ছাত্র রাজনীতির প্রাণকেন্দ্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুরকেন্টিন যেন প্রাণহীন হয়ে পড়েছে৷ দেশে জরম্নরি অবস্থা ঘোষণার পর ক্যাম্পাসে ছাত্র সংগঠনের সকল কার্যক্রম বন্ধ৷ ক্যাম্পাসে ছাত্রনেতাদের একমাত্র আড্ডাস্থল বা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু মধুরকেন্টিন এবং ডাকসু সংগ্রহশালা৷ কিন্তু ক্যাম্পাসে ছাত্রনেতাদের আগমন থেমে গেছে৷ অনেক ছাত্রনেতা আতংকগ্রসত্মও৷ সব মিলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ছাত্রনেতা শূন্য৷ আর ডাকসু ভবনের দোতলায় দৈনিক পত্রিকা পড়ার ছাত্র-ছাত্রী ও ছাত্র নেতাকর্মীদের আকাল সৃষ্টি হয়েছে৷ বিকেলের আড্ডাও বটতলা ও হাকিম চত্বরে আর নেই৷
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ডাকসু সংগ্রহশালায় সংরৰিত বিভিন্ন দলিলপত্র এবং সংগ্রহশালার সংগ্রাহক গোপাল দাসের লেখা থেকে জানা যায়, ১৯৬৬ সালে কলা ভবন শিৰক লাউঞ্জ থেকে স্থানানত্মর হয়ে মধুর রেসত্মোরাঁয় রূপানত্মরিত হয়েছিল বর্তমানের অধুনালুপ্ত ঢাকার শেষ নবাবের রমনার বাগান বাড়ীর রংমহলটি (বর্তমান মধুরকেন্টিন)৷ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি নিদর্শন হিসেবে রেসত্মোরাঁর পূর্ব সৌন্দর্য ছিল৷ তারও আগে নবাবের এই বিশ্রামাগারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তারা ব্যাচেলর ঘর হিসেবে ব্যবহার করে আসছিলেন৷ তখনো এই রমনার বাগান বাড়ির নবাব স্যার সলিমুলস্নাহ’র বিশ্রামাগারটি সৌন্দর্যে তেমন কোন ত্রম্নটি ছিল না৷ স্থাপনাটির চারপাশে শেডের সৌন্দর্য ছিল দেখার মত৷ স্থাপনাটির সম্মুখ গোলঘর দুটোর খিলানগুলো এতোই সুন্দর ছিল যা অন্য কোথাও এখন চোখে পড়ে না৷ তখন ব্যবসা প্রশাসন ইনষ্টিটিউট ভবন তৈরি হয়নি৷ ফলে নবাবের এই বাগান বাড়িটির চারদিক ফলদ বৃৰে ছিল পরিপূর্ণ৷
তবে লিচু গাছই ছিল তুলনামূলক অনেক বেশি৷ তখন অত্র এলাকাটিকে লিচুবাগান বলা হতো৷ বর্তমানেও কলা ভবন ক্যাফেটরিয়ার পূর্ব দৰিণ কোণে একটি লিচু গাছ রয়েছে৷ নবাবী স্থাপনাটির একেবারে নিকটতম পূর্বপাশে ছিল ব্যায়ামের সরঞ্জাম৷ বিশ্রামাগারটির মেঝেতে বিছানো ছিল বহু মূল্যবান মারবেল পাথর, যা বর্তমানেও ঘরটির পশ্চিম দিকের মেঝেতে বিছানো রয়েছে৷ ডাকসু পরিচালিত রেসত্মোরাঁ হিসেবে যাত্রা শুরম্নর সময় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপৰ সামান্য দূরে বর্তমানের ডাকসু সংগ্রহশালার স্থানে একটি টিনের চালা তৈরী করে রেসত্মোরাঁর খাবার তৈরীর ব্যবস্থা করে দেয়৷ তারপর এক সময় ডাকসু ভবন স্থাপন করার কারণে নাসত্মা তৈরির ঘরটি সরিয়ে বর্তমান রেসত্মোরাঁর স্থানে স্থানানত্মর করা হয়৷ ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন পাকিসত্মানি সৈন্যদের তাণ্ডবে ব্যাপক ৰতি সাধিত হওয়ার কারণে পূর্বের বেশির ভাগ স্থাপনাই নষ্ট হয়ে যায়৷ যে কারণে এখন আর নবাবের কোন কিছুই অবশিষ্ট নেই৷
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যাত্রা শুরম্নর পরের দিকে শহীদ মধুর পিতা আদিত্য চন্দ্র দে পিতা নকরী চন্দ্র দে’র পরামর্শে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগে ফেরি করে মিষ্টি, সন্দেশ, খাজা বিক্রয় করতেন৷ তিনি পুরানো ঢাকার জিন্দাবাজার লেনের বাসা থেকে নিয়মিত এখানে আসা-যাওয়া করতেন৷ পরে ১৯২১ সালের পর কলা ভবনের (বর্তমান মেডিক্যাল কলেজ) সিড়ির নিচে চা নাসত্মা বিক্রি শুরম্ন করেন৷ ওই সময় পিতামহ নকরী চন্দ্র দে মৃতু্যবরণ করলে আদিত্যচন্দ্র দে একাই ব্যবসা শুরম্ন করেন৷ মেঝ ছেলে মধুসূদন দে কে সংসারের হাল ধরার জন্য পিতার আদেশে ব্যবসার দায়িত্ব নিতে হলো৷ মধুর বয়স তখন ১৫ বছর৷ ১৯৩৫ থেকে মধুসূদন দে তার পিতা আদিত্য চন্দ্র দে-র সাথে খাবারের ব্যবসা শুরম্ন করেন৷ এরপর পিতা আদিত্য চন্দ্র দে ১৯৩৯ সালের মে মাসে মৃতু্যবরণ করেন৷ ঐ অবস্থায় মধুসূদন দে ব্যবসার হাল ধরেন৷ দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ ডাকসুর ক্যান্টিন পরিচালনার দায়িত্ব দেন মধুসূদন দে কে ১৯৬৬ সালে৷ মেডিক্যাল কলেজ ভবন থেকে নীলৰেতের বর্তমান কলাভবনের শিৰক লাউঞ্জে চলে আসেন তিনি৷ এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপৰ ঢাকার নবাবদের বাগান বাড়িটি ডাকসুর ক্যান্টিন হিসেবে পরিচালনার জন্য মধুকে বরাদ্দ দেন৷ এ সময় মধুসূদন দে পরিবার পরিজন নিয়ে থাকতেন শিববাড়ী, জগন্নাথ হলের পাশে৷ ২৬ শে মার্চ ১৯৭১ সালে সকাল ৮টায় মধুসূদন দে তার বড় ছেলে, বড় ছেলের স্ত্রী, মধুসূদন দে’র স্ত্রী পাক সৈন্যদের গুলিতে নিহত হন৷ মধুসূদন দে’র আরেক কন্যা রানু সৈন্যদের গুলিতে আহত হন৷ ১৯৭২ সালের ১৬ জানুয়ারির প্রতিভা ভারত থেকে ফিরে আসেন৷ পরে প্রতিভা ধ্বংসপ্রাপ্ত ক্যান্টিন পরিচালনা শুরম্ন করেন৷ তারপর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১০ হাজার টাকা দেন মধুসূদনের পরিবারের সদস্যদের৷ পরে ডাকসু নেতৃবৃন্দ ১৯৭২ সালে ডাকসু পরিচালিত মধুরক্যান্টিনের পরিচিত সাইন বোর্ড স্থাপন করেন৷ ১৯৭৬ সালে প্রতিভার বিয়ে হয়ে গেলে অরম্নণ কুমার দে ক্যান্টিনের হাল ধরেন৷ মধুর ছেলে অরম্নণ কুমার এখনও ঐতিহ্যবাহী মধুরক্যান্টিনের হাল ধরে আছেন৷
সুত্র
আরেকটু বিস্তারিত
মধুর ইতিহাস