Sunday, June 19, 2011

প্রাক-মধ্যযুগে বিক্রমপুরে মানববসতি ছিল

মুন্সিগঞ্জের প্রাচীন বিক্রমপুর অঞ্চলে (বজ্রযোগিনী ও রামপাল ইউনিয়ন) প্রাক-মধ্যযুগে মানববসতি ছিল। গবেষকদের ধারণা, এ মানববসতি প্রায় ৭০০ থেকে ১৩০০ বছরের পুরোনো। একটি বেসরকারি গবেষণা সংস্থার সাম্প্রতিক প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় প্রাচীন এ বসতির সন্ধান পাওয়া যায়।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক সুফি মোস্তাফিজুর রহমানের নেতৃত্বে ওই গবেষণা পরিচালিত হচ্ছে। জানতে চাইলে প্রথম আলোকে তিনি বলেন, প্রত্নতাত্ত্বিক খননে মাটির নিচে একটি ইটের তৈরি দেয়াল পাওয়া গেছে। ইটের আকৃতি দেখে ধারণা করা যায়, এটি প্রাক-মধ্যযুগীয় (৭০০-১৩০০ শতক) স্থাপনার অংশবিশেষ। কার্বন-১৪ ডেটিং করে এই স্থাপনার সুনির্দিষ্ট বয়স নির্ধারণ করা হবে বলে তিনি জানান। এ ছাড়া খননস্থান-সংলগ্ন সুখবাসপুর থেকে একটি পোড়ামাটির ভাস্কর্যের অংশবিশেষ পাওয়া যায়।

গবেষণা এলাকা: এখনকার মুন্সিগঞ্জ, ঢাকা, ফরিদপুর ও শরীয়তপুর জেলার অংশজুড়ে বিস্তৃত ছিল প্রাচীন বিক্রমপুর অঞ্চল। এ ছাড়া পদ্মার ভাঙনেও বিক্রমপুরের অংশবিশেষ ধ্বংস হয়ে গেছে। প্রাচীন বঙ্গ ও সমতট জনপদের গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নস্থান হিসেবে বিক্রমপুরকে ধরা হয়।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ঐতিহ্য অন্বেষণের গবেষণায় প্রাথমিকভাবে মুন্সিগঞ্জ সদরের চারটি ইউনিয়ন নির্বাচন করে প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ চালানো হচ্ছে। এ কাজে সহযোগিতা করছে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশন। ইতিমধ্যে দুটি ইউনিয়ন বজ্রযোগিনী ও রামপালের তিনটি গ্রামের নয়টি স্থানে উৎখনন করা হয়।
মুন্সিগঞ্জের রঘুরামপুরে প্রাক-মধ্যযুগের একটি স্থাপনায় কাজ করছেন গবেষকেরা (বাঁয়ে), সুখবাসপুর থেকে পাওয়া পোড়ামাটির ভাস্কর্যের অংশবিশেষ... ছবি: পাপ্পু ভট্টাচার্য্য

ফলাফল: রঘুরামপুর গ্রামের প্রত্নস্থানে প্রায় ১২ ফুট দীর্ঘ ও ৪ ফুট প্রস্থের উৎখনন খাদে একটি ৫ মিটার লম্বা নিয়মিত ইটের দেয়াল পাওয়া গেছে। দেয়ালটি প্রায় দেড় মিটার (১৪৫ সেমি.) চওড়া। এই দেয়ালটি থেকে আরও দুটি পার্শ্ব দেয়ালের সংযুক্তির চিহ্ন পাওয়া গেছে।

গবেষকেরা বলছেন, ইটের নিয়মিত এই কাঠামো বড় কোনো স্থাপনার অংশবিশেষ হতে পারে। কেননা ইটের তৈরি বড় কাঠামোর ক্ষেত্রেই কেবল এত চওড়া দেয়াল ব্যবহার করা হতো। এ ছাড়া কাঠামোটির ইটের দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতা যথাক্রমে ২৬, ২৪ ও ৫ সেন্টিমিটার করে। এ ধরনের ‘পাটা’ আকৃতির ইট প্রাক-মধ্যযুগের স্থাপত্যগুলোয় ব্যবহার করা হতো। এ জন্য ইটের আকৃতি দেখে এটাকে প্রাথমিকভাবে প্রাক-মধ্যযুগীয় স্থাপত্য বলে মনে করা হচ্ছে। পাহাড়পুর ও ময়নামতিতেও ওই সময়ের স্থাপত্য পাওয়া যায়।

গবেষকদের ধারণা, বজ্রযোগিনী গ্রামের উৎখনন খাদে পাথর ভেঙে ভাস্কর্য তৈরি করা হতো। এই খাদে পাওয়া পাথরগুলো চমৎকারভাবে খাঁজ-কাটা। এগুলোর গায়ে বিভিন্ন ধরনের অলংকরণ পাওয়া গেছে। পাথর ও ইটের অনিয়মিত রূপ থেকে ধারণা করা হচ্ছে, এর আশপাশে কোনো নির্মাণকেন্দ্র থাকতে পারে। এ ছাড়া উৎখননে স্থাপত্যিক ধ্বংসাবশেষ, মৃৎপাত্রের টুকরো, পাথরের নিদর্শনের ভেঙে যাওয়া টুকরো, কিছু ধাতব নিদর্শন পাওয়া গেছে।

ঐতিহাসিক ভিত্তি: বর্তমানের মুন্সিগঞ্জ জেলা প্রাচীন আমল থেকেই রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ভারত ও বাংলাদেশজুড়ে বিভিন্ন সময় চালানো প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তাম্রলিপির ভিত্তিতে বলা হয়, অঞ্চলটি রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

মুন্সিগঞ্জে (সাবেক বিক্রমপুর) চন্দ্র (সময়কাল ৯০০-১০৫০ খ্রি.), বর্ম (১০৮০-১১৫০ খ্রি.) এবং সেন (১০৯৫-১১৬০ খ্রি.) রাজবংশের রাজধানী ছিল। চন্দ্র রাজবংশের কেদারপুর ও রামপাল থেকে পাওয়া কয়েক ধরনের তাম্রলিপি, বর্ম রাজবংশের বজ্রযোগিনী ও সেন রাজবংশের ব্যারাকপুর তাম্রলিপিতে বিক্রমপুরকে ‘জয়স্কন্ধাভার’ (বিজয় ক্যাম্প) বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া জাতীয় জাদুঘর, রাজশাহীর বরেন্দ্র জাদুঘরসহ ভারতের কয়েকটি জাদুঘর পরিদর্শন করে গবেষকেরা বিক্রমপুর থেকে উদ্ধার করা ৭৯টি ভাস্কর্যের তালিকা করেছেন। পাথর, পোড়ামাটি ও বিভিন্ন ধাতু (যেমন রুপা) দিয়ে তৈরি এসব ভাস্কর্য বিক্রমপুর থেকে উদ্ধার করা হয়। এ জন্য গবেষকদের ধারণা, এই অঞ্চলে প্রাক-মধ্যযুগীয় বসতি ছিল।

গুপ্ত ও পাল রাজত্বকালে বিক্রমপুরে কোনো মানববসতি-সম্পর্কিত প্রত্যক্ষ প্রমাণ এখনো পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। বিভিন্ন তাম্রলিপিতে চন্দ্র, বর্মণ ও সেন রাজবংশের আধিপত্য বিস্তারের প্রমাণ পাওয়া গেলেও এই প্রথম ওই সময়কালের কোনো স্থাপত্যিক নিদর্শনের অংশবিশেষের সন্ধান মিলল।

উদ্যোক্তারা জানান, এ বছরের ১৪ এপ্রিল থেকে খননকাজ শুরু হয়েছে। গতকাল শুক্রবারও খননকাজ চলেছে। তবে বর্ষা শুরু হওয়ায় এই কাজ আপাতত স্থগিত রাখা হচ্ছে।

কুন্তল রায়