Monday, May 23, 2011

বিপর্যস্ত জাপান পুনর্গঠনে পিছিয়ে নেই প্রবাসী বাংলাদেশীরা

রাহমান মণি
প্রথম আলো জাপান প্রতিনিধি অগ্রজ মনজুরুল হক তার একটি আর্টিকেলে লিখেছিলেন ‘দূতাবাস বন্ধের ঘোষণায় আমরা চ্যাম্পিয়ন’। শ্রদ্ধেয় অগ্রজ মনজুর ভাইয়ের সঙ্গে কিছুটা মিল রেখে তারই অনুজ হিসেবে বলতে চাই বিপর্যস্ত জাপান পুনর্গঠনে জাপানে অবস্থানরত বিভিন্ন দেশের কমিউনিটির মধ্যে বাংলাদেশী কমিউনিটি শুধু চ্যাম্পিয়নই নয় বরং বলা যেতে পারে এ পর্যন্ত এক এবং অদ্বিতীয় হিসেবে অবস্থান করে জাপানি বন্ধুদের হৃদয়ে স্থায়ী আসন গেড়ে নিয়েছে। প্রথম চ্যাম্পিয়নটি হয়েছিলাম বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক একটি মাত্র ঘোষণায়। বিব্রত হতে হয়েছিল জাপান প্রবাসী বাংলাদেশীদের, যা মনজুরুল হক তার লেখায় সুনিপুণ বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছিলেন। জাপান প্রবাসীরা যে কেবল হতভম্ব হয়েছিলেন, তা নয়। উদ্বিগ্ন ও বিচলিত হয়েছিলেন দেশে রেখে আসা তাদের অসংখ্য নিকটজনসহ বিশ্বে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অগণিত শুভাকাঙ্ক্ষীদের জন্য।

অযোগ্য পররাষ্ট্রমন্ত্রীর একটি মাত্র ঘোষণা মুহূর্তের মধ্যে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে মিডিয়ার কল্যাণে। জাপান মিডিয়ায়ও ফলাও করে প্রচার পায়। প্রবাসীদের আলোচনার প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়ায় দূতাবাস বন্ধ ঘোষণা। প্রবাসীরা উপায় খুঁজতে থাকে কিভাবে এ কলঙ্ক মুক্ত হয়ে প্রিয় বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করা যায়। একটি খালি স্থানে ইমারত তৈরি করতে যে পরিমাণ শ্রম এবং সময় নষ্ট হয়, তার চেয়ে বেশি নষ্ট হয় ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে গড়তে। আর তা যদি হয় গড়া ইমারত ভেঙে একই স্থানে নতুন ইমারত তৈরি করতে। এখানে তাই হয়েছে। প্রবাসীদের অক্লান্ত পরিশ্রমে গড়া এতদিনের উজ্জ্বল ভাবমূর্তির ইমেজ মাত্র একটি ঘোষণায় মুহূর্তের মধ্যে ধূলিসাৎ হয়ে গেলেও তা পুনরুদ্ধার করতে প্রবাসীদের যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছে। এখনও হচ্ছে। তারপরও প্রবাসীরা দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, যে কোন মূল্যে তারা তাদের প্রিয় মাতৃভূমির ভাবমূর্তি উদ্ধার করবেই করবে।

১১ই মার্চ ইতিহাসের ভয়াবহ ভূমিকম্প (৯ মাত্রা) ও এর ফলে সৃষ্ট ১৬ মিটার উঁচু সুনামির আঘাতে জাপানের উত্তর-পূর্বাঞ্চল লণ্ডভণ্ড হয়ে গেলে ব্যাপক জানমালের ক্ষতির সচিত্র প্রতিবেদন আধুনিক মিডিয়ার কল্যাণে বিশ্ববাসী অবলোকন করেছে। বিপুল সংখ্যক মানুষ তাদের আবাসস্থল হারিয়ে উদ্বাস্তু হয়ে পড়েন। স্থানীয় প্রশাসন তাদের সাধ্যমতো এগিয়ে আসে তাৎক্ষণিকভাবে। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কমিউনিটি সেন্টার, সরকারি প্রতিষ্ঠান, আশ্রয় কেন্দ্রগুলো তাৎক্ষণিক খুলে দেয়া হয় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য। অনেকেই তাদের নিকটাত্মীয়দের কাছে আশ্রয় নেন। কেউ বা নিজ থেকেই উদ্বাস্তুদের আশ্রয় দেন তাদের সাধ্য অনুযায়ী। কিন্তু তাতেও পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খেতে হয় সরকারকে। কারণ এতো বড় একটা ভয়াবহ দুর্যোগ তাৎক্ষণিকভাবে সামাল দেয়া কোন সরকারের পক্ষেই সম্ভব নয়। আকতার নামে এক প্রবাসী বাংলাদেশী হোটেল ব্যবসায়ী তার দুটি আবাসিক হোটেলের পুরোটাই উদ্বাস্তুদের জন্য খুলে দেন আশ্রয় নেয়ার জন্য। শুধু তাই নয়, প্রবাসী এই বাংলাদেশী তার দুটি হোটেলের সব কয়টি রুমে এবং মেঝেতে বিছানা পেতে আশ্রিতদের খাবার-দাবার সহ সব ধরনের দেখভাল নিজ কাঁধে তুলে নেন। বিষয়টি জাপান মিডিয়ায় প্রকাশ পেলে জাপান সরকারসহ বিভিন্ন মহলে ব্যাপক সাড়া জাগায়। জাপান সরকার কর্তৃক এক বিবৃতিতে প্রবাসী বাংলাদেশীর এই মহতী কাজের প্রশংসা করা হয়।

৩রা এপ্রিল রোববার টোকিওর তাকিনো গাওয়া কাইকানে জাপান প্রবাসী কমিউনিটি সার্বজনীন এক চ্যারিটি কনসার্ট ও পূর্ণদৈর্ঘ্য বাংলা ছায়াছবি প্রদর্শনীর আয়োজন করে অর্থ তহবিল সংগ্রহ করার জন্য। কনসার্টে জাপান ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী সংসদ সদস্য, জাপান-বাংলাদেশ পার্লামেন্টারিয়ান দলের সহ-সভাপতি আকিরা ইশিই, জাপান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ইয়োশিদা, স্থানীয় প্রশাসনের ওয়ার্ড কমিশনার আকিরা কামিকাওয়াসহ জাপানের বহু গণ্যমান্য ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। প্রধান অতিথি ছিলেন টোকিওস্থ বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত একেএম মজিবুর রহমান ভূঁইয়া। উপস্থিত ছিলেন দূতাবাসের সব কর্মকর্তা, প্রবাসী সামাজিক-সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, ব্যবসায়িক, বিভিন্ন আঞ্চলিক সংগঠনসমূহ, ধর্মীয় সংগঠন, শিশু সংগঠন, প্রবাসী মিডিয়া কর্মীবৃন্দ, সর্বোপরি বিপুল সংখ্যক প্রবাসী। অনুষ্ঠান থেকে মোট ১২,০০০৭২ (বার লাখ বাহাত্তর) ইয়েন সংগ্রহ হয়। সংগৃহীত অর্থের পুরোটাই কমিউনিটি নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে জাপান রেডক্রসের কাছে আনুষ্ঠানিক হস্তান্তর করা হয় ৯ই এপ্রিল শনিবার। জাপান রেডক্রসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে প্রদানকৃত অর্থ গ্রহণ করেন এবং বাংলাদেশ কমিউনিটির ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, এই প্রথম জাপানে অবস্থানরত কোন বিদেশী নাগরিক কমিউনিটি দ্বারা আয়োজিত কোন চ্যারিটি কনসার্ট ও ছবি প্রদর্শনে সংগৃহীত অর্থ জাপান রেডক্রস গ্রহণ করলো। বিভিন্ন দেশ, আন্তর্জাতিক সংস্থা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিগতভাবে অনেকেই অর্থ প্রদান করেছে।