Saturday, November 29, 2014

গ্রামীণমেলা জনপদের মানুষকে নির্মল আনন্দ দেয়

হারিয়ে যাচ্ছে মুন্সীগঞ্জের গ্রামীণমেলা
মীর নাসির উদ্দিন উজ্জ্বল: সভ্যতার জনপদ মুন্সীগঞ্জ-বিক্রমপুর। বিক্রমপুরে রয়েছে নিজস্ব কৃষ্টি ও সংস্কৃতি। শত শত বছর ধরে এ জেলার কৃষ্টির অংশ হিসেবে কালী মেলা, বৈশাখী মেলা, গলিয়া মেলা, মনসা মেলাসহ নানা গ্রামীণ মেলা উদযাপিত হচ্ছে। যেখানে দেশ সংস্কৃতিতে প্রাণের স্পন্দন জাগে। আনন্দের ঢেউ পড়ে শিশুসহ সববয়সী মানুষের। শহরের মনসা বা দশমী মেলা, মালখানগর গ্রামীণ মেলা, শেখরনগরের কালীপূজা মেলা ছাড়াও এই জনপদের বিভিন্ন এলাকায়ই বহু কাল আগে থেকে বসে নানা মেলা। মেলাগুলোতে বেচাকেনা আর বিনোদন ছাড়াও নানা রকম পুর্ণার্থীদের অংশগ্রহণও থাকে। এছাড়া বাংলা নববর্ষ ও চৈত্র সংক্রান্তিতে প্রায় প্রতিটি গ্রামগঞ্জে বসত মেলা। একদিন থেকে তিন দিনব্যাপী এসব মেলায় মানুষের ঢল নামত। কিন্তু কালের বিবর্তনের এই মেলা এখন বিলুপ্ত প্রায়। গলিয়ার মেলা নতুন প্রজন্মের কাছে একবারেই বিস্ময়কর। বজ্রযোগিনী ও কালির আটপাড়ায় গলিয়ার মেলার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে এম এ আউয়াল বলেন, এই মেলার জন্য অপেক্ষায় থাকতাম আমরা। বাংকে পয়সা জমাতাম। মাটির ঘোড়া, হাতিসহ নানা কিছু কেনার জন্য। আর গলিয়ার খৈ উখড়া না খেলে তো ভালো লাকতো না।

প্রায় শত বছর ধরে শহরের জুবলী খালের পাশে বসত ‘দশমী মেলা’। এই মেলাকে মনসা মেলাও বলা হয়। প্রাচীন এই মেলা প্রতিবছর ভাদ্র মাসের ২ তারিখে বসত। জুবলি খাল ভরাট হওয়ার পরেও ভরাটকৃত সড়কেই বিশাল এই মেলা বসত। এই অঞ্চলের শিশু থেকে সব বয়সী মানুষ অপেক্ষায় থাকত। এই অঞ্চলের মেয়েরাও এই মেলার সময় ধরে নাইর আসতো বাবার বাড়িতে। কৌতুক অভিনেতা টেলিসামাদ শত ব্যস্ততা সত্ত্বেও প্রতি বছরই এই মেলায় অংশ নিতেন। এবার অসুস্থ অবস্থায়ও তিনি এই মেলার খবর নেন। মেলাটি ১৫ দিন থেকে মাসব্যাপীও হওয়ার নজির রয়েছে। তবে নানা অবহেলা, ষড়যন্ত্র আর স্বার্থান্বেষীদের কারণে সুইমিংপুলে স্থানান্তরের অপচেষ্টার কারণে মেলার ধারা ব্যাহত হয়। তবে আশার কথা হলো কয়েক বছর পর এ বছর নির্দিষ্ট সময়ে শহরের লঞ্চঘাট এলাকার যুবলী সড়কের ওপর বসে জাঁকজমকপূর্ণ এই মেলা। শিশুদের খেলনা, কসমেটিকস আর গৃহস্থালির প্রয়োজনীয় সব সমগ্রীই এখানে পাওয়া যায়। রকমারী পণ্যের পসরায় স্থান পেয়েছে লাড্ডু, পিঠি, মুরলী, নিমকি, গজা ও বিন্দি। নানা রকমের শতাধিক দোকান বসেছে এই মেলায়। সেখানে পণ্য সামগ্রীর আইটেমেরও যেন শেষ নেই। তাই বেচাকেনাও রমরমা। মেলার ক্রেতার ঢল নেমেছে। তাই বিক্রেতারাও বেজায় খুশি।

নানা বয়সী মানুষ কেনাকাটাসহ সরাসরি ঈদ বিনোদন উপভোগ করে। জেলার শ্রেষ্ঠ সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন হিসেবে পুরস্কারপ্রাপ্ত ‘ফ্রেন্ডস এ্যাসোসিয়েশন অব মালখানগর’ এই গ্রামীণ মেলার আয়োজন করে। বিশাল এই মেলায় দু’শতাধিক স্টল নানা পসরা সাজিয়ে বসেছে। আর পাশে বড় আকারের মঞ্চে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পসরা তো রয়েছেই। তাই গভীর রাত অবধি মানুষের কোলাহলে বিশেষ এক পরিবেশ সৃষ্টি হচ্ছে। মেলায় প্রতিদিনই ছিল প্রাণের স্পন্দন। শিশুদের খেলনা, কসমেটিকস আর গৃহস্থালির প্রয়োজনীয় সব সমগ্রীই এখানে। রকমারী পণ্যের পসরায় স্থান পেয়েছে লাড্ডু, পিঠি, মুরলী, নিমকি, গজা ও বিন্দি। মেলাকে ঘিরে সিরাজদিখান উপজেলাসহ সারা জেলায় এক বিশেষ উৎসব আমেজ চলে। সিরাজদিখান উপজেলা চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন আহমেদ জানান, গ্রামগঞ্জের ঐতিহ্য ধরে রাখা ও জনগণকে নির্মল আনন্দ দেয়ার জন্যই এই আয়োজন। এই আসনের সংসদ সদস্য সুকুমার রঞ্জন ঘোষ বলেন, গ্রামীণ মেলা দেশজ সংস্কৃতি বিকাশে ভূমিকা ছাড়াও গ্রামীণ জনপদের মানুষকে নির্মল আনন্দ দেয়। আয়োজক ‘ফ্রেন্ডস এ্যাসোসিয়েশন অব মালখানগরের সাধারণ সম্পাদক প্রভাষক বাহাউদ্দিন বাহার জানান, মানুষের জন্য নির্মল আনন্দ আর বিক্রপুরের সংস্কৃতি বিকাশেই এই আয়োজন করা হচ্ছে একযুগ ধরে। প্রতি বছরই মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ছে।

বিক্রপুরের আরেক আলোচিত মেলা হচ্ছে শেখরনগরের কালী পূজার মেলা। ৫শ’ বছরের ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় সিরাজদিখান উপজেলার শেখরনগরে প্রতিবছর চৈত্র মাসে জমে কালী মেলা। তিন দিন পর্যন্ত চলে এই মেলা। এ মেলাকে কেন্দ্র করে এখানে লাখো মানুষের ঢল নামে। দেশ বিদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাখ লাখ মানুষ আসে এখানে মা কালীর পূজায়। ভারত ও নেপালসহ বিভিন্ন দেশের পুর্ণার্থীরাও এই মেলায় যোগ দিচ্ছে বহু বছর ধরে। মেলাকে ঘিরে সমবেত হয় লাখো মানুষ। সনাতন (হিন্দু) ধর্মীয় উৎসব হলেও সব সম্প্রদায়ের মানুষ আসেন এই মেলায়। দেশের দূর-দূরান্ত থেকে হাজার হাজার নারী-পুরুষ ও শিশুরা আসেন। মেলাকে ঘিরে দোকানিরা তাদের পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেন। মেলায় বেচাকেনা চলে গভীর রাত পর্যন্ত। ভক্তরা কয়েক সহস্রাধিক পাঠা বলি দেন কালী মার মন পেতে। পূজা উপলক্ষে শেখরনগর মন্দির, শ্মশানঘাট এলাকায় সারারাত চলে ভক্তদের দেহতত্ত্ব, সামা সঙ্গীত, ভক্তিগীতি গান। পাপ মোচন ও পুণ্য লাভের আসায় দেশ-বিদেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজার হাজার নারী-পুরুষ সিরাজদিখানের শেখরনগরে আসেন কালী মায়ের কাছে বিপদ থেকে পরিত্রাণ পাওয়া ভক্তরা মানত দিতে ও কালী মায়ের অশেষ কৃপা আদায় করতে। শ্রীশ্রী কালী মায়ের মেলার আনন্দে পাল্টে যায় সিরাজদিখানের শেখরনগরের চিত্র। অ্যাডভোকেট মৃণাল কান্তি দাস এমপি বলেন, গ্রামীণ মেলাগুলোতে আগে সার্কাস, যাত্রা, মৃত্যু কূপ কার-মোটরসাইকেল খেলাসহ চলত নানা বিনোদন।

সার্কাসে হাড়ি, ভল্লুকসহ নানা প্রাণীরও দেখা মিলত। কিন্তু এখন মেলার পাশাপাশি যাত্রা সার্কাসও বন্ধ প্রায়। বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সুখেন চন্দ্র ব্যানার্জী বলেন, এখন অনেক মেলা চালু হয়েছে- যা দেশজ সংস্কৃতির পরিপন্থী। বিশিষ্টজনরা বলেন, কথিত এসব জুয়া, পুতুল নাচের আড়ালে নগ্ন নৃত্য চালিয়ে মূল মেলাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে অর্থ লিপ্সুরা। অথচ গলিয়ার মেলায় সাপের খেলা, নাগর দোলাসহ কত আকর্ষণীয় বিষয় থাকত। অধ্যাপিকা সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি এমপি বলেন, নানা প্রতিবন্ধকতা, মৌলবাদ, জঙ্গীবাদসহ নানা কারণে বৈশাখী মেলা, গলিয়া বিলুপ্ত হচ্ছে। কিন্তু বাঙালীর ঐতিহ্য হচ্ছে এই মেলা। যেখানে দেশজ সংস্কৃতির স্পন্দন জাগে। আনন্দের ঢেউ পড়ে শিশুসহ সববয়সী মানুষের। এই ঐতিহ্য কৃষ্টি ধরে রেখে আগামী প্রজন্মকে দেশজ সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় ঘটাতে হবে।

মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. সাইফুল হাসান বাদল জানান, গ্রামীণ মেলা হচ্ছে বাঙালী সংস্কৃতি অন্যতম অংশ। এই দেশজ মেলাকে সঠিকভাবে আয়োজনের ক্ষেত্রে প্রশাসনের সব রকম সহায়তা রয়েছে। কিন্তু অভাব সঠিক উদ্যোক্তার। তবে প্রাচীন জনপদ বিক্রমপুর তথা মুন্সীগঞ্জের প্রাচীন মেলাগুলো স্বমহিমায় আবার জাগ্রত করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।

জনকন্ঠ