Tuesday, July 05, 2011

শ্রদ্ধাঞ্জলি : সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

৭৬তম জন্মদিনে কাজী জুলফিকার আলী
গত ২৩ জুন ছিল শিক্ষাবিদ ও প্রাবন্ধিক অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর ৭৬তম জন্মদিন। ১৯৩৬ সালের এই দিনে তিনি ঢাকা জেলার বিক্রমপুরে জন্মগ্রহণ করেন। দীর্ঘ ছয় দশক ধরে তিনি আমাদের সমাজের চারপাশের নানাবিধ বিষয় নিয়ে লিখে চলেছেন। তাঁর কলম এখনো পুরোমাত্রায় সক্রিয়। ইতোমধ্যে তাঁর লেখা প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা আশি অতিক্রম করেছে।

পিতা হাফিজুদ্দীন চৌধুরী ও মা আছিয়া খাতুনের জ্যেষ্ঠ পুত্র তিনি। তাঁর স্কুল জীবন অতিবাহিত হয় রাজশাহী, কলকাতা ও ঢাকায়। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের সময় তাঁর পিতা কলকাতা ছেড়ে ঢাকা চলে এসে তাঁকে পুরনো ঢাকার সেন্ট গ্রেগরি স্কুলে অষ্টম শ্রেণীতে ভর্তি করে দেন। এখান থেকেই ১৯৫০ সালে তিনি বৃত্তিসহ প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করে নটর ডেম কলেজে ভর্তি হন। ১৯৫২ সালে নটর ডেম কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় প্রথম বিভাগসহ কলা শাখায় সম্মিলিত মেধা তালিকায় ৯ম স্থান অধিকার করেন। এর পর তিনি ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে । ১৯৫৫ সালে এ বিভাগ থেকে তিনি দ্বিতীয় শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করে স্নাতক সম্মান এবং ১৯৫৬ সালে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৫৭ সালে তিনি প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে। পরবর্তী ৪৪ বছর ধরে তিনি এখানেই কর্মরত ছিলেন।

১৯৫৯ সালে তিনি ব্রিটিশ কাউন্সিলের বৃত্তি নিয়ে লিডস বিশ্ববিদ্যালয়ে পোস্ট গ্রাজুয়েট ডিপ্লোমা করার জন্য প্রথমবারের মতো ইংল্যান্ড যান। ১৯৬২ সালে তিনি বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর করা নাজমা জেসমিনের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক নাজমা জেসমিন চৌধুরী ১৯৮৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর দুরারোগ্য ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে অকালে মারা যান। মৃত্যুর পূর্বে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটে শিক্ষকতায় নিয়োজিত ছিলেন। ১৯৬৫ সালে জনাব চৌধুরী দ্বিতীয়বারের মতো ইংল্যান্ড যান কমনওয়েলথ স্কলারশিপ নিয়ে লেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করার জন্য। ১৯৬৮ সালে তিনি পিএইচডি গবেষণার কাজ সম্পন্ন করেন। তাঁর পিএইচডি বিষয় ছিল " ঞযব ঃৎবধঃসবহঃ ড়ভ বারষ রহ ঃযব হড়াবষং ড়ভ ঔড়ংবঢ়য ঈড়হৎধফ, ঊ গ ঋৎড়ংঃবৎ ধহফ উ ঐ খধৎিবহপব."

১৯৭১ সালে তৎকালীন সেনা শাসক লে. জে. টিক্কা খান যে ছয় জন শিক্ষককে রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপের জন্য সতর্ক করে দেন অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তাদের একজন ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় আলবদরের হত্যা তালিকায়ও তাঁর নাম ছিল, কিন্তু ভাগ্যক্রমে নির্ভরযোগ্যসূত্রে সংবাদ পাওয়ায় তিনি তা এড়াতে সক্ষম হন।

১৯৭৩ সালে অধ্যাপক চৌধুরী ইংরেজি বিভাগের চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন এবং ১৯৭৩ সালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পুস্তক কেন্দ্র এবং উচ্চতর মানববিদ্যা গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠায় তিনি মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদেও তিনি দায়িত্ব পালন করেন। তিনবার তিনি সিনেট কর্তৃক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন সদস্যের উপাচার্য প্যানেলভুক্ত হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পত্রিকা প্রবর্তন করে তিনি পনের বছর ধরে এর সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করেন, আট বছর ধরে সম্পাদনা করেন উযধশধ টহরাবৎংরঃু ঝঃঁফরবং পত্রিকা। এছাড়া লন্ডন, নিউইয়র্ক, কলকাতা, বেইজিং, কোপেনহেগেন ও মেলবোর্নে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলনে তিনি তাঁর প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। ২০০১ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ থেকে অবসর গ্রহণ করেন। ২০০২ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রফেসর এমিরেটাস এবং ২০০৩ সালে (চার বছরের জন্য) ইউজিসি প্রফেসর হিসেবে মনোনীত হন।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ১৯৭৬ সালে গদ্যে ও গবেষণায় বাংলা একাডেমী পুরস্কার এবং ১৯৮৮ সালে গবেষণায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্বর্ণপদক লাভ করেন। ১৯৯৬ সালে তিনি (শিক্ষায়) একুশে পদক লাভ করেন। এ ছাড়াও তিনি লেখক সংঘ পুরস্কার (১৯৭৫), লেখিকা সংঘ পুরস্কার (১৯৮০), কাজী মাহাবুুবউল্লাহ পদক (১৯৮৩), অলকতা সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৮), আব্দুর রউফ চৌধুরী পুরস্কার (২০০১) ও ঋষিজ পুরস্কার (২০০২) লাভ করেন। ২০০২ সাল থেকে অধ্যাপক চৌধুরী সমাজ রূপান্তর অধ্যয়ন কেন্দ্রের সভাপতির দায়িত্ব পালন করে চলেছেন এবং তাঁর সম্পাদিত সাহিত্য সংস্কৃতির ত্রৈমাসিক পত্রিকা ‘নতুন দিগন্ত’ ২০০২ সাল থেকে নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে। তাঁর ‘নির্বাচিত প্রবন্ধ’ সম্প্রতি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অনার্স কোর্সের পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা (সংকলিত ও সম্পাদিত গ্রন্থ বাদে) ৮৪। তাঁর লেখা প্রথম গ্রন্থ ছোটদের শেকস্পীয়র (১৯৬২), দ্বিতীয় গ্রন্থ অšে¦ষণ (১৯৬৪)। দ্বিতীয় ভুবন , নিরাশ্রয় গৃহী, আরণ্যক দৃশ্যাবলী, অনতিক্রান্ত বৃত্ত, এ্যারিস্টটলের কাব্যতত্ত্ব, কুমুর বন্ধন, বেকনের মৌমাছিরা, স্বাধীনতা ও সংস্কৃতি, উনিশ শতকের বাংলা গদ্যের সামাজিক ব্যাকরণ, বাঙালীকে কে বাঁচাবে, বৃত্তের ভাঙাগড়া, গণতন্ত্রের পক্ষ-বিপক্ষ, উদ্যানে এবং উদ্যানের বাইরে, শ্রেণী সময় ও সাহিত্য, দ্বিজাতি তত্ত্বের সত্যমিথ্যা, লেনিন কেন জরুরী, বাঙালীর জয় পরাজয়, লিঙ্কনের বিষণœ মুখ, দুই বাঙালীর লাহোর যাত্রা, বাঙালীর জাতীয়তাবাদ, ইংরেজি সাহিত্যে ন্যায় অন্যায়, পিতৃতান্ত্রিকতার বিপক্ষে, বিরূপ বিশ্বে সাহসী মানুষ, বাংলা সাহিত্য ও বাঙালী মধ্যবিত্ত, অখণ্ড সেই বৃত্তে ইত্যাদি তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। তাঁর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘দুই যাত্রায় একযাত্রী’ (২০০৮) ও ‘দুই যাত্রায় একযাত্রী’ দ্বিতীয় খণ্ড (২০১১)।

দুই
গল্পের ঢঙে লেখা অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর গদ্য পাঠক নন্দিত। দেশ-জাতি, সমাজ ও সংস্কৃতি নিয়ে তাঁর গভীরতর ভাবনা, অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণ ও সূক্ষ্মতর পর্যবেক্ষণ চিন্তাশীল পাঠককে তাঁর লেখার প্রতি একাত্ম করে তোলে। ইতিহাস ও সময় সচেতন লেখক হিসেবে তিনি ঘটনাবলির মূল্যায়ন করেছেন নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিতে যেখানে সাধারণ মানুষের প্রতি তার দৃঢ় অবস্থান ও অঙ্গীকারের সুস্পষ্ট পরিচয় মেলে। অধ্যাপক চৌধুরীর প্রবন্ধে সমাজের শ্রেণীবৈষম্য, পুঁজিবাদ-পুঁজির উদ্দেশ্য, মধ্যবিত্তশ্রেণীর অবস্থান, ভূমিকা; তাদের ভয় ও কৃত্রিমতা, নারীর অবস্থান, নারী-পুরুষ বৈষম্য, ধর্ম ও ধর্মনিরপেক্ষতা, শিক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা ও অসারতা প্রভৃতি বিষয়ের পর্যালোচনা প্রাধান্য পেয়েছে। তাঁর সমাজ চিন্তায় ইতিহাসের প্রসঙ্গ এসেছে ঘুরেফিরে, ইতিহাসবেত্তার মতোই তিনি সামন্তবাদ ও সাম্রাজ্যবাদকে বিশ্লেষণ করেছেন।

প্রসঙ্গক্রমে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর প্রবন্ধ থেকে অংশবিশেষ তুলে ধরা যেতে পারে। ‘স্বাধীনতার স্পৃহা সাম্যের ভয়’ গ্রন্থের বিজ্ঞানের সামাজিকতা প্রবন্ধে তিনি বলেন, “সামন্তবাদ এই সমাজের চিত্ত থেকে মোটেই উৎপাটিত হয়নি। ও দিকে এক প্রকারের বিকৃত পুঁজিবাদের বিকাশ ঘটে গেছে। এই পুঁজিবাদ সাম্রাজ্যবাদ নিয়ন্ত্রিত। তাই আমাদের বুর্জোয়া স্বাধীন নয়, সাহসী নয়, গণতন্ত্রীও নয় পুরোপুরি। এই তাঁবেদার মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া চ্যালেঞ্জ করে না, পারলে দালালি করে। জিজ্ঞাসা করবে, যুক্তি চাইবে, অবিশ্বাস করবে এ তার ঐতিহ্যে নেই, কল্পনাতেও নেই খুব বেশি পরিমাণে। তার ঐতিহ্য সন্ত্রস্ততার, আত্মসমর্পণের।”

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী যথার্থই ইতিহাস সচেতন লেখক। তিনি নিরাসক্ত দৃষ্টিতে ভারতবর্ষে ইংরেজের ভূমিকা মূল্যায়নে সচেষ্ট থেকেছেন। ভারতীয়দের মধ্যে স্বাধীনতাবোধ জাগরণে ইংরেজের বিশেষ ভূমিকা ছিল বলে তিনি মনে করেন। অন্যদিকে বিদ্যাসাগর-বঙ্কিমের মতো অনেকের সামাজিক প্রতিষ্ঠার মূল ভিত্তি ছিল ইংরেজের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ। আর ভারতবর্ষে লাঞ্ছনা ঘটিয়ে- ইংরেজ শাসনই ভারতবর্ষীয়দের জাতীয়তাবাদী করে তোলে বলে তাঁর অভিমত। রবীন্দ্রনাথের ‘গোরা’ প্রবন্ধে তিনি তাই বলেন, “জতীয়তাবাদের সৃষ্টিতে ইংরেজের ভূমিকা গোরার জন্ম পরিচয়ের মতোই গুপ্ত কিন্তু নির্মম ও অনস্বীকার্য।” তিনি বাস্তবতাকে অনেক বড় মনে করেন, বাস্তবতা সম্বন্ধে ব্যক্তির উপলব্ধির তুলনায়।

সমাজের মানুষের স্বার্থপরতা এবং সমাজ জীবনের প্রাণহীনতা অধ্যাপক চৌধুরীকে বিশেষভাবে চিন্তিত করে। তাঁর মতে অর্থচিন্তা ও মুনাফাচিন্তা আন্তরিক সম্পর্ক বিকাশের অন্তরায় হয়ে দেখা দিয়েছে পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থায়। ‘লিঙ্কনের বিষণœ মুখ’ গ্রন্থে তিনি যথার্থই বলেন, “মুনাফাই যেখানে প্রধান নিরিখ সেখানে ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির আন্তরিক ও গভীর সম্পর্ক হবে কী করে? আমি হিসাব করে দেখছি আপনার সঙ্গে সংযোগ থাকলে আমার কী লাভ, আপনি দেখছেন আমার কাছাকাছি এলে আপনার লাভ নাকি লোকসান এটাই যখন সত্য হয় তখন দোকানদারি চলে, মানবিক সম্পর্ক গড়া চলে না।”

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী মনে করেন শ্রেণীবৈষম্য আমাদের জনগণকে বিভিন্ন ধারায় বিভক্ত করে রেখেছে। এজন্য তাদের পারস্পারিক সম্পর্ক মিত্রের না হয়ে বৈরী হয়ে থাকে। আর এ কারণে জনগণ ও জনগণের স্বার্থ এক হয়ে উঠছে না। সামাজিক বিকাশ ও উন্নতির জন্য প্রতিযোগিতার চাইতে সহযোগিতা যে বেশি প্রয়োজন- তিনি তা বিভিন্ন আলোচনার সূত্রে স্পষ্ট করতে চেয়েছেন। তাঁর মতে ভোগলিপ্সুরা উগ্র ও স্বৈরাচারী হয় এবং যথেচ্ছ ধন বৃদ্ধির কারণে আমাদের সমাজের ধনীরা উদ্ধত ও অত্যাচারী হয়ে উঠেছে। তাঁর বিবেচনায় এ দেশে প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হলে মানুষে মানুষে বৈষম্য দূর করতে হবে, মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও জীবনের নিরাপত্তা দিতে হবে, সর্বোপরি প্রভু-ভৃত্য সম্পর্কের বদলে সামাজিক জীবনে সকলের অংশগ্রহণমূলক সম্পর্ক গড়ার প্রতি জোর দিতে হবে।

kazizali@gmail.com