ভর করে বেঁচে থাকবে যারা, তাদেরও শ্রমিকের মর্যাদা দিতে হবে। দিতে হবে শ্রমের ন্যায্য মূল্য।

nurquamrunnaher@yahoo.com