সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
১৬ ডিসেম্বরের পর থেকে যে পরিবর্তনটা এলো তখন ব্যক্তিগত স্বপ্নটা বড় হয়ে দাঁড়াল সমষ্টিগত স্বপ্নের তুলনায়। সমষ্টিগত স্বপ্নকে পেছনে রেখে আমরা প্রত্যেকে নিজের মতো ব্যক্তিগত স্বপ্ন দেখতে থাকলাম। অর্থাৎ নিজের কতটা সম্পদ হবে, নিজে কতটা ক্ষমতা পাব, নিজের কতটা প্রতিষ্ঠা হবে, নিজের কতটা সম্মান বাড়বে এটাই হয়ে দাঁড়াল লক্ষ্য। এমনকি আমরা দেখেছি মুক্তিযুদ্ধের ওপর যারা স্মৃতিকথা লিখেছেন তাদের লেখায় 'আমার দেখা ১৯৭১', 'একাত্তরে আমার ভূমিকা', 'আমার ১৯৭১', '১৯৭১ ও আমি'_ এসব বিষয়ই উপজীব্য হয়ে এসেছে। অর্থাৎ ব্যক্তিগত অর্জন, ব্যক্তিগত ভূমিকাই প্রাধান্য পেল
মুক্তিযুদ্ধের চেতনাটা আসলে একটা স্বপ্ন, একটা সমষ্টিগত স্বপ্ন, সমষ্টিগত মুক্তির স্বপ্ন। এ স্বপ্নটাকে আমরা যখন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলছি তখন কিন্তু আমরা এটাকে স্বাধীনতার চেতনা থেকে আলাদা করছি। স্বাধীনতা হচ্ছে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার একটা পরিবর্তন। এই স্বাধীনতা আমরা দু-দু'বার পেয়েছি, একবার ১৯৪৭-এ, তারপর ১৯৭১-এ। মুক্তি হচ্ছে আরও ব্যাপক বিষয়। অর্থাৎ রাষ্ট্রের চরিত্রে পরিবর্তন এবং রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে যে সমাজ আছে তার মৌলিক পরিবর্তন। দু'বার স্বাধীন হলেও আসলে আমাদের সমাজব্যবস্থায় কোনো মৌলিক পরিবর্তন ঘটেনি। ব্রিটিশ আমলে যে সমাজ ছিল, যে রকম একটা সামাজিক, রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা তারা তৈরি করেছিল, সেটাই রয়ে গেছে। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে মুক্তির যে স্বপ্নটা ছিল, সেটা হলো এই সমাজ বদলাবে, এই রাষ্ট্র বদলাবে এবং কেবল রাজনৈতিক স্বাধীনতা আসবে না, প্রকৃত মুক্তি আসবে।
প্রকৃত মুক্তি বলতে একটি মানবিক সমাজ ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা। গণতন্ত্রের মূল বিষয়টা হচ্ছে_ অধিকার এবং সুযোগের সাম্য। দ্বিতীয় বিষয় হচ্ছে, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ। তৃতীয়টা হচ্ছে, সর্বস্তরে ও পর্যায়ে জনপ্রতিনিধিদের শাসন প্রতিষ্ঠা। প্রথমে মুক্তির স্বপ্ন বিষয়ে এক ধরনের অস্পষ্টতা ছিল, যে জন্য শুরুতে আমাদের যুদ্ধটাকে স্বাধীনতার যুদ্ধই মনে হয়েছিল। কিন্তু পরে মানুষের অংশগ্রহণ যত বাড়ল, স্বপ্নটা যত বিকশিত হলো, ততই এটা মুক্তির সংগ্রাম বলে পরিষ্কার হয়ে উঠল। এই সংগ্রামটা দীর্ঘকালের। কিন্তু আমরা এটাকে এভাবে আগে কখনও উপলব্ধি করিনি। যেমন ধরা যাক, ১৯৪৭-এর স্বাধীনতার কথা। ১৯৪৭-এ আমরা স্বাধীনতার কথাই বলেছি। তখন মুক্তির কথাটা এভাবে আসেনি। স্বাধীনতার জন্য ১৯৪৭-এ আসলে আমরা কোনো সংগ্রাম করিনি। ১৯৪৭-এ একটা দাঙ্গা হয়েছিল। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার মধ্য দিয়ে দেশ ভাগ হলো। আর তখন প্রকৃত অর্থে যা ঘটল, সেটা হলো ক্ষমতার হস্তান্তর। ইংরেজ শাসকরা স্থানীয় শাসকদের কাছে [যাদের অধিকাংশই ছিল পাঞ্জাবি] রাষ্ট্রক্ষমতা দিয়ে গেল। ক্ষমতার হস্তান্তর ঘটল। তবে পূর্ববঙ্গের মানুষের বুঝতে মোটেই বিলম্ব হলো না, তারা প্রকৃত স্বাধীনতা পায়নি, মুক্তি তো অনেক পরের কথা। সে জন্য রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন তৈরি হলো এবং রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়েই আমাদের যে স্বায়ত্তশাসনের দাবি তার জন্য আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটল।
তবে আমরা কিন্তু রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সময় একমাত্র রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের কথা বলিনি। যদিও পাকিস্তানে তখনকার জনসংখ্যার মধ্যে শতকরা ৫৬ জন ছিল বাঙালি। বলা হয়েছিল অন্যতম রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই, অর্থাৎ আমরা স্বায়ত্তশাসন চাচ্ছি। ওই স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন চলতে থাকল ধারাবাহিকভাবে। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনের মধ্য দিয়েও আমরা স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে রায় দিলাম। ছয় দফা যখন এলো, সেটাও স্বায়ত্তশাসনের দাবি। কিন্তু ক্রমাগত মানুষের মধ্যে পূর্ণ স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাটা জেগে উঠল। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বিজয়ের পরে ছয় দফা এক দফায় চলে এলো। সেই এক দফাটা হলো বাংলাদেশের স্বাধীনতা। তারও পরে মুক্তির কথাটা এলো, অর্থাৎ ওই যে একটা সমষ্টিগত স্বপ্ন, সেই স্বপ্ন আমরা দেখতে থাকলাম। আমরা চাইলাম আমাদের এ সমাজের পরিবর্তন হবে, আগের সমাজ থাকবে না। এ রাষ্ট্র আগের রাষ্ট্র থাকবে না। পাকিস্তানে আমাদের যে রাষ্ট্রটা ছিল সেটা ব্রিটিশ শাসনের ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়ে বিকশিত একটা রাষ্ট্র। সে রাষ্ট্র ছিল কাঠামোগতভাবে আমলাতান্ত্রিক এবং অর্থনৈতিকভাবে পুঁজিবাদী। বলা যায়, কাঠামোটা আমলাতান্ত্রিক এবং অর্থনীতিটা পুঁজিবাদী। একে ভেঙে আমরা প্রকৃতভাবে একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র চেয়েছি, কিন্তু সেই রাষ্ট্র আমরা পাইনি। এবং সেই রাষ্ট্র না-পাওয়ার জন্যই আমাদের এত দুর্ভোগ।
আমরা এখন পর্যালোচনা করতে পারি কী কারণে কী ঘটল। যে একটা সমষ্টিগত স্বপ্ন ছিল, মুক্তির স্বপ্ন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও গণতান্ত্রিক সমাজের স্বপ্ন। কিন্তু বিজয়ের পর মুক্তি আমরা অর্জন করতে পারিনি। ১৬ ডিসেম্বরের পর থেকে ওই সমষ্টিগত স্বপ্ন যেটাকে আমরা '৭১ সালের ওই ভয়াবহ সময়ে নির্যাতনের মুখে, নিপীড়নের মুখেও ধারণ করে রেখেছিলাম, যদিও তখন সময়টা ছিল দুঃস্বপ্নের, হানাদাররা ওই দুঃস্বপ্ন তৈরি করেছিল কিন্তু আমরা সমষ্টিগত স্বপ্নটাকে ধারণ করেছিলাম। আমরা যে সংগ্রামটা করছিলাম, যে লড়াইটা করছিলাম, তার মধ্যে ওই স্বপ্নটাই ছিল চালিকাশক্তি। আমরা বুঝেছিলাম ব্যক্তির মুক্তি সবার মুক্তির মধ্যে নিহিত, এটা আলাদা করে আসবে না। কিন্তু ১৬ ডিসেম্বরের পর থেকে যে পরিবর্তনটা এলো তখন ব্যক্তিগত স্বপ্নটা বড় হয়ে দাঁড়াল সমষ্টিগত স্বপ্নের তুলনায়। সমষ্টিগত স্বপ্নকে পেছনে রেখে আমরা প্রত্যেকে নিজের মতো ব্যক্তিগত স্বপ্ন দেখতে থাকলাম। অর্থাৎ নিজের কতটা সম্পদ হবে, নিজে কতটা ক্ষমতা পাব, নিজের কতটা প্রতিষ্ঠা হবে, নিজের কতটা সম্মান বাড়বে_ এটাই হয়ে দাঁড়াল লক্ষ্য। এমনকি আমরা দেখেছি মুক্তিযুদ্ধের ওপর যারা স্মৃতিকথা লিখেছেন তাদের লেখায় 'আমার দেখা ১৯৭১', 'একাত্তরে আমার ভূমিকা', 'আমার ১৯৭১', '১৯৭১ ও আমি'_ এসব বিষয়ই উপজীব্য হয়ে এসেছে। অর্থাৎ ব্যক্তিগত অর্জন, ব্যক্তিগত ভূমিকাই প্রাধান্য পেল। ফলে মুক্তিযুদ্ধ ছিল যে ব্যাপক জনগণের অংশগ্রহণে, সে ব্যাপারটা পিছিয়ে গেল। নতুন নতুন বীরের আত্মপ্রকাশ ঘটতে থাকল। তারা নতুন নতুন বীরত্বের কাহিনী বলতে থাকলেন এবং সব ব্যাপারটা এমন হলো যেন ব্যক্তিগত অর্জনের মধ্যেই ব্যক্তির মুক্তি আছে। ফলে সমষ্টিগত মুক্তির খোঁজ ছেড়ে মানুষ ব্যক্তিগত সম্পত্তি নিয়ে ভাবনা শুরু করল। '৭১-এ আমরা মুক্তি খুঁজেছি সমষ্টিগত। '৭১-এর পরে আমরা প্রত্যেকেই ভাবছি, যারা দৃষ্টান্ত, যারা আদর্শ তারা প্রত্যেকেই ভেবেছেন যে তার সম্পত্তিটা তাকে মুক্তি দেবে, আমার সম্পত্তি যত হবে ততই আমি মুক্ত হব। আর এ ধারণার জন্য আমাদের ওই যে সোনালি স্বপ্নটা সেটা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল, যেটাকে পাকিস্তানি হানাদার ভাঙতে পারেনি, সেটাকে আমরা ভাঙলাম বিজয়ের পরে। বলা যায়, বিজয়ের পরে এটা আমাদের একটা ঐতিহাসিক পরাজয় যে, আমরা সমষ্টি চিন্তা বাদ দিয়ে ব্যক্তি চিন্তাকে বরণ করে নিলাম।
সঙ্গত প্রশ্ন এই যে, ঐতিহাসিক পরাজয়ের এই দায়টা কার? দায়িত্ব দিতে হবে নেতৃত্বকে। কেননা নেতৃত্বই তো পরিচালনা করে, তারাই আদর্শ স্থাপন করে, দৃষ্টান্ত স্থাপন করে, তাদের অনুকরণেই অন্যরা শেখে। যে নেতৃত্ব আমাদের দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে সামনে ছিল সেটা ছিল জাতীয়তাবাদী নেতৃত্ব এবং জাতীয়তাবাদীরা মনে করেন তাদের পক্ষে যে ভূমিকাটা পালন করার দায়িত্ব ছিল সেটা ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর শেষ হয়ে গেছে। এরপরে তারা আর ওই স্বপ্নটাকে এগিয়ে নেয়নি।
২
গণতান্ত্রিক যে লক্ষ্যের কথা বলছি সে লক্ষ্যটা আসলে সমাজতান্ত্রিক লক্ষ্যই। শুধুই নামের পার্থক্য। কিন্তু ওই যে জাতীয়তাবাদীরা, তারা সমাজতান্ত্রিক ধারণার কাছে যাবে না। সে জন্যই সংবিধান থেকে সমাজতন্ত্রের বিচ্ছেদ ঘটেছে। জিয়াউর রহমানের সময় সামরিক ফরমানের জোরে তিনি তা করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় যে জাতীয়তাবাদীরা মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছেন তারাও সরকারে এসে সংবিধানের ওই আদি রূপটাকে ফিরিয়ে আনতে চাননি, ধর্মনিরপেক্ষতা আনতে চাননি, বৈষম্য আর দূর করতে চাননি। কাজেই ব্যর্থতা যদি বলতে হয় সেটা নেতৃত্বের ব্যর্থতা। আবার ব্যর্থতা বলাও যাবে না এই অর্থে যে, জাতীয়তাবাদীদের কাছে আমরা কতটা আশা করব? আমরা জাতীয়তাবাদীদের কাছে আশা করব না যে তারা সমাজকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবে, উত্তরণের জায়গাটাতে যাবে। ব্যর্থতা যদি বলতে হয় তাহলে সেটা হচ্ছে সেই শক্তির, যারা এই জাতীয়তাবাদীর অর্জনটাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে পারত। যারা প্রকৃত দেশপ্রেমিক ও গণতান্ত্রিক, যাদের এক কথায় বামপন্থি বলা যায়। কিন্তু ওই বামপন্থি শক্তি আমাদের দেশে বিকশিত হয়নি। যেটুকু ছিল তার বিপর্যয় ঘটল। তাদের যে সবচেয়ে বড় দল যেটা ছিল মস্কোপন্থি কমিউনিস্ট পার্টি এবং ন্যাপ, তারা আওয়ামী জাতীয়তাবাদীদের সঙ্গে মিশে গেল তাদের সঙ্গে এক হয়ে জোট করল। আর যারা পিকিংপন্থি তারা বিভ্রান্ত। তারা ছিন্নভিন্ন। তারা একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে পারেনি। ওই গ্গ্নানি তাদের মধ্যে আছে, ফলে তারা তখন এবং এখনও পথ খুঁজে পাচ্ছে না। পরবর্তী সময়ে তাদের আবার অন্য যে জাতীয়তাবাদী অর্থাৎ বিএনপি তার সঙ্গে যোগাযোগ হয়ে গেল এবং তারা ক্রমেই সেখানে চলে গেল। ফলে যে শক্তিটা এখানে নেতৃত্ব দিতে পারত আরও অগ্রগমনের জন্য জাতীয়তাবাদী বিজয়ের মুহূর্তটি ধরে সেটাকে গণতান্ত্রিক বিকাশের মাধ্যমে প্রকৃত গণতান্ত্রিক বিকাশের পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারত, যাওয়ার যে কর্তব্য ছিল এ দেশের সমাজতান্ত্রিকদের, তারা সে দায়িত্ব পালন করতে পারেনি। এটা তাদের দিক থেকে আরেকটা ঐতিহাসিক পরাজয় যে, তারা এটা করতে পারল না। ফলে আওয়ামী লীগের ভেতর থেকেই জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল [জাসদ] বেরিয়ে এল। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের নামটার মধ্যেই দেখা গেল যে তারা জাতীয়, মানে সমাজতান্ত্রিক নয় এবং তাদের কোনো স্পষ্ট ধারণা ছিল না, তারা কীভাবে কী করতে চায়। তাদের লক্ষ্যটা ছিল শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়েই আন্দোলন করা। আলাদা দল করেও তারা শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারল না। শেখ মুজিবের মৃত্যুর পর তাদের আর কোনো ভূমিকা রইল না। তারা ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল।
বামপন্থিরা বিভ্রান্ত হয়ে গেছে, তারা দুই দলে ভাগ হয়ে কেউ গেছে আওয়ামী লীগে, কেউ বিএনপিতে। যারা রয়েছে তারাও তাদের ভূমিকা পালন করতে পারছে না। অন্যদিকে আবার সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরে একটা বিরাট ধস নামল সমাজতন্ত্রীদের মধ্যে। আমাদের এখানকার মতো ধস অন্য কোনো দেশে নামেনি। কমিউনিস্ট পার্টি নিজেকে বিলুপ্ত করে দিল। এ রকম সিদ্ধান্ত অন্য কোনো দেশের কমিউনিস্ট পার্টি নেয়নি কমিউনিস্ট পার্টির সম্পত্তি ভাগাভাগি হবে এবং নিজেদের বিলুপ্ত করবে তারপর একদল বলবে যে, তাদের দর্শন ভ্রান্ত ছিল এ রকম ঘটনা আর কোথাও ঘটেনি।
কাজেই স্বাধীনতার পর থেকে পুরো সময়টা আমরা দেখতে পেলাম যে একটা শাসক শ্রেণী এখানে গড়ে উঠল। যে শাসক শ্রেণী পুঁজিবাদী আদর্শ বিশ্বাস করে। কিন্তু পুঁজিবাদ ও গণতন্ত্র একসঙ্গে যাবে না কারণ পুঁজিবাদ বৈষম্য তৈরি করে, আর গণতন্ত্র চায় বৈষম্যহীনতা। গণতন্ত্র চায় সমষ্টিগত কল্যাণ, ব্যক্তিগত মুনাফা নয়। তো যারা এখানে শাসক শ্রেণী, তারা মূলত একই শ্রেণী এবং সবাই পুঁজিবাদে বিশ্বাস করে। সেজন্য দেখা যায় এ দল, ওই দল এর মধ্যে পার্থক্যটা তেমন নেই। আজকে যে লোক এ দলে আছে কালকে ওই দলে যেতে পারে। এদের মধ্যে আসলে মৌলিক কোনো পার্থক্য নেই। যৎসামান্য যা আছে সেটা মৌলিক না। এই যে শাসক শ্রেণী বাংলাদেশকে এখন শাসন করছে তারা মুক্তিযুদ্ধের ওই চেতনাকে, যে চেতনাটাকে বলছি গণতান্ত্রিক সমাজ বা রাষ্ট্র গড়ার চেতনা এবং স্বপ্ন তারা সেটাকে লালন করে না। ক্ষমতা ভোগ করার প্রতিযোগিতায় তারা লিপ্ত। তাদের মধ্যে যে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, সেটা হচ্ছে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। বলেছিলাম ব্যক্তিগত স্বপ্ন ধারণা করার কথা, শাসক শ্রেণীর প্রতিটা ব্যক্তিই এ স্বপ্ন ধারণ করে। ওইখানেই তাদের ঐক্য যে তারা সবাই ধনী হতে চায় এবং ধনী লোকদের একটা শ্রেণী এখানে গড়ে উঠেছে।
মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন ছিল গণতান্ত্রিক মানবিক সমাজের স্বপ্ন; কিন্তু যুদ্ধের পর যারাই ক্ষমতায় এসেছে তাদের দ্বারা সেটা পূরণ হওয়া সম্ভবই ছিল না। কেননা জাতীয়তাবাদীরা সমাজতন্ত্রী হয় না, কারণ তারা সমাজকে এগিয়ে নিতে চায় না। শুধু ক্ষমতার হস্তান্তর চায়। জাতীয়তাবাদীরা সাধারণত ক্ষমতায় রূপান্তর চায় না। যেমন পাকিস্তান আমলে আমরা দেখলাম যে, ইংরেজ চলে গেল, পাকিস্তান শাসকরা ক্ষমতা পেল। তখন আমরা মনে করলাম, পাকিস্তানি শাসকরা কেন ওই জায়গা দখল করে আছে, আমরা ওই জায়গাটা দখল করব। এ জন্য ক্ষমতার হাত বদল হলো, কিন্তু মৌলিক কোনো পরিবর্তন এলো না। সেই আইন, সেই ব্যবস্থা, সেই আমলাতন্ত্র, সেই বাহিনী সবই অক্ষুণ্ন রইল। প্রকৃত অর্থে যেটা ঘটল সেটা ক্ষমতার হস্তান্তর। কাজেই তারা, যারা ক্ষমতার হস্তান্তরে বিশ্বাস করেন তারা তো সমাজতন্ত্রী হবেন না। কারণ সমাজতন্ত্রের মূল কথাটা হচ্ছে_ সমাজ কাঠামোতে মৌলিক পরিবর্তন বৈষম্য দূর করা, মানুষে মানুষে সাম্য তৈরি করা। জাতীয়তাবাদীরা তো ওই লক্ষ্যে ছিলেন না। তারা চাচ্ছিলেন যে ক্ষমতা পাকিস্তানিদের হাতে আছে, পাঞ্জাবিদের হাতে আছে, তারা ওই ক্ষমতাটা নেবেন এবং তারা জনতার সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে ওই ক্ষমতাটা পেয়ে গেলেন। মুক্তিযুদ্ধে জনগণই হচ্ছে চালিকাশক্তি, তারাই সংগ্রাম করেছে, তারাই বঞ্চিত হয়েছে, তাদের খবর কেউ রাখে না। তাদের ত্যাগের কোনো হিসাব নাই। মুক্তির সংগ্রামে এদের অংশগ্রহণ কিভাবে ঘটেছে তার খবর আমরা জানি না। নারী নির্যাতনে ইতিহাস আমাদের জানা নেই। কিন্তু উপরে উপরে কতগুলো মানুষের ভূমিকাকে বড় করে দেখানোর জন্য মিডিয়া চেষ্টা করে, দলগুলো চেষ্টা করে। আওয়ামী লীগ কিন্তু সমাজতন্ত্রের কথা আগে বলেনি, প্রথমে বলে ১৯৭০ সালের নির্বাচনের সময়। এর আগে তাদের মুখে আমরা কখনো সমাজতন্ত্রের কথা শুনিনি। সে সময়ে বলেছে, কেননা সমাজতন্ত্র ছাড়া তখন মানুষ অন্য কিছু শুনতে প্রস্তুত ছিল না। দ্বিতীয়ত হচ্ছে, মওলানা ভাসানী যদি সমাজতন্ত্রের কথা বলেন তাহলে আবার একটা বিভাজন তৈরি হবে। এ জন্য আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে সমাজতন্ত্রের ধ্বনি উচ্চারিত হয়েছিল। কিন্তু সে বিষয়ে তাদের অঙ্গীকার দৃঢ় ছিল না, দৃঢ় থাকা সম্ভবও ছিল না। তাদের সেই ধরনের প্রস্তুতি ছিল না। কাজেই যখন দেশ স্বাধীন হলো, কল-কারখানাগুলো সব রাষ্ট্রীয়করণ হলো, সেখানে দলীয় লোকজনের একটা ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠিত হলো, যারা নিজেদের সেগুলোর মালিক মনে করতে শুরু করল। তারা যন্ত্রপাতি, জমি, সম্পদ সব বিক্রি করে দিয়ে সবকিছুকে নিজেদের সম্পত্তি করার চেষ্টা করেছে।
বাঙালির জাতিসত্তা ও সংস্কৃতির যে স্বীকৃতি তার মূলে আছে মুক্তিযুদ্ধ এবং পৃথিবীতে বাংলাদেশের যে স্থান সেটা আমাদের ওই মুক্তিযুদ্ধের কারণে অর্জিত হয়েছিল। কাজেই এটা হারিয়ে যাওয়ার বিষয় না মোটেই। এটা কেবল যে স্মৃতিতে আছে তাও নয়, আমাদের অভিজ্ঞতার মধ্যে আছে, আমাদের চিন্তার মধ্যে আছে, আমাদের ইতিহাসের মধ্যে আছে।
আমাদের দেশে সমাজতান্ত্রিক প্রস্তুতি একদমই ছিল না। ছিল বাঙালির জাতীয়তাবাদী চেতনা। এই চেতনাটা ছিল ভাষাকেন্দ্রিক। আমরা মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী হলাম। এই যে পরিবর্তন এটা বিরাট সাংস্কৃতিক তাৎপর্য আছে, আমরা জাতীয়তাবাদের ক্ষেত্রে ধর্মকে আর প্রধান উপাদান হিসেবে গ্রহণ করছি না। গ্রহণ করছি ভাষাকে। এবং ভাষা হচ্ছে অসাম্প্রদায়িক, ভাষা ধর্মনিরপেক্ষ, শ্রেণীনিরপেক্ষ। কাজেই আমরা তখন এমন একটা সংস্কৃতিক কথা ভাবছিলাম, যেখানে ধর্মের ভিত্তিতে মানুষে মানুষে বিভাজন থাকবে না ও শ্রেণীর বিভাজন থাকবে না এবং সবারই একটা পরিচয় থাকবে তা হবে বাঙালি পরিচয়। এখানে একটা বিষয় যোগ করব, বাংলাদেশ কিন্তু এক জাতির রাষ্ট্র নয়, এখানে যে ক্ষুদ্র জাতিসত্তা আছে, তাদের আছে ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি। তাদের সংস্কৃতিগুলোকে আমরা বিকশিত হওয়ার সুযোগ দেব এটিই ছিল লক্ষ্য এবং এটিই প্রয়োজন যে তাদের সংস্কৃতিও নিজস্ব উপায়ে বিকশিত হবে।
লেখক : শিক্ষাবিদ প্রাবন্ধিক