Monday, July 04, 2011

পদ্মা সেতু নির্মাণে আর কোনো বাধা নেই

জাকির হোসেন
অবশেষে পদ্মা সেতু নির্মাণে আর কোনো বাধা রইলো না। এ সেতুর মূল অংশের নির্মাণ কাজের দরপত্র আহ্বানের অনুমোদন দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। তাই চলতি মাসের মধ্যে পদ্মা সেতুর মূল অবকাঠামো নির্মাণের লক্ষ্যে চূড়ান্ত দরপত্র আহ্বান করা হবে। এরপর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠিান নির্দিষ্ট হলেই সেতুর মূল কাজ শুরু হবে।

বারবার পদ্মা সেতু প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি এবং সেতু নির্মাণে প্রি-কোয়ালিফিকেশন টেন্ডারে প্রাকযোগ্যতার বিষয় নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে বিশ্বব্যাংক। এ কারণে দীর্ঘদিন প্রতিষ্ঠানটি সেতুর মূল টেন্ডার আহ্বানে অনুমোদন দিচ্ছিল না। এমন অনিশ্চয়তার মধ্যে দ্রুত বিশ্বব্যাংকের আপত্তি প্রত্যাহারে সেতু বিভাগের সচিব মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া বর্তমানে ওয়াশিংটন (বিশ্বব্যাংক) সফর করছেন। গতকাল রোববার সকালে বিশ্বব্যাংক কর্তৃপক্ষ তাদের আপত্তি প্রত্যাহার করে নেয়। দুই-একদিনের মধ্যে এ সিদ্ধান্ত বাংলাদেশ সরকারকে জানানো হবে। এরপর শুরু হবে টেন্ডার আহ্বান ও সেতুর মূল কাজ। যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের পদ্মা সেতু বাস্তবায়নে নিয়োজিত সেতু বিভাগ সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

এদিকে পদ্মা সেতু নির্মাণে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়ায় যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন এ ব্যাপারে সহযোগিতা চেয়ে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতকে চিঠি দেন গত ২১ জুন। ওই চিঠিতে বলা হয়, পদ্মা সেতু নির্মাণ আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার প্রকল্প। এ প্রকল্প প্রক্রিয়াকরণে সেতু বিভাগ শতভাগ স্বচ্ছতা, দক্ষতা, দ্রুততা, সরকারি নিয়ম-কানুন ও বিশ্বব্যাংকের গাইডলাইন অনুসরণ করেছে। এতে

কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি। বিশ্বব্যাংকের ইতিহাসে এতো স্বচ্ছতা বজায় রেখে কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে বলে মনে হয় না। এরপরও স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একটি কুচক্রীমহল বিভিন্নভাবে পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন বিলম্বিত করছে। তাই পদ্মা সেতু নির্মাণে বিশ্বব্যাংকের সম্মতির বিষয়টি নিয়ে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে অর্থমন্ত্রীর কথা বলা প্রয়োজন। এতে পদ্মা সেতুর বাস্তবায়ন কার্যক্রম বিলম্ব দূর হবে এবং নির্মাণ কাজ শুরুর কার্যক্রম ত্বরান্বিত হবে।
গত ২৮ এপ্রিল মুন্সীগঞ্জের মাওয়া-পদ্মা নদীবক্ষে 'ভাষা শহীদ বরকত' জাহাজে আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের পক্ষে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব মো. মোশাররফ হোসেন এবং বিশ্বব্যাংকের পক্ষে বিশ্ব ব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর অ্যালেন গোল্ডস্টেইন ১২শ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করেন। ওই খবরে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ৩ কোটি মানুষ আনন্দে উদ্বেলিত হয়। কিন্তু পদ্মা সেতু নির্মাণ পিছিয়ে যাওয়ায় সেই আনন্দ কিছুটা হলেও মস্নান হয়ে যায়।

২৯০ কোটি মার্কিন ডলার ব্যয়ে নির্মিতব্য মুন্সিগঞ্জের মাওয়া ও শরীয়তপুরের জাজিরা পয়েন্টে ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার পদ্মা সেতু প্রকল্পে বিশ্বব্যাংক ১৫শ মিলিয়ন মার্কিন ডলার দেয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে। পর্যায়ক্রমে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ৭৬ মিলিয়ন, ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক (আইডিবি) ১৪০ মিলিয়ন ও জাপান ৪০০ মিলিয়ন ডলার দেয়ার ঋণ চুক্তি সই করে। এতে সেতু নির্মাণের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়।

মহাজোট সরকার গঠনের ১৩ দিনের মাথায় ২০০৯ সালের ১৯ জানুয়ারি সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় পদ্মা সেতু প্রকল্পটি অনুমোদিত হয় এবং ২৯ জানুয়ারি পরামর্শক কমিটির সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। পরামর্শক কমিটি ২০০৯ সালের ২ ফেব্রুয়ারি হতে বিস্তারিত ডিজাইল প্রণয়নের কাজ শুরু করে। ইতিমধ্যে ভূমি অধিগ্রহণ, এলাকার ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং র‌্যাপ-১ এর আওতায় ৪টি পুনর্বাসন এলাকার মাটি ভরাট কাজও সম্পন্ন করা হয়েছে। এছাড়া প্রধান সেতু, অ্যাপ্রোাচ রোড এবং রিভার টার্নিং ওয়ার্কের বিস্তারিত ডিজাইনও চূড়ান্ত করা হয়েছে।

গত বছর ১১ এপ্রিল বিশ্বব্যাংকের অনুমোদিত প্রাকযোগ্যতা যাচাইয়ের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হলে ১১টি প্রতিষ্ঠান আবেদন করে। এর মধ্যে ৫টি প্রতিষ্ঠান প্রাকযোগ্য বিবেচিত হয়। মূল্যায়ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে প্রাকযোগ্য ৫টি প্রতিষ্ঠানের অনুমোদনের জন্য বিশ্বব্যাংকের কাছে পাঠানো হয়। বিশ্বব্যাংকের গাইডলাইন মেনে মূল্যায়ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেও বিশ্বব্যাংক গত বছর ১০ অক্টোবর পর্যন্ত কমিটির সুপারিশের ওপর সম্মতি না দিয়ে প্রায় পূর্বে উল্লেখিত বিশেষ কোম্পানিটিকে প্রাকযোগ্যতা বিবেচনা করার জন্য ৩ মাস পর পুনঃটেন্ডার আহ্বানের জন্য পরামর্শ দেয়। ১১ অক্টোবর পুনরায় (দ্বিতীয়বার) প্রাকযোগ্যতার দরপত্র আহ্বান করলে ১০টি প্রতিষ্ঠান আবেদন করে এবং বিদেশি উপদেষ্টা ও দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির মূল্যায়নের প্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আগের প্রাকযোগ্যতার দরপত্রে প্রাকযোগ্য বিবেচিত হয় আগের ৫টি প্রতিষ্ঠান।

সূত্র জানায়, দ্বিতীয়বার আহ্বানকৃত প্রাকযোগ্যতা মূল্যায়িত প্রতিবেদন গত ৭ জানুয়ারি বিশ্বব্যাংকের সম্মতির জন্য প্রেরণ করা হলে ২৯ মার্চ বিশ্বব্যাংক দ্বিতীয়বারে মতো চায়না রেলওয়ের কনস্ট্রাকশন কোম্পানিকে প্রাকযোগ্য বিবেচনা করার জন্য অনুরোধ করে। এবং বিদেশি উপদেষ্টা ও দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন কোম্পানির (সিআরসিসি) দাখিলকৃত কাগজপত্র পুনঃপরীক্ষা-নিরীক্ষা করে চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন কোম্পানিকে প্রাকযোগ্য বিবেচনা করা যায় না বলে প্রতিবেদন দাখিল করে এবং বিবিএ গত ৩০ মার্চ প্রতিবেদন বিশ্বব্যাংকের বরাবরে প্রেরণ করে। গত ৬ এপ্রিল বিশ্বব্যাংক সিআরসিসিকে প্রাকযোগ্য বিবেচনা করা যায় কি না-মন্তব্যসহ এ বিষয়ে প্রতিবেদন দাখিল করার জন্য তৃতীয়বারের বিবিএকে অনুরোধ করে বিশ্বব্যাংক। বিবিএ বিদেশি উপদেষ্টার প্রতিবেদন সংযুক্ত করে সিআরসিসিকে প্রাকযোগ্য বিবেচনা না করার কারণ ব্যাখ্যা করে বিশ্বব্যাংকে পত্র দেয়।

গত ১৩ এপ্রিল বিশ্বব্যাংক সিআরসিসি-এর কাছে থেকে সেতু নির্মাণের পাইলের বিষয়ে অধিকতর তথ্য সংগ্রহ করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সিআরসিসিকে প্রাকযোগ্য বিবেচনা করা যায় কি না মর্মে বিবিএকে চতুর্থবারের মতো নির্দেশনা প্রদান করে। সিআরসিসিয়ের কাছে রেকিং পাইলের অভিজ্ঞতার ডকুমেন্ট চাওয়া হলে তারা ছবিসহ কিছু ডকুমেন্ট দাখিল করে। বিদেশি উপদেষ্টা ও দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি (টিইসি) রেকিং পাইলের অভিজ্ঞতার ডকুমেন্ট পর্যালোচনায় দেখতে পায়, অন্য প্রতিষ্ঠানের করা ব্রিজের ছবি পরিবর্তন করে সিআরসি-এর নামে জমা দিয়েছে। গত ৭ মে বিদেশি উপদেষ্টা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে সিআরসিসি অসত্য তথ্য দাখিল করেছে।

জানা গেছে, গত ৯ মে সিআরসিসি বিবিএকে পত্র দিলে মূল সেতু প্রাকযোগ্যতার প্রস্তাব প্রত্যাহার করা হয়। এবং তাদের স্থানীয় এজেন্ট ভেঞ্চার ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের এজেন্সিশিপ বাতিল করা হয়। এতে প্রমাণিত হয় সিআরসিসি-এর পক্ষে স্থানীয় প্রতিনিধি ভেঞ্চার ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড বিভিন্ন জাল তথ্য পরিবেশন করেছে। গত ১১ মে বিবিএ বিদেশি উপদেষ্টার প্রতিবেদন ও সিআরসিসি-এর প্রাকযোগ্যাতা প্রত্যাহার প্রস্তাব বিশ্বব্যাংক বরাবরে দাখিল করে মূল সেতুর প্রাকযোগ্যতার ওপর সম্মতি প্রদানের জন্য অনুরোধ করা হয়। পরে ১২ মে বিশ্বব্যাংক আপডেট প্রাকযোগ্যতা মূল্যায়ন প্রতিবেদন দাখিল করার জন্য বিবিএকে অনুরোধ করে। সে অনুযায়ী যোগাযোগ মন্ত্রণালয় থেকে প্রি-কোয়ালিফাইড ৫টি প্রতিষ্ঠানের অনুমোদনের জন্য সর্বশেষ বিশ্বব্যাংকে আপডেট প্রতিবেদন পাঠানো হয়।