Saturday, June 25, 2011

বুকের রক্ত দেব তবু মাটি নয় বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসীর ঘোষণা

আড়িয়ল বিলের পর এবার সিরাজদিখানে বঙ্গবন্ধু বিমানবন্দর!
শফিকুল ইসলাম শ্রীনগর (মুন্সীগঞ্জ): বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণের স্থান হিসেবে এবার মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানকে বেছে নেয়া হচ্ছে। নতুন বিমানবন্দরের জন্য ৪টি স্থান চিহ্নিত করা হলেও সব বিষয় বিবেচনায় এগিয়ে আছে মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান। প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় বুধবার জাতীয় সংসদে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী জিএম কাদের এই ঘোষণা দেয়ার পরই মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় সিরাজদিখানের মানুষের মধ্যে।

এদিকে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট সিটি ও আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্মাণের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ফুঁসে উঠছে তারা। গতকাল সকালে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট সিটি নির্মাণ প্রকল্পের পর্যবেক্ষক দল ওই এলাকা পরিদর্শন করার খবর ছড়িয়ে পড়লে শত শত লোক এর প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করে। এ সময় বিক্ষোভকারীরা ঢাকা-মরিচা সড়ক অবরোধ করে রাখে এবং রাস্তায় টায়ার জড়ো করে অগ্নিসংযোগ করে।

জানা গেছে, মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার চিত্রকোর্ট ইউনিয়নে গতকাল সকাল ১০টায় বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট সিটি নির্মাণ প্রকল্পের পর্যবেক্ষক দল আসার কথা ছিল। এ খবরে সকাল থেকে শত শত নারী-পুরুষ রাস্তায় ব্যারিকেড সৃষ্টি করে। এতে প্রায় ৩ ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ থাকে। স্থানীয় সংসদ সদস্য সুকুমার রঞ্জন ঘোষ ঘটনাস্থলে পৌঁছে উত্তেজিত জনগণকে এই বলে আশ্ব্বস্ত করেন যে, জনগণ না চাইলে সিরাজদিখানে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট সিটি নির্মিত হবে না। পরে বিক্ষোভকারীরা অবরোধ তুলে নিলে আপাতত পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। তবে তারা সরকারকে হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, বুকের তাজা রক্ত দিব তবু জন্মস্থানের মাটি দিব না। তারা জোর দাবি করে বলেন, সরকার যেন অহেতুক তাদের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে না দেয়। অন্যথায় তারা কঠিন কর্মসূচি দিতে বাধ্য হবে।

এদিকে সরকারের নীতি-নির্ধারক পর্যায়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণের বিষয়টি। এরই মধ্যে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সেলের প্রধান জয়নাল আবেদীন তালুকদার, সিভিল এভিয়েশনের চেয়ারম্যানসহ বিমানবাহিনীর উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা ৪টি স্থান পরিদর্শন করে বিমান ও পর্যটন সচিব আতাহারুল ইসলামের কাছে প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন। সচিব পরে তা বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী জিএম কাদেরের কাছে পেশ করবেন। পরবর্তীকালে প্রতিবেদনের আলোকে সারসংক্ষেপ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে পাঠানো হবে। উচ্চপর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে বর্তমানে আলোচনা চলছে। বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণের জন্য সরকার এরই মধ্যে নতুন করে ৪টি স্থান চিহ্নিত করেছে। জায়গাগুলো হচ্ছে— মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান, ফরিদপুরের ভাঙ্গা, মাদারীপুরের রাজৈর ও গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া। সরকার পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) ভিত্তিতে এ প্রকল্প হাতে নিয়েছে।

সিরাজদিখানে বিমানবন্দরের ঘোষণায় লোকজন ক্ষুব্ধ হয়ে পড়েছেন। তারা বলছেন, বিমানবন্দর আসলে কোথায় হচ্ছে? কার কার বাড়ি ঘর যাচ্ছে, কে হচ্ছে গৃহহীন, কে ভিটামাটি হারাচ্ছে, এত জমিইবা পাবে কোথায় সরকার- এসব প্রশ্ন এখন ঘুরপাক খাচ্ছে সিরাজদিখানের মানুষের মধ্যে। রাস্তার মোড়ে মোড়ে, চায়ের দোকানে মাঠে-ঘাটে যেখানে ৮-১০ জন লোকের সমাগম সেখানেই চলছে এসব গুঞ্জন। সাধারণ মানুষের মধ্যেও কৌতহূলের শেষ নেই। তবে সিরাজদিখান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দাউদ উল ইসলাম ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) মাহবুবা আইরিন এ ব্যাপারে কিছুই জানেন না বলে জানিয়েছেন।

উল্লেখ্য, আড়িয়ল বিলে এই বিমানবন্দরের ঘোষণায় বিলবাসীরা ‘জান দেবো তবু জমি দেবো না’ শপথ নিয়ে সরকারের চাপিয়ে দেয়া সিদ্ধান্তকে প্রতিহত করেন। ওই ঘটনায় বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীসহ প্রায় একুশ হাজার লোককে আসামি করে মামলা করা হয় এবং এক পুলিশ সদস্য নিহতসহ শতাধিক আহত হয়।

আড়িয়ল বিল রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক শাজাহান বাদল আমার দেশকে জানান, আড়িয়ল বিল রক্ষায় তারা আমাদের বিরুদ্ধাচরণ করেছে। এবার আমরা এটাকে স্বাগত জানাব। তবে আড়িয়ল বিল রক্ষা কমিটির একাধিক নেতা ও আড়িয়লবিলবাসী সরকারের এ সিদ্ধান্তে সন্দেহ পোষণ করছেন। তাদের ধারণা, সুকৌশলে সরকার আবার আড়িয়ল বিল গ্রাস করার নতুন কোনো চালবাজি করছে। এ নিয়ে আড়িয়ল বিল রক্ষার প্রথম আন্দোলনকারী অঞ্চল বারৈখালীসহ বিলবাসীদের মধ্যে চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে।