Wednesday, November 19, 2014

পদ্মার ওপারে দিন বদলের অপেক্ষা

রাজীব আহমেদ: সড়কপথে দূরত্ব ৩৩৫ কিলোমিটার। সকালে বাসে উঠলে রংপুরের মানুষ ঢাকায় পৌঁছত গভীর রাতে। দিন বদলেছিল ১৯৯৮ সালে, যখন যমুনা নদীর ওপরে নির্মিত একটি সেতুর ওপর দিয়ে গাড়ির চাকা ঘুরতে শুরু করেছিল। উদ্বোধনের দিন থেকে বঙ্গবন্ধু সেতুর ওপর দিয়ে গাড়ির চাকার সঙ্গে ঘুরতে শুরু করে উত্তরের মানুষের ভাগ্য। আজ দেড় দশক পর রাজশাহী (রংপুরসহ) এখন আর দেশের দরিদ্রতম বিভাগ নয়। দারিদ্র্যের হার এখন সবচেয়ে বেশি বরিশালে।

ঢাকা থেকে মাওয়া হয়ে বরিশালের দূরত্ব মাত্র ১৬৭ কিলোমিটার, রংপুরের দূরত্বের অর্ধেক। কিন্তু এক ট্রাক পণ্য নিয়ে বরিশাল থেকে ঢাকায় আসতে সময় লাগে কমপক্ষে ২৪ ঘণ্টা। কখনো কখনো সেটি তিন দিনেও গড়ায়। সড়কপথে ছয়-সাত ঘণ্টার বেশি লাগে না; কিন্তু পদ্মা নদী পার হতেই ঘাটে বসে থেকে কাটাতে হয় দীর্ঘ সময়। অথচ একটি সেতু হলে তিন-চার ঘণ্টার মধ্যে বরিশাল পৌঁছে যাওয়া যেত।

পদ্মা সেতুকে কেন্দ্র করে উত্তরের মতো নিজেদের দিন বদলের স্বপ্ন দেখছে দক্ষিণের জেলাগুলোর প্রায় তিন কোটির বেশি মানুষ। এ সেতু হলে তাদের এলাকায় গ্যাস যাবে, শিল্পায়ন হবে। দ্রুত পণ্য পরিবহন করা যাবে, পণ্যের ভালো দাম মিলবে। সঙ্গে শিক্ষা, চিকিৎসার উন্নতি হবে- এমন আশা ওই সব জেলার বাসিন্দাদের। সড়কপথের পাশাপাশি পদ্মা সেতুর মাধ্যমে রেল যোগাযোগ স্থাপিত হলে পণ্য পরিবহন খরচও কমবে। মংলা বন্দরের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হলে ওই বন্দর চট্টগ্রাম বন্দরের মতোই কর্মচাঞ্চল্যে ভরে উঠবে বলেও আশা দক্ষিণের ব্যবসায়ীদের।

এর সঙ্গে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশও। দুর্নীতির অভিযোগ তুলে যে সেতু থেকে বিশ্বব্যাংক সরে গেছে তাদেরই ‘প্রজেক্ট অ্যাপরাইসাল ডকুমেন্টে’ বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সীমানার ২৭ শতাংশ পদ্মা সেতুর ওপারে অবস্থিত। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় চার ভাগের এক ভাগ ওই অঞ্চলে বসবাস করে। সেতুটি নির্মিত হলে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জিডিপির প্রবৃদ্ধি ১.৭ শতাংশ বেশি হবে। এতে জাতীয় জিডিপির হার বাড়বে ০.৫৭ শতাংশ। এতে ওই অঞ্চলে দারিদ্র্য বিমোচনের হার ১ শতাংশীয় পয়েন্ট হারে বাড়বে।

বিশ্বব্যাংক আরো বলেছে, পদ্মা সেতুর কারণে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে যাতায়াতের দূরত্ব কমবেশি ১০০ কিলোমিটারের মতো কমবে। এতে গাড়িতে সময় বাঁচবে দুই ঘণ্টার মতো। আর ট্রাকের ক্ষেত্রে সময় কমবে ১০ ঘণ্টা। এ সেতু শুধু ঢাকার সঙ্গে দক্ষিণের সংযোগ স্থাপনই করবে না, এটি এশিয়ান হাইওয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা; যে হাইওয়ের মাধ্যমে জাপানের টোকিও থেকে তুরস্কের ইস্তাম্বুল পর্যন্ত সংযোগ স্থাপনের আঞ্চলিক পরিকল্পনা আছে।

সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পদ্মা সেতুর প্রভাব বহুমাত্রিক। এর ফলে যোগাযোগ সহজ হবে, মানুষের এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়ার হার বাড়বে। কর্মসংস্থান হবে, বিনিয়োগ ও পণ্যের বাণিজ্য বাড়বে, যা ওই অঞ্চলকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।’

তিনি বলেন, ‘যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতি হলে মানুষের মবিলিটি বাড়ে। একসময় উত্তরবঙ্গের মানুষ কোথাও যেত না। সেখানে মঙ্গা ছিল, অভাব ছিল। এখন রংপুরের মানুষ কাজের খোঁজে চট্টগ্রামও চলে যায়। তাদের যোগাযোগ বেড়েছে বঙ্গবন্ধু সেতুর কারণে।’

‘পদ্মা সেতুর অর্থনৈতিক প্রভাব প্রাক্কলন’ শীর্ষক এক গবেষণায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের দুজন অধ্যাপক ড. বজলুল হক খন্দকার ও ড. সেলিম রায়হান দেখিয়েছেন, পদ্মা সেতু নির্মিত হলে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে পণ্য ও সেবার চাহিদা বাড়বে, যাতে দেশের মোট অভ্যন্তরীণ চাহিদাও বাড়বে। স্যোশাল আকাউন্টিং ম্যাট্রিক্স (এসএএম) ব্যবহার করে তাঁরা বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, পদ্মা সেতু নির্মিত হলে দক্ষিণাঞ্চলে শস্য চাহিদা ২০ শতাংশ, মাছের চাহিদা ২০ শতাংশ, ইউটিলিটি সেবা ১০ শতাংশ ও পরিবহন সেবার চাহিদা ৫০ শতাংশ বাড়বে। এর ফলে দেশের মোট শস্য চাহিদা ১০ শতাংশ, মাছের চাহিদা ১০ শতাংশ, ইউটিলিটি সেবার চাহিদা ৫ শতাংশ ও পরিবহন চাহিদা ২০ শতাংশ বাড়বে। ড. সেলিম রায়হান জানান, বঙ্গবন্ধু সেতুর কারণে উত্তরাঞ্চলে পণ্য ও সেবার চাহিদা যেভাবে বেড়েছিল তার ওপর ভিত্তি করে এ হিসাব করা হয়েছে।

বঙ্গবন্ধু সেতুতে এগিয়েছে উত্তর, পিছিয়ে দক্ষিণ : যমুনায় বঙ্গবন্ধু সেতু হওয়ার পর উত্তরাঞ্চলে দারিদ্র্য বিমোচন দ্রুত হারে হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) খানা আয়-ব্যয় জরিপ অনুযায়ী, ২০০০ সালে বরিশাল বিভাগে দারিদ্র্যের হার ছিল ৫৩ শতাংশ, খুলনায় ছিল ৪৫ শতাংশ; ২০১০ সালে তা কমে বরিশালে হয় ৩৯.৪ শতাংশ এবং খুলনায় হয় ৩২.১ শতাংশ। ২০০০ সালে রাজশাহীতে (রংপুরসহ) দারিদ্র্যের হার ছিল বরিশাল ও খুলনার চেয়ে বেশি। কিন্তু ২০১০ সালে তা ওই দুই বিভাগের চেয়ে কমে ৫৭ থেকে ৩৫.৭ শতাংশে দাঁড়ায়।

বঙ্গবন্ধু সেতু হওয়ার পর উত্তরাঞ্চলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও বেড়েছে। ফলে দেশের মোট অর্থনৈতিক ইউনিটে উত্তরাঞ্চলের অংশীদারি এখন অনেক বেশি, যা দক্ষিণাঞ্চলের ক্ষেত্রে কমে গেছে। বিবিএসের অর্থনৈতিক শুমারি অনুযায়ী, ২০০১ সালে দেশের ইকোনমিক ইউনিটের ৫.৫ শতাংশ বরিশালে এবং ১৪.৭ শতাংশ ছিল খুলনায়; ২০১৩ সালে তা কমে যথাক্রমে ৪.৮ ও ১২.৮ শতাংশে দাঁড়ায়। ২০১৩ সালে রাজশাহীতে ইকোনমিক ইউনিটের সংখ্যা ২০০০ সালের ১৩.৫ থেকে বেড়ে ১৫.১ শতাংশ হয়েছে। রংপুরে ১০.৯ থেকে বেড়ে ১৩.৫ শতাংশ হয়েছে।

বর্তমানে দেশের মোট উৎপাদনশীল শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ৪.৮ শতাংশ বরিশালে এবং ১৪.২ শতাংশ খুলনায় অবস্থিত। রাজশাহী ও রংপুরে উৎপাদনশীল শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দক্ষিণের চেয়ে বেশি। ওই দুই বিভাগে দেশের ২৬ শতাংশের চেয়েও বেশি উৎপাদনমুখী শিল্প অবস্থিত।

পরিবর্তনের আশা দক্ষিণে : পদ্মা সেতু নির্মিত হলে বরিশালে শিল্পায়ন হবে কি না জানতে চাইলে বরিশাল মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিএমসিসিআই) সভাপতি মো. নিজাম উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পদ্মা সেতু হলে বরিশালে গ্যাস আসবে। গ্যাস এলে আমি নিজেই প্লাস্টিক পণ্য উৎপাদনের একটি কারখানা করার চিন্তা করছি। আমার মতো আরো শত শত ব্যবসায়ী বিনিয়োগ করার জন্য মুখিয়ে আছে।’ তিনি বলেন, বরিশাল বিভাগ শিল্পায়নে পিছিয়ে আছে। এর বড় কারণ এখানে গ্যাস নেই, যোগাযোগব্যবস্থায় বাধা পদ্মা। সেতু হলে দেশের তৃতীয় সমুদ্রবন্দর হিসেবে পায়রা গতিশীল হবে। পাশাপাশি এ অঞ্চলে অনেক রপ্তানিমুখী শিল্প-কারখানা গড়ে উঠবে।

খুলনা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (কেসিসিআই) পরিচালক অ্যাডভোকেট মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ঢাকা থেকে মংলা বন্দরে যেতে একটি ট্রাকের সাত-আট ঘণ্টা সময় লাগে। কিন্তু ফেরিঘাটে জট থাকলে দু-তিন দিন অপেক্ষা করতে হয়। পদ্মা সেতু হলে সাড়ে তিন থেকে চার ঘণ্টার মধ্যে মংলা বন্দরে যাওয়া যাবে। তিনি জানান, মংলা আগের চেয়ে এখন অনেক গতিশীল। গ্যাস সংযোগ এলেই খুলনা ইপিজেডে প্রচুর বিনিয়োগ হবে। এখনই কোনো প্লট খালি নেই। বিনিয়োগকারীরা সেখানে শিল্পপ্রতিষ্ঠান নির্মাণের অপেক্ষায় আছেন। বিদেশে রপ্তানির জন্য ৯৫ শতাংশ চিংড়ি ও ৮০ শতাংশ পাটপণ্য খুলনা থেকে মংলার বদলে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে রপ্তানি হয় বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ক্রেতারা যোগাযোগব্যবস্থার অভাবে খুলনায় যেতে চান না। এ ছাড়া আরো কিছু সমস্যা আছে।’

মতিঝিলের একটি বেসরকারি সংস্থার কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম মনে করেন, পদ্মা সেতু দিয়ে দুই ঘণ্টার মধ্যে মাদারীপুর যাওয়া যাবে। তখন তিনি প্রতি সপ্তাহে গ্রামের বাড়িতে যাবেন বলে জানান।

কালের কন্ঠ