Saturday, December 06, 2014

রামপালে মোগল আমলে তৈরি পানাম-পুলঘাটা সেতু

মুন্সিগঞ্জের রামপালে মোগল আমলে তৈরি পানাম পুলঘাটা সেতুটি তদারকির অভাবে নষ্ট হতে বসেছে। চুন-সুরকি দিয়ে তৈরি ১৭১ ফুট দৈর্ঘ্যের সেতুটির কাঠামোর বিভিন্ন অংশ ইতিমধ্যে ভেঙে গেছে। ঈদ, পূজা ও পয়লা বৈশাখের মতো উৎসবের দিনে শত শত দর্শনার্থীর ভিড় জমে সেতুর ওপরে। বিনোদনপ্রত্যাশী মানুষের আনাগোনা লেগেই থাকে প্রতিদিন। বিদেশিরাও আসেন মাঝেমধ্যে। অথচ ঐতিহ্যের স্মারক এখনকার বিনোদনের খোরাক সেতুটি সংস্কার ও সংরক্ষণে কোনো উদ্যোগ নেই প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের।

মুন্সিগঞ্জ শহর থেকে প্রায় চার কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে সদর উপজেলার রামপাল ইউনিয়নের মিরকাদিমের খালের ওপর পানাম-পুলঘাটা সেতুটি। মোগল আমলের নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের পানাম নগরের সঙ্গে মুন্সিগঞ্জের পানাম-পুলঘাটা সেতুটির একটি সম্পর্ক রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। এই সেতুর মতো সোনারগাঁ থেকে পানাম নগরের পশ্চিম দিকে দুলালপুরে ‘পানাম নগর সেতু’ নামে আরও একটি সেতু আছে।

এর নিচ দিয়ে উত্তর ও দক্ষিণ দিকে বয়ে গেছে মিরকাদিম খাল। সেতুটিতে তিনটি খিলান রয়েছে। মোগল স্থাপত্যে খিলান থাকা একটি বৈশিষ্ট্য বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। সেতুর পশ্চিম প্রান্তে বৃষ্টির পানি যাওয়ার জন্য একটি নর্দমা রয়েছে। পশ্চিম প্রান্ত টঙ্গিবাড়ী উপজেলার আবদুল্লাহপুরে পড়েছে। আর পূর্বপ্রান্ত পড়েছে সদর উপজেলার পানাম-পুলঘাটা এলাকায়।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, অধিদপ্তর ২০০৬ সালে মিরকাদিম খালের ওপর পানাম-পুলঘাট সেতুটি সংরক্ষণের আওতায় নিয়ে আসে। এরপর সেতুটির সংস্কার করে এর দুই পাশে দুটি সতর্কীকরণ নোটিশ পুঁতে দেয়। ওই নোটিশে সেতুর দেয়ালে কোনো কিছু লেখাসহ অবকাঠামোর ক্ষতিসাধন করলে দণ্ডনীয় অপরাধের সতর্কবার্তা ছিল।
অতি সম্প্রতি সরেজমিনে পানাম-পুলঘাটা সেতু পরিদর্শন করে সতর্কীকরণ নোটিশ বোর্ড (সাইনবোর্ড) দুটি পাওয়া যায়নি। সেতুর দুই পাশের রেলিংয়ে চুন ও কালি দিয়ে লেখা নানা মন্তব্য দেখা গেছে। দক্ষিণ পাশের দেয়ালের বড় একটি অংশ ভেঙে গেছে। এ ছাড়া সেতুটির নিচের অংশের দুই পাশ দিয়েই চুন ও সুরকির আস্তর ক্ষতবিক্ষত হয়ে পড়েছে। সেতুর পাশেই দেয়াল ঘেঁষে ইট-বালুর ব্যবসা চলছে। সেতুর পূর্ব পাশের দক্ষিণ দিকে ১০ গজের মধ্যেই স্থানীয় কয়েকটি নির্মাণাধীন দোকানঘর। তবে এখন এর নির্মাণকাজ বন্ধ রয়েছে।

সেতু লাগোয়া ইটের ব্যবসা করছেন রামপাল ইউনিয়নের হাতমারা এলাকার কালু মিয়া। কালু মিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, ‘এই জমি আমার খরিদ করা। আমার জমিতে ব্যবসা করছি।’ সেতুর কাছে দোকানঘর নির্মাণ করেছেন জোড়ারদেউল এলাকার আবুল কালাম। এই বিষয়ে কালামের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।

পানাম পুলঘাটের বর্তমান হাল উদাসীনতার কারণেই ঘটেছে বলে মনে করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক সুফি মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, এসব সম্পদ যে অমূল্য তা স্থানীয় মানুষকে বোঝাতে হবে। এসব সম্পদ নিয়ে তাদের ভেতরে গর্ববোধ তৈরির দায়িত্ব সরকারকে নিতে হবে।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের ঢাকা অঞ্চলের পরিচালক মো. আতাউর রহামান প্রথম আলোকে জানান, সেতুটি ২০০৬ সালে সংরক্ষণের পর সংস্কার করা হয়। কিন্তু সেতুর নিচ দিয়ে ট্রলারসহ নৌযান যাওয়ার সময় সেতুতে আঘাত লাগতে লাগতে দুই পাশে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সেতুর কাছে ইটের ব্যবসার বিষয়টি তার জানা নেই বলে জানান আতাউর। দোকান নির্মাণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘দোকান নির্মাণের খবর পেয়ে ঢাকা থেকে এসে আমরা বাধা দিয়েছি। খুব শিগগিরই সেতুটি পরিদর্শন করতে যাব। আগামী অর্থবছরে নতুন করে আবার সংস্কারের জন্য বাজেট বরাদ্দের জন্য আবেদন করা হবে।

প্রথম আলো