প্রতিদিন কয়েক মন দুধ ব্যবহার হচ্ছে এ ক্ষির তৈরিতে। সব মৌসুমেই এর চাহিদা থাকলেও শীতে চাহিদা অনেক বেশী। বাঙালী ঐতিহ্যের পাটিসাপটা পিঠা তৈরিতেও প্রয়োজন হয় পাতক্ষিরের। নতুন জামাইর সামনে পিঠাপুলির সাথে এই এ ক্ষির ব্যবহার না করা যেন বেমানান। গ্রাম বাংলায় মুরির সঙ্গেও এ ক্ষির খাওয়ার পুরানো রীতি রয়েছে।
সন্তোষ গ্রামের সাতটি পরিবার এখন এই ক্ষির তৈরীর সাথে জড়িত। তবে পুলিনবিহারী দেবই প্রথম স্ত্রীকে নিয়ে এ ক্ষির তৈরী করে বিক্রি করতেন বলে তার উত্তরসূরীরা জানান। সেও শত বছর আগের কথা। এছাড়া ইন্দ্র মোহন ঘোষ, লক্ষী রানী ঘোষও তৈরি করতেন এই ক্ষির। তারা সকলেই বর্তমানে প্রয়াত। এখন তাদের বংশধররাই এই পেশা ধরে রেখেছেন। কার্তিক চন্দ্র ঘোষ, ভারতী ঘোষ, সুনীল চন্দ্র ঘোষ, রমেশ শ্যাম ঘোষ, বিনয় ঘোষ, মদুসূদন ঘোষ, সমির ঘোষ ও ধনা ঘোষ এ পেশায় বর্তমানে রয়েছেন। তবে সুনীল ঘোষের ৫ ভাই এ পেশায়। ক্ষির তৈরীতে পারদর্শী পারুল ঘোষ বলেন, প্রতিটি পাতক্ষির তৈরীতে ৩ কেজি দুধ প্রয়োজন হয়। আধা ঘন্টার বেশী সময় ধরে জাল দিতে হয় এ দুধ। দুধের সঙ্গে সামান্য প্রায় ৫০ গ্রাম চিনি ব্যবহার করা ছাড়া আর কিছুই ব্যবহার হয় না এ ক্ষির তৈরীতে। তবে ডায়াবেটিক রোগীর জন্য বিশেষ অর্ডার থাকলে এ চিনি দেয়া হয়না। তারপর যখন দুধ ঘন হয়, তখন মাটির দৈ-এর পাতিলের মতো বিশেষ পাতিলে (পাত্র) রাখা হয় ক্ষির। ঘন্টা খানেক পর ঠান্ডা হলে তা কলা পাতায় পেচিয়ে বিক্রয়যোগ্য করা হয়। তবে হাতের যশ ও কৌশল ক্ষির তৈরীতে কাজে লাগাতে হয়। ঘন করতে গেলে চুলোয় দুধে পোড়া লেগে যায়। তাই কাঠের বিশেষ লাঠি দিয়ে অনবরত দুধ নাড়তে হয় ।
আর ‘‘পাতা’’ নিয়েই এর নামকরন। হ্যাঁ, তৈরী সম্পন্ন হওয়ার পর এ ক্ষির কলা পাতায় জড়িয়ে থাকে বলেই ক্ষিরের নাম হয়েছে পাতক্ষির বললেন ভারত ঘোষ। শুধু সুনীল ঘোষের বাড়িতেই প্রতিদিন এ ক্ষীর তৈরী হয় ৫০ টিরও বেশী। প্রতিটি ক্ষিরের ওজন প্রায় আধা কেজি। প্রতি পাতক্ষিরের মূল্য ১০০ থেকে ১শ.২০টাকা। বাজারে দুধের দাম বেড়ে গেলে বেড়ে যায় ক্ষিরের দামও। ঘরের বউরা এ ক্ষির তৈরিতে কষ্ট করেন বেশি। হাড় ভাঙ্গা পরিশ্রমের পর তৈরী হয় এ ক্ষির। তবে প্রতিটিতে ১০/৫ টাকার বেশী লাভ হয়না। দোকানে নিয়ে বিক্রি ছাড়াও বাড়িতে এসেও অর্ডার দিয়ে থাকে অনেকে।
নয়নতারা ঘোষ বলেন, আমেরিকা, ইতালী, জার্মান, ফ্রান্স ও জাপান থেকেও এ ক্ষির অর্ডার আসে। আমাদের হাতে তৈরী এ খাবারের বিনিময়ে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয় এটাইতো বড় প্রাপ্তি। তার জা বড় পারুল ঘোষ বলেন, আমরা কষ্ট করে এ ক্ষির তৈরি করলেও আমাদের মেয়েদের তা শিখাইনা। তারা বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল, কলেজে পড়ে। তবে এ বাড়ির বৌ হিসাবে যারা আসেন তাদেরই এ কাজ শিখার রীতি।
এই পাতক্ষির মুন্সীগঞ্জ তথা বিক্রমপুরের ঐতিহ্য বহন করে চলেছে যুগ যুগ ধরে। এছাড়া বিক্রমপুরের দই, মিষ্টি, বিশেষ করে ছানার আমত্তিও বেশ জনপ্রিয়। আর রসমসলাই সুস্বাধু। কিন্তু সব কিছুকেই টপকিয়ে পাতক্ষির ঐতিহ্য আর ব্যাতিক্রমের দিক থেকে সবচেয়ে বড় একটি জায়গা দখল করে আছে।
মুন্সীগঞ্জ নিউজ