Tuesday, October 28, 2014

অতিরিক্ত অর্থলিপ্সায় প্রাণহানি এমএল পিনাক-৬ লঞ্চডুবির তদন্ত প্রতিবেদন

শফিকুল ইসলাম জুয়েল: ‘অতিরিক্ত যাত্রীর কারণে ওজন বেড়ে যাওয়া, প্রতিকূল আবহাওয়া ও চালকের অদক্ষতার কারণে ডুবে গেছে এমএল পিনাক-৬। এই লঞ্চডুবির ঘটনায় মৃতদেহ উদ্ধার হয়েছে ৪৯ জনের। নিখোঁজ রয়েছে শতাধিক। এসব প্রাণহানির নেপথ্যে রয়েছে লঞ্চ মালিক, ঘাট ইজারাদার থেকে শুরু করে তদারকি প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত অর্থলিপ্সা।’ পিনাক ডুবি সংক্রান্ত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে পিনাক যাত্রা করলেও তদারকিতে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর কেউই নিষেধ করেনি। এমনকি ত্রুটিযুক্ত লঞ্চটি ‘অশান্ত নদীতে চলাচলের অনুপযোগী’ হলেও কেউ এর বিরোধিতা করেনি। ফলে দুর্ঘটনায় পতিত হয়ে সহস্র মানুষকে কাঁদিয়েছে। নিঃস্ব করেছে অসংখ্য পরিবারকে।’
এরই মধ্যে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় গঠিত ৭ সদস্যের কমিটির তদন্ত প্রতিবেদনটি মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছেন। এই তদন্ত প্রতিবেদনে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌচলাচল অধ্যাদেশ ১৯৭৬-এর ৪৫ নম্বর ধারার (৩) উপধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে দুর্ঘটনার কারণ উদ্ঘাটন এবং দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তি ও সংস্থাকে শনাক্ত করা হয়েছে। একইসঙ্গে দুর্ঘটনা প্রতিরোধে করণীয় উল্লেখ করে সুনির্দিষ্ট সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে।

৬৩ পৃষ্ঠার এ প্রতিবেদনে দুর্ঘটনাকবলিত লঞ্চ থেকে বেঁচে যাওয়া ৯ যাত্রী, ৩ প্রত্যক্ষদর্শী, নৌযানের মালিক-কর্মচারী, লঞ্চ মালিক সমিতির কর্মকর্তা, নৌযান পরিচালনা সংশ্লিষ্ট সকল দপ্তর/ সংস্থার কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সাক্ষাত্কারের মূল বক্তব্য স্থান পেয়েছে। একইসঙ্গে সংযুক্ত করা হয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর, হাইড্রোগ্রাফি বিভাগ, নৌযান রেজিস্ট্রার, সার্ভেয়ার দপ্তরের সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র।

প্রতিবেদনের ‘দুর্ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ’ অংশে বলা হয়েছে, গত ৪ আগস্ট সকাল সাড়ে ৯টার দিকে মাদারীপুরের শিবচর কাওড়াকান্দি লঞ্চঘাট থেকে আড়াইশর বেশি যাত্রী নিয়ে এমএল পিনাক-৬ মুন্সীগঞ্জ জেলার মাওয়া ঘাটের উদ্দেশে যাত্রা করে। মাত্র ৮৫ জন যাত্রী ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন এ লঞ্চটি পথিমধ্যে মাদারীপুর জেলার কাঁঠালবাড়ী ঘাটে থামে। সেখানেও লঞ্চটির কর্মচারীরা ডাকাডাকি করে আরও প্রায় ৪০/৫০ জন যাত্রী ঠেসে তোলে। অতিরিক্ত যাত্রীর চাপে লঞ্চটিতে হাঁটাচলার কোনো স্পেস ছিল না। দোতলার কেবিনে ওঠার জন্য দু’পাশে সিঁড়ি ছিল না। কেবিনে ওঠার জন্য ছোট একটি সিঁড়িতেও যাত্রীরা দাঁড়িয়ে ছিল। কেবিনে ছিলনা কোনো লাইফ জ্যাকেট। লঞ্চটি যখন মূল পদ্মা নদীতে গিয়ে পৌঁছে তখন নদী ছিল প্রচণ্ড উত্তাল। তীব্র বাতাসে বড় বড় ঢেউ আঘাত হানছিল লঞ্চটিতে। এ সময় স্রোত ছিল দক্ষিণমুখী আর বাতাস ছিল উত্তরমূখী। আর লঞ্চটিও দক্ষিণ দিক থেকে উত্তর দিকে যাচ্ছিল।

এ সময় লঞ্চটির মুখ ডান দিকে বাঁক ছিল। ঢেউও আসছিল ডান পাশ দিয়ে। অতিরিক্ত ওজনে পাটাতনের নিচের অংশ ডুবে ছিল আগে থেকেই। ফলে বড় বড় ঢেউ আসলেই পানি ঢুকছিল লঞ্চের নিচের অংশে। এ সময় যাত্রীরা চিত্কার করে আল্লাহকে ডাকছিল আর একধার থেকে আরেকধারে যেতে ছোটাছুটির চেষ্টা করছিল। এ সময় মারাক্তক ঝুঁকির মধ্যে এগোচ্ছিল লঞ্চটি। ঢেউয়ের তোড়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে চলতে ছিল লঞ্চটি। এ সময় মাওয়ামূখী আরেকটি লঞ্চ ডান পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। ওই সময় লঞ্চের বড় একটি ঢেউ আঘাত করলে নৌযানটি ডানদিকে কাত হয়ে যায় এবং অনেক পানি ঢুকে যায়। এর পরপরই (লঞ্চটি কাত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে) আর একটি বড় ঢেউ আঘাত হানে লঞ্চটিতে। আর এতেই পানির নিচে তলিয়ে পড়তে থাকে পিনাক।

২৫ থেকে ৪৫ সেকেন্ডের মধ্যেই পুরো লঞ্চ অতলে হারিয়ে যায়। এ সময় অনেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মরক্ষার চেষ্টা করে। লাফিয়ে পালায় সারেংও। যাত্রীদের অনেকেই জানালা দিয়ে বেরুনোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। কারণ, লঞ্চটির ছোট জানালা রশি দিয়ে ক্রস আকারে বাঁধা ছিল। এ সময় স্থানীয়রা প্রায় ৬০ জন যাত্রীকে জীবিত উদ্ধার করে। মাওয়াঘাট থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে ঘটে স্মরণকালের এ লঞ্চ দুর্ঘটনাটি। তবে যাত্রীদের ধারণা, পাশ দিয়ে যাওয়া অন্য আরো ৩টি লঞ্চের মতো সোজা না গিয়ে একটু ঘুরে আড়াআড়িভাবে গেলে দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব ছিল।

প্রতিবেদনে দুর্ঘটনাকবলিত নৌযানের বিবরণ ও রেজিস্ট্রেশন অংশে বলা হয়, এমএল পিনাক-৬ লঞ্চটির রেজিস্ট্রেশন নম্বর এম-১৫১২৭। যাত্রীবাহী লঞ্চটির প্রথম মালিক মনিরুজ্জামান খোকন। পরবর্তীতে ক্রয়সূত্রে মালিক আবু বকর সিদ্দিক কালু। লঞ্চটি ১৯.৫০ মিটার দৈর্ঘ্য এবং ৪.৬০ মিটার প্রস্থ, আর গভীরতা ১.৪০ মিটার। ১৯৯১ নির্মিত স্টিলের তৈরি লঞ্চটির তিন দফা নকশার পরিবর্তন করা হয়। তৈরির সময় লঞ্চটির নাম ছিল এমএল বিসমিল্লাহ-২। পরবর্তীতে ২০০৬ সালে লঞ্চটি মডিফিকেশন করে এমএল রূপসী-২ নামে পুনঃরেজিস্ট্রেশন করা হয়।

সর্বশেষ ২০০৭ সালে লঞ্চটি এমএল পিনাক-৬ নামে নতুনভাবে রেজিস্ট্রেশন করা হয়। মূল নকশায় অনুমোদিত যাত্রী সংখ্যা ৬৭ থাকলেও পরবর্তীতে নকশায় তা ৮৫ জন করা হয়। যার নকশা (জিএ, মিডশিপ সেকশন ও লাইন্স প্ল্যান যা অনুমোদিত নয়) তৈরি ও উপস্থাপন, এবং ইনক্লাইনিং এক্সপেরিমেন্ট রিপোর্ট ও স্ট্যাবিলিটি বুকলেট অধিদপ্তর কর্তৃক অনুমোদন পায়নি। আর এই লঞ্চটির ধারণক্ষমতা ১৩০ জনের বেশি নয়।

প্রতিবেদনে ঘাট ও যাত্রী ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং ব্যবস্থা অংশে বলা হয়-আইনুযায়ী ঘাট ও যাত্রী ব্যবস্থাপনার মুখ্য দায়িত্ব অন্যান্য সরকারি সংস্থার পাশাপাশি বিআইডব্লিউটিএর। বিআইডব্লিউটিএ’র টার্মস অব রেফারেন্স অনুযায়ী ট্রাফিক ইন্সপেক্টর অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ন্ত্রণের কাজটি করে থাকেন। ঈদ মৌসুমে যাত্রী পারাপারের জন্য ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মাওয়া, কাওড়াকান্দি, আরিচা, দৌলতদিয়া ইত্যাদি ঘাটে যাত্রীর চাপ অনেক বেড়ে যায়। ঐ সময় ঘাট ও যাত্রী চাপ বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ সকল ঘাটে ট্রাফিক ইন্সপেক্টরসহ অন্যান্য কর্মকর্তা/কর্মচারীদের বিশেষ দায়িত্ব দেয়া হয়।

ওই সময় বিআইডব্লিউটিএ ঢাকা বন্দরে ৭ জন, নারায়নগঞ্জ বন্দরে ৩ জন টি.আই পদায়ন করা হলেও মাওয়া, কাওড়াকান্দি ও কাঁঠালবাড়ী ৩টি ঘাটের মধ্যে শুধুমাত্র মাওয়া ঘাটে ১ জন টিআই পদায়ন করে। ঈদ পরবর্তী সময় যখন ঢাকামুখী যাত্রী বাড়লেও কাওড়াকান্দি ও কাঁঠালবাড়ী ঘাটে কাউকে দায়িত্ব প্রদান করেনি। এমনকি মাওয়া ঘাটে ট্রাফিক ইন্সপেক্টরকেও কাওড়াকান্দি ও কাঠালবাড়ী ঘাটে অতিরিক্ত দায়িত্ব প্রদান করা হয়নি। অন্যদিকে সমুদ্র পরিবহণ অধিদপ্তর একটি রেগুলেটরি বডি হিসেবে নৌ চলাচল মনিটরিং, বার্ষিক সার্ভের মাধ্যমে ফিটনেস যাচাই ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে নৌ নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। অধিদপ্তরের অধীন অভ্যন্তরীণ জাহাজ পরিদর্শনালয় নামে একটি দপ্তর আছে। সেখানে মুখ্য পরিদর্শকের অধীন ফিল্ড লেভেলে ঢাকা, নারায়নগঞ্জ, বরিশাল, খুলনা, চট্টগ্রাম, পটুয়াখালী, চাঁদপুর বন্দর ও প্রধান কার্যালয়ে ৮টি পরিদর্শকের পদ ও কার্যালয় রয়েছে।

কিন্তু বর্তমানে ঢাকা, বরিশাল, চাঁদপুর ও চট্টগ্রামে একজন করে পরিদর্শক নিয়োজিত থাকলেও তাদের সাথে কোন সহকারী ও এমএলএসএস পদায়ন করা হয়নি। মাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নদী বন্দর হওয়ার পরও এখানে কোন কার্যালয় নেই বা কোন কর্মকতা/কর্মচারী নেই। তাছাড়া পরিদর্শন কাজের জন্য কোনো লজিস্টিকস সাপোর্ট রাখা হয়নি। এছাড়া মাওয়া, কাওড়াকান্দি ও কাঠালবাড়ী নৌ-বন্দরের মধ্যে ২টি নৌ-বন্দর মাওয়া ও কাওড়াকান্দিতে ট্রাফিক ইন্সপেক্টর পদের মধ্যে মাওয়া ঘাটে কর্মরত জাহাঙ্গীর ভূঁইয়া দুর্ঘটনার দিন সকালে মাওয়া ঘাট ত্যাগ করে মাঝিকান্দি ঘাটে যান। অথচ মাওয়া - মাঝিকান্দি বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃক স্বীকৃত কোন নৌ রুট নয়। এমনকি জাহাঙ্গীর ভূইয়া মাওয়া ঘাটের বার্থিং সারেংকেও তার সাথে নিয়ে যান। ফলে কার্যত ওই দিন মাওয়া-কাওড়াকান্দি ও কাঁঠালবাড়ী ঘাটে কোন কর্মকর্তা/কর্মচারী দায়িত্বে ছিল না।

প্রতিবেদনে নৌযানটির বর্তমান অবস্থান অংশে বলা হয়— ‘দুর্ঘটনা পরবর্তী বিভিন্ন সংস্থার বিশেষজ্ঞরা তাদের স্ব স্ব নৌযান ও সাইডস্ক্যান সোনারের সাহায্যে নৌযানটির অবস্থান চিহ্নিত করতে ব্যর্থ হয়। তবে, দেশে বিদ্যমান সর্বাধুনিক প্রযুক্তি সম্বলিত জাহাজ জরিপ-১০ ও কাণ্ডারী-২-এর সাহায্যে এবং উন্নতমানের আধুনিক সাইডস্ক্যানার ব্যবহার করে ডুবে যাওয়া এমএল পিনাক-৬ সদৃশ্য একটি ধাতব কাঠামো নদীগর্ভে চিহ্নিত করে। এ সময় নদীতে তীব্র স্রোত থাকায় ২টি উদ্ধারকারী নৌযান প্রস্তুত থাকা সত্ত্বেও ডুবুরিদের জীবননাশের আশঙ্কা চিন্তা করে দুর্ঘটনাকবলিত নৌযানটি উদ্ধার করার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে। ফলে মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসন ১১ আগস্ট উদ্ধার কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করে।’

দৈনিক বর্তমান