তিনি লিখতে লিখতে জীবনকে দেখেন এবং দেখতে দেখতে তাকে লেখেন। এই দেখা ও লেখার মধ্যে পরস্পরের আন্তঃসম্পর্ক উভয়কেই ঋদ্ধ করে। লেখার টেবিল থেকে উঠে বাজারের থলে নিয়ে প্রকাশকের কাছে যাওয়া এবং তার কাছে চূড়ান্ত হতাশ হওয়ার পরও যিনি লেখা ছাড়তে পারেন না, তিনিই তো প্রকৃত শিল্পী।
দুই উচ্চাকাঙ্ক্ষীর একজন মানিক নিজে, অন্যজন তার অগ্রজ সুধাংশুকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়। সুধাংশুকুমারের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল বৈষয়িক জীবনে সফল হওয়া। তিনি তা হয়েছেন। আর মানিকের লক্ষ্য ছিল নিজে যা ভেবেছেন সাহিত্যে তাকে প্রতিষ্ঠিত করা। তিনিও সফল হয়েছেন। কিন্তু বৈষয়িক জীবনে সফল আর সাহিত্য জীবনে সফল_ এ দুইয়ের মধ্যে তীব্র এক দ্বন্দ্ব রয়েছে। জীবন দিয়ে মানিক ওই দ্বন্দ্বের মুখোমুখি হয়েছেন। কী ছিল সেই দ্বন্দ্ব? সে কথা 'গল্প লেখার গল্প'য় মানিক নিজেই ব্যাখ্যা করেছেন, 'তোর দাদা লেখাপড়া শিখে দু হাজার টাকার চাকরি করছে, এই কি করলি বলতে পারিস? না একটা গাড়ি, না একটা বাড়ি।'
সুধাংশুকুমার যখন দুই হাজার টাকা মাইনে পাচ্ছেন, তখন ফোর ফিগার অর্থাৎ এক হাজার [১০০০] টাকা পেলেই বঙ্গীয় মনুষ্যের সফলতার একটা বড় উচ্চতা বলে গণ্য হতো। সুতরাং সেই লোকের পক্ষে বাড়ি-গাড়ি করা কোনো কঠিন ব্যাপার ছিল না। আর যে লেখক হতে চায়, বিশেষত মানিকের মতো লেখক, যিনি তার পূর্বের লেখকদের শ্রদ্ধা করলেও ভাবেন, তিনি যা দেখছেন এবং যে ধরনের লেখা আগে লেখা হয়নি, সেটা তাঁকেই লিখতে হবে, সে ধরনের লেখক তো নিজের বিপদ নিজেই ডেকে আনেন। সুতরাং বাড়ি-গাড়ি তো তার হয়ই না, উল্টো তিনি স্বাস্থ্যকে অবহেলা করেন।
তাঁর পূর্ববর্তী শরৎচন্দ্র সম্পর্কে মানিকের মনে হয়েছে, এই লেখক তথাকথিত ন্যায় ও নৈতিকতার চেয়ে মানুষ ও তার বাস্তবতাকে বড় করে দেখেছেন, কিন্তু সেখানেও নানা দোদুল্যমানতা ও পিছুটান রয়েছে। উপরন্তু মানিক 'প্রতিভা'য় বিশ্বাস করতেন না। তার মনে হতো, 'আত্মজ্ঞানের অভাব আর রহস্যময়তার লোভ ও নিরাপত্তার জন্য প্রতিভাবানরা কথাটা মেনে নেন।' লক্ষ্য না করে উপায় নেই, ভাষার সীমাবদ্ধতার জন্য প্রতিভায় বিশ্বাস না করেও মানিককে 'প্রতিভাবান' কথাটাই ব্যবহার করতে হয়। তার চেয়েও বড় কথা, 'প্রতিভা'কে তিনি 'জনগণের সম্পত্তি' বলে ভাবতেন।
ফলে সহোদর হলেও মানিক ও সুধাংশুর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সম্পূর্ণ পরস্পরবিরোধী। মানিকের বাবা হরিহর বন্দ্যোপাধ্যায়ও ছিলেন এক ভিন্নজাতের মানুষ। সন্তানদের মধ্যে নানা প্রতিক্রিয়া দেখে নিজের বাড়ি বিক্রি করে সেই অর্থ তিনি তাদের মধ্যে ভাগ করে দেন। আর ওই ভাগের অর্থ পেতে মেজদা অর্থাৎ সুধাংশু কুমার জানিয়ে দেন, ঐ টাকা ভাগের সময় ছাড়া তিনি আর বাড়িতে আসতে পারবেন না, পাছে তাকে ভাইদের সঙ্গে থাকতে হয়। মার্কসীয় মতবাদে দীক্ষিত হওয়ার আগেই মানিক এভাবে জীবনে নিজেদের অত্যন্ত নিকটজনের কাছ থেকে শ্রেণীবিভাজনের শিক্ষা পেয়েছিলেন।
কিন্তু শ্রেণী তো শুধু স্বজনকেই ত্যাগ করে না, জীবন ও তার অগ্রগতিকেও বর্জন করে। মানিকের দিনপঞ্জি থেকে : 'বিদ্বান? স্কলারশিপের টাকার লোভে_ বড় চাকরির লোভে_ পড়ত, জ্ঞানের জন্যে নয়। গভর্নমেন্টের চাকরি পেয়ে তাই অনায়াসে বিজ্ঞানচর্চা ছাড়ল।' কলেজে পড়তে গিয়ে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় অধ্যাপকদের মধ্যেও সেই একই প্রবণতা লক্ষ্য করেছেন। বিদ্যাচর্চার পরিবর্তে তারা 'চিন্তার জড়তা'য় ভোগেন ও কেবল চাকরি করেন।
তাঁর জীবন জিজ্ঞাসার কিছু জবাব মানিক সাহিত্যে পেয়েছেন কিন্তু সব নয়। আবার সাহিত্য তার মধ্যে নানা জিজ্ঞাসার সৃষ্টি করেছে। ফলে সাহিত্যের মধ্যেও তিনি বৈজ্ঞানিক কৌতূহলের জবাব খুঁজেছেন। এক ভাই যখন জাগতিক স্বার্থে বিজ্ঞানকে ত্যাগ করছে, অন্য ভাই তখন সাহিত্যকে বৈজ্ঞানিক কৌতূহলের আশ্রয় বলে ভাবছেন। 'জীবনকে বুঝবার জন্য গভীর আগ্রহ নিয়ে পড়তাম গল্প উপন্যাস। গল্প উপন্যাস পড়ে নাড়া খেতাম গভীরভাবে, গল্প উপন্যাসের জীবনকে বুঝবার জন্য ব্যাকুল হয়ে তল্লাশ করতাম বাস্তব জীবন।' সেই সঙ্গে এই জিজ্ঞাসায়ও প্রশ্নদীর্ণ হতেন, ভদ্রজীবনের ভণ্ডামি, বিরোধ, হীনতা, স্বার্থপরতা, অবিচার, অনাচার, বিকারগ্রস্ততা, সংস্কারপ্রিয়তা ও যান্ত্রিকতা সত্ত্বেও কেন মানুষ মনে করে তা সুন্দর ও মহৎ? সে কি তৃণমূলের মানুষের সঙ্গে তাদের পার্থক্যের কারণে? এভাবে মার্কস পড়ার এবং মার্কসীয় পার্টিতে যোগ দেওয়ার আগেই মার্কসকথিত ষড়াব ধহফ যধঃব ৎবষধঃরড়হংযরঢ়-এর মধ্যে তিনি প্রবেশ করেন।
জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা সুধাংশুকুমারের অত্যন্ত কাছের সম্পর্ক থেকে মানিক এই বিষয়টিকে যেমন অত্যন্ত প্রত্যক্ষভাবে দেখেছেন, তেমনি আবার তার বৈজ্ঞানিক ও সাধারণ চারিত্র্য বিষয়ে সচেতন হয়েছেন। অগ্রজকে যে লিখেছেন 'যদি বুঝাইতেন' সে কাজটি তিনি সারাজীবন তাঁর সাহিত্যে করেছেন। তিনি যে প্রশ্ন তুলেছেন 'লেখক কে?' এবং তার জবাবে বলেছেন 'পিতার মতো যিনি দেশের মানুষকে সন্তানের মতো জীবনাদর্শ বুঝিয়ে শিখিয়ে পড়িয়ে মানুষ করার ব্রত নিয়েছেন' তা কোনো সরলোক্তি নয়, তার রয়েছে প্রবল ও প্রকাণ্ড জীবনবোধ ও তৃষ্ণা। সে কারণে কলম-পেষার পেশা বেছে নিয়ে প্রশংসায় আনন্দ পেলেও অহংকারবোধ করতে চাননি। বরং সে রকম ক্ষেত্রে তাঁর আফসোস জেগেছে, 'তাহলে খাঁটি লেখক কবে হবো!' তাঁর দাদা যখন তাঁকে সাহিত্যের নামে অক্ষমতার দায়ে অভিযুক্ত করেন তখন তিনি তাকে অস্বীকার করে লেখেন, 'আমি স্বীকার করি না যে, আমি অক্ষম। কলেজে পড়িবার সময় স্থির করিয়াছিলাম, সাহিত্যক্ষেত্রে বড় হইব। আমি তাহা প্রতিপালন করিয়াছি। অবশ্য অর্থোপার্জনের দিক হইতে বিশেষ সুবিধা করিতে পারি নাই। কিন্তু গরিব হওয়াটা অপরাধ নয়।' অতঃপর তিনি যে লিখেছেন, ৭০/৮০ টাকার চাকুরি তিনি এখনও পেতে পারেন কিন্তু সে চাকুরি নেওয়ার উপায় তার নেই এবং তিনি যে চাকুরি করতেন তাও ছেড়ে দিয়েছেন তাতে বোঝা যায়, সাহিত্যে তার অর্জনের লক্ষ্য কতটা উঁচুতে বাঁধা ছিল।
মানিক হচ্ছেন সেই লেখক যিনি মনে করেন, জীবনবিচ্ছিন্ন হয়ে কোনো সাহিত্যচর্চা সম্ভব নয়। কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেওয়ার আগে ও পরে এই ছিল তার মৌলিক জীবন-দর্শন। পার্টির কর্মকাণ্ডের নানা সমালোচনা করলেও মূলত এই কারণে আমৃত্যু তিনি তার সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন।
২. একথা সবাই জানেন, মানিকের দুটি উপন্যাস 'পদ্মানদীর মাঝি' ও 'পুতুলনাচের ইতিকথা' তাঁর শ্রেষ্ঠ অর্জন। এবং উপন্যাস দুটি কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেওয়ার আগে লেখা। পার্টিতে যোগ দেওয়ার পর ওই মাত্রার উপন্যাস তিনি আর লিখে উঠতে পারেননি। এক্ষেত্রে প্রথমেই মনে রাখা দরকার, মানিক অর্ধশতাব্দীও বেঁচে থাকেননি। এই সময়ে অঙ্গীকার-উত্তর সাহিত্য করার জন্য যে প্রস্তুতি মানিক নিয়েছিলেন, অসুখ ও আর্থিক অসঙ্গতিকে অতিক্রম করে তাতে সফল হওয়া তার পক্ষে সম্ভব হয়নি। 'মার্কসবাদ সম্পর্কে অজ্ঞ থেকে সাহিত্য করতে গেলে এলোমেলো উল্টাপাল্টা অনেক কিছু ঘটবেই' জেনেও মানিক প্রকৃত মার্কসবাদীর মতো তার অর্ধেক জীবনের সাহিত্যসাধনাকে বাতিল বলে গণ্য করেননি।
ধরা যাক 'পদ্মানদীর মাঝি'র কথা। কুবেরদের জেলেপল্লীর প্রসঙ্গে ঔপন্যাসিক জানাচ্ছেন, 'ঈশ্বর আছেন ঐ গ্রামে,
ভদ্রপল্লীতে। এখানে তাঁহাকে খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে না।' কুবেরের উলঙ্গ দুই ছেলে যখন সামান্য জিনিস নিয়ে কলহ করে তখন কুবের যে 'চাহিয়াও দেখিল না' সেটা তার উদাসীনতা নয়। 'শিক্ষা হোক, নিজের ভালো বুঝিয়া লইতে হইবে। দুদিন পরে জীবন-যুদ্ধে সমস্ত জগতের সঙ্গে যখন তাহাদের লড়াই বাধিবে তখন মধ্যস্থতা করিতে আসিবে কে?'
অঙ্গীকার-পূর্ব মানিক তাহলে এই শিক্ষা পেলেন কোত্থেকে? পেলেন জীবন থেকে। 'অতিথি আসিয়াছে, অতিথি চলিয়া যাইবে। তারপরে সপরিবারে উপবাস করিবে সে।' এই শিক্ষার জন্য কুবেরকে তো কোনো বই পড়তে হয়নি, জীবন তাকে এই সরল কিন্তু নির্মম সত্য শিখিয়েছে। আর তার স্রষ্টা সরাসরি সেখানে হাত পেতেছেন। এই সত্যের উল্টোদিকে আছে এই বাস্তবতা যে, 'তিন টাকায় দু আনার বেশি ফাঁকি দিবার সাহস তাহার নাই বলিয়াই হোসেন তাহাকে বিশ্বাস করে।'
মনে রাখা দরকার, কুবেরের জগতের মধ্যে তার স্রষ্টার দৃষ্টি সীমাবদ্ধ নয়। হোসেন মিয়ার চরিত্র ও তার ময়নাদ্বীপ লেখকেরই আবিষ্কার। ওই দ্বীপে তার মসজিদ-মন্দির নির্মাণ না করার ঘোষণার মধ্যে মধ্যবিত্তের 'ইহলৌকিকতা' আরাম ও প্রশ্রয় পেয়েছে। কিন্তু এভাবে তার লুণ্ঠন চরিত্র যে আড়ালে পড়ে গেছে বা যাচ্ছে সেই দৃষ্টি অনেক চক্ষুষ্মান মানুষেরও নেই। উপন্যাসের শেষাংশে ঘরের মধ্যেই চোরাই মাল উদ্ধারের ঘটনায় কুবের আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধাই শুধু পড়ে না, ঔপন্যাসিক যে বলেন, 'তাছাড়া গরিব নয় কুবের?' তাতে পটভূমির সামগ্রিকতা উন্মোচিত হয়। এ দৃষ্টিভঙ্গি মার্কসবাদী নয় বটে, কিন্তু তার পূর্বচিহ্ন অবশ্যই।
'পুতুলনাচের ইতিকথা'র শশী ও কুমুদই শুধু আলাদা নয়, প্রথমজনও নানাভাবে বিভক্ত। 'শহরতলী'তে যশোদা যাদের 'ভদ্রলোক' বলে মনে করে, তারা একদিকে যেমন মজুরদের ঘেন্না করে, অন্যদিকে তেমনি বড়লোকদের পা চাটে, ভদ্রলোকি অপমান বোধ টনটনে হলেও স্বার্থের জন্য তারা দিব্যি অপমান সয়ে যায়_ মানিক তা তার পরিপার্শ্ব ও জীবনেই দেখেছেন।
কুসুম ও কপিলা এই জীবনের সৃষ্টি হলেও তাকে আগ্রহ্য ও অস্বীকার করার প্রবণতাও তাদের মধ্যে বর্তমান। শিল্পী হিসেবে এখানে তিনি গণ্ডিকে অতিক্রম করে যান। এসব চরিত্র সৃষ্টির মধ্যে তিনি তাতে যুক্ত হওয়ার আগেই মার্কসীয় সৃষ্টিশীলতা খুঁজে পান।
৩. মেজদা সুধাংশুকুমারকে মানিক জানিয়েছিলেন, তিনি টানা এক বছর ধরে তাঁর রোগের চিকিৎসা করাতে চান। কারণ তা না হলে তাঁর হয়তো 'আংশিক সাফল্য' আসবে এবং তাতে তিনি সন্তুষ্ট নন। চার বছরের সাহিত্য সাধনায়ই যে তিনি রবীন্দ্র-শরৎচন্দ্র-পরবর্তী শ্রেষ্ঠ লেখক হিসেবে অভিহিত হয়েছেন তাতেও তিনি তৃপ্ত নন। তাঁর অ্যাম্বিশন সম্পূর্ণরূপে সফল না হলে 'বাঁচিয়া থাকিবার চিন্তা আমার নাই।'
এই উচ্চাকাঙ্ক্ষার বিপরীতে অগ্রজের বৈষয়িক উচ্চাকাঙ্ক্ষা কীভাবে মানবিক মূল্যবোধকে বিপন্ন করছে তার উদাহরণ পাওয়া যায় তাঁকে লেখা মানিকের পত্রাংশ থেকে, "পিতা-মাতা ও ভাইভগিনীর প্রতি কর্তব্য করিতেছেন না বিবেকের এই দংশন এবং আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধব আপনার নিন্দা করিতেছে, লোকের কাছে আপনি 'মানুষ' হিসেবে ছোট হইয়া যাইতেছেন এই চিন্তা এবং অন্যান্য আরও কতগুলি কারণে আপনি আমাদের সঙ্গে একটা সৃষ্টিছাড়া কৃত্রিম সম্পর্ক স্থাপন করিলেন। বাবা-মা আপনাকে সম্পূর্ণরূপে পাইলেন না অথচ আপনি সন্তান হইয়া রহিলেন। আমরা কেহ ভাইয়ের অধিকার পাইলাম না অথচ ভাই হইয়া রহিলাম। কেবল তাহাই নহে, মধ্যে মধ্যে কিছুকালের জন্য এই সম্পর্ক প্রায় ভাঙ্গিয়াও যাইতে লাগিল।" ফলে ভাই-ভাইয়ের সম্পর্কের মধ্যে আনুষ্ঠানিক যান্ত্রিকতা দেখা দেয়, 'আপনি পত্র পর্যন্ত লিখিতেন যেন গভর্নমেন্টের উচ্চপদস্থ কর্মচারী অধীনস্থ কেরানীর কাছে সরকারী বিষয়ে নোট পাঠাইছে।'
পারিবারিক বৃত্তের মধ্যে মানিক যাকে প্রত্যক্ষ করেছেন শিল্পী বলেই তিনি জানেন, সমাজের এই বাস্তবতাই তাতে প্রতিফলিত। ফলে পারিবারিক সম্পর্কের তিক্ততা একসময় তাকে কথাশিল্পে রূপান্তরিত করে। তিনি লিখতে লিখতে জীবনকে দেখেন এবং দেখতে দেখতে তাকে লেখেন। এই দেখা ও লেখার মধ্যে পরস্পরের আন্তঃসম্পর্ক উভয়কেই ঋদ্ধ করে। লেখার টেবিল থেকে উঠে বাজারের থলে নিয়ে প্রকাশকের কাছে যাওয়া এবং তার কাছে চূড়ান্ত হতাশ হওয়ার পরও যিনি লেখা ছাড়তে পারেন না, তিনিই তো প্রকৃত শিল্পী।
ঔপনিবেশিক ভারতে যাঁর জন্ম তিনি স্বাধীনতা-উত্তর স্বদেশে কিছুকাল বেঁচে থাকেন। তিনি শুধু জনগণকে শেখাতে চান না, তাঁদের কাছ থেকেও শিখতে চান। সেই শেখা তাঁর শুরু হয়েছিল। কিন্তু শেষ হয়নি। সেই প্রক্রিয়ার মধ্যে আমরাও রয়েছি। আমাদের প্রজাতন্ত্রের চারটি দশক সেই শিক্ষার গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। আমলাতন্ত্রের যে আচরণ মানিকের মেজদা পরিবারের সদস্যদের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেছেন, আমরা যেন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে সেই বৃত্তের মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছি। এর থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে আমাদেরও মুক্তি নেই।
মানিক ও তার মেজদার উচ্চাকাঙ্ক্ষা পরস্পরের এতই বিরোধী যে, একটির মৃত্যু অন্যটির বিকাশের কারণ ও উপায়। আমাদেরও বিবেচনা করে দেখতে হবে, আমরা উচ্চাকাঙ্ক্ষার কোন পথটি অনুসরণ করব। একটি পথের অনুসরণ করে বিপরীতটির ফল প্রত্যাশা করার মূর্খতা থেকে যতদিন আমরা মুক্ত হতে না পারব, ততদিন ভ্রান্তির মোহ থেকেও আমাদের পরিত্রাণ নেই। অন্তর্বর্তী এই পর্বে মানিকের দৃষ্টান্ত থেকে আমরা অনুপ্রাণিত হতে পারি।