আবদুল্লাহ আল মামুনের রুমে ঢুকেই ফরীদি বলল, 'কী রে মামুন, কেমন আছিস?'
মামুন ভাই মুহূর্তের জন্য চমকালেন তারপরই বিনীত ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়ালেন, 'জি ভালো আছি। আসুন, আসুন ফরীদি ভাই।'
তারপরই ফরীদির বিখ্যাত ঠা ঠা করা হাসি। আমি বসেছিলাম মামুন ভাইয়ের সামনে। দুজনের অভিনয়ে এমন হতভম্ব হয়েছি, কথা বলতে পারছি না!
এটা সংশপ্তকের সময়কার কথা। নাট্যরূপের কাজে আমি জড়িত ছিলাম বলে প্রায়ই বিটিভিতে যাই, মামুন ভাইয়ের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করি, রিহার্সেল দেখি। শুটিংয়েও যাই মাঝে মাঝে।
একদিনের ঘটনা। ঢাকার বাইরে গ্রাম এলাকায় শুটিং হচ্ছে। অনেকেই শুটিংয়ে। ফরীদি, আমি, আরেকজন অতি দুর্বল এবং নিম্নমানের অভিনেতা কাম বিটিভির অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রডিউসার বাসে বসে আড্ডা দিচ্ছি। আমি সেই ভদ্রলোকের নাম বলব না। পরবর্তী সময়ে তিনি প্রডিউসার বা তারও ওপরের পদে কাজ করেছেন। কথায় কথায় তিনি খুবই আফসোস করে একসময় বললেন, 'বুঝলা ফরীদি, এত দিন ধরে অভিনয় করি, কোনো মূল্যায়নই হলো না।'
ফরীদি বাইরের দিকে তাকিয়ে সিগারেট টানছিল, ভদ্রলোকের কথা শুনে তাঁর দিকে তাকিয়ে চট করে রেগে গেল, 'মূল্যায়ন মানে? ওই মিয়া, আপনের আবার মূল্যায়ন কী? আপনের অভিনয় কোনো অভিনয়? আপনেরে তো অভিনয়ই করতে দেওয়া উচিত না। বিটিভি থিকা বাইর কইরা দেওয়া উচিত।'
কেউ যে কারও মুখের ওপর এমন করে বলতে পারে_আমি ভাবতেই পারিনি। হাসব না কী করব বুঝতে পারছি না।
দাঁতে ঠোঁট কামড়ে অন্যদিকে তাকিয়ে রইলাম। ভদ্রলোক এমন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়েছেন, কথা না বলে নিঃশব্দে বাস থেকে নেমে গেলেন। ফরীদি আমার দিকে তাকিয়ে বলল, 'কেমন দিলাম?' তারপরই সেই ঠা ঠা করা হাসি। ফরীদির এই হাসি আমি প্রথম শুনি তিয়াত্তর সালের শুরুর দিকে। নারায়ণগঞ্জের আলম কেবিনের সামনের ফুটপাতে। বিকেলবেলা। সদ্য স্বাধীন হওয়া দেশ। ফরীদি মুক্তিযুদ্ধ করে এসেছে। বাবার পোস্টিং নারায়ণগঞ্জে। ফরীদি পড়াশোনার চেয়ে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডাই দেয় বেশি। দিন কাটায় আলম কেবিনে। ঘন ঘন চা আর সিগারেট আর শিল্প-সাহিত্যের গল্প। মাহবুব কামরান, মুহসিন, কবীর ওরা তার বন্ধু। আমাকে নিয়ে গিয়েছিল মাহমুদ শফিক। সে তখন দিনরাত কবিতা লেখে। নারায়ণগঞ্জের মুজিবুল হক কবীর তার বন্ধু। কবীরের বাবা সিরাজুল হক 'কালের পাতা' নামে মাসিক সাহিত্য পত্রিকা বের করেন। শফিক সেখানে কবিতা লেখেন। গেণ্ডারিয়ার রজনী চৌধুরী রোডে শফিক আর আমি পাশাপাশি বাড়িতে থাকি। আমার মাথায় মাত্র লেখার পোকা ঢুকেছে। শফিক আমাকে নিয়ে গেল 'কালের পাতা'র অফিসে। অফিস কবীরদের বাসার ভেতর। সেই বিকেলেই ফরীদির সঙ্গে পরিচয়। পরিচয়ের মুহূর্তেই বুঝলাম, 'জিনিসটি' ভেতরে ভেতরে টগবগ টগবগ করে ফুটছে। চান্স পেলে ওর সামনে কেউ দাঁড়াতে পারবে না।
পরবর্তীকালে তাই হলো। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইকোনমিকস পড়তে গেল ফরীদি। পরিচয় হলো সেলিম আল দীনের সঙ্গে। তারপর ঢাকা থিয়েটার। নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু, আফজাল হোসেন। সেলিম আল দীনের মঞ্চ কাঁপানো নাটক 'শকুন্তলা' একটু বেশিই কাঁপিয়ে দিল ফরীদি। তারপর আফজাল তাকে টিভি নাটকে ঢুকাল। একাধারে মঞ্চ এবং টেলিভিশন। তারপর একসময় সিনেমা। ফরীদি কিংবদন্তি হয়ে উঠল।
ফরিদুর রেজা সাগরের রেস্টুরেন্ট 'খাবার দাবার' ছিল আমাদের আড্ডার জায়গা। ফরীদি প্রায়ই আসত। সাহিত্য পাঠের নেশা আছে তার। আমরা তখন শীর্ষেন্দুর লেখায় খুব মজেছি। শীর্ষেন্দুর 'ঘুণ পোকা' আমার কাছ থেকে পড়তে নিয়ে হারিয়ে ফেলল ফরীদি। আমার তখন একটা সাহিত্যিক ভাব হয়েছে। কঠিন কঠিন শব্দ ব্যবহার করে কথা বলি। ফরীদিকে গম্ভীর গলায় বললাম, এই সব বালখিল্যতার মানে হয় না। এখনো শব্দটা ভোলেনি ফরীদি। মাঝে মাঝেই শব্দটা বলে ঠা ঠা করে হাসে।
ফরীদির কমোডে সবসময় সিগারেটের পিছন দিকটা পড়ে থাকে। অর্থাৎ কমোডে বসে সে সিগারেট টানে, ফ্ল্যাশ করার পর হয়তো সিগারেট শেষ হয়, কমোডে ফেলেই বেরিয়ে আসে।
আমাকে একদিন বলল, 'তুই আমাকে নিয়ে একটা বই লেখ।' খানিকক্ষণ পর বলল, 'বইটা কোত্থেকে শুরু করবি বল তো?' আমি নির্বিকার গলায় বললাম, তোর কমোড থেকে।
শুনে ফরীদির সেই ঠা ঠা করা হাসি।
ফরীদিকে নিয়ে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা লিখে যেতে পারি আমি। আটত্রিশ বছরের বন্ধুত্ব। এই এত দিনে কত আনন্দ বেদনার স্মৃতি আমাদের, কত সুখ-দুঃখের মুহূর্ত। কত রাত একসঙ্গে কাটিয়েছি আমরা, কত দিন! কত নাটক করেছি একসঙ্গে, কত গল্পকথা। ফরীদির বাইরেরটা সবাই দেখে, আমি তার ভেতরটা দেখেছি। ফরীদির ভেতর ফরীদির হাইটের চেয়ে অনেক অনেক বেশি উচ্চতার একজন মানুষ বাস করে। সেই মানুষ যেমন শিক্ষিত, তেমন মেধাবী, তেমন প্রতিভাবান, তেমন মানবিক, তেমন হৃদয়বান, তেমন তীক্ষ্ম, তেমন ঠাট্টাপ্রিয়, তেমন স্পষ্টবাদী, তেমন বন্ধুবৎসল, তেমন নিঃসঙ্গ, তেমন দুঃখী।
কিছুদিন আগে হঠাৎ এক সন্ধ্যায় ফরীদির ফ্ল্যাটে গেছি। গিয়ে দেখি ফ্ল্যাটে কেউ নেই। ফরীদি একা একটি সোফায় বসে সিগারেট টানছে। এমন একা ফরীদিকে আমি কোনোদিন দেখিনি। আমার বুকটা হু হু করে উঠেছিল। কথায় কথায় ফরীদি বলল, 'আমি মরে গেলে তোরা আমাকে দেখতে আসবি না।' কোন অভিমান থেকে বলল কে জানে!
আমি চোখ মুছতে মুছতে বেরিয়ে এলাম।
ফরীদি, মৃত্যুর কথা বলো না বন্ধু। তোমাকে মানায় না। তুমি বলবে জীবনের কথা, হাসি এবং গভীর আনন্দের কথা। বাঁচো, যত দিন পারো বেঁচে থাকো বন্ধু। যত দিন পারো আমাদের আলোকিত করো।
জন্মদিনের শুভেচ্ছা।