মীজানূর রহমান শেলী
এই অবস্থায় ক্ষমতা জনগণের কল্যাণে ব্যবহƒত না হয়ে দলীয় আধিপত্য বিস্তারের উদ্দেশ্যে ব্যবহƒত হয়। এই কারণেই, এমনকি দৃশ্যত স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচনও সব কিছু জেতা ও হারার খেলায় পরিণত হয়, যেখানে বিজয়ী দল হয়ে ওঠে সবকিছুর মালিক আর পরাজিত পক্ষ হয় সর্বস্বান্ত। বলা বাহুল্য, এই পরিস্থিতিতে গণতন্ত্র বলিষ্ঠ হয় না, হয় দুর্বল ও নির্জীব। এসব ক্ষেত্রে নির্বাচন প্রক্রিয়া ‘নির্বাচিত স্বৈরতন্ত্রের’ পথ প্রশস্ত করে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে ক্রান্তিকাল ফিরে ফিরে আসে। আড়াই বছর আগে অনির্বাচিত, প্রলম্বিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আওতায় অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের বিপুল বিজয় এবং সংসদীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ঘটে এক ঐতিহাসিক উৎক্রান্তি। তার রেশ মিলিয়ে যেতে না যেতেই যেন শুরু হয়েছে আর এক ক্রান্তিলগ্ন। সংবিধান-নির্দেশিত সময়সীমা অনুযায়ী পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় আসবে আরও প্রায় আড়াই বছর পর। অথচ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে কি-না সেই প্রশ্নে রাজনৈতিক অঙ্গনে সৃষ্টি হয়েছে দারুণ উত্তাপের। দেশের উচ্চতম আদালতের রায় অনুযায়ী সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর আওতায় সৃষ্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান সংবলিত সংশোধনীটি ভবিষ্যতের জন্য অবৈধ ও বাতিল ঘোষিত হয়েছে। অবশ্য রায়ে এই কথাও বলা হয়েছে যে, বাস্তব প্রয়োজনের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় সংসদের সিদ্ধান্ত সাপেক্ষে ভবিষ্যতের দুটি জাতীয় নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হতে পারে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব সর্Ÿোচ্চ আদালতের রায়ের ভিত্তিতে বলেন যে, অবৈধ ঘোষিত তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার আওতায় কোন নির্বাচন অনুষ্ঠানের সুযোগ নেই। ইতিমধ্যে মন্ত্রিসভার অনুমোদনক্রমে প্রস্তাবিত পঞ্চদশ সংশোধনীর যে বিল জাতীয় সংসদের চলমান অধিবেশনে পেশ করা হয়েছে তাতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ব্যবস্থা রাখা হয়নি। বিলটি বৃহস্পতিবার পাস হয়েছে। সংসদে সরকার পক্ষের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতার পরিপ্রেক্ষিতে এই আইন পাস করার পথে কোন বাধা ছিল না। কিন্তু প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ও তার মিত্র রাজনৈতিক দলগুলো সরকারি দলের এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করেছে এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া কোন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে না বলে ঘোষণা দিয়েছে। শুধু তাই নয়, তাদের দাবি আদায় করার জন্য তারা গত ৫ জুন সকাল-সন্ধ্যা এবং ১২ ও ১৩ জুন ৩৬ ঘণ্টা দেশব্যাপী লাগাতার হরতাল পালন করেছে। বক্তব্য ও পাল্টা বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে এবং সামগ্রিকভাবে রাজনৈতিক অঙ্গনে অস্থিরতা বেড়ে ওঠার লক্ষণ দেখা দিয়েছে। ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের এই বিপরীতমুখী অবস্থান দৃশ্যত ভবিষ্যৎ সংঘর্ষ ও সংঘাতের আবহ সৃষ্টি করেছে। অবশ্য অতি সম্প্রতি রাজনৈতিক উত্তাপ প্রশমনে দুই পক্ষের বক্তব্যে কিছুটা আগ্রহের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকার আর রাখা যাবে না বলার পরও সমস্যা নিরসনে আলোচনার জন্য বিরোধী দলকে সংসদে এসে বক্তব্য রাখতে আহ্বান জানাচ্ছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে অনড় থেকে বিএনপি জানায়, ওই সরকারের প্রধান কে হবে সে বিষয়ে এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট ব্যাপারে আলাপ-আলোচনায় তারা যোগ দিতে পারেন। উল্লেখ্য যে, বিএনপি ইতিমধ্যেই জানিয়ে দিয়েছে, সদ্য অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি খায়রুল হক আগামী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে তার কাছে গ্রহণযোগ্য হবেন না।
বিদ্যমান পরিস্থিতির ঘন মেঘে কোন রুপালি রেখা দেখা যাচ্ছে কিনা তা সুস্পষ্টভাবে বলার সময় এখনও আসেনি। সার্বিকভাবে পরিস্থিতি অস্থির, ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারবিষয়ক বিবাদের মীমাংসা হলে মঙ্গল। এতে গণতন্ত্র আশু দ্বন্দ্ব-সংঘাতের আশংকা থেকে মুক্ত হবে এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি হবে বলিষ্ঠ। এই কাক্সিক্ষত অবস্থার সৃষ্টি না হলে জাতির জীবনে অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি ঘটা অসম্ভব নয়। সাংঘর্ষিক ও সংঘাতময় পরিস্থিতি দেশ ও জাতিকে মারাÍক রাজনৈতিক সংকট ও ভয়াবহ সার্বিক বিপর্যয়ের দিকে নিয়ে যেতে পারে। ভীতিকর এই পরিণতি থেকে রক্ষা পেতে হলে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও প্রধান দলগুলোকে যেমন তেমনি সারা সমাজকে সচেতন ও সতর্কভাবে পদক্ষেপ নিতে হবে। তাদের বর্তমান রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার মধ্যে খুঁজে নিতে হবে চলমান সমস্যা ও ঘনায়মান সংকটের উৎস ও শেকড়গুলোকে।
এসব উৎস ও শেকড় নিহিত রয়েছে বিভাজনের রাজনীতিতে। এই বিভক্তির রাজনীতি সাংস্কৃতিক একাÍতায় সমৃদ্ধ বাংলাদেশকে কার্যকরী গণতন্ত্র অর্জন করতে দেয়নি। অথচ সফল গণতন্ত্র জনগণকে সক্রিয়ভাবে জাতির জীবনে অংশগ্রহণ করার সুযোগ দেয়। এর ফলে জনগণ জাতীয় জীবনের মূল বিষয়গুলোতে ঐকমত্য গড়ে তোলার প্রক্রিয়ায় সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সাংস্কৃতিক ঐক্যের বন্ধন আরও মজবুত হয়, ফলে বৈচিত্র্যের মধ্যেও জাতীয় ঐক্য ও সংহতি আরও বলিষ্ঠ হয়ে ওঠে।
কিন্তু অসম্পূর্ণ গণতন্ত্রে এই কাক্সিক্ষত প্রক্রিয়াগুলো বিঘিœত ও বাধাগ্রস্ত হয়। ‘অনিশ্চিত’ অথবা ‘অনুদার’ গণতন্ত্র নামে পরিচিত এ ধরনের ব্যবস্থায় গণতন্ত্র পথভ্রান্ত হয়। বিকৃত গণতন্ত্রের পরিবেশে রাজনৈতিক দলসমূহ ও তাদের নেতারা মৌলিক জাতীয় প্রশ্নে ঐকমত্য গড়ে তুলতে বা তা টিকিয়ে রাখতে ব্যর্থ হয়। এই পরিস্থিতিতে ভিন্নমতকে সহনশীল চোখে দেখা হয় না। অসহিষ্ণুতা রাজনীতি ও সমাজকে আচ্ছন্ন করে রাখে। ফলে প্রবল রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব জš§ দেয় অনৈক্য, বিভেদ ও বিশৃংখলার। পরিণতিতে জনসমর্থন আদায় করার জন্য বিবদমান দলগুলো গণতান্ত্রিক উপায়ে কাজ না করে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রলোভন ও বল প্রয়োগের পথ বেছে নেয়। এ অবস্থায় ক্ষমতা জনগণের কল্যাণে ব্যবহƒত না হয়ে দলীয় আধিপত্য বিস্তারের উদ্দেশ্যে ব্যবহƒত হয়। এ কারণেই, এমনকি দৃশ্যত স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচনও সব কিছু জেতা ও হারার খেলায় পরিণত হয়, যেখানে বিজয়ী দল হয়ে ওঠে সবকিছুর মালিক আর পরাজিত পক্ষ হয় সর্বস্বান্ত। বলা বাহুল্য, এই পরিস্থিতিতে গণতন্ত্র বলিষ্ঠ হয় না, হয় দুর্বল ও নির্জীব। এসব ক্ষেত্রে নির্বাচন প্রক্রিয়া ‘নির্বাচিত স্বৈরতন্ত্রের’ পথ প্রশস্ত করে।
ক্ষমতায় আসার পর সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দল পরাজিত বিরোধী দলের ভূমিকা ও শক্তিকে খর্ব করার কাজে মনোযোগ দেয়। ফলে বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রাণ-শক্তি ‘দল-ব্যবস্থা’ মারাÍকভাবে ব্যাহত হয়। শ্রীলংকা, জিম্বাবুয়েসহ অন্য কয়েকটি দেশের মতো বাংলাদেশেও এই ক্ষতিকর প্রক্রিয়ার ঘন ঘন পুনরাবৃত্তি দেখা যায়। অনিশ্চিত ও অসম্পূর্ণ গণতন্ত্রে ক্ষমতা অর্জনের প্রতিযোগিতা পরিণত হয় ক্ষমতা দখল করার ও টিকিয়ে রাখার তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। এহেন পরিস্থিতিতে ক্ষমতাসীন দল পৃষ্ঠপোষকতার রাজনীতির মাধ্যমে বিরোধী দলকে কোণঠাসা ও নির্জীব করার প্রক্রিয়া জোরদার করে। সমাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর সদস্যদের পৃষ্ঠপোষকতা দান করে সরকারি দল ক্ষমতাকে মজবুত ও টেকসই করার চেষ্টা চালায়।
স্মরণ রাখা প্রয়োজন, গণতান্ত্রিক শাসনে কয়েকটি প্রক্রিয়া অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। এর একটি হচ্ছে অর্থনৈতিক ও শ্রেণী স্বার্থের ভিত্তিতে সমর্থন অর্জন, অন্যটি হচ্ছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহের ওপর বৈধ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ন্যায়নীতিভিত্তিক রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা। গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার এ ধারণার মূলে রয়েছে সমাজতাত্ত্বিক ম্যাক্স ওয়েবারের প্রশাসনিক বা আমলাতান্ত্রিক যুক্তিবাদিতার তত্ত্ব। এই তত্ত্বের ভিত্তিতে যে ব্যবস্থার সৃষ্টি হয় তার আওতায় আনুষ্ঠানিক সংস্থাসমূহ এবং প্রতিষ্ঠিত বিধিরীতি ও প্রক্রিয়া যথাযথভাবে কাজ করতে পারে।
গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া এবং পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্যে এক ঘনিষ্ঠ ও পরস্পরনির্ভর সম্পর্ক বিদ্যমান দেখা যায়। এ পটভূমিতে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে যে, বাংলাদেশের মতো যেসব উন্নয়নশীল বা স্বল্পোন্নত দেশে পুঁজিবাদ পুরোপুরি বিকশিত নয় এবং গণতান্ত্রিক সুশাসন এখনও পূর্ণাঙ্গভাবে রূপায়িত নয়, তাদের অবস্থা কী? ম্যাক্স ওয়েবারের তত্ত্বে প্যাট্রিমোনিয়ালিজম বা উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পর্কভিত্তিক ব্যবস্থা প্রাক-পুঁজিবাদী সমাজের গ্রহণযোগ্য সংগঠন হিসেবে স্বীকৃত। এক্ষেত্রে কর্তৃত্ব ও তার বৈধতার উৎসে থাকে আÍীয়তার সম্পর্ক বা গোষ্ঠীগত একাÍতার ঐতিহ্যগত বন্ধন। কিছু কিছু উন্নয়নশীল বা স্বল্পোন্নত সমাজে আজ আমরা দেখি অন্য ধরনের এক পৃষ্ঠপোষকতার বুনট। এখানে পৃষ্ঠপোষক ও পোষিতের সম্পর্ক ঐতিহ্য বা উত্তরাধিকারের ভিত্তিতে গড়ে ওঠে না, এ সম্পর্কের মূলে থাকে এক নতুন ধাঁচের বিনিময়। এই বিনিময়নির্ভর সম্পর্কের বুনটে আশ্রিত ও অনুগতরা পৃষ্ঠপোষকতা ও অর্থ-সম্পদের বিনিময়ে তাদের আনুগত্য, সমর্থন এবং প্রয়োজনে পেশিশক্তি পৃষ্ঠপোষকের কাজে লাগায়। মূলত এই ব্যবস্থায় সম্মতি এবং বৈধতা আদিকালিক মূল্যবোধ (চৎরসড়ৎফরধষ ঠধষঁবং) থেকে উৎসারিত নয় বরং এর জš§ হয় পৃষ্ঠপোষকের কাছ থেকে পাওয়া অর্থ, সুযোগ ও সুরক্ষার সূতিকাগারে। কোন কোন বিশ্লেষক এই সম্পর্ককে নিউ-প্যাট্রিমোনিয়ালিজম বা নয়া উত্তরাধিকারবাদ বলে অভিহিত করেন। পৃষ্ঠপোষক ও পোষিতের সম্পর্কের নির্যাস হচ্ছে সম্পদ, সুযোগ ও সিদ্ধান্ত, অনুচরদের সমর্থন আদায় প্রক্রিয়া এবং প্রতিযোগিতার প্রক্রিয়ার ওপর পৃষ্ঠোপোষকদের ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণ।
আফ্রিকার কয়েকটি দেশ এবং শ্রীলংকা, পাকিস্তান ও বাংলাদেশসহ বেশ কয়েকটি উন্নয়নশীল বা স্বল্পোন্নত দেশে পৃষ্ঠপোষক ও পোষিতের সম্পর্কের এক বিস্তৃত জাল রাজনীতি ও সমাজকে ঘিরে রেখেছে। অনানুষ্ঠানিক শাসন প্রক্রিয়ার (ওহভড়ৎসধষ এড়াবৎহধহপব) শক্তি ও ব্যাপকতা এই জালকে আরও বিস্মৃত করেছে।
এসব ক্ষেত্রে বিজয়ী বা পরাজিত কোন পক্ষই সুস্থ গণতান্ত্রিক রাজনীতির চর্চায় আস্থাবান নন। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা অর্জন ও টিকিয়ে রাখার জন্য তারা নিজ নিজ দলের যোগ্যতার উপরও দৃশ্যত বিশ্বাসী নয়। ফলে ক্ষমতার জন্য প্রতিযোগিতার গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া হয়ে পড়ে বিকৃত ও দূষিত। ক্ষমতাসীন দল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও সম্পদের উপর একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করার চেষ্টা চালায়। এরই মাধ্যমে সেই দল ক্ষমতায় তার অধিষ্ঠান দৃঢ়তর করে পরবর্তী নির্বাচনগুলোতে জয়লাভের বিষয়টি নিশ্চিত করতে চায়। এই প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোকে সরকারি দলের প্রবল আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণের আওতায় নিয়ে আসা হয়। এতে করে ক্ষমতাসীন দল তার আশ্রিতদের আনুকূল্য বিতরণ করতে পারে। পরিণতিতে আমলাতন্ত্র, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং পেশাজীবী সমাজের আনুকূল্যপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা পৃষ্ঠপোষকদের অর্থাৎ ক্ষমতাসীন দলের স্বার্থের প্রহরী হিসেবে কাজ করে এবং তার ক্ষমতা মজবুত ও দীর্ঘস্থায়ী করতে সহায়তা দেয়। পারস্পরিক স্বার্থরক্ষার এই বিস্তৃত জালে বসে তারা বুঝি একে অন্যকে সহজেই বলতে পারে, ‘সেইখানে যোগ তোমার সাথে আমারও ঃ ’।
শাসকগোষ্ঠী এবং তাদের অনুগতদের মধ্যে পৃষ্ঠপোষক ও আশ্রিতের সম্পর্কের বেড়াজাল প্রায় ক্ষেত্রেই অতি বিস্তৃত ও ঘন হয়ে ওঠে। স্বল্পোন্নত দেশে এমনটি ঘটলে এক দারুণ নেতিবাচক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সেখানে এই সম্পর্কের জাল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর শক্তি বৃদ্ধিতে সাহায্য করে না বরং তাদের দ-র্বল ও নির্জীব করে তোলে। প্রশাসন, স্থানীয় সরকার এবং আইন পরিষদসহ রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানকে সম্প্রসারণশীল ওই বেড়াজালের আওতায় আনা হয়। সেই লক্ষ্যে এদের দলীয়করণের প্রক্রিয়ার শিকারে পরিণত করা হয়।
বিভাজনের গণতন্ত্রে দলীয়করণ শুধু ক্ষমতাসীন দলই করে না, বিরোধী দলও করে থাকে। যে দলই যখন ক্ষমতায় থাকে তখন প্রশাসনকে নিজ পক্ষে টানার চেষ্টা করে। ফলে জনপ্রশাসনে ঘটে অনাকাক্সিক্ষত মেরুকরণ। ক্ষমতাসীন দল যাদের অনুগত মনে করে তাদেরই সরকারি চাকরিতে নিয়োগ করে এবং আকর্ষণীয় পদে অধিষ্ঠিত করে। পদোন্নতির ক্ষেত্রেও রাজনৈতিকভাবে অনুগতদের অগ্রাধিকার দেয়া হয়।
প্রতিবার সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে অনুগত নয় এমন বিপুলসংখ্যক প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলকভাবে অবসর দেয়া হয় অথবা বদলি করা হয়। শূন্যপদগুলোতে রাজনৈতিকভাবে অনুরক্ত ব্যক্তিদের নিয়োগ দেয়া হয়, তাদের প্রয়োজনীয় যোগ্যতা থাকুক বা নাই থাকুক। এই দলীয়করণের ফলে প্রশাসন অচিরেই তার স্বাতন্ত্র্য, কার্যক্ষমতা ও নিরপেক্ষতা হারিয়ে ফেলে। পরিণতিতে জনপ্রশাসন ব্যবস্থা মারাÍকভাবে দ-র্বল হয়ে পড়ে এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও টেকসই করা দুঃসাধ্য হয়ে ওঠে। ক্ষমতালিপ্সু রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং রাজনৈতিকভাবে অনুগত অথচ অদক্ষ ও অযোগ্য প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের এই অশুভ আঁতাত জনপ্রশাসনের সজীবতা ও কার্যকারিতা দারুণভাবে হ্রাস করে। ফলে আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ শিথিল হয়। বিশৃংখল পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন প্রক্রিয়া বিপুলভাবে বিঘিœত হয় এবং রাষ্ট্র দ-র্বল ও অকার্যকর হয়ে পড়ার উপক্রম হয়।
ব্যর্থ বা প্রায় অকার্যকর রাষ্ট্রে অদূরদর্শী রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও তাদের দল স্থানীয় সরকার ব্যবস্থারও শক্তি ও কার্যপরিধি খর্ব করে। ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের পর পাকিস্তান ও বাংলাদেশসহ অন্যান্য অনেক দেশে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া স্ব-শাসিত স্থানীয় সরকার-ব্যবস্থাকে দুর্বল ও নিষ্ক্রিয় করার প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক দলগুলো সক্রিয় ভূমিকা রাখে। যখনই যে দল ক্ষমতায় আসে তখনই সে দল ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণে সচেষ্ট হয়। সেই উদ্দেশ্যে ক্ষমতাসীন দল স্থানীয় সরকারের স্বাধীন কার্যক্রম ব্যাহত করার উদ্যোগ নেয়। জাতীয় আইন পরিষদের সদস্য ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের ব্যবহার করে স্থানীয় সরকারি সংস্থাগুলোর ওপর অতিমাত্রায় নিয়ন্ত্রণ আরোপ করার প্রবণতা প্রবল হয়। ফলে এই প্রতিনিধিত্বশীল তৃণমূল সংস্থাগুলোর জীবনীশক্তি হ্রাস পায়। এ ধরনের নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থার আর একটি ক্ষতিকর মাত্রা হচ্ছে, স্থানীয় সরকার স্তরে পৃষ্ঠপোষক ও আশ্রিতের সম্পর্কের মহাজাল বিস্তার। স্থানীয় উন্নয়নের জন্য নির্দিষ্ট সম্পদ শাসক দল কর্তৃক একচেটিয়াভাবে নিয়ন্ত্রণের ফলে সংশ্লিষ্ট এলাকায় অসম এবং অন্যায্য উন্নয়নের ধারা প্রবল হয়ে ওঠে। এছাড়াও সরকার বদলের ফলে অন্য দল ক্ষমতায় এলে বিদ্যমান ব্যবস্থা ব্যাহত হয়, পরিণতিতে ধারাবাহিক ও স্থিতিশীল উন্নয়নের পথ রুদ্ধ হয়ে যায়।
কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা ক্ষমতারিক্ত ও নির্জীব হওয়ার ফলে বিকেন্দ্রীকরণ প্রক্রিয়া বিঘিœত হয়। পরিণতিতে তৃণমূল স্তরে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় জনগণ অর্থবহভাবে অংশ নিতে পারে না। এ অবস্থায় গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ে, দেশব্যাপী বিভাজন ও দ্বন্দ্ব তীব্র হয় এবং রাষ্ট্র আরও দ্রুতবেগে ব্যর্থতার পথে এগিয়ে যায়।
প্রায় অকার্যকর রাষ্ট্রে পৃষ্ঠপোষকতার ক্ষতিকর বেড়াজাল বিচার বিভাগকেও আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রাখে। অনিশ্চিত গণতন্ত্রে প্রধান বিচারপতি ও অন্যান্য বিচারক নিয়োগ দেয়ার ক্ষমতা কার্যত দলীয় সরকারের প্রধান নির্বাহীর হাতেই ন্যস্ত থাকে। এর ফলে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব-সংঘাতে ক্ষীয়মাণ গণতন্ত্রে ক্ষমতাসীন দল তার অনুগতদের বিচারক হিসেবে নিয়োগ দেয়। পৃষ্ঠপোষক ও আশ্রিতের সম্পর্কনির্ভর পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক আনুগত্যের বিষয়টি প্রধান হয়ে দাঁড়ায়, এখানে নিয়োগপ্রাপ্তদের নৈতিকতা, যোগ্যতা এবং মানের বিষয়গুলো অনেক সময় উপেক্ষিত হয়। এভাবে নিযুক্ত ব্যক্তিরা দৃশ্যত ক্ষমতাসীন দলের অনুগ্রহপুষ্ট হয়ে তারই স্বার্থ রক্ষায় কাজ করেন বলেই ব্যাপক অভিযোগ ওঠে। এহেন পরিবেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও রক্ষা দুঃসাধ্য হয় এবং শাসক দলের আধিপত্যের পথ প্রশস্ত হয়। দলীয় ক্ষমতার নিরংকুশ বিস্তার খাঁটি গণতন্ত্র বিকাশের পথ রুদ্ধ করে।
ব্যর্থপ্রায়, ভঙ্গুর রাষ্ট্রে ‘দখলে’র প্রক্রিয়া রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর চৌহদ্দির বাইরেও সক্রিয় থাকে। ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রত রাজনৈতিক শক্তিগুলো পুরো সমাজকে ‘আমরা’ ও ‘তারা’ এই দুই শিবিরে বিভক্ত করার কাজে তৎপর থাকে। চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবী, ব্যবসায়ীসহ সব পেশাজীবী গোষ্ঠী দলীয়করণের জালে আবদ্ধ হয়ে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর কোন না কোনটির অনুগ্রহপুষ্ট আশ্রিতে পরিণত হয়। সংশ্লিষ্ট দল ক্ষমতায় গেলে অনুগতদের বিভিন্নভাবে পুরস্কৃত করে এবং বিরোধীদের করে সুযোগ-সুবিধাবঞ্চিত। ক্ষমতার স্বার্থে ও পৃষ্ঠপোষকতার ভিত্তিতে তৈরি সমাজের এই বিভাজন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মূল কাঠামোকে মারাÍক হুমকির মুখোমুখি করে।
অন্যদিকে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলোর আর্থিক ক্ষমতায়নের দ্বন্দ্বময় প্রতিযোগিতা মুক্তবাজার অর্থনীতির এক বিপজ্জনক বিকৃতি ঘটায়। অনুচর পুঁজিপতিদের (ঈৎড়হু ঈধঢ়রঃধষরংঃং) পৃষ্ঠপোষকতা ও সহায়তা দান করে শাসকগোষ্ঠী বাজারে তাদের একচেটিয়া আধিপত্যের পথ প্রশস্ত করে। ফলে বাজারবান্ধব অর্থনীতি প্রতিকূল পরিবেশে নিষ্ক্রিয় ও নির্জীব হয়ে পড়ে। রাজনীতি প্রভাবিত পৃষ্ঠপোষকতার অর্থনীতি বল্গাহীন দুর্নীতির পথ উš§ুক্ত করে দেয়। পচনের এই মারাÍক প্রক্রিয়া জাতীয় সম্পদের লাগামহীন লুটপাট ও বিপুল অপচয়ের মাধ্যমে অর্থনীতিকে নির্জীব ও জরাগ্রস্ত করে তোলে।
দলনির্ভর একচেটিয়া অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে আহরিত অর্থবিত্ত অনেক সময়ই দলীয় ক্যাডারদের পেশিশক্তি বাড়ানোর কাজে লাগানো হয়। অসুস্থ এই প্রক্রিয়া দলবাজিকে জোরদার করে, রাজনীতিতে আনে ভয়াবহ দূষণ, গণতন্ত্রকে করে সংকটাপন্ন।
যেসব দেশে গণতন্ত্র এখনও অসম্পূর্ণ এবং অনিশ্চিত সেখানে প্রায়ই ব্যক্তিকেন্দ্রিক নেতৃত্ব প্রবল প্রতাপে বিদ্যমান দেখা যায়। বিকাশমান অনেক গণতান্ত্রিক দেশেই মোহিনী (ঈযধৎরংসধঃরপ) নেতৃত্ব বংশানুক্রমিক সূত্রে প্রতিষ্ঠিত। এ ধরনের নেতৃত্ব ব্যক্তিনির্ভর ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক। এই পরিস্থিতিতে ব্যক্তির গুরুত্ব ও প্রভাব বিধি-ব্যবস্থার চেয়ে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। শীর্ষ নেতার নিরংকুশ ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি সরকার ও দল উভয়কেই নিয়ন্ত্রণ করে। মোহিনী নেতৃত্বের অধীনে দলের মধ্যে গণতান্ত্রিক আচার-আচরণ পরিপূর্ণ রূপ পায় না। দল ক্ষমতায় গেলে সরকারে গণতন্ত্রও সীমিত হয়ে ওঠে। ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়ার পরও দলে ব্যক্তি-নেতৃত্বের শক্তি ও প্রভাব কমে না বরং অনেক ক্ষেত্রে বেড়ে যায়। দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্রের ঘাটতি দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও বিকাশের পথে প্রায়ই বিশাল বাধার সৃষ্টি করে।
আজকের দুনিয়ায় ভঙ্গুর গণতন্ত্রবিশিষ্ট দেশগুলোর জটিল সমস্যা ও সংকটের মূলে রয়েছে রাজনৈতিক নেতৃত্বের অসম্পূর্ণতা ও দুর্বলতা। এ ধরনের নেতৃত্বের সৃষ্টি হয় পথচ্যুত রাজনীতির গর্ভে। আবার এই নেতৃত্বই পথভ্রান্ত গণতন্ত্রের বিভ্রান্তি ও সমস্যাকে কোন কোন সময় আরও জটিল করে তোলে। ক্ষমতার রাজনীতির মোহে আচ্ছন্ন দ্বন্দ্বমান রাজনৈতিক দলগুলো সুস্থ গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতার বদলে বেছে নেয় ভয়াবহ প্রতিদ্বন্দ্বিতার পথ। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা লাভের উদগ্র বাসনা জš§ দেয় দ্বন্দ্বময় সাংঘর্ষিক রাজনীতির। ফলে বিবদমান পক্ষগুলো জাতীয় জীবনের মূল বিষয়গুলোতে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করতে বা টিকিয়ে রাখতে ব্যর্থ হয়। পরিণতিতে জাতি হয় বিভক্ত, নষ্ট হয় তার যুগ-সঞ্চিত একাÍতাবোধ। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর অদূরদর্শী দ্বন্দ্ব-বিবাদ বিভক্ত জাতিকে প্রায় জিম্মি করে রাখে। বংশানুক্রমিক ঐতিহ্যের ধারক মোহিনী নেতৃত্বের পেছনে কাতার বেঁধে রাজনৈতিক দলগুলো নিজ নিজ পক্ষে জনসমর্থন আদায়ের চেষ্টা চালিয়ে যায়। নেতা ও দল উভয়ই ক্ষমতাসীন হয়ে রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোকে নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য ওইসব সংস্থার সদস্যের সঙ্গে গড়ে তোলে পৃষ্ঠপোষক ও আশ্রিতের সম্পর্ক। এই সম্পর্কের বিস্তার তারা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের চৌহদ্দির বাইরেও ঘটাতে থাকে। শীর্ষ নেতারা প্রায়ই এ সম্পর্কের বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত আনুগত্যকে প্রাধান্য দেন। উচ্চ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পদে শীর্ষ সহযোগী ও সহকর্মী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে আনুগত্যের বিবেচনা যোগ্যতা ও দক্ষতার মাপকাঠির চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়। স্বাভাবিকভাবেই এই পরিস্থিতিতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও টেকসই করা দুঃসাধ্য হয়ে ওঠে এবং আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। পৃষ্ঠপোষক ও আশ্রিতের সম্পর্কভিত্তিক রাজনীতি অর্থনীতিকেও দূষিত করে। এই দূষণের ফলে অর্থনীতি অনুচর-পুঁজিবাদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়, দুর্নীতি ও লুটপাট জাতীয় জীবনকে বিপর্যস্ত করে।
স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল আরও অনেক দেশের মতোই বাংলাদেশের সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক সমস্যাগুলো বিশাল আর্থ-সামাজিক পরিপ্রেক্ষিতে সৃষ্টি হয়। যে পরিপ্রেক্ষিতে সাম্প্রতিক জটিলতা ও সংকট দানা বেঁধে উঠেছে তার মূলে রয়েছে এক নেতিবাচক মনোভঙ্গি যা যত না আদর্শ ও নীতিনির্ভর, তার চেয়ে বেশি নির্ভরশীল ক্ষমতার দ্বন্দ্বের ওপর। ক্ষমতার রাজনীতি জš§ দেয় অপরিণামদর্শী পৃষ্ঠপোষকতার বিভক্ত সমাজ। পৃষ্ঠপোষক ও পোষিত উভয়েই বুঝি মনে মনে সারাক্ষণ আওড়ায় ‘সেইখানে যোগ তোমার সঙ্গে আমারও ঃ’। স্বল্পস্থায়ী ক্ষমতা, অর্থবিত্ত ও প্রভাব-প্রতিপত্তির মোহে আদর্শ, নৈতিকতাকে দূরে ঠেলে শুধু ক্ষমতা দখল ও টিকিয়ে রাখার দ্বন্দ্বে মেতে থাকলে রাজনীতি জাতীয় উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পথ প্রশস্ত করবে না, একের পর এক টেনে আনবে মারাÍক সংকট ও বিপর্যয়। সারা সমাজ বিপন্ন হবে, ব্যর্থতার দিকে এগিয়ে যাবে রাষ্ট্র। একমাত্র দৃঢ়সংকল্প ও দূরদর্শী রাজনৈতিক নেতৃত্বই আসন্ন বিপর্যয়ের হাত থেকে দেশ ও গণতন্ত্রকে রক্ষা করতে পারে। বিবদমান নেতা ও দলসমূহকে সাহস ও উদারতা নিয়ে সংঘর্ষ ও সংঘাতের পথ পরিহার করে গণতান্ত্রিক পন্থায় জাতীয় ঐক্য ও সৌহার্দ্য ফিরিয়ে আনতে হবে। তা যদি তারা করতে পারেন তাহলেই জাতি খুঁজে পাবে সফলভাবে সংকট নিরসনের শান্তিপূর্ণ পথ।
ড. মীজানূর রহমান শেলী : চিন্তাবিদ, সমাজবিজ্ঞানী ও সাহিত্যিক