এর বিপরীতে উত্তরে তাকাতেই নতুন বিশাল এক অডিটরিয়াম। এটি অতীশ দীপঙ্কর পাবলিক লাইব্রেরী এন্ড অডিটরিয়াম। প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে শীঘ্রই এমন আরও অনেক রংবেরংয়ের স্থাপনা চোখে পড়বে। এখানে অতীশ দীপঙ্কর মেমোরিয়্যাল কমপ্লেক্স স্থাপিত হয়েছে। ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০১০ইং অতীশ দীপঙ্করের ১০৩০ তম জন্ম উৎসবে আনুষ্ঠানিকভাবে এই কমপ্লেক্স ভিত্তি ফলক উন্মোচন করা হয়। অডিটরিয়ামের জায়গা ছাড়াই আড়াই একর জমির উপর স্থাপিত হবে এই কমপ্লেক্স।
তিববতের অতীশ স্মৃতি মঠের আদলে এই কমপ্লেক্সে আধুনিকতার নানা ছোয়া থাকবে। এই ফল
উন্মোচন করতে দেশী বিদেশী বহু অতিথির সমাবেশ ঘটে বিক্রমপুর তথা মুন্সীঞ্জের সদর উপজেলার বজ্র্রযোগিনী গ্রামে। বরণ্যে অতিথিদের আগমনের যেন নতুন সাজে সেজেছিল জ্ঞান তাপসসের নয়নাভিরাম এই গ্রাম।
৯৮০ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি অতীশ দীপঙ্কর জন্ম গ্রহণ করেন এই মাটিতে। তাঁর এই জন্ম ইতিহাসের কোথাও কোথাও ৯৮২ সাল লেখা হয়েছে। তবে জন্ম স্থান সব জায়গাই বিক্রমপুরের বজ্রযোগিনী উল্লেখ রয়েছে। বিক্রমপুর ইতিহাসে তাঁর জন্ম নিয়ে হুবুহু এভাবে লেখা হয়েছে ‘‘ পাগ-সাম-জন-জাঙ্গ -এর মতে অতীশ দীপঙ্করের জন্মভূমি বিক্রমপুরের বজ্রাসনের পূর্ব দিকে অবস্থিত। মূল ইংরেজীতে এভাবে লেখা-
‘‘Dipankar was born At 980 in the Royal family of Gour at Bikrampur in Bangla, a country lying to the East of Vajrasana. ’’
দীপঙ্কর তাঁর আত্ম জীবনীতে লিখেছেন-‘‘আমার দেশে রাজা এবং রাজবংশীয় লোকের বসবাস। ভূ ইন্দ্র চন্দ্র নামে এক রাজা রাজত্ব করেন। রাজবংশীয়দের দেহে রাজ রক্ত থাকিলেও তাহারা রাজ্য বা সিংহাসনের অধিকারী নহেন। আমি রাজ বংশে জন্ম লাভ করেছিলাম। আমার পিতার তিব নাম থাহি দান পগ (Tib-Namm-khahihi-dvan-phyug) তবে বাংলার ইতিহাসে অতীশ দীপঙ্করের পিতার নাম কল্যাণ শ্রী ও মায়ের নাম প্রভাবতী উল্লেখ রয়েছে। কল্যাণ শ্রী তিববতীয় নাম হলো - Dge-vahi. বাল্যকালে দীপঙ্করের নাম ছিল চন্দ্রগর্ভ। দীপঙ্কর আত্মজীবনীতে রাজা হিসাবে ভূ আন্দ্র চন্দ্রের কথা বলেছেন। সে যুগে দীপঙ্করের বাড়ির দু’ কিলোমিটার উত্তরে শ্রীচন্দ্র (৯৩০-৯৮০) লডহর চন্দ্র, পূর্ণচন্দ্ররা রাজত্ব করেন। তারা সবাই বৌদ্ধ রাজা ছিলেন।
অতীশ ১০৫৩ সালে ৭৩ বছর বয়সে দেহ ত্যাগ করেন তিববতের ন্যাথাং (Nathan) শহরে। তাঁর সমাধি মন্দির Sgro-সধ নামে পরিচিত। ১৯৮১ সালে এই জ্ঞান তাপসের দেহভস্ম রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়।
৭৩ বছরের জীবনে তিনি মানব কল্যাণে বহু অবদান রেখে গেছেন। অল্প বয়সেই দীপঙ্কর শিক্ষক জেতারির কাছ থেকে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। অধিক জ্ঞান লাভে কৃষ্ণ গিরিচ বিহারে রাহুল গুপ্তের কাছে বৌদ্ধদিগের ত্রিশিক্ষা নামক তত্ত্বগ্রন্থের শিক্ষার জন্য গমন করেন। মাত্র ১৯ বছর বয়সে ওদন্তপুরী বিহারের আচার্য পরমপন্ডিত শঅল রক্ষিতের কাছ থেকে ভিক্ষুব্রত দীক্ষা লাভ করেন। ২৫ বছর বয়সে তিনি একজন প্রসিদ্ধ নৈয়ায়িক ব্রাম্মণকে তর্ক যুদ্ধে পরাজিত করে অসীম গৌরব অর্জন করেন। এরপরই ওদন্তপুরী বিহারের বৌদ্ধচার্য শীলরক্ষিত দীপঙ্করকে শ্রীজ্ঞান উপাধি দান করেন। ২৯ বছর বয়সে তিনি বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেন। ৩১ বছর বয়সে দীপঙ্কর শ্রীলঙ্কা গমন করেন ও পরে নালান্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের মহাচার্য পদে আসীন হন। ১০৪১ সালে হিমালয় অতিক্রম করে তিনি তিব্বতে যান। তাঁর অসাধারণ পান্ডিত্যের কারণে তিববতীরা তাঁকে অত্যন্ত সম্মানজনক ‘অতীশ’ উপাধিতে ভূষিত করে। বৌদ্ধ ধর্মে তাঁর প্রয়োজনীয় সংস্কার আজও বৌদ্ধ জগতে মৌলিক বিধি ব্যবস্থা হিসাবে অনুসৃত হচ্ছে। দীপঙ্কর বহু গ্রন্থের প্রণেতা। ‘বোধীপথ প্রদীপ’,‘সংগ্রহ গর্ভ’,‘চর্য্যা সংগ্রহ দীপ’,‘মধ্যো মোপদেশ’ ও ‘মহাযান পথ সাধন বর্ণ সংগ্রহ’ প্রভৃতি গবেষণা ধর্মী গ্রন্থ রচনা করেছেন।
এসবের মূলেই তাঁর বজ্রযোগিনী গ্রাম। তাই এই গ্রামকে আলোকিত করতে চায় দীপঙ্কর ভক্তরা। এই গ্রাম ঘিরে জ্ঞানের জ্যোতি ঝড়ানোর পাশাপাশি বিশাল পর্যটন কেন্দ্র হিসাবেও হাতছানি দিয়ে ডাকছে। জেলা শহরের প্রায় ৫ কিলোমিটার এবং রাজধানী ঢাকা থেকে ২৮ কিলোমিটার দুরের বজ্রযোগিনীতে গিয়ে প্রকৃতির নৈস্বর্গিক ভিন্ন রূপের বজ্রযোগিনীকে দেখা যাবে। পন্ডিতের ভিটা নামে পরিচিত দীপঙ্করের স্মৃতিমঠটিও ঘষামাজা করে আবার রং করা হয়েছে। এই আয়োজন ধর্ম নিরপেক্ষতারও বিরল দৃষ্টান্ত হতে পারে।
মুন্সীগঞ্জ নিউজ