Wednesday, November 05, 2014

থামে না স্বজনদের কান্না!

লঞ্চ দুর্ঘটনা
অরূপ দত্ত: মাওয়ায় লঞ্চ দুর্ঘটনা। ছবি: হাসান রাজাগত ৪ আগস্ট। ঘড়িতে তখন বেলা সোয়া ১১টা। একটি বিশেষ প্রতিবেদনের তথ্য সংগ্রহে ব্যস্ত রাজধানীর মতিঝিলে। হঠাৎ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের একজন তথ্যদাতার (সোর্স) ফোন। মাওয়ায় পিনাক লঞ্চ দুর্ঘটনা। পর পরই প্রথম আলোর রিপোর্টিং বিভাগের প্রধান শওকত হোসেন মুঠোফোনে, ‘ফটোগ্রাফার নিয়ে তাড়াতাড়ি যান।’

ভাবছিলাম আর কত দুর্ঘটনা, আর কত মৃত্যু! কবে থামবে নিহত ব্যক্তিদের স্বজনদের কান্না? এ বছরই ৩ মে পটুয়াখালীর গলাচিপা নদীতে ১০০ যাত্রী নিয়ে ডুবে গিয়েছিল এমভি শাথিল-১। একই লঞ্চ দুর্ঘটনায় পড়ে জানুয়ারিতেও। ১৫ মে তিন শতাধিক যাত্রী নিয়ে মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ায় মেঘনা নদীতে ডুবে যায় এমভি মিরাজ।
গাড়ি নিয়ে ছুটছি। কেরানীগঞ্জ থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটারের পথ মুন্সিগঞ্জের মাওয়া ঘাট। মনে হলো হাজার কিলোমিটার। ইচ্ছে হলো উড়োজাহাজে চলি। কাছাকাছি আসতেই ভেসে আসে কান্না, আহাজারি। পদ্মাপারে হাজার হাজার মানুষ—পুলিশ, র্যাব, ডুবুরি, কোস্টগার্ড।

কিন্তু ‘এমএল পিনাক-৬’ নামের যে লঞ্চটি ডুবে গেল তার অবস্থান কোথায়? কেউ সঠিকভাবে বলতে পারেন না। কেউ কেউ হাত বাড়িয়ে দেখিয়ে দেন মাঝনদী। পদ্মা তখনো উত্তাল। তার মধ্যেই ট্রলার নিয়ে একটু যেতেই মাঝি আর সাহস পান না, ‘না, সম্ভব না। আমার ট্রলারও ডুইবা যাইব।’

নদীপারে ভিড়ে দাঁড়িয়ে বৃদ্ধা জোহরা বেগম। দৃষ্টি মাঝনদীতে। খঁুজছেন দুই মেয়েকে। ফটোগ্রাফার হাসান রাজা ছবি তুলতে যেতেই তেড়ে এসে গালে বসিয়ে দিলেন থাপ্পড়, ‘সংবাদিক? ফটো তুইল্যা কী অইব? আমার মাইয়াগোরে আইনা দিতে পারবা?’

একটু দূরে অনেক মানুষের জটলা। ভেতরে শেখ সাদী। ভেজা কালো পোশাক। থেকে থেকে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন। দুই সন্তান আর স্ত্রীকে নিয়ে আসছিলেন শরীয়তপুর থেকে। লঞ্চ ডোবার পরও দুই হাতে দুই সন্তানকে ধরে রেখেছিলেন। ছিটকে গেছে। নদীর গভীরে দড়ি ফেলে স্পিডবোট উদ্ধার করে এনেছে সাদীকে। চিৎকার করে বলছেন, ‘আমি স্বার্থপর, আমার সন্তানদের ফেলে আমি বেঁচে আছি।’

১৫ বছর বয়সী রিমার মুখে, শরীরে জখমের চিহ্ন। কারা যেন বিস্কুট দিয়েছে খেতে। কিন্তু সে তখন পাথরের মতো স্তব্ধ। দুই চোখ স্থির। বোন-ভাই ও খালা-খালুকে হারিয়েছে সে।

তীরে বসে মধ্যবয়সী আলী জব্বার। শরীয়তপুর থেকে ঢাকার উদ্দেশে এক ছেলে, দুই মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে রওনা দিয়েছিলেন। শুধু নিজের জীবন নিয়ে ভেজা শরীরে একটি স্পিডবোটে উঠতে পেরেছেন। বিলাপ করছিলেন, ‘সকালেও সবাই আছিলাম, এখন একলা অইয়া গেলাম রে।’

ডুবে যাওয়া লঞ্চ থেকে বেঁচে এ রকম গল্প নিয়ে কাঁদছেন, ঘুরছেন অনেক যাত্রী। নিখোঁজ স্বজনদের উদ্ধার করবে কে?

পিনাকের পাশেই চলমান একটি লঞ্চের যাত্রীরা বললেন, চোখের সামনে একসঙ্গে এত মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু আগে আর কেউ দেখেননি। মাত্র ১৬ কিলোমিটার দূরের মাদারীপুরের কাওড়াকান্দি ঘাট থেকে মাওয়া হয়ে ঢাকায় যাত্রা। ঈদুল ফিতরের পর খুশিমনেই ফিরছিলেন যাত্রীরা। কিন্তু উত্তাল পদ্মা। দেড় তলা উচ্চতার, ৮৫ জন বসার ছোট লঞ্চে যাত্রী ওঠানো হয় প্রায় ৩০০। মাওয়া ঘাটের কাছে এসে ঢেউ আর স্রোতের টানে, অতিরিক্ত যাত্রীর চাপে আর মাস্টার-চালকের অদক্ষতায় ভারসাম্য হারিয়ে একদিকে কাত হয়ে ডুবে গেল লঞ্চটি।

ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল বেকার বসে। কোথায় খুঁজবেন? বিভিন্ন চ্যানেলের ভিডিও ক্যামেরা তাক করতেই ঘাট থেকে কয়েকজন লাফিয়ে পড়লেন নদীতে। লাশ খোঁজার ভঙ্গি। কিন্তু লাশ তো অনেক দূরে।

বেলা যখন প্রায় দেড়টা, হঠাৎ নিখোঁজ যাত্রীদের স্বজনদের বিলাপ রূপ নিল বিদ্রোহে। মন্ত্রী কই? বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান কই? আমাদের স্বজনেরা কখন উদ্ধার হইব?

এর আগেই নৌমন্ত্রী শাজাহান খান ও কর্মকর্তারা এসে জাহাজে টহল দিয়েছেন। আশার কথা শুনিয়েছেন। কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। বেলা আড়াইটার দিকে হঠাৎ পদ্মার ওপর হেলিকপ্টারের বিকট শব্দ। পুলিশের পোশাক পরা বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান শামছুজ্জোহা খন্দকার আকাশে। যদি কিছু দেখা যায়! লাভ একটাই হলো, কয়েক লাখ টাকার তেল পুড়ল।

উদ্ধারকারী নৌযানের দেখা নেই। বেলা প্রায় পৌনে দুইটায় বিআইডব্লিউটিএর একজন পরিচালক বললেন, রুস্তম চাঁদপুরের কাছে আছে, চলে আসবে। সন্ধ্যা সাতটায় চেয়ারম্যান শামছুদ্দোহা খন্দকার বললেন, রুস্তম আসছে, চাঁদপুর ছাড়িয়েছে। এল রাত সাড়ে আটটায়। পিনাক খুঁজে পাওয়া গেল না। আরেকটি উদ্ধারযান ‘নির্ভীক’ এল দুই দিনের মাথায়। পেল না। নৌবাহিনীর আধুনিক যন্ত্র দিয়ে খোঁজা হলো। অবশেষে ছয় দিনের মাথায় সবাই হতাশ, খোঁজার পালা থেমে যায়।

কিন্তু আজও থামেনি স্বজনদের কান্না। মুঠোফোনে কথা হলে কাঁদতে কাঁদতেই কথা বলেন তাঁরা। নৌ সংস্থাগুলোর কর্মকর্তারা আপাতত আয়েশে। আরেকটি দুর্ঘটনা ঘটলে হয়তো নড়েচড়ে বসবেন।

প্রথম আলো