মানুষ নিয়ে গড়া সমাজ মানুষের মতই জীবন্ত। জীবিত মানুষ যেমন কখনো জড় ও নিশ্চল হতে পারে না, তেমনি হতে পারে না সমাজও। মানুষের মত সমাজও সততঃ চলমান। সমাজে গতি থাকবে, থাকবে প্রাণবন্ত চঞ্চলতা, এতে আশ্চর্য বা শঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু শঙ্কা জাগে তখনি, যখন চঞ্চলতা অস্থিরতা হয়ে দাঁড়ায়, যখন চলার গতিতে থাকে না ছন্দ বা সুবিন্যস্ত পদক্ষেপ। ছন্দহীন চাঞ্চল্যের সমাজ আসলে অস্থির সমাজ। উত্তেজিত অস্থির সমাজে স্থিতিশীলতা থাকে না, থাকে শুধু বিশৃঙ্খল এবং অবিন্যস্ত চাঞ্চল্য। এই অবস্থায় যুগ-প্রাচীন মূল্যবোধে দেখা যায় বিসঙ্গতি ও মারাত্মক অবক্ষয়। এ হেন পরিস্থিতিতে পরিবার ও গোষ্ঠীসহ সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বন্ধন শিথিল হয়ে ওঠে এবং রাষ্ট্রীয়, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানসমূহ হয়ে পড়ে নির্জীব ও অকার্যকর। আজকের বিশ্বে এ ধরনের অস্থির সমাজের বহু নজির রয়েছে। সোমালিয়াসহ অনেক ক’টি দেশেই সরকারের অস্তিত্ব অতি দুর্বল, প্রায় অবলুপ্ত। এসব ক্ষেত্রে রাষ্ট্র যেন থেকেও নেই, শুধু নামমাত্র রূপে টিকে আছে। আমাদের এই অস্থির সময়ে উত্তর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশে দেখা দিয়েছে দারুণ সামাজিক ও রাজনৈতিক উত্তেজনা ও চাঞ্চল্য। তিউনিসিয়া, মিশর, লিবিয়া, ইয়েমেন, সিরিয়া, বাহরাইন ও জর্ডানসহ এসব দেশে একনায়কত্ববাদী ও স্বৈরাচারী শাসকদের বিরুদ্ধে প্রবল ও ব্যাপক আন্দোলনের পটভূমিতে যে সামাজিক অস্থিরতা, তা মূলতঃ ইতিবাচক। এই পরিস্থিতি বস্তুত গণতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিকভাবে সুসম পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাতেই সৃষ্ট হয়েছে। লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য মহৎ হলেও এর ফলে এসব সমাজে যে সংঘর্ষ ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হয়েছে, তাতে মানুষের দুর্ভোগ কমেনি বরং ক্রান্তিকালের অনিশ্চিতি সামাজিক শান্তি ও শৃঙ্খলাকে নাজুক অবস্থায় ফেলেছে। বাংলাদেশের মত আরও অনেক উন্নয়নশীল, স্বল্পোন্নত ও দারিদ্র্যপীড়িত দেশেও দেখা যায় ব্যাপক ও বিসতৃত সামাজিক অস্থিরতা। দারিদ্র্য, বেকারত্ব, অপশাসন, দুর্নীতি- এসব সমাজে উত্তেজনা ও অস্থিতির সৃষ্টি করে। অন্যদিকে সামাজিক অস্থিরতাও আবার ওই সব নেতিবাচক ও ক্ষতিকর প্রবণতাগুলোকে প্রবল করে তোলে।
কিন্তু শুধু তুলানামূলকভাবে দরিদ্র ও স্বল্পোন্নত দেশেই নয় অর্থনৈতিকভাবে বেশ কিছুটা উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশেও এ ধরনের অস্থিরতা কম বেশি পরিলক্ষিত হয়। উদাহরণস্বরূপ বর্তমান বিশ্বের গ্রীস, পর্তুগাল ও আয়ারল্যান্ডসহ কয়েকটি দেশের কথা উল্লেখ করা যায়। এসব ক্ষেত্রে অর্থনীতির ব্যবস্থাপনায় অক্ষমতা এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহ নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে অদক্ষতা এসব দেশকে ঋণ জর্জরিত করে জনগণকে দারুণ বেকারত্ব ও অস্বচ্ছলতার শিকারে পরিণত করেছে। এরা তাই এখন সমৃদ্ধ প্রতিবেশী দেশ ও বহুপক্ষীয় অর্থায়ন সংস্থার মুখাপেক্ষী হতে বাধ্য হচ্ছে। তাদের সমস্যা ছোট করে দেখার অবকাশ নেই। কিন্তু উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর সমস্যা আরও জটিল ও মারাত্মক।
এমনিতেই দারিদ্র্য, ক্ষুধা ও অপুষ্টি, স্বাস্থ্যহীনতা ও অশিক্ষা এদের নিত্যসঙ্গী। তার ওপরে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক নেতৃত্বের ত্রুটি ও দুর্বলতা এবং মারাত্মক রাজনৈতিক বিভাজন ও বিভেদ এদের ক্ষেত্রে বিপুল অস্থিরতা সৃষ্টি করে। পক্ষ নির্বিশেষে রাজনৈতিক দলগুলোর সরকারি সংস্থা ও প্রশাসনকে দলীয়করণের ক্ষতিকর প্রবণতা ও দুর্নীতির রাহুগ্রাস এসব দেশের সমাজকে আরও বিশৃঙ্খল ও অস্থির করে তোলে।
যে দিক থেকেই দেখা যাক না কেন দারিদ্র্য সামাজিক অস্থিরতার এক প্রধান ও মূল উৎস। প্রবাদে বলে, ‘দারিদ্র্য সর্বগুণ হরণ করে’। প্রবাদে আরও বলা হয় ‘অভাবে স্বভাব নষ্ট’। যুগ-প্রাচীন এসব প্রবাদ সত্যের প্রতিফলন হলেও এগুলো সবটুকু সত্য প্রকাশ করে না। দরিদ্র মানুষ সম্বলহীন ও অসহায় এবং তাকে প্রলোভন দেখিয়ে অথবা অর্থনৈতিকভাবে দমন করার ভয় দেখিয়ে সমাজবিরোধী কাজে অনেক ক্ষেত্রেই নিয়োগ করা যায়। সমাজের দুর্বৃত্ত ও দুর্জনেরা দরিদ্র জনগোষ্ঠীর একাংশকে এমনিভাবে সমাজবিরোধী ও নৈতিকতাহীন কাজে লাগিয়েও থাকে। কিন্তু মূলত সাধারণ মানুষ দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত হয়েও সহজে নীতিবোধ বর্জন করে না। এই জন্যই দারিদ্র্যপীড়িত অনেক দেশেই রাজনীতি যতই বিভাজনমূলক বা সাংঘর্ষিক হোক না কেন, প্রশাসন যতই বিশৃঙ্খল বা দুর্বল হোক না কেন, এদের অনেকের ক্ষেত্রেই সামাজিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা তেমন ব্যাপকভাবে বিঘ্নিত হয় না।
বাংলাদেশের কথাই ধরা যাক, এখানে সীমিত পরিসরে, মাত্র ৫৬ হাজার বর্গমাইল এলাকায় বাস করে প্রায় ১৬ কোটি লোক। ঘনবসতিপূর্ণ এবং দরিদ্র-প্রধান এই দেশে আইন শৃঙ্খলা রক্ষার জন্যে নিয়োজিত আছে পুলিশ, আনসার বাহিনীসহ সাকুল্যে আড়াই বা তিন লাখ প্রহরী। সামরিক ও আধা সামরিক বাহিনীসমূহের আরও প্রায় দুই লক্ষ সদস্য সাধারণত সরাসরি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার কাজে নিয়োজিত থাকে না। তাই তুলনামূলকভাবে স্বল্পসংখ্যক রক্ষী ও প্রহরী নিয়ে সন্তোষজনকভাবে সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষা করা অতি দুরূহ কাজ হয়ে উঠতো যদি না দেশের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ শান্তিপ্রিয়, নীতিনিষ্ঠ এবং আইন ও শৃঙ্খলার প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও অনুগত না হতো। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত ব্যক্তিরা যে শুধু সংখ্যায়ই অল্প তা নয়, অনেক ক্ষেত্রেই তাদের নেই প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র-শস্ত্র যানবাহনসহ অন্যান্য দরকারী উপকরণ। এই পরিস্থিতিতে দেশের মাত্র ১ শতাংশ বা ১৬ লাখ লোক যদি মারাত্মক ও সংগঠিত অপরাধী হতো তাহলে এদের নিয়ন্ত্রণ করে সমাজকে শৃঙ্খলায় ও শান্তিতে রাখা যেত না। সুতরাং বাংলাদেশের মত সমাজসমূহে কেবল দারিদ্র্যই সামাজিক অস্থিরতার জন্ম দেয়, এ কথা হলফ করে বলা চলে না।
আসলে সামাজিক অস্থিরতার মূলে কি রয়েছে? এর সরল-সহজ উত্তর তাৎক্ষণিকভাবে দেওয়া সম্ভব নয়। তবে এ কথা বলা যায় যে, চলমান উৎক্রান্তিক সময় ও তার নানা বৈশিষ্ট্য সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে। অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের যে দুনিয়াতে আমরা বাস করি, তার প্রভাব আমাদের সমাজেও সক্রিয় আছে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঠিক ব্যবস্থাপনা না হলে সমাজে অসাম্য বেড়ে ওঠে, ধনী আরও ধনী হয়, গরিব হয় আরও গরিব। আকাঙ্ক্ষা ও আশা পূরণের পথ না পেয়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর তরুণেরা বিপদগামী হতে পারে। তারা পরিণত হতে পারে জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস ও অপরাধ প্রক্রিয়ার সহায়ক শক্তি বা অনুচরে। অন্যদিকে ধনাঢ্য, বিত্তবান সংসারের তরুণ সদস্যেরাও অভাবের অভাবে মেতে উঠতে পারে দুঃখ-বিলাসে অথবা যোগ দিতে পারে অনাচার ও অপরাধের উত্তেজনাকর প্রক্রিয়ায়।
শ্রেণী নির্বিশেষে কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণী অনেকেই আবার উন্মুক্ত আকাশ সংস্কৃতির ধারক ও বাহক গণমাধ্যমের একাংশর নানা উত্তেজক ও অনৈতিক অশ্লীল অনুষ্ঠানের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে বাস্তব জীবনে উচ্ছৃঙ্খলতা ও অপরাধমূলক কাজে লিপ্ত হয়। সামপ্রতিককালে বাংলাদেশে (ও অন্যান্য উন্নয়নশীল, উৎক্রান্তিক সমাজে) যে নারী উত্ত্যক্তকরণ ও নির্যাতনের প্রসার দেখা যায়, তার পেছনে অনেক ক্ষেত্রেই এই ধরনের প্রবণতা সক্রিয় ভূমিকা রাখে।
আরও কথা আছে। নারী নির্যাতন ও যৌন হয়রানিসহ অন্যান্য যে সামাজিক অনাচার ও অপরাধ ঘটে, তার সঙ্গে প্রায়ই জড়িত থাকে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে প্রভাবশালীদের আশ্রয় ও প্রশয়। দলবাজি কণ্টকিত সমাজে দলীয় নেতৃত্বের কোন কোন অংশ বিপদগামী তরুণের পেশিশক্তিকে তাদের কাজে লাগায়। এই তরুণদের ঐ প্রভাবশালীরা চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দখলবাজি ইত্যাদি অপকর্মে সহায়তা ও পৃষ্ঠপোষকতা দেয়। এর ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলো অপরাধীদের সফলভাবে দমন করতে পারে না। পরিণতিতে সামাজিক অস্থিরতা ও ঘৃণ্য অপরাধ বাড়তে থাকে এবং বিশৃঙ্খল অবস্থা শিকার হয় সাধারণ মানুষ ও তাদের পরিবারবর্গ।
আমাদের মত সমাজে তাই অস্থিরতা, অস্থিতিশীলতা প্রতিরোধ ও হ্রাস করতে হলে সবচেয়ে প্রথমে প্রয়োজন সব ক্ষেত্রে সব স্তরের নেতৃত্বের সংশোধন ও পরিশীলন। শুধু রাজনীতি নয়, অর্থনীতি, বাণিজ্য, প্রশাসন, শিক্ষা, সংস্কৃতির সব ক্ষেত্রেই নেতা-নেতৃদের তাঁদের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। তাঁদের দৃঢ়সংকল্প নিয়ে সামাজিক শৃঙ্খলা ও স্থিতি রক্ষার কাজে এগিয়ে আসতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন বলিষ্ঠ ও মজবুত জাতীয় ঐক্যের। বিভাজন ও দলীয়করণের পথ পরিহার করে জাতীয় জীবনের মূল বিষয়গুলোতে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করা সময়ের দাবি। এই দাবি পূরণ করতে পারলেই রাজনৈতিকভাবে উন্নত, প্রশাসনিক ক্ষেত্রে সবল ও সক্ষম এবং অর্থনৈতিকভাবে সুসম দেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
শুধু বাংলাদেশেই নয় স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল অনেক দেশেই জাতীয় সমাজ অস্থির সময়ের শিকারে পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক বিভেদ, বিবাদ ও সংঘর্ষ, সুশাসনের ঘাটতি, ব্যাপক দুর্নীতি এবং ন্যায়পর আচরণের অভাব এসব সমাজে যে অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছে, তার ফলে সমাজের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ট শান্তিপ্রিয় ও দুর্বল সদস্যরা পড়েছে দারুণ বিপাকে। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম যেমন লিখেছেন:
“অসহায় জাতি মরিছে ডুবিয়া জানে না সন্তরন
কাণ্ডারী আজ দেখিব তোমার মাতৃমুক্তি পণ”।
এই অবস্থায় এসব সমাজের কাণ্ডারীদের হুঁশিয়ার হতে হবে, সময় থাকতেই নিতে হবে জাতিকে ত্রাণ করার সুষ্ঠু ও কার্যকর পদক্ষেপ।
* চিন্তাবিদ, সমাজ বিজ্ঞানী ও সাহিত্যিক ড. মীজানূর রহমান শেলী সেন্টার ফর ডেভেল্পমেন্ট রিসার্চ, বাংলাদেশ (সিডিআরবি)-র প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান এবং আর্থ-সামাজিক ত্রৈমাসিক ‘এশিয়ান অ্যাফেয়ার্স’-এর সম্পাদক।