Thursday, June 02, 2011

বিশ্বমন্দার প্রভাব

সালেহউদ্দিন আহমেদ
২০০৭ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সূচিত হওয়া অর্থনৈতিক সংকট বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে উন্নত উন্নয়নশীল সব দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকেই ব্যাহত করেছে। এর ফলে উন্নত দেশগুলোর প্রবৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা দেয়। যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের অর্থনৈতিক তৎপরতায়। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিশ্বমন্দার কোনো আশু প্রভাব না পড়লেও যতই দিন যাচ্ছে ততই বাংলাদেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। যথাযথ নীতি ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মোকাবেলা করতে হবে এসব চ্যালেঞ্জ। তবে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন আমদানি, রফতানি, রেমিট্যান্স, মূল্যস্ফীতি, ঋণপ্রবৃদ্ধির মতো সামষ্টিক খাতগুলো খতিয়ে দেখা। এতে বোঝা যাবে সামষ্টিক অর্থনীতি ও অর্থনৈতিক নীতিমালায় বিশ্বমন্দার কতটা প্রভাব পড়েছে। কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়ে থাকলে এর মাধ্যমে তা মোকাবেলা করাও সম্ভব হবে। এই নিবন্ধে বাংলাদেশের অর্থনীতির সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ, এর ওপর বিশ্বমন্দার প্রভাব ও তা মোকাবেলার উপায়গুলো তুলে ধরা হলো :

ম্যাক্রো বা সামষ্টিক প্রবণতা
সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রবণতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রকৃত খাতে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ২০০৮-২০০৯ সালে ছিল ৫.৯ শতাংশ। রিজার্ভ মানি ও ঋণ বিতরণের দিক থেকে আর্থিক খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল যুক্তিসঙ্গত। তবে এক্সটারনাল বা বাহ্যিক খাতের পারফরম্যান্স ছিল অত্যন্ত দুর্বল। ২০০৮-২০০৯ অর্থবছরের প্রথম ও দ্বিতীয় কোয়ার্টারে রফতানি কমে যায় উল্লেখযোগ্য হারে। সাম্প্রতিক তথ্যে কিছু পুনরুদ্ধারের বিষয়টি দৃশ্যমান হলেও তৈরি পোশাক ছাড়া অন্য কোনো খাতেই রফতানি তেমনি বাড়েনি। ২০০৮ সালের জুলাই থেকে ২০০৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত মোট রফতানি প্রবৃদ্ধি ছিল মাইনাস ৭ শতাংশ। তবে আমদানি খাতের দিকে তাকালে দেখা যাবে ২০০৮-০৯ অর্থবছরের প্রথম ও দ্বিতীয় কোয়ার্টার তেমন মন্দ ছিল না। তবে আমদানিও ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে। বিশেষ করে সার্বিক আমদানি কমে যায় ৫ শতাংশেরও বেশি।

এক্ষেত্রে বিনিয়োগ ইস্যুটি খুবই প্রাসঙ্গিক। আলোচ্য সময়ে শিল্পের কাঁচামাল এবং ভারী মেশিনারি আমদানি কমে যায়। অথচ এলসি খোলার হার বাড়ে ৩ শতাংশ। আর এলসির প্রকৃত বাস্তবায়ন হার কমে যায় ৬ শতাংশ। বিনিয়োগের অন্যতম প্রধান নির্দেশক শিল্পঋণ বছর শেষে নেমে আসে এক-চতুর্থাংশে। এটা বিনিয়োগের নেতিবাচক দৃশ্যপটেরই নির্দেশক।

জিডিপির খাতভিত্তিক অবদান
কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল বেশ ভালো, ৪.২ শতাংশ। তবে এর বেশির ভাগটাই এসেছে শস্য খাত থেকে। পশুসম্পদ ও মৎস্য উপ-খাতে তেমন প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা যায়নি।

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল স্বস্তিদায়ক পর্যায়ে_ এক হাজার কোটি ডলারের বেশি। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় হারেও তেমন ওঠানামা দেখা যায়নি। বিশ্বমন্দায় সরকারের প্রতিক্রিয়া কী ছিল। ব্যাপকভিত্তিক দেখলে সরকারের প্রতিক্রিয়া ছিল খাতভিত্তিক সুনির্দিষ্ট প্যাকেজ। গোটা অর্থনীতিভিত্তিক প্যাকেজ নয়। যেমন রফতানি উন্নয়ন তহবিল বাড়াতে সরকার খাদ্য খাতের জন্য একটি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে। কিছু কর ও ভ্যাট রেয়াত সুবিধাসহ গার্মেন্ট খাতের জন্য ঘোষণা করা হয় দুই হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ। সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের ভিজিডি কর্মসূচিতে সহায়তা বাড়ানো হয়। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভর্তুকি বাড়ানোসহ কৃষি খাতের ওপর ব্যাপক গুরুত্বারোপ করা হয়। এ ছাড়া বিদেশ থেকে রেমিট্যান্স আসার পরিমাণ বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ অন্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করে। এসব নীতিগত ব্যবস্থা নির্দিষ্ট কিছু খাতে সুফলও বয়ে আনে। ২০০৮-২০০৯ অর্থবছরের তুলনায় ২০০৯-১০ অর্থবছরে রফতানি বেড়েছে ১১ শতাংশ। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি ছিল ২২ শতাংশ। পরের অর্থবছরে এই প্রবৃদ্ধি ছিল ১৫ থেকে ১৯ শতাংশের মধ্যে। বিশ্ব অর্থনৈতিক সংকটের সবচেয়ে বড় ধকল সইতে হয় আমদানি খাতকে। ২০১০ অর্থবছরে আমদানি কমতে পারে ৪ থেকে ৭ শতাংশ।

এবার আসা যাক, মূল্যস্ফীতি প্রসঙ্গে। উদ্বেগজনক বিষয় হচ্ছে ২০০৭-০৮ অর্থবছরে শুধু খাদ্য মূল্যের কারণেই নয়, খাদ্য বহির্ভূত পণ্যের মূল্যের কারণেও মূল্যস্ফীতির ওপর ব্যাপক চাপ পড়ে। ২০০৮-০৯ অর্থবছরের তুলনায় পরের বছর মূল্যস্ফীতি বাড়ে ৭ শতাংশের মতো। চিত্র থেকে বোঝা গেছে এর ভবিষ্যৎ প্রবণতা। নীতিতে নাটকীয় পরিবর্তন না এলে এবং তার বাস্তবায়ন না ঘটলে এর প্রভাব পড়বে ব্যয় আর রাজস্ব খাতে।

বিনিয়োগ বাড়ানো যেখানে বড় চ্যালেঞ্জ আর অবকাঠামো বড় সমস্যা, সেখানে অর্থনীতিতে অধিকতর গতি আনা যাবে কীভাবে। এ ক্ষেত্রে যে বিষয়টির ওপর পর্যাপ্ত আলোকপাত করা হয় না তা হচ্ছে নীতির ধারাবাহিকতা। পূর্ববর্তী সরকারের উদ্যোগকে পাল্টে ফেলা কিংবা তার ধারাবাহিকতা বজায় না রাখা এক দুর্ভাগ্যজনক বাস্তবতা। বিনিয়োগকারীদের কাছে যদি সরকারি নীতি ভবিষ্যৎ বাচ্য বা অনুকূল না হয় তাহলে বিনিয়োগে জড়াতে তারা অবশ্যই চিন্তা করবে।

অর্থনৈতিক খাতের আরেক চ্যালেঞ্জ বাড়তি তারল্যের প্রবণতা। এই বাড়তি তারল্য শেয়ারবাজার, ভূমি এবং রিয়েল এস্টেটসহ সম্ভাব্য খাতগুলোতে নিয়ে যেতে হবে। কৃষি খাতে প্রণোদনা প্রদানসহ আরো কিছু ইস্যুও রয়েছে।

ব্যাষ্টিক প্রবণতা
এবার আসা যাক দ্বিতীয় অংশে। তা হচ্ছে ব্যাংক ঋণের ব্যাষ্টিক প্রবণতা। বাংলাদেশে বিভিন্ন এলাকার ৯টি ব্যাংকের ১৯টি শাখার তথ্য পর্যালোচনা করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কুড়িগ্রামের মতো পিছিয়ে থাকা এবং টঙ্গী, গাজীপুর, কেরানীগঞ্জ ইত্যাদি গতিশীল এলাকার ব্যাংক শাখা। মৌলিক উপাত্ত হচ্ছে, এই ব্যাষ্টিক পর্যায়ের ব্যাংক ঋণ যাচ্ছে ব্যবসা ও বিভিন্ন সেবামূলক কাজে, এসএমই, পরিবহন, যোগাযোগের মতো প্রকৃত খাতে নয়।
আরেক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বেসরকারি খাতে ঋণ বিতরণ কমে গেছে। এ ছাড়া বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের পারফরম্যান্স সরকারিগুলোর চেয়ে অনেক ভালো বলে পরিলক্ষিত হয়েছে। যেমন ২০০৯ সালের মার্চ মাসে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংকের ওই ১৯ শাখা মাত্র ১৭৯ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করেছে। আর বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক ঋণ বিতরণ করেছ এর চেয়ে অনেক বেশি. ৩ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা। এ ক্ষেত্রে আমি একটু যোগ করতে চাই_ ঝুঁকিপূর্ণ এবং বিকাশমান এলাকাগুলোতে ঋণ বিতরণ বাড়ানোর জন্য রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর এটাই সবচেয়ে ভালো সময়। তা ছাড়া ব্যাংকের রয়েছে অনেক বেশি শাখা।

উপসংহার
কয়েকটি বিষয়ে আলোকপাত করে আমি এ নিবন্ধের ইতি টানতে চাই। আমার প্রথম মন্তব্য হচ্ছে_ বিশ্ব অর্থনৈতিক সংকট প্রমাণ করেছে যে, সরকারের দূরদর্শী হস্তক্ষেপ আর সতর্ক কড়াকড়ি আরোপে কোনো বিকল্প নেই। এমনকি যখন বাজার সংকল্প প্রণোদনা কাঠামো কাজ করে তখনও। দ্বিতীয় মন্তব্য হচ্ছে মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবেলায় বাংলাদেশ ব্যাংক যেসব ঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছে তা নিয়ে। প্রবৃদ্ধিকে মূল্যস্ফীতির ওপর প্রাধান্য দিতে গিয়ে এই ঝুঁকির মুখে পড়তে হচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে। এটা সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতির একটা প্রশ্ন। আমার তৃতীয় মন্তব্য ব্যাংকিং খাতের বাড়তি তারল্য নিয়ে। বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধিতে আমাদের বর্তমান এবং অতীত অভিজ্ঞতা কী? বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক নীতি কতটা কার্যকরভাবে ব্যাংকিং খাতের বর্তমান বাড়তি তারল্যের সমস্যা সমাধানে সহায়ক হতে পারে? সবশেষে বলতে চাই_ দেশকে উচ্চ প্রবৃদ্ধির দিকে নিয়ে যেতে আর্থিক, অর্থনৈতিক, আমদানি-রফতানি ও শিল্পনীতিতে আমরা কতটা কার্যকরভাব সামঞ্জস্য বিধান করতে পারি?

লেখক : সাবেক গভর্নর
বাংলাদেশ ব্যাংক