Thursday, July 21, 2011

ঘুষ-দুর্নীতি এবং কালো টাকা-সাদা টাকা প্রসঙ্গে

অলিউর রহমান ফিরোজ
দেশে কালো টাকার আবার ছড়াছড়ি হওয়ার উপক্রম হয়েছে। শেয়ারবাজারে আবার কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ দেয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। বাজারের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে সরকার গঠিত বাংলাদেশ ফান্ড-এ টাকা বিনিয়োগ করলে টাকার উৎস খোঁজা হবে না। সরকারকে ১০ শতাংশ কর দিয়ে এ কালো টাকা সাদা করা যাবে। রাষ্ট্র থেকে কালো টাকার বন্ধের উদ্যোগ গ্রহণ করেও তা আবার কালো টাকার মালিকদের সুযোগ দেয়া সত্যিই নিন্দনীয়। দেশে এমনিতেই কালো টাকা দেশের জন্য বিপজ্জনক। যার প্রতিফলন আমরা দেখেছি শেয়ারবাজারে। শেয়ারবাজার ধসের জন্য যে কটি কারণ রয়েছে তার অন্যতম হলো কালো টাকা। এ টাকা শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের প্রভাবে শেয়ারবাজারের ব্যাপকভাবে দরপতন শুরু হয়। কালো টাকার মালিকদের শিথিলতার জন্য আবাসন ব্যবসায়ীরাও সরকারের কাছে আবেদন জানাচ্ছেন। আবাসন শিল্পের বড় ধরনের বিনিয়োগ আসে মূলত কালো টাকার মালিকদের থেকে। তা বন্ধ হওয়ার কারণে তাদের ব্যবসা এখন একটু নিম্নমুখী। কিন্তু সরকার পুঁজিবাজারে কালো টাকা বিনিয়োগ করলে তা বিপজ্জনক হয়ে পড়বে। কালো টাকা মূলত দুই ভাবে তার মালিকরা উপার্জন করে থাকেন। ১. কালোবাজারি-চোরাচালান, ঘুষ-দুর্নীতি এবং ২. বৈধভাবে ব্যবসা করেও উপার্জিত টাকার উপর সরকারকে কর প্রদান না করে। টিআইবি'র প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে_ আমদানি করা পণ্যের প্রায় ৭২ শতাংশ পণ্যছাড়ে ঘুষ দিতে হয়। এখানে কালো টাকার মালিকদের সঙ্গে যারা বৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনা করেন তাদের একটা বড় ধরনের বৈষম্য দেখা দেয়। একজন ব্যবসায়ী তিনি সরকারকে সঠিক পন্থায় কর দিয়ে ব্যবসা করার কারণে তার পণ্যের মূল্যে বেড়ে যায় অপরদিকে যিনি কর গোপন করেন তার পণ্যের মূল্যে কমে যায়। এর ফলে যিনি বৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনা করেন তিনি কালো টাকার মালিকদের সঙ্গে ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতায় কুলিয়ে উঠতে ব্যর্থ হন। এভাবেই এক সময় সৎ ব্যবসায়ীরা মার খেয়ে গুটিয়ে পড়েন। আর সরকার কালো টাকার মালিকদের কাছ থেকে বৈধভাবে কর না পেয়ে রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হন। যার প্রভাব এসে পড়ে আমাদের সমাজ ব্যবস্থায়। কালো টাকার প্রচলন শুরু হয় মূলত বিএনপি সরকারের আমলে। তার ধারাবাহিকতায় আওয়ামী লীগ সরকারও কালো টাকার মালিকদের সুযোগ দেয়। টিআইবির এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত অর্থবছরে ২১ হাজার কোটি টাকার কর ফাঁকি দেয়া হয়েছে। যা জাতীয় রাজস্ব আয়ের এক-তৃতীয়াংশ এবং জাতীয় আয়ের প্রায় ২ দশমিক ৮ শতাংশ। কর ফাঁকির ঘটনার কয়েকটি বিষয়কে চিহ্নিত করেছেন তারা।

তার মধ্যে-প্রকৃত আয় এবং বেতন গোপন করা, আত্মীয়স্বজনের নামে প্লট ও ফ্ল্যাট, ডিপিএস ও অন্যান্য বন্ড কেনা, করযোগ্য আয় গোপন করে ধার করে সম্পদ ক্রয় এবং গঠন, বেতনের অংশবিষেশ করমুক্ত আয় হিসেবে দেখানো, বিদেশে অর্থ পাচার এবং কম সংখ্যক ক্লায়েন্ট ও কম ফি প্রদর্শন। এভাবেই আমাদের রাজনৈতিক শীর্ষ ব্যক্তিরা কালো টাকার মালিকদের অবৈধ সুযোগ-সুবিধা দিয়ে দুর্নীতি করার উৎসাহ প্রদান করেন। এদের প্রভাবে বাজারে সিন্ডিকেট প্রথা তৈরি হয়। কালো টাকার বহনের চেয়ে তারা বিভিন্ন প্রকার মালামাল গুদামজাত করে বাজারে ব্যাপক সংকটের সৃষ্টি করে। তাদের সঠিকভাবে আইনের আওতায় না আনার কারণে দেশ দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। এ কলুষতা থেকে দেশকে বাঁচাতে হবে। দেশে দুর্নীতি কতটা মাকড়সার জালের মতো বিস্তার করেছে তা দুর্নীতি প্রতিরোধকারী প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তাকে ঘুষের টাকাসহ হাতে নাতে ধরাতেই তা পরিষ্কার হয়ে গেছে। দুর্নীতি প্রতিরোধ করতে যেয়ে তারাই যদি কালো টাকায় বশীভূত হয়ে যায় তাহলে এরকম প্রতিষ্ঠানের দরকারই বা কী? মানুষের জীবন এমনিতেই সংকটাপন্ন। তার সঙ্গে এ অপকর্ম রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থাকে আরও অধঃগতির দিকে ধাবিত করছে।

সাভারে এক এএসপির বিরুদ্ধে ৫০ হাজার টাকা হয়রানিমূলক আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। যারা দেশের অনিয়ম-অবিচার রোধে এগিয়ে আসবেন তারাই একের পর এক এভাবে অপকর্মের ভাগিদার হলে সাধারণ নিরীহ মানুষজন কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? ঢাকার সাভার সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মীর মো. শাহজাহান এক গৃহবধূ ও তার মেয়েকে মিথ্যা মামলায় ঢোকানোর ভয়-ভীতি দেখিয়ে টাকা আদায় করতে গিয়েছিলেন। তিনি গৃহবধূ ও তার মেয়েকে বাড়ি থেকে মাদক ব্যবসায়ী দেখিয়ে গ্রেফতার করে সাভার থানা এএসপি ভবনে নিয়ে যান। এ সময় মাকে আটক করে মেয়েকে তিনি ছেড়ে দেন তার দাবিকৃত টাকা নিয়ে আসার জন্য। মেয়ে বাড়ির স্বর্ণালঙ্কার বন্ধক রেখে চলি্লশ হাজার টাকা নিয়ে গেলে তাকে এবং তার মাকে ছেড়ে দেয় পুলিশ। অবাক হতে হয় যখন দুর্নীতির দায়ে পুলিশ বিভাগ টিআইবির প্রতিবেদনে শীর্ষ স্থান দখল করলেও পুলিশের আইজি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে তার বাহিনীর সাফাই গাইতে দেখে। সাভারে যখন এএসপির বিরুদ্ধেই যখন এত বড় গুরুতর অভিযোগ উঠে তখন তার নিম্ন পর্যায়দের অবস্থা আরও যে তথৈবচ তা আর বলার অপেক্ষা থাকে না। দেশের মানুষ পারত পক্ষে কেউ থানা পুলিশের দ্বারস্থ সহজে হতে চায় না। থানাগুলোতে ঘুষ বাণিজ্যের অবস্থা আরও ভয়াবহ। টাকা ছাড়া মামলা করলেও ফাইনাল রির্পোট কেউ চোখে দেখতে পান না। সবচেয়ে বেশি অবাক হতে হয় যখন দেশের শীর্ষ স্থানীয় কোন ব্যক্তির বিরুদ্ধে ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠে।

জোট সরকারের সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ৫০ কোটি টাকার বিনিময়ে খুনের দায় থেকে মুক্তি দেয়ার অভিযোগ রয়েছে। সাবেক এই স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী চাঞ্চল্যকর সাবি্বর হত্যাকা- নিয়ে যে ভাবে টাকার বিনিময়ে আসামিকে মামলা থেকে রেহাই দিতে মরিয়া হয়েছেন তা সত্যিই লজ্জাজনক। তার আমলে দশ ট্রাক অস্ত্রের চালানের খালাসও হয়েছিল বিরাট অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে। এভাবেই আমাদের শীর্ষ আমলা-কর্তাদের দুর্নীতির জাল বিস্তার দেখে জাতি শঙ্কিত না হয়ে পারেন না। অভিযোগ ওঠে বর্তমান যোগাযোগমন্ত্রীকে নিয়ে। সে নির্বাচিত হয়ে তার এলাকায় মাত্র একবার গিয়েছিলেন। তিনি এখন বড় বড় প্রকল্প নিয়ে মহাব্যস্ততায় দিন-যাপন করছেন। আর তার বিরুদ্ধেই উড়াল সড়ক প্রকল্পের কাজ তার নিজস্ব প্রতিষ্ঠানে পাইয়ে দিতে অভিযোগ উঠেছে। এদিকে দেশের দুদক আইনে প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তন আনছেন। সরকারের অনুমতি ছাড়া কোন সরকারি কর্মকর্তা বা সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে কোন তদন্ত ও মামলা করা যাবে না। তার এ ভূমিকায় দেশের দুর্নীতিবাজ বাবরদের মতো যারা আমাদের গিলে খাচ্ছেন তাদের অাঁড়াল করতেই তার আইনে পরিবর্তন আনার অন্যতম কারণ বলে দেশের সাধারণ মানুষ মনে করেন। কোথায় যাবেন যেখানে ঘুষ বাণিজ্য নেই। জমি ক্রয় করে মিউটেশন করতে গেলে টাকা ছাড়া তার কোন আপনজন মিউটেশন করতে পারবে না। হাসপাতালে টাকা ছাড়া বিনামূল্যের সিট পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়ে। সরকারি ব্যাংকগুলো থেকে ঋণ পেতে হলে অগ্রিম ১০ শতাংশ না দিলে ঋণ পাওয়া যাবে না। পাসপোর্ট করতে গেলে ঘুষবাণিজ্যের নমুনা স্বচক্ষে দেখা যায়। আর এজি অফিসের কথা আর কী বলব। সেখানে টাকা ছাড়া বিল পাস করা কেউ স্বপ্নেও কোন দিন ভাবতে পারবে না। টাকা দিলে তারা যে কোন অনিয়মের বিল পাস করা মুহূর্তের ব্যাপার হয় মাত্র। দেশে নিয়োগ বাণিজ্যের কথা সবারই জানা। তাছাড়া দেশে রয়েছে ভর্তিবাণিজ্য। অপরদিকে বদলি বাণিজ্যের জন্য বড় ধরনের অঙ্ক গুনতে হয়। তাই দেশের মানুষ এখন ঘুষবাণিজ্যের জালে বন্দী হয়ে আছেন।

দেশে বাড়ছে বৈষম্য। এ থেকে আমরা মুক্তি চাই। দেশ থেকে দুর্নীতির অপছায়া দূর করতে হবে।

সংবাদ