এস.এম গোলাম মুস্তফা
দেশ ও জাতির আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন সুষ্ঠু ও সমন্বিত সকল ধরনের যোগাযোগ ব্যবস্থা, কিন্তু পদ্মা নদী বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে রাজধানীসহ মূল ভূখণ্ড হতে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। ফলে এ অঞ্চলে প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ আধুনিক যোগাযোগের আশানুরূপ উন্নয়নের ছোঁয়া পায়নি, যেমন রেললাইনসহ উন্নত সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা। অথচ, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে রয়েছে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সামুদ্রিক বন্দর (মংলা) এবং সর্ববৃহৎ বেনাপোল স্থল বন্দর। তাই এই অঞ্চলের সাথে রাজধানীসহ অন্যান্য অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নের জন্য ঢাকা-মাওয়া-খুলনা এবং বরিশাল মহাসড়কের উন্নয়ন যদি ব্যাপকভাবে করা হয় এবং পদ্মা নদীর উপর রেললাইনসহ বহুমুখী সেতু নির্মিত হলে রাজধানী ঢাকাসহ মূল ভূখণ্ডের সাথে দক্ষিণাঞ্চলের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হবে। তাহলে সমগ্র দেশ সড়ক ও রেলওয়ে নেটওয়ার্কে চলে আসবে এবং যোগাযোগের ক্ষেত্রে এক বিপ্লব ঘটবে। উল্লেখ্য, প্রতি বছর এ অবহেলিত অঞ্চলের হাজার হাজার মানুষ লঞ্চডুবি ও ফেরি পারাপারের অবর্ণনীয় দুর্ভোগ হতে বেঁচে যাবে। তাছাড়া প্রতি বছর শত শত কোটি টাকা ফেরি চলাচলের জন্য ও নদী ড্রেজিং বাবদ যে ব্যয় হয়, তা সাশ্রয় হবে।
এ সেতুটির গুরুত্ব এমনই যে রাজধানীসহ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা-উপজেলা ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে যাতায়াতের দূরত্ব, সময় ও অর্থের অভাবনীয় হ্রাস পাবে, এর কারণ হলো পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া হয়ে ঢাকা-বরিশাল শহরের দূরত্ব ২৭৭ কিলোমিটার, আর মাওয়া হয়ে দূরত্ব ১৭৬ কিলোমিটার। বর্তমানে পাটুরিয়া হয়ে ঢাকা-খুলনার দূরত্ব ৩৪৬ কিলোমিটার, পক্ষান্তরে মাওয়া হয়ে এর দূরত্ব ২৪৫ কিলোমিটার। ঢাকা-বেনাপোলের দূরত্ব পাটুরীয়া হয়ে ২৭০ কিলোমিটার, যা মাওয়া হয়ে এর দূরত্ব ১৭৫ কিলোমিটার। পাটুরিয়া হয়ে মাদারিপুর শহরের দূরত্ব ২২০ কিলোমিটার যা মাওয়া হয়ে দাঁড়ায় মাত্র ৮০ কিলোমিটার। তাছাড়া মাওয়া হয়ে ঝিনাইদহ, নড়াইল, যশোহর, চুয়াডাঙ্গা, সাতক্ষীরা এবং মাগুরার দূরত্ব প্রায় ১০০ কিলোমিটার ও গোপালগঞ্জসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সকল জেলা শহর ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানের দূরত্ব ১০০-১৫০ কিলোমিটার কম হবে। বঙ্গবন্ধু বহুমুখী সেতু নির্মাণের ফলে দেশের উত্তরাঞ্চলের অবকাঠামোর যে অভাবনীয় উন্নতি হচ্ছে, তেমনি মাওয়ায় পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মিত হলে এ অবহেলিত অঞ্চলের অবকাঠামোর ব্যাপক উন্নতি হবে। এ ব্যতিত ঢাকার গেণ্ডারিয়া অথবা ফতুল্লা রেলস্টেশন হতে বুড়িগঙ্গা ও ধলেশ্বরী নদীর উপর দিয়ে মাওয়া হয়ে রেললাইন নির্মাণ করে বরিশাল ও মংলা বন্দরের সাথে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করা হলে পণ্য আনা-নেয়াসহ জনগণের চলাচলের সময় ও ব্যয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কমে যাবে। তাছাড়া রেললাইনবিহীন যথা-মুন্সীগঞ্জ, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, বরিশাল, ঝালকাঠি, বরগুনা, গোপালগঞ্জ ও বাগেরহাটসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার সাথে রেললাইন নির্মাণসহ ফরিদপুর-পুকুড়িয়া রেললাইনটি ভাঙা পর্যন্ত বর্ধিত করে পদ্মা বহুমুখী সেতু রেললাইনের সঙ্গে ভাঙ্গায় সংযুক্ত করে সরাসরি টেকেরহাট নিয়ে একটি শাখা গোপালগঞ্জ হয়ে মংলা এবং অপরটি মাদারীপুর জেলার উপর দিয়ে বরিশাল, পটুয়াখালি ও বরগুনা নেয়া হলে রেল যোগাযোগের ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক সৃষ্টি হবে। এখানে উল্লেখ্য যে, দীর্ঘ দিনের প্রস্তাবিত জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা-লাকসাম কডলাইন নির্মাণ করে পদ্মা সেতুর রেললাইনের সাথে সংযুক্ত করে দিলে চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে ঢাকার দূরত্ব ৮০ কিলোমিটার এবং মংলা বন্দরসহ অন্যান্য জেলা শহরের সাথে ১৫০ হতে ২০০ কিলোমিটার দূরত্ব কমে যাবে। তাছাড়া, চট্টগ্রামের নাজিরহাট হয়ে কক্সবাজার রেললাইন নির্মাণ করে এবং কুলাউড়া হয়ে শাহবাজপুর পর্যন্ত রেললাইনটি সংস্কার করা হলে ও যশোহর-ফরিদপুর আরেকটি কডলাইন নির্মাণ করে বেনাপোলের সাথে যদি সরাসরি সংযোগ স্থাপিত হয়, তাহলে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে বিরাট এক বিপ্লব সাধিত হবে। এছাড়া ভারত-বার্মার সাথে রেলওয়ের মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নতিসহ ট্রান্স-এশিয়া রেললাইনের সম্প্রসারণ ঘটবে। এর ফলে বেনাপোলের সঙ্গে ঢাকা-চট্টগ্রামসহ দেশের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ জেলা ও উপজেলার দূরত্ব অর্ধেকে নেমে আসবে এবং সময়, ব্যয়, জাতীয় নিরাপত্তা ও বিভিন্ন জাতীয় পণ্য পরিবহনে মারাত্মক সাফল্য বয়ে আনবে। এখানে উল্লেখ্য যে, ঢাকা-লাকসাম কডলাইন নির্মাণ করা হলে টঙ্গী-ভৈরল ডাবল লাইনের গুরুত্ব একেবারেই থাকবে না। এক্ষেত্রে টঙ্গী-ভৈরব ডাবল লাইন নির্মাণ না করে এ অর্থ জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা-লাকসাম কডলাইন নির্মাণে ব্যয় করা হলে তাতে দেশ ও জাতি উপকৃত হবে এবং টঙ্গী-ভৈরব ডাবল-লাইন নির্মাণের ব্যয় নিয়ে ভবিষ্যতে আর প্রশ্ন দেখা দিবে না। এছাড়াও বর্তমানে দেশের খাল-বিল, নদী-নালা ইত্যাদির নাব্যতা হ্রাস পাওয়ায় পূর্বের ন্যায় রেললাইন ও ব্রীজ নির্মাণের ব্যয় অনেক কম হবে। এখানে উল্লেখ্য যে, বৃটিশ শাসনামলে গভীর নদী-নালা ও খাল-বিল অতিক্রম করে রেললাইন নির্মাণ করেছিল, যা বাংলাদেশ রেলওয়েতে ভ্রমণ করলেই অনায়াসে বোঝা যাবে। সেক্ষেত্রে দক্ষিণাঞ্চলে রেললাইন নির্মাণ করা মোটেই অসম্ভব ছিল না, গভীর নদী-নালা ও খাল-বিলের অজুহাত দেখিয়ে বৃটিশ সরকার এ অঞ্চলে রেললাইন নির্মাণ করেনি।
পরবর্তীতে পাকিস্তান সরকার ফরিদপুর হতে বরিশাল পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণের একটি বৃহৎ প্রকল্প গ্রহণ করেছিল। এ প্রকল্পের অধীনে জরিপের মাধ্যমে বরিশাল পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণের জায়গা নির্ধারণপূর্বক পাকিস্তান ইস্টার্ন রেলওয়ে কর্তৃক পিলারও স্থাপন করা হয়েছিল। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর এ প্রকল্পের আওতায় ফরিদপুর হতে পুকুড়িযা পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণ করে ট্রেন চলাচল করা হয়েছিল, যা বিগত সরকারের সময় তা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এ ব্যতীত পুকুড়িয়া হতে ভাঙ্গা পর্যন্ত রেললাইনের জন্য মাটি কাটার কাজও সম্পন্ন করেছিল। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুরও এ প্রকল্প বাস্তবায়নের স্বপ্ন ছিল, কিন্তু দুঃখের বিষয়, ১৯৭৫ সালে জাতির জনক শহীদ হওয়ার পর এ প্রকল্পের কাজ নানা ষড়যন্ত্রে ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায়। এ প্রকল্পের আওতায় যে সকল অফিস, বাসাবাড়ি ও জায়গা-জমিসহ শত শত কোটি টাকার বিপুল পরিমাণ সম্পদ ছিল, তাও লুটপাট হয়ে আর অবশিষ্ট নেই। তাছাড়া এ পদ্মা সেতু উপলক্ষে দক্ষিণ অঞ্চলের সড়কপথের ব্যাপক উন্নয়ন হলে সুন্দরবন ও কুয়াকাটাকে কেন্দ্র করে কুতুবদিয়া, মহেশখালি, হাতিয়া ও কক্সবাজার হয়ে সেন্টমার্টিন পর্যন্ত বিশাল আন্তর্জাতিক পর্যটন শিল্প গড়ে উঠবে। এছাড়া বেনাপোল, ভোমরা ও দর্শনা স্থলবন্দর থেকে বিপুল পরিমাণ পণ্য রেল ও সড়ক পথে পরবহন করা সহজতর হবে। এ ব্যতীত ঢাকা-মাওয়া সড়কের সাথে সংযোগ রেখে রাজধানীর উত্তর ও দক্ষিণ দিকে দুটি বাইপাস সড়কের ব্যবস্থা করলে বেনাপোল ও মংলা থেকে চট্টগ্রাম ও দেশের অন্যান্য স্থানে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে সময় কম, দূরত্ব ও ব্যয়সহ রাজধানীর উপর দিয়ে যান চলাচলের চাপ অনেক হ্রাস পাবে এবং যানজটও কমে যাবে। এ ব্যতীত পদ্মা বহুমুখী সেতুর কারণে মংলা বন্দরের সাথে ঢাকাসহ অন্যান্য অঞ্চলের যোগাযোগ স্থাপিত হলে এতে চট্টগ্রাম বন্দরের উপর চাপও কমবে, ফলে মংলা বন্দরের কার্যক্রম বেড়ে যাবে। এছাড়া সার্কভুক্ত দেশ নেপাল এবং ভুটান বাংলাদেশে পঞ্চগড় ও দিনাজপুর জেলার স্থলবন্দরসমূহসহ রেলপথ ও সড়কপথ ব্যবহারের মাধ্যমে তাদের পণ্য পরিবহন করতে পারবে, এবং সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পাবে। এতে যে শুধু বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পাবে তা নয় কিন্তু সমগ্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সাথে সরাসরি ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণ ঘটবে। উপরন্তু এ সেতুর উপর দিয়ে গ্যাস এবং বিদ্যুৎ সরবরাহের মাধ্যমে এ অঞ্চলের মানুষ ভীষণভাবে উপকৃতসহ বিভিন্ন ধরনের শিল্প-কারখানা গড়ে উঠবে। ফলে বেকার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। তাছাড়া মাছ ও তরিতরকারিসহ কাঁচামাল, অন্যান্য পণ্যসামগ্রী ঝুঁকিমুক্ত ও সহজতর পরিবহনের সুবিধা সৃষ্টি হবে।
উল্লেখ্য যে, এ সেতুটি হবে দক্ষিণ বাংলার জনগণের প্রাণ কিন্তু বিগত দিনে এটি মাওয়ায় নির্মাণ নিয়ে প্রচুর ষড়যন্ত্র/ টালবাহানা হয়েছে যা দেশবাসী অবগত আছেন। যা হোক, বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা প্রথমেই বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে এবং এ সেতুটি নির্মাণের সর্বোচ্চ পদক্ষেপ নেন। এ কারণে বর্তমান সরকারের মাননীয় যোগাযোগ মন্ত্রী আলহাজ্ব সৈয়দ আবুল হোসেন সাহেবকে দায়িত্ব প্রদান করেন। মন্ত্রী মহোদয়ের অক্লান্ত পরিশ্রমে ইতোমধ্যে এ সেতুটি নির্মাণের প্রাথমিক কাজ অনেক দূর এগিয়ে নিয়েছেন। সেতুটির নকশা ও জমি অধিগ্রহণের কাজ শেষ হওয়ার পথে বলে জানা গেছে। মাননীয় মন্ত্রী মহোদয় উল্লেখ করেছেন যে, এ সেতুটির উপর দিয়ে রেললাইনসহ অন্যান্য সুবিধাদি থাকবে এবং এ সরকারের আমলেই এর কাজ শেষ হবে বলে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। তিনি আরো উল্লেখ করেছেন যে, এ সেতুটি হবে দৃষ্টিনন্দন ও রুচিসম্পন্ন। তাই সেতুটির নির্মাণ কাজের অগ্রগতিতে দক্ষিণ বাংলার জনগণের পক্ষ হতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও মাননীয় যোগাযোগ মন্ত্রী তাঁদের জানাই প্রাণঢালা অভিনন্দন ও মোবারকবাদ।
উল্লেখ্য যে, এ সেতুটি নির্মিত হবে মাওয়া-জাজিরার মধ্যে এবং দৈর্ঘ্য হবে ৫.৫৮ কিলোমিটার, প্রস্থ রেললাইনসহ ২৫ মিটার এবং সংযোগ সড়ক প্রায় ১৩ কিলোমিটার ও ব্যয় হবে প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা।
[লেখক: সাবেক রেলওয়ে কর্মকর্তা]