Monday, July 27, 2009

মুন্সীগঞ্জে ফুটবল মাঠে সংঘর্ষে খেলোয়াড়সহ আহত ২০

মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার শান্তিনগর গ্রামে ফুটবল খেলার সময় সংঘর্ষে একজন বিদেশি খেলোয়াড়সহ উভয়পক্ষের অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে আছেন- রিয়াজ ও সুদানি ফুটবলার রিচি মরিস। তারা দুজনই পূর্ব নয়াকান্দি শান্তি সংঘ ক্লাবের হয়ে খেলছিলেন।

আহতরা বিভিন্ন চিকিৎসা কেন্দ্র থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন।

গজারিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোজাম্মেল হোসেন জানান, পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এনেছে। তবে এখনও পর্যন্ত এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে তিনি জানান, শান্তিনগর গ্রামে ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনালে চরবাউশিয়া বড়কান্দি ফ্রেন্ডস ক্লাব এবং পূর্ব নয়াকান্দি শান্তি সংঘ ক্লাব খেলছিল।

খেলার ৫৫ মিনিটের সময় রিচি মরিসের গোল করে শান্তি সংঘ এগিয়ে যায়। পরে রিয়াজ আরেকটি গোল করার মুহূর্তে বিপক্ষ দলের খেলোয়ারা তাকে টেনে ধরে। এ নিয়ে দুদলের খেলোয়াড়দের মধ্যে সংষর্ঘ বেধে যায়।

রিচি মরিস দুপক্ষকে শান্ত করতে গেলে বিপক্ষের খেলোয়াড়রা তার উপরও হামলা চালায়। পরে দু’দলের সমর্থকদের মধ্যেও সংঘর্ষ বেধে যায়।

সংঘর্ষকারীরা গোলবার উপড়ে ফেলে এবং পুরস্কার বিতরণের মঞ্চ তছনছ করে বলে ওসি জানান।

ঘটনাস্থল থেকে রাত পৌনে ১০ টায় উপ-পরিদর্শক (এসআই) নাসিম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, খেলাপণ্ড হওয়ায় দু’গ্রামবাসীর মধ্যে এখনও উত্তেজনা বিরাজ করছে। তবে পরিস্থিতি মোকাবেলায় পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।

সাকুরা ফুলের দেশে - ইমদাদুল হক মিলন

Sakuraইমদাদুল হক মিলন
প্রথমবার
পি আর প্লাসিড সাহিত্যপ্রেমী যুবক। বহুদিন হয় সে জাপানে থাকে। বিবেকবার্তা নামে ছোট্ট একটা কাগজ করে। ২০০৪ সালের শুরুর দিকে সে আমার ফ্ল্যাটে এল। সঙ্গে অতি লম্বা, বয়স্ক এক জাপানি ভদ্রলোক আর প্লাসিডের অতি ক্ষুদ্র ছেলেটি। নাম থাইয়ো। তখন থাইয়োর বয়স তিন সাড়ে তিন হবে। কিন্তু চঞ্চলতায় তার বয়স হাজার খানেক। সেদিনের আগে এত চঞ্চল বাচ্চা আমি আর দেখিনি। আধাঘণ্টা খানেকের মধ্যে সমস্ত ফ্ল্যাট তছনছ করে ফেলল। একদিকে থাইয়ো আমার ফ্ল্যাট তছনছ করছে, অন্যদিকে খুবই নির্বিকার ভঙ্গিতে বসে প্লাসিড আমার সঙ্গে কথা বলছে। এপ্রিলে টোকিওতে বৈশাখী মেলা হচ্ছে কয়েক বছর ধরে। জাপানপ্রবাসী বাঙালিরা একত্র হয়ে করে। সেখানে সে একটা বইয়ের স্টল করবে এবং বিবেকবার্তার পক্ষ থেকে আমাকে একটা পুরস্কার দেবে। আমি যেতে রাজি আছি কি না, পুরস্কার গ্রহণে রাজি আছি কি না এটা জানার জন্য তার সপুত্র দেশে আগমন। আমার রাজি না হওয়ার কোনো কারণ নেই।

এপ্রিলের ১৫ তারিখে টোকিও পৌঁছে গেলাম। প্লাসিড আমাকে নিয়ে তুলল টুলুর বাড়িতে। সে থাকে মিকুরা এলাকায়। জাপানি স্ত্রীর নাম ওগাহারা আখিকো। পাঁচ বছর বয়সী ছেলেটির নাম হিরোকি। না, এই বাচ্চাটি শান্ত।
বৈশাখী মেলা ১৭ তারিখে। মাঝখানে একটা ফাঁকা দিন। টুলু আমাকে অমিয়া এলাকায় নিয়ে বিখ্যাত হিকাওয়া জিনজা (টেম্পল) দেখাল। সাকুরা বাগানে নিয়ে গেল। তখনো কোনো কোনো গাছে ফুটে আছে সাকুরা, জাপানের বিখ্যাত ফুল। ছোট এবং বড় করা যায়, সাইতামা এলাকার সিনথোসি স্টেডিয়ামটি হচ্ছে তেমন। টুলু আমাকে সেই স্টেডিয়াম দেখাল। পুরোটা দিন আমরা ঘুরেই কাটালাম। বিকেলের দিকে প্লাসিড এসে যোগ দিয়েছিল।

পরদিন বৈশাখী মেলা। মেলা হচ্ছে ইকেবুকোরো এলাকার নিশিগুচি পার্কে। প্লাসিডের জাপানি বউ ইউকি আমাদের নিয়ে গেল। সঙ্গে থাইয়ো আছে। ছেলেটি এত শার্প, আমার চেহারা মনে রেখেছে। দৌড়ে এসে আমার প্যান্ট টেনে ধরল। ধরল এত আন্তরিক ভঙ্গিতে কিন্তু আমি ভয় পেয়ে গেলাম। যাব্বাবা, টেনে খুলে ফেলবে নাকি!

নিশিগুচি পার্কে বৈশাখী মেলাটি সেবার বিশাল আয়োজনে হলো। জাপানের বিভিন্ন এলাকা থেকে বাঙালিরা এসেছে। টোকিওর মেয়র আছেন। তাঁর সঙ্গে আছে অনেক জাপানি গণ্যমান্য ব্যক্তি। আমাদের রাষ্ট্রদুত আছেন। পরিচয় হলো, কিন্তু তিনি আমাকে পাত্তাই দিলেন না। মনটা একটু খারাপই হলো।

সেবার দুই সপ্তাহ থাকলাম জাপানে। জাপানপ্রবাসী কবি, লেখক, সাংবাদিক, শিক্ষক−অনেকের সঙ্গে পরিচয় হলো। সেবারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো, যেখানে বৈশাখী মেলা হয়, সেই পার্কে একটা শহীদ মিনার তৈরির প্ল্যান করেছে বাঙালিরা। মেয়রের অনুমতির চেষ্টা চলছে। শহীদ মিনারের একটা মডেলও তৈরি করেছেন একজন বাঙালি আর্কিটেক্ট। শহীদ মিনারসংক্রান্ত একটা মিটিংয়ে আমি একদিন ছিলাম। ভাবতে ভালো লাগছিল যে আমাদের ভাষাশহীদদের স্নৃতির উদ্দেশে শহীদ মিনার হবে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম এক শহর টোকিওতে। স্বপ্ন শেষপর্যন্ত স্বপ্নই থেকে যাবে কি না কে জানে। না, আমাদের সেই স্বপ্ন স্বপ্ন থাকেনি। বাস্তবায়িত হয়েছে। টোকিওর ইকেবুকোরো এলাকার নিশিগুচি পার্কে শহীদ মিনার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেই শহীদ মিনারের সামনে গিয়ে দাঁড়ালে নিজেদের জন্য গর্ব হয়।

সেবার ‘বিবেকবার্তা পুরস্কার’ দেওয়া হলো দুপুরবেলা টোকিওর এক রেস্টুরেন্টে। মনজুরুল হকের হাত থেকে নিলাম। একদিন বিকেলবেলা এনএইচকেতে গেলাম। এনএইচকে রেডিওর জন্য মনজু ভাই আমার একটা সাক্ষাৎকার নিলেন। ফেরার সময় প্লাসিড আর আমি হাঁটছি। হেঁটে হেঁটে টোকিওর বিকেল দেখছি। বিশাল এক হোটেলের সামনের ফুটপাত দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি। হোটেলের নাম অ্যানা (অঘঅ)। কেন যে হোটেলটার দিকে তাকিয়ে মনে হলো, এই হোটেলে যদি একটা রাত অন্তত কাটানো যেত! কোনো কারণ নেই, তবু মনে হলো। দ্বিতীয়বার জাপানে গিয়ে এই হোটেলেই আমাকে উঠতে হয়েছিল। আশ্চর্য এক স্বপ্নপূরণ।

তাকেশি কাইকো স্নারক বক্তৃতা
১৯৩০ সালে পশ্চিম জাপানের ওসাকা শহরে জন্েনছিলেন তাকেশি কাইকো। এই লেখক তাঁর লেখালেখির জন্য যতটা বিখ্যাত, তাঁর বলিষ্ঠ রাজনৈতিক অবস্থানের জন্যও ততটাই বিখ্যাত। জাপানি সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ দুই স্বীকৃতি আকুতাগাওয়া সাহিত্য পুরস্কার এবং মায়নিচি সাহিত্য পুরস্কার−দুটোই তিনি বেঁচে থাকা অবস্থায় পেয়েছেন। সমকালীন জাপানি সাহিত্যের তিনি এক সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব। ইয়ুকিউ মিশিমার পরবর্তী প্রজন্েনর ঔপন্যাসিকদের মধ্যে অন্যতম প্রধান হিসেবে তাকেশি কাইকোকে গণ্য করা হয়। ষাটের দশকে সাংবাদিকতার দায়িত্ব পালনের জন্য তিনি ভিয়েতনামে অবস্থান করছিলেন। সে সময় এশীয় ভুখন্ডে মার্কিন আগ্রাসনের যে নগ্ন ছবি দেখেছিলেন তা তাঁকে মার্কিনবিরোধী অবস্থানের দিকে নিয়ে যায়। ভিয়েতনামের সেই অভিজ্ঞতার আলোকে অনবদ্য এক উপন্যাস রচনা করেন। উপন্যাসের নাম ওঘঞঙ অ ইখঅঈক ঝটঘ. এ উপন্যাস পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় অনুদিত হয়ে বোদ্ধা পাঠকের ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করে। তাকেশি কাইকো মৃত্যুবরণ করেন ১৯৮৯ সালে। ঔপন্যাসিক, গল্পকার, সমালোচক ও টিভিব্যক্তিত্ব কাইকো ওসাকা ইউনিভার্সিটি থেকে আইনশাস্ত্রে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন। শুরুর জীবনে কিছুকাল আইনের পেশায় যোগ দিলেও এই পেশায় তিনি থাকেননি। পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন সাংবাদিকতা। সাংবাদিকতা এবং সৃজনশীল সাহিত্য রচনাই ছিল মৃত্যুপর্যন্ত তাঁর প্রধান কাজ। পৃথিবীর ৪০টির মতো দেশ তিনি ভ্রমণ করেছেন। সেসব দেশের অধিকাংশই এশিয়া মহাদেশের। জাপানের বাইরে ওই সব দেশের পটভুমিতে তিনি রচনা করেন বেশ কিছু উপন্যাস। ফলে দেশগুলোর সঙ্গে গড়ে ওঠে তাঁর নিবিড় সম্পর্ক।
জাপান ফাউন্ডেশন জাপানের খুবই গুরুত্বপূর্ণ এক প্রতিষ্ঠান। তাকেশি কাইকোর মৃত্যুর পর তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে জাপান ফাউন্ডেশনকে বড় রকমের একটা অঙ্কের টাকা দেওয়া হয়। সেই টাকা থেকে বছরে একবার জাপান ফাউন্ডেশন আয়োজন করে ‘তাকেশি কাইকো মেমোরিয়াল এশিয়ান রাইটার্স লেকচার সিরিজ’। এশিয়ার কোনো এক দেশের একজন লেখককে আমন্ত্রণ জানায় জাপান ফাউন্ডেশন। সেই লেখক জাপানে গিয়ে তাঁর দেশের সাহিত্য এবং নিজের লেখা নিয়ে চারটা বক্তব্য দেন। বক্তব্যগুলো তিনি তাঁর নিজের ভাষায় লিখে জাপান ফাউন্ডেশনকে পাঠিয়ে দেন। ফাউন্ডেশন সেই বক্তব্য জাপানি ভাষায় অনুবাদ করে। লেখক তাঁর নিজের ভাষায় বক্তৃতা করেন, পাশে বসে একজন জাপানি ভাষার এক্সপার্ট সেই বক্তৃতার জাপানি অনুবাদ পাঠ করেন। ২০০৫ সালের জন্য বাংলাদেশকে নির্বাচন করে জাপান ফাউন্ডেশন। আর লেখক হিসেবে নির্বাচন করে আমাকে। ঢাকায় আমাকে আমন্ত্রণ জানাতে এলেন প্রফেসর কিউকো নিওয়া এবং মিস্টার মাসাকি হিরানো। ২০০৫ সালের বক্তব্য দিতে আমি জাপানে গেলাম ২০০৬-এর মার্চে। প্রথম বক্তৃতা হলো হিরোশিমা ইন্টারন্যাশনাল সেন্টারে। সেন্টারের পাশেই অ্যানা (অঘঅ) হোটেল। সেই হোটেলেই তোলা হলো আমাকে। ফাউন্ডেশন থেকে আমাকে একজন গাইড দিয়েছে। কচুর ডগার মতো নরম এক বাঙালি যুবক। নাম সুমন্ত ঘোষ। আরেক বাঙালি যুবক এবং শান্তিনিকেতনে পড়াশোনা করা প্রায় বাঙালি এক জাপানি ভদ্রমহিলাকে নিয়ে সুমন্ত আমাকে হিরোশিমা এয়ারপোর্টে রিসিভ করতে এল। তারিখ ১০ মার্চ ২০০৬।

হিরোশিমায় নেমে আমার গা কাঁটা দিয়ে উঠেছিল। এই সেই হিরোশিমা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে, ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট সকাল আটটা ১৫ মিনিটে পৃথিবীর প্রথম আণবিক বোমা নিক্ষিপ্ত হয় এই শহরে। মুহুর্তে পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল শহরের অধিকাংশ দালানকোঠা, নিহত হয় এক লাখ ২০ হাজার লোক, পরে প্রাণ হারায় তার দ্বিগুণ।

অ্যানা হোটেলের খুব কাছে সেই জায়গা, যেখানে নিক্ষিপ্ত হয়েছিল আণবিক বোমা। হেঁটে যেতে কয়েক মিনিট লাগে। হোটেলে লাগেজ রেখেই বেরিয়ে গিয়েছিলাম। এলাকাজুড়ে ‘পিস মেমোরিয়াল পার্ক’। ১৯৫৫ সালে এখানে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে ‘হিরোশিমা পিস মেমোরিয়াল মিউজিয়াম’। পৃথিবীর লাখ লাখ মানুষ এই মিউজিয়াম দেখতে আসে, আণবিক বোমার ভয়াবহতার কথা মনে করে হিরোশিমা ট্র্যাজেডির জন্য এখনো চোখের পানি ফেলে। শিশুরা পিস মনুমেন্টের সামনে দাঁড়িয়ে স্তব্ধ হয়ে থাকে। হিরোশিমা পিস মেমোরিয়াল পার্কে ঘুরতে ঘুরতে আমার মনে পড়েছিল আমার দেশের কথা। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের কথা। স্বজন হারানোর বেদনায় আমার বুক ভারী হয়েছিল।

পিস মেমোরিয়াল পার্কের এক পাশে দাঁড়িয়ে আছে চারতলা এক পুরোনো বাড়ির কঙ্কাল। সুমন্ত বলল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বাড়িটা ছিল পাবলিক লাইব্রেরি। আণবিক বোমার আঘাতে পুরো এলাকা ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর শুধু এই বাড়িটা এভাবে দাঁড়িয়ে ছিল। গা থেকে খসে পড়েছে আস্তরণ, দাঁড়িয়ে আছে শুধু কঙ্কাল। আমি সেই বাড়ির সামনে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকি।

পরদিন বক্তৃতা। প্রফেসর কিউকো নিওয়া এবং মিস্টার মাসাকি হিরানোর সঙ্গে টোকিও থেকে এসেছেন আনোয়ার জাহিদ। তিনি এনএইচকেতে কাজ করেন। আমার বক্তৃতার জাপানি অনুবাদ করেছেন। অসম্ভব সুন্দর কন্ঠের অধিকারী। স্টেজে বসে আমি এক প্যারা করে বক্তৃব্য পাঠ করি, আনোয়ার জাহিদ সঙ্গে সঙ্গে সেই এক প্যারার জাপানি অনুবাদ পড়েন। মিলনায়তন ভর্তি জাপানি লেখক, প্রকাশক, প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিক এবং হিরোশিমার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহিত্যের ছাত্রছাত্রী। বক্তৃতার আগে মাসাকি হিরানো আমার হাতে একগাদা টাকা ধরিয়ে দিয়েছেন। প্লেনের টিকিট আগেই আমাকে ঢাকায় পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। হোটেলের খরচ ইত্যাদি সবই বহন করছে জাপান ফাউন্ডেশন। এর বাইরে প্রতিদিনকার হাতখরচের টাকা দিচ্ছে, বক্তৃতার জন্য দিচ্ছে। প্রতিটি বক্তৃতার জন্য আমাকে একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দেওয়ার কথা। কিন্তু চারটি বক্তৃতা আমি লিখিনি। লিখেছি একটি। যেহেতু বক্তৃতার জায়গা ভিন্ন ভিন্ন, শ্রোতা ভিন্ন ভিন্ন, সুতরাং একটি বক্তৃতাই আমি পাঠ করব। এদিক দিয়ে আমার কিছুটা লস হয়ে গেল। চারটি ভিন্ন বক্তৃতা লিখলে তিন গুণ বেশি টাকা পাওয়া যেত। আর জাপানে থাকা অবস্থায় মারাটারা গেলে আমার পরিবার পেত বিশাল অঙ্কের টাকা। জাপান ফাউন্ডেশন আমার ইন্স্যুরেন্স দিয়েছিল ৩০ মিলিয়ন ইয়েনের। আর চমৎকার একটা স্যুভেনির বের করেছিল আমাকে নিয়ে।

চার দিন ছিলাম হিরোশিমায়। এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছি আর আমার শুধু মনে পড়ছে এই শহরের সেই ভয়ঙ্কর ট্র্যাজেডির কথা। এখনো সেই ভয়াবহ স্নৃতি নিয়ে বেঁচে আছেন কিছু মানুষ। আণবিক বোমার হাত থেকে বেঁচে যাওয়া সেসব মানুষকে বলা হয় ‘হিবাকুশা’। আণবিক বোমা হামলার সময় হিরোশিমা শহরের লোকসংখ্যা ছিল দুই লাখ ৫৫ হাজার। বোমাটির ওজন ছিল ৬০ কেজি। যে বিমানটি বোমা বহন করছিল তার নাম ‘এনোলা গে’। বোমাটির নাম ‘লিটল বয়’। বিমানের কমান্ডার কর্নেল পল টিবেটস। ১৯৪৫ সালের ৫ আগস্ট টিবেটস আনুষ্ঠানিকভাবে ৪৪-৮৬২৯২ নম্বরের বোমারু বিমানটির নামকরণ করেন ‘এনোলা গে’। ‘এনোলা গে’ ছিল তাঁর মায়ের নাম। টিবেটসের নানার একটি প্রিয় উপন্যাসের নায়িকার নাম ছিল ‘এনোলা গে’। উপন্যাসের নায়িকার নামে মেয়ের নাম রেখেছিলেন ভদ্রলোক। ভুপৃষ্ঠ থেকে দুই হাজার ফুট উঁচুতে ১৩ কিলোটন শক্তিতে বিস্কোরিত হয় ‘লিটল বয়’। হিরোশিমা শহরের কেন্দ্রস্থলে, যেখানে বিস্কোরিত হয় বোমা, সেই জায়গাটিকে বলা হয় ‘এ বোম্ব ডোম’। বোমা বিস্কোরণের পর ‘এনোলা গে’র কো-পাইলট রবার্ট লুই দেখতে পেলেন একটি বিশাল ছাতার মতো ভয়ঙ্কর ঘন মেঘে হিরোশিমা ঢাকা পড়ে গেছে। শহরটি ফুটছে, ঝলসে যাচ্ছে। এই দৃশ্য দেখে তিনি আপন মনে বলে উঠলেন, ‘হায় ঈশ্বর, আমরা এ কী করলাম!’

সাওরির সঙ্গে দেখা হলো ১৪ মার্চ ২০০৬। টোকিওর হানেদা এয়ারপোর্টে সে আমাকে রিসিভ করতে এসেছে। পুরো নাম সাওরি তাকাহাসি। বয়স ২৭ বছর। জাপান থেকে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য পড়তে এসেছিল। ফজিলাতুন্নেসা মুজিব হলে থাকত। পড়াশোনা শেষ না করেই জাপানে ফিরে গিয়েছিল। চমৎকার বাংলা বলে, চমৎকার রবীন্দ্রসংগীত গায়। সামান্য আনন্দেই শিশুর মতো হাততালি দেয়। আমার বাকি তিনটি বক্তৃতা হবে টোকিও, ওসাকা ও সেন্দাইতে। হাতে সময় ১০ দিন। এই ১০ দিন ২৪ ঘণ্টা সাওরি আমার সঙ্গে। এই তিন জায়গায় সে আমার গাইড। সাওরি এনএইচকেতে কাজ করে। দেখা হওয়ার মুহুর্তেই সাওরির সঙ্গে আমার ভাব হয়ে গেল। হানেদা থেকে ট্রেনে করে টোকিওর সেই আনা হোটেলে যাচ্ছি। ফাঁকা কামরায় আমি আর সাওরি; সাওরি আমাকে রবীন্দ্রসংগীত গেয়ে শোনাল−‘বড় আশা করে এসেছি গো কাছে ডেকে লও’।

প্রথমবার টোকিওতে এসে আমি অনেক কিছুই দেখেছিলাম। যেমন ‘টোকিও টাওয়ার’ ‘রূপপুঙ্গি হিলস’। সাওরি আমাকে দেখাল ‘মুরি আর্ট মিউজিয়াম’ ‘মেইজি জিইনগু’ (মন্দির)। ১৫ মার্চ বেলা তিনটায় জাপান ফাউন্ডেশন ভবনের নিজস্ব অডিটরিয়ামে বক্তৃতা। মিলনায়তন ভর্তি দর্শক-শ্রোতার মধ্যে তিন-চারজন মাত্র বাঙালি। মনজু ভাই, প্লাসিড, এমদাদ। কিন্তু সেদিন জাপানি রীতিনীতি ভেঙে বক্তৃতা শুরু করতে হলো পাঁচ মিনিট দেরিতে। কী কারণ? মাসাকি হিরানো হাসিমুখে বললেন, ‘তোমাদের রাষ্ট্রদুত সাহেব আসবেন। তিনি অনুরোধ করেছেন, পাঁচ মিনিটের মধ্যে এসে পৌঁছাবেন। তিনি এলে যেন বক্তৃতা শুরু হয়।’ আমি একটু বিরক্তই হলাম। এই সেই ভদ্রলোক, বৈশাখী মেলায় আমাকে পাত্তাই দেননি। ভদ্রতা করেও একটি কথা বলেননি। যা হোক, পাঁচ মিনিট পরে আমি মিলনায়তনে ঢুকলাম। সঙ্গে সঙ্গে আমার সম্মানে উঠে দাঁড়ালেন মিলনায়তন ভর্তি মানুষ। প্রথম সারিতে দাঁড়িয়ে আছেন আমাদের রাষ্ট্রদুত। তাঁর পাশে পরবর্তীকালে বাংলাদেশে যিনি জাপানি রাষ্ট্রদুত সেই ভদ্রলোক। আমি দুজনকেই অভিবাদন জানালাম। বলতে লজ্জা লাগছে, তবু বলি, পরবর্তীকালে বাংলাদেশে জাপানি রাষ্ট্রদুত ভদ্রলোক আমার বক্তব্য শুনে এতটা মুগ্ধ হলেন, আমার সঙ্গে হ্যান্ডশেক করার সময় উচ্ছ্বসিত গলায় বললেন, ‘আরে, তোমার তো… প্রাইজ পাওয়া উচিত।’ সাওরি আমার পাশে দাঁড়িয়ে হাততালি দিচ্ছিল।
সাওরি আমাকে টোকিওর এক সাকুরা বাগানে নিয়ে গিয়েছিল। তিন-চার ঘণ্টা সেই ফুলের বনে আমরা ঘুরে বেড়ালাম। একদিন জাপানের ঐতিহ্যবাহী কাভুকি নাটক দেখাল। সেই রাতে বসন্তের হাওয়া বইছিল পুব দিক থেকে। সাওরি বলল, এই হাওয়াকে জাপানি ভাষায় বলে ‘সুমপু’।

টোকিও থেকে ওসাকা গিয়েছিলাম ‘সিনকেনসেন’-এ। মানে বুলেট ট্রেনে। সেই পথে দেখা হলো ‘ফুজি মাউনটেন’। জাপানিরা শ্রদ্ধা করে বলে ‘ফুজি সান’। তারিখ ১৭ মার্চ ২০০৬। আমার শেষ বক্তৃতা ছিল ‘সেনদাই’তে। সেনদাই লিটারারি মিউজিয়ামে। সেখানে ঢুকেই দেখি নুরজাহানসহ আমার অনেক বই সাজিয়ে রাখা। আর দেয়ালে রবীন্দ্রনাথের বিশাল এক ছবি। আমাকে দেখে বেশ একটা সাড়া পড়ল দর্শক-শ্রোতাদের মধ্যে। একজনও বাঙালি নেই, সবাই জাপানি। আমার সঙ্গে ছবি তোলার জন্য ভালো রকম ব্যগ্র দেখলাম তাদের। সাওরি দুরে দাঁড়িয়ে শুধু মিটিমিটি হাসে। এই মেয়ে আমাকে ‘কিয়োটো’ নিয়ে গিয়েছিল। কিয়োটো জাপানের প্রাচীনতম এক শহর। মন্দিরের শহর। ওই শহরে দার্শনিকদের হাঁটার জন্য আলাদা একটা রাস্তা আছে, রুপার মন্দির আছে, সোনার মন্দির আছে। সাওরি আমাকে ঘুরে ঘুরে সব দেখাল। সেবার জাপানে সাওরির সঙ্গে ১০টি দিন আমার জীবনের শ্রেষ্ঠতম সময়।

তৃতীয়বার

২০০৮ সালের আগস্টে আবার গিয়েছি জাপানে। সেবার শুধু টোকিওতেই। জাপানে প্রচুর বিক্রমপুরের লোক। বিক্রমপুর সোসাইটি খুবই নামকরা সংগঠন। তাদের অভিষেক অনুষ্ঠানের পাশাপাশি আমাকে ‘রাইটার্স অ্যাওয়ার্ড’ দেওয়া হবে। সেই অ্যাওয়ার্ড নিতে গেছি। এমদাদ নামে আমার এক প্রিয়ভাজন অন্য একটি মেলার আয়োজন করেছে। সেই মেলায়ও আমি প্রধান অতিথি। প্রথমে এমদাদের অনুষ্ঠান। তার সঙ্গে থাকলাম চার দিন। তারপর বিক্রমপুর সোসাইটির অনুষ্ঠান। সোসাইটির সভাপতি নুর আলী আমাকে নিয়ে তুলল অন্য হোটেলে। ঢাকা থেকে কিছু নাচ-গানের শিল্পী, অভিনয়শিল্পীও এসেছেন এই অনুষ্ঠান উপলক্ষে। দেলোয়ার নামে আমার অতিপ্রিয় একটি ছেলে সারাক্ষণ আমার সঙ্গে। সেবারের ভ্রমণে দিনগুলো কেটেছিল বিক্রমপুরের ছেলেদের সঙ্গেই, খুব আনন্দে।

আপাতত শেষবার
আবার সেই পি আর প্লাসিড। ২০০৯ সালের বৈশাখী মেলা উপলক্ষে প্লাসিড প্রথমবারের মতোই আমার একক বইয়ের স্টল করল। দ্বিতীয়বারের মতো ‘বিবেকবার্তা পুরস্কার’ দিল আমাকে। আমার হাতে পুরস্কার তুলে দিলেন মিসেস ক্যাথরিন মারিনো। ‘ফরেন করেসপনডেন্টস ক্লাব অব জাপান’-এর প্রেসিডেন্ট তিনি। ইকেবুকোরো নিশিগুচি পার্কের যেখানটায় আমাদের শহীদ মিনার, তার প্রায় লাগোয়া একটি মিলনায়তনে এক মনোরম সন্ধ্যায় ক্যাথরিন আমার হাতে এই পুরস্কার তুলে দিলেন। তিনি আমেরিকান, স্বামী জাপানিজ। ভদ্রমহিলা যতটা জাঁদরেল, ভদ্রলোকটি ততটাই নম্র। স্ত্রীর প্রতিভায় খুবই মুগ্ধ ভদ্রলোক। দেশে ফিরে দেখি প্রতিটি ইংরেজি দৈনিকে ক্যাথরিন আমার হাতে পুরস্কার তুলে দিচ্ছেন এই ছবি ছাপা হয়েছে।

জাপানে এক বক্তৃতায় দেশটিকে বলেছিলাম ‘আমার দ্বিতীয় দেশ’। বলার কারণ হচ্ছে, বাংলাদেশের বাইরে এই একটি মাত্র দেশ, চারবার গিয়েছি সেই দেশে, চারবারই সাহিত্যের জন্য কোনো না কোনোভাবে সম্মানিত হয়েছি আমি। তাকেশি কাইকো স্নারক বক্তৃতার মতো বিশাল সম্মান জুটেছে। সুতরাং জাপানের কাছে আমার ঋণ অনেক।

এবার সাওরির সঙ্গে দেখা হয়নি। সাওরির বিয়ে হয়ে গেছে। স্বামীর সঙ্গে সে এখন ওসাকায়। ফোনে কথা হয়েছে। ফেরার সময় খুব মনে পড়ছিল তার কথা। কিয়োটোর সোনার মন্দিরে সে আমাকে নিয়ে গিয়েছিল। মন্দিরের সামনে দাঁড়িয়ে আমার মনে পড়েছিল রবীন্দ্রনাথের সেই বিখ্যাত গান−

আজি বাংলাদেশের হূদয় হতে কখন আপনি
তুমি এই অপরূপ রূপে বাহির হলে জননী!
ওগো মা, তোমায় দেখে দেখে আঁখি না ফিরে! তোমার দুয়ার আজি খুলে গেছে সোনার মন্দিরেু

http://www.munshigonj.com/MGarticles/Milon/2009/SakuraMilon.html

মাওয়ায় যানজটে যাত্রীর মর্মান্তিক মৃত্যু

ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কে মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার মাওয়া ফেরিঘাটে যানজটে আটকা পড়ে আনোয়ার হোসেন আনু (৫৫) নামের এক যাত্রী বাসেই মৃত্যুবরণ করেছেন। গতকাল শুক্রবার বেলা ১২টার দিকে মাওয়া ৩ নম্বর ফেরিঘাটে এই মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটে। ঝালকাঠির বাদলকাঠি এলাকার মুদি ব্যবসায়ী আনু ঢাকায় মেয়ের বাসায় বেড়ানো শেষে বাড়ি ফিরছিলেন। কিন্তু পথেই তিনি হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। মাওয়া ফেরিঘাট কর্তৃপক্ষ জানায়, একটি ফার্মেসি থেকে একজন চিকিৎসক আনা হলেও বাসের ভেতরই তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।

মুন্সীগঞ্জ ফুটবল লীগে সমাবেশ জয়ী

জেলা ফুটবল লীগে সমাবেশ ক্লাব জয় পেয়েছে। গতকাল মুন্সীগঞ্জ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত খেলায় তারা ৫-০ গোলে অনির্বান যুব সংঘকে হারিয়ে দেয়। বিজয়ী দল প্রথমার্ধে ৩ গোলে এগিয়ে ছিল।

‘ভালোটাই টিকে থাকবে’ আশাবাদী একজন মানুষ আব্দুল কাদের

Best-Actor-awardবাংলা নাটকের স্বর্ণযুগ বলতে আসলে কোন সময়টাকে বোঝায় এখনই তা বলা কঠিন। তবুও একটা সময় ছিল যখন ঘরে ঘরে টেলিভিশন ছিল না, গ্রামেগঞ্জে বিদ্যুৎ ছিল না, তবুও মফস্বলের মানুষ ব্যাটারি জোগাড় করে, একটা সাদাকালো টেলিভিশনের সামনে মাদুর পেতে জটলা করে বসে দেখত বাংলা নাটক। মনে পড়ে সেই দিনগুলোর কথা যখন বাকের ভাই আর বদি ভাইকে ঘিরে চলতো তুমুল আড্ডা আর আলোচনা। আলোচিত সেই বদি ভাই বর্তমান, অতীত আর ভবিষ্যতের নাটক ও ব্যাক্তিগত জীবনের কথা বলেছেন জলছবির কাছে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আব্দুল্লাহ্ নূহ

নাটকে আপনার বর্তমান ব্যস্ততা দিয়েই শুরু করি…

আব্দুল কাদের : আসলে ব্যস্ততার ব্যাপারটা ব্যক্তির ওপর নির্ভর করে। কম-বেশি ব্যাপারটা আমি হিসাবে ধরি না। আমার তিরিশটা নাটক যদি এক মাসে যায় এবং সেগুলো একটাও মনে রাখার মতো না হয় তবে কোনো ভালো কিছু হলো বলে আমি মনে করি না। আবার মাসে যদি মাত্র একটা নাটক যায় এবং সেটি হিট হয় তবে আমি মনে করি ওই একটি কাজই আমি হিসাবের মধ্যে ধরি। সংখ্যা নয়, আমি মানে বিশ্বাস করি।

এখন নাটকের ব্যাপারটা আমার কাছে কেমন যেন এলোমেলো মনে হয়। অসংখ্য নাটক হচ্ছে। এর মধ্যে পজেটিভ নাটক যে হচ্ছে না, তা নয়। কিন্তু একশটার মধ্যে সেই সংখ্যা দশটা হয়। তবে সেই দশটা কখন হয় তা অনেকে জানে না। তবে আমি ভালো নাটক করার মানসিকতা রাখি, করছি এবং সামনে আরও করব।

আপনি বলছিলেন যে, নাটকে আসার সময়টা জানতে চায় সবাই। কিন্তু এই বিষয়টিই আমি যদি একটু ভিন্নভাবে জানতে চাই যে, নাটকে আসার গল্পটা যদি বলেন?

আব্দুল কাদের : স্কুলজীবনে নাটক করেছি। সেটা অনেকেই করে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই আমার আসলে নাটক করা শুরু। এবং আমরা নাটক আসলে পেশাগতভাবেই শুরু করেছিলাম। আমরা নাট্যচক্র করেছি। আমি মহসীন হলের নাট্যসম্পাদক ছিলাম। সব হল মিলে আমরা নাট্যচক্র করি এবং স্বাধীনতাউত্তর খুব ভালো নাটক করি। সেলিম আল দ্বীন, আল মনসুর তখন লিখতেন। তারপর থিয়েটারে জয়েন করি। আব্দুল্লাহ্ আল মামুন, রামেন্দু মজুমদার তাদের সঙ্গে কাজ শুরু করি। এবং আমি একেবারে ছোট চরিত্র ভূমিকা থেকে শুরু করেছি। সেখান থেকে কাজ শুরু করে ধীরে ধীরে নিজের উত্তরণ ঘটিয়েছি। পরিচালক আব্দুল্লাহ্ আল মামুনের চোখে পড়ি। তখন এমন হয়েছে যে, আমাকে হিসাবে রেখে নাটকের স্ক্রিপ্ট করা হতো। সেভাবে আমি মঞ্চে কাজ করতে করতে এসেছি। আমি শিখে এসেছি। আর নাটকের শিক্ষা তো মঞ্চেই হয়।

আমার নাটকে আসার গল্প বলতে এটাই যে, অন্তরের তীব্র আকাক্সক্ষা। নাটকের প্রতি আকর্ষণ, সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধ। নাটক তো শুধু বিনোদন নয়, নাটক সমাজের দর্পণ। নাটকের মাধ্যমে সমাজে মেসেজ পৌঁছে দেয়া হয়।

এখানে একটা কথা এসেছে যে, আপনাকে ধরে নাটকের স্ক্রিপ্ট লেখা হতো। এ ব্যাপারটা আসলে কেন? অর্থাৎ ঠিক কোন চরিত্রটায় আপনাকে বিবেচনা করা হতো?

আব্দুল কাদের : আমার মনে হয় একটা জিনিস নাট্যকাররা আমার মধ্যে খুঁজে পান। সেটা হলো যে, আমি নাটকে কখনো অভিনয় করি না। আমি চরিত্রটাকে চিত্রায়ণ করি। এই যেমন এখন আপনার সঙ্গে কথা বলছি, এটাও একটা চরিত্র। এখানে আমি যদি অভিনয় করি বাস্তবতা বাদ দিয়ে, সেটা মেকি হয়ে যাবে। এভাবে আমি সব সময় রাস্তায় চলতে চলতে সমাজের বিভিন্ন চরিত্র অবলোকন করি। বিভিন্ন জায়গায় যাচ্ছি, বিভিন্ন রকম মানুষের সঙ্গে মিশছি। সব চরিত্র লক্ষ্য করি এবং সময়মতো কাজে লাগিয়ে দিই।

এবারে একটু ব্যক্তিগত প্রসঙ্গে আসি। পরিবারের সদস্য কয়জন?

আব্দুল কাদের : আমার স্ত্রী খায়রুন কাদের। তিনি গৃহিণী, বিউটিশিয়ান ও অভিনেত্রী । আমার এক পুত্র, এক কন্যা। পুত্রের নাম শফিউল আজম, কন্যার নাম মেহেরুন নাহার। পুত্র-কন্যা দুজনেই নিজ নিজ পেশায় নিয়োজিত।

আপনার পরিবারের সদস্যরা আপনার নাটকগুলোর চরিত্র নিয়ে কি মন্তব্য করে?

আব্দুল কাদের : ওরা খুব মজা পায়। বসে বসে দেখে আর হাসে। কারণ আমার তো দুইটা ভূমিকা। একটা হচ্ছে অফিসে আমার একটা রোল। এখানে একজন এক্সিকিউটিভ আমি। গম্ভীর হয়ে থাকতে হয়। আর অভিনয়ে আরেকরকম। এটা আসলেই মজার ব্যাপার।

এখানে অফিসের অর্থাৎ আপনার চাকরিজীবনের প্রসঙ্গ এলো। সেটা নিয়ে একটু কথা বলি, বাটাতেও তো অনেক বড় দায়িত্ব পালন করছেন, এ সম্পর্কে যদি কিছু বলেন…

আব্দুল কাদের : বাটাতে আমি যোগ দিই ১৯৭৯ সালে। তারপর ধাপে ধাপে আমি ওপরে উঠি। রিটেইল জোন ম্যানেজার, রিটেইল ম্যানেজার এভাবে মার্কেটিং ম্যানেজার, তারপর এখন কনসালট্যান্ট বিজনেস ডেভেলপমেন্ট। এমনকি আমার অবসর হয়ে গেছে ৩০ মার্চ ২০০৯তে। তারপরও ওরা আমাকে অনেক সম্মান দিয়ে রেখেছে। আমি একদিনও অবসর নিতে পারিনি। যেদিন রিটায়ারমেন্ট হয়েছে তারপর দিন থেকেই আবার অফিস করছি।

বাংলাদেশে এই কোম্পানিটাকে যে অনেকটা আমিই গড়ে তুলেছি। বাটা বাজার, বাটা শপÑ এগুলো সব আমার লিডারশিপে করা। সব মিলিয়ে আমি আমার অফিসিয়াল কাজটিকে খুব এনজয় করি। এবং আমি চাই আমার কোম্পানি আরও ভালো করুক।

আগে কোনটা হয়েছিল? চাকরি না নাটক?

আব্দুল কাদের : আমি ১৯৭৩ সাল থেকে নাটক করি। ১৯৭৬ সালে বিটপিতে জয়েন করি। ১৯৭৯ তে বাটাতে আসি। কাজেই সবার আগে আমি নাটক শুরু করি। কিন্তু আমি দুটোই চালিয়ে গেছি এবং যাচ্ছি। এ ব্যাপারে অনেকেই অনেক সময় প্রশ্ন করে যে, আপনি সময় পান কখন?

এখানে আমি আসলে যেটা করি তা হলো, আমি অনেক পরিকল্পনা করে কাজ করি। যেটা আমার পরিকল্পনার ছকের মধ্যে পড়ে না সেটা আমি করি না। যেমন শুটিংয়ের কাজ করি শুক্র-শনিবারে। আর অন্য সময় যদি বিশেষ দরকার হয় তবে আমি ছুটি নিই কোম্পানি থেকে। কোম্পানি আমাকে সেই সহযোগিতা করে।

আবার পরিচালক ও অভিনেতা-অভিনেত্রীরা আমাকে খুব সহযোগিতা করে। তারা জানে যে, আমার সময় কম। তাই তারা আমার শটগুলো আগে নিয়ে সহযোগিতা করে।

আপনাকে তো বাটা ছাড়ছে না। বাটার জন্য তাহলে আপনারও নিশ্চয় বিশেষ পরিকল্পনা আছে?

আব্দুল কাদের : বাটার জন্য আমি যেটা করছি যে, ব্যবসার সমৃদ্ধিতে কাজ করা, আরও বাটা বাজার এবং বড় বড় বাটার দোকান করা, তারপর হাশ পাপিস। বাংলাদেশে বিশেষভাবে মার্কেটিং করছি আমরা। এমনিতে বাটার দোকানে বিক্রি করতামই আমরা, এখন হাশ পাপিসের আলাদা এক্সক্লুসিভ শোরুম করছি। গুলশানে একটা করেছি, বসুন্ধরা মলে একটা করেছি এবং ২০১১ সালের মধ্যে ২০টা হাশ পাপিস স্টোর করার পরিকল্পনা করেছি। আমরা বড় আকারের দোকান করব। বসুন্ধরা মলে যেমন করেছি ৭তলায় ১২ হাজার বর্গফুট জায়গা নিয়ে। যমুনা মলে চেষ্টা করছি। এভাবে বড় আকারের দোকান করার চেষ্টা করছি। যাতে ভালো ইমেজটা ধরে রাখা যায়। ব্র্যান্ড নিয়ে কাজ করছি। এগুলো প্রফেশনাল মার্কেটিং এপ্রোচ।

হাশ পাপিস তো ইন্টারন্যাশনাল ব্র্যান্ড?

আব্দুল কাদের : হ্যাঁ, এটা আমেরিকান কোম্পানি। বিশ্বের প্রায় ১০০টি দেশে তারা মার্কেটিং করে। বাংলাদেশে আমরা লাইসেন্সপ্রাপ্ত।

আবার একটু নাটকে আসি। নাটক নিয়ে আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?

আব্দুল কাদের : ভালো নাটক করার মানসিকতা তো আছেই। তবে আমার একটা পরিকল্পনা আছে। এমন একটা সিরিয়াল করতে চাই যেটা মানুষকে খুব আনন্দ দেবে। কারণ আনন্দ দেয়াটা খুব কঠিন কাজ। আমি অনেক নাটকেই দেখেছি আনন্দ দেয়ার চেষ্টা করা হয় কিন্তু হয় না। কারণ এটা একটা বিশেষায়িত ব্যাপার, যা সবাই পারে না। সে জায়গাটায় আমার যে অভিজ্ঞতা ও পরিচিতি আছে তার মাধ্যমে আমি জানি যে, আমার নিজস্ব উদ্যোগে নিজের প্রোডাকশনে আমাকেই করতে হবে। এ রকম একটা পরিকল্পনা আমার আছে।

এ যাবৎ আপনার অভিনীত চরিত্রগুলোর মধ্যে আপনার কাছে কোন চরিত্রটা সেরা বলে মনে হয়?

আব্দুল কাদের : আমি চোখ বন্ধ করে বলতে পারি, টেলিভিশনে ‘কোথাও কেউ নেই’-এর বদি ভাই। এ ছাড়াও আমি অনেক ভালো নাটক করেছি। যেমন, আব্দুল্লাহ আল মামুনের অনেক নাটক, হুমায়ূন আহমেদের, ফেরদৌস হাসান, ডিএ তায়েব, ইমদাদুল হক মিলন ও আরও অনেক নাট্যকারের নাটক করেছি। কিন্তু ওই নাটকটা মানুষের মনে দাগ কেটে গেছে আরকি।

মঞ্চেও আমি অনেক নাটকই করেছি কিন্তু মেরাজ ফকিরের মা নাটকটা আমার কাছে মনে হয়েছে বেশি ইম্প্যাক্ট ফেলেছে। চলচ্চিত্র আমি বেশি করিনি। কিন্তু রং নাম্বার নামে একটা সিনেমায় অভিনয় করেছি। সেখানে আমার চরিত্রটা ছিল ‘বড় ভাই’-এর। কিছু বড় ভাই থাকে না যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকে। কখনো বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে যায় না। সবার সহযোগিতায় এগিয়ে যায় এবং সহযোগিতা করতে গিয়ে নানারকম মজার ঝামেলা সৃষ্টি করে ফেলে। সেটা ছিল একটা মজার চরিত্র। এ রকম অনেক ভালো কাজ করেছি।

এমন কিছু মুখ থাকে যা দেখলেই মনের মধ্যে এক ধরনের প্রশান্তি চলে আসে, এমন কিছু মুখ থাকে যেগুলো এমনিতেই যেন মনের মধ্যে খুশি ছড়িয়ে দেয়, আনন্দ লাগে। দর্শক আপনার মধ্যে সে রকম একটি মুখ দেখে। আপনি সেই জায়গাটিতে কাজও করছেন। আপনার কি মনে হয় এ রকম মুখ আমাদের মিডিয়াতে যথেষ্ট আছে?

আব্দুল কাদের : এটা একটা দারুণ ব্যাপার। আমাদের মাঝে কিছু কিছু এ রকম আছেন। তবে আমাদের অভিনয়ের মধ্যে একটা নিয়ন্ত্রণ রাখতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে যে, হাসির নাটক মানেই জোর করে হাসানোর চেষ্টা নয়। খুব একটা রঙিন পোশাক পরে ফেললাম, কিছুটা চিৎকার করে অভিনয় করলাম, একটু লাফালাফি করলাম এতে লোক হাসে না। একটু নিয়ন্ত্রিত অভিনয় করতে হবে।

আমি জানি এ রকম ভালো প্রতিভা আমাদের মধ্যে আছে এবং আমি তাদের দিয়ে কাজ করাতে পারব। আমার প্রতি তাদের শ্রদ্ধাও আছে যথেষ্ট।

আপনি বর্তমান নাটকে অস্থির সময়ের কথা বলছিলেন, আপনাদের সময়ের সঙ্গে এখনকার সময়ের পার্থক্যটা কী?

আব্দুল কাদের : এখন প্রচুর নাটক হচ্ছে। এর মধ্যে ভালো নাটকও কিন্তু হচ্ছে। যেহেতু অনেক নাটক হচ্ছে সেহেতু যেগুলো খুব ভালো সেগুলো অনেকেই মিস করছে। এখানে আমাদের টিভি চ্যানেলগুলোও বিজ্ঞাপন প্রচার করছে বেশি। করতে হচ্ছে। আমাকে যদি এর সমাধানের কথা বলেন তবে বলব যে, এত নাটক হওয়া উচিত না। নাটক করা উচিত স্ক্রিপ্ট দেখে বাছাই করে। একজন অভিনেতা-অভিনেত্রী কত অভিনয় করবে? সকালে একটা চরিত্রে অভিনয় করছে, রাতে আরেকটা চরিত্রে অভিনয় করছে। একদিনে দুটা চরিত্রে অভিনয় করা সম্ভব না। ক্লান্তির একটা ব্যাপার আছে। এর পরের ব্যাপারটি হলো, ভালো স্ক্রিপ্ট। এমনকি অতীতের হিট করা ভালো নাট্যকারেরা এখন সিনে নাই। তাদেরকে ব্যবহার করতে হবে। আগে দেখতাম প্রোডিউসাররা গিয়ে একটা ভালো নাট্যকারের কাছে বসত ভালো স্ক্রিপ্টের জন্য। তাদের অনুরোধে নাট্যকাররা লিখতেন সুন্দর করে। কিন্তু এখন যেন কিছুটা এলোমেলো। এখন যেহেতু সংখ্যা বেড়েছে, সেহেতু মান একটু মার খাচ্ছে। সমাধানটা একপর্যায়ে এমনিতেই বের হয়ে আসবে। ভালোটাই টিকে থাকবে।

ইয়াজ উদ্দিনকে মামলায় জড়ানোর কোনো পথ পাচ্ছে না বিএনপি

সাবেক রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদকে মামলার ফাঁদে ফেলতে কোনো পথ পাচ্ছে না বিএনপি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে তার কার্যক্রমের জন্য কিভাবে তাকে মামলায় জড়ানো যায় এ নিয়ে বিএনপির একাধিক শীর্ষস্থানীয় আইনজীবী আইন-কানুন ঘেঁটে চলেছেন। জানা গেছে, সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদেই তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। উপায় না পেয়ে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল বাংলাভিশনে পয়েন্ট অব অর্ডারে তার দেয়া স্বাক্ষাৎকার পর্যালোচনা করছেন তারা। সূত্র জানিয়েছে, এ সাক্ষাৎকারের বিষয়বস্তুই হতে পারে মামলার একমাত্র হাতিয়ার। সূত্র আরো জানায়, ১/১১ পরবর্তী সময়ে সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল মইন উ আহমেদ, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টাসহ অন্যান্য উপদেষ্টাদের কার্যক্রমে যতো না বিএনপি ক্ষুব্ধ তার চেয়ে বেশি ক্ষুব্ধ হয়েছেন রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের কার্যক্রমে। এ কারণে যে কোনো উপায়ে তাকে মামলায় জড়াতে চায় বিএনপি।

পদ্মা বহুমুখী সেতুর সঙ্গে রেলের গুরুত্ব

এস.এম গোলাম মুস্তফা
দেশ ও জাতির আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন সুষ্ঠু ও সমন্বিত সকল ধরনের যোগাযোগ ব্যবস্থা, কিন্তু পদ্মা নদী বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে রাজধানীসহ মূল ভূখণ্ড হতে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। ফলে এ অঞ্চলে প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ আধুনিক যোগাযোগের আশানুরূপ উন্নয়নের ছোঁয়া পায়নি, যেমন রেললাইনসহ উন্নত সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা। অথচ, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে রয়েছে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সামুদ্রিক বন্দর (মংলা) এবং সর্ববৃহৎ বেনাপোল স্থল বন্দর। তাই এই অঞ্চলের সাথে রাজধানীসহ অন্যান্য অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নের জন্য ঢাকা-মাওয়া-খুলনা এবং বরিশাল মহাসড়কের উন্নয়ন যদি ব্যাপকভাবে করা হয় এবং পদ্মা নদীর উপর রেললাইনসহ বহুমুখী সেতু নির্মিত হলে রাজধানী ঢাকাসহ মূল

মুন্সীগঞ্জে সালিশি বৈঠকে হামলা : নিহত ১


সংগ্রামী জীবনশিল্পী মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়

manikএ ম এ আ জি জ মি য়া
বাংলা সাহিত্যে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯০৮-১৯৫৬) এক বিস্ময়কর প্রতিভা, অনন্য কথাশিল্পী। শোষিত, বঞ্চিত ও নিপীড়িত মানুষের জীবনযাত্রা ও লড়াই-সংগ্রাম তিনি সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন এবং নিপুণ শিল্পীর ন্যায় কলমের অাঁচড়ে তা জীবন্ত করে তুলেছেন। সেখানে তাঁর মানবপ্রেম, সামাজিক অঙ্গীকারবোধ এবং শ্রেণী দৃষ্টি ভঙ্গি সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। লেখক জীবনের শুরুতে তার মধ্যে ফ্রয়েডীয় রেখাপাত দেখা গেলেও অচিরেই তিনি তা কাটিয়ে ওঠেন। নিছক শিল্পের জন্য শিল্প নয়, তিনি বিশ্বাসী ছিলেন মানুষের জন্য শিল্প বা জীবনের জন্য শিল্প অভিধায়। এক্ষেত্রে মানুষ বলতে তিনি মেহনতী গণমানুষকে বুঝিয়েছেন। তার এ মানসগঠনে ছাত্রজীবনে বিজ্ঞান অধ্যয়ন এবং পরে দেশী-বিদেশেী সাহিত্য ও দর্শন পাঠ বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল। এজন্য কল্লোল যুগের (১৯২৩-১৯৩০) হয়েও তিনি কল্লোলীয় তরঙ্গে আন্দোলিত হননি, স্পন্দিত হননি পূর্ব-দিগন্তের প্রখর রবিরশ্মি দ্বারা। প্রথমদিকে তিনি প্রগতি লেখক সংঘের আন্দোলনে সম্পৃক্ত না হলেও চলি্লশের দশকে প্রগতি লেখক ও শিল্পী সংঘের কর্মকান্ডে ব্যাপকভাবে জড়িয়ে পড়েন। তিনি যোগ দেন কম্যুনিস্ট পার্টিতে। তখন লেখালেখির পাশাপাশি পার্টির সমাজবদলের কর্মকান্ডই তার জীবনের প্রধান অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে। আর এজন্য তাকে বরণ করে নিতে হয়েছিল চরম দারিদ্র্যক্লিষ্ট জীবন। গণমানুষের জীবনের শরিক হয়ে একজন কলমপেশা শ্রমিকের ন্যায় তিনি সারাটি জীবন অর্থকষ্টে কাটিয়েছেন; তবুও কোনো মোহ বা প্রলোভনের পঙ্কিল পথে পা বাড়াননি। ব্যতিক্রম মানিক জীবনের বৈশিষ্ট্য এখানেই। আর এজন্যই বাংলা সাহিত্যে মানিক, মানিক রতন হয়ে রয়েছেন। শত বছরের মানিক মারাও গেছেন অর্ধশত বছরের বেশি হয়ে গেল। কিন্তু আজও তার দীপ্তি ছড়িয়ে পড়ছে অবিশ্রান্ত ধারায়। তিনি জন্মেছিলেন ১৯০৮ সালের ১৯ মে সাঁওতাল পরগনার দুমকা শহরে এবং মারা যান ১৯৫৬ সালের ৩ ডিসেম্বর কলকাতায়। তার সাড়ে ৪৮ বছরের স্বল্পায়ু জীবনে তিনি সাহিত্যচর্চা করেছেন ৩২ বছর। তার মধ্যে কিশোর বয়সে ৪ বছর নীরব কাব্যচর্চা (১৯২৪-১৯২৮), কলেজ জীবনে ৪ বছর শৌখিন সাহিত্যচর্চা (১৯২৮-১৯৩২) এবং অবশিষ্ট ২৪ বছর তিনি নিরবচ্ছিন্ন সাহিত্যচর্চা (১৯৩২-১৯৫৬) করেছেন। এ সময়কালে তিনি বাংলা সাহিত্যে যে অবদান রেখে গেছেন গুণ, মান ও সংখ্যায় তা অভাবনীয় ও বিস্ময়কর। তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ৮৩। তার মধ্যে উপন্যাস-৪০ (অসম্পূর্ণ-৩), গল্পগ্রন্থ-২২, প্রবন্ধ সংকলন-৩, নাটক-১, কাব্যগ্রন্থ-১ এবং অন্যান্য-১৬।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পৈতৃক বাড়ি ছিল বিক্রমপুর (মুন্সিগঞ্জ)-এর মালপদিয়া গ্রামে। তার পূর্বপুরুষরা ছিলেন সিমুলিয়া গ্রামের অধিবাসী। তার পিতার নাম হরিহর বন্দ্যোপাধ্যায় ও মা নীরদাদেবী। তার মাও ছিলেন বিক্রমপুরের গাওদিয়া গ্রামের মেয়ে। তাই মানিকের শেকড় গ্রথিত ছিল প্রাচীন বাংলার ইতিহাসখ্যাত শত ঐতিহ্যমণ্ডিত বিক্রমপুরে এবং এখানকার মাটি থেকেই তার জীবনরস সিঞ্চিত হয়েছে; আত্মপ্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে তা ফুলে ফলে সুশোভিত হয়েছে। অাঁতুর ঘরে কালো গায়ের রং-এর মধ্যেও তার ঔজ্জ্বল্য প্রকাশ পেয়েছিল। তাই তার নামকরণ হয়েছিল ‘কালো মানিক’। কিন্তু পিতৃপ্রদত্ত নাম ছিল প্রবোধ কুমার। ডাক নাম মানিক হলেও লেখক নাম মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। বিশ বছর বয়সে কলেজে পড়াকালে বন্ধুদের সঙ্গে বাজি ধরে লিখে ফেলেন ‘অতসী মামী’ গল্পটি। তা ১৩৩৫ সালের পৌষ সংখ্যা ‘বিচিত্রা’য় প্রকাশিত হলে সকলে চমকে ওঠেন। লেখালেখির জগতে মানিকের এই যে অগ্রযাত্রা প্রাণস্পন্দন থেমে না যাওয়া পর্যন্ত তা অব্যাহত ছিল। যেসব পত্রপত্রিকায় তার লেখা প্রকাশিত হয়েছে তার মধ্যে বিচিত্রা, বঙ্গশ্রী, পূর্বাশা, ভারতবর্ষ, পরিচয়, যুগান্তর, প্রভাতী, আনন্দবাজার, স্বাধীনতা, বসুমতী, ছোটদের রংমশাল, অভিদারা, অনন্যা, এলোমেলো, এখন, আগামী প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। তার প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ (উপন্যাস) ‘জননী’ এবং গল্পগ্রন্থ ‘অতসী মামী ও অন্যান্য গল্প’। তার অসম্পূর্ণ উপন্যাস ‘মাটি ঘেঁষা মানুষ’ সম্পূর্ণ করেন সুধীর রঞ্জন মুখোপাধ্যায়। কিশোর উপন্যাস ‘মশাল’ কে সম্পূর্ণ করেছেন তা জানা যায়নি। তবে কিশোর উপন্যাস ‘মাটির কাছে কিশোর কবি’ সম্পূর্ণ করেছেন খগেন্দ্রনাথ মিত্র। তার লেখা দুটি উপন্যাসের ভূমিকা অসম্পূর্ণ ছিল, সম্পূর্ণ নয় অগ্রন্থিত রচনার তালিকা। কিছু লেখা হয়তো এখনও অনাবিষ্কৃত রয়ে গেছে।

চাকুরিজীবী পিতার কর্মস্থান পরিবর্তিত হওয়ায় তিনিও বিভিন্ন স্থানে লেখাপড়া করেছেন। ফলে লেখাপড়ায় অনেকটা বিঘ্ন ঘটলেও নানান অঞ্চলের মানুষের সাথে মেলামেশা করে যে বাস্তবজ্ঞান অর্জন করেছিলেন সে সব অভিজ্ঞতা তার পরবর্তীকালের লেখক জীবনে সহায়ক হয়েছিল। ছোটবেলা থেকে তিনি মেধাবী ছিলেন এবং পরীক্ষায় ভাল ফল করেছেন। ১৯২৪ সালে মা মারা গেলে তিনি অনেকটা শোকাচ্ছন্ন হয়ে পড়েন এবং সম্ভবত এ সময়ে নীরবে কাব্যচর্চা শুরু করেন। ১৯২৬ সালে মেদেনীপুর স্কুল থেকে তিনি প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করেন। নৈর্বাচনিক ও আবশ্যিক গণিতে লাভ করেন লেটার মার্ক। ১৯২৮ সালে বাঁকুরা ওয়েস লিয়ন মিশন কলেজ থেকে তিনি আইএসসি পাস করেন প্রথম বিভাগে। তিনি ভর্তি হলেন প্রেসিডেন্সি কলেজে গণিত বিষয়ে বিএসসি সম্মান শ্রেণীতে। কিন্তু এ সময়ে তিনি ধরাবাঁধা লেখাপড়ায় আগ্রহ হারিয়ে দেশ-বিদেশের সাহিত্য পাঠে মনোনিবেশ করেন। ফলে পরপর দু’বছর বিএসসি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হন। এ জন্য নিকট ছাত্ররাও তার প্রতি বিরাগভাজন হয়ে পড়েছিলেন। ইতোমধ্যে তার লেখালেখিও শুরু হয়ে গিয়েছিল পুরোদমে। জীবনধারণের জন্য চাকুরি করেন নবারুন (১৯৩৪) ও বঙ্গশ্রী (১৯৩৭-১৯৩৯) পত্রিকায় সহকারী সম্পাদক হিসেবে। কিন্তু মৃগী রোগাক্রান্ত মানিককে ডা. বিধানচন্দ্র রায় বিয়ে করার পরামর্শ দিলেন। ১৯৩৮ সালের ১১ মে বিক্রমপুরের পঞ্চসার গ্রামের সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কন্যা কমলা দেবীর সঙ্গে তার বিয়ে হয়। শরীরও অনেকটা সুস্থ হয়ে এলো। ইতোমধ্যে তার লেখক খ্যাতি দেশময় ছড়িয়ে পড়েছে। পেশা হিসেবে লেখালেখিকেই বেছে নিয়েছেন। আর্থিক অসচ্ছলতা ঘোচাতে ১৯৩৯ সালে তিনি একবার প্রেসব্যবসা শুরু করেছিলেন। উদ্দেশ্য সেখান থেকেই বই ও একটি পত্রিকা প্রকাশ করবেন। কিন্তু এক বছর না যেতেই প্রেস ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায়। লেখালেখির অর্থে সংসার চলে না। অবসরপ্রাপ্ত বৃদ্ধ পিতাও স্বেচ্ছায় আশ্রয় নিয়েছেন। পিতার সেবাযত্নেও এতটুকু অবহেলা তিনি করেননি। ১৯৪৩ সালে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের সময় কিছুকাল তিনি ওয়ার ফ্রন্টের প্রভিন্সিয়াল অর্গানাইজার এবং বেঙ্গল দফতরে পাবলিসিটি এসিস্যান্ট হিসেবে চাকরি করেছেন। আকাশ বাণী কলকাতা কেন্দ্রে যুদ্ধ বিষয়ক প্রচার ও নানাবিধ বেতার অনুষ্ঠানে যোগদান করেছেন। কিন্তু সে সময় ফরমায়েসি কাজে তার পোষায়নি। তিনি স্বেচ্ছায় কেটে পড়েছেন। লেখালেখি করে অধিক অর্থ উপার্জনের চেষ্টা করেছেন। তার লেখায় যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ, দুর্ভিক্ষ, কালোবাজারী, মুনাফালোভীর চিত্র ফুটে ওঠে। তাছাড়া ফ্যাসিবাদ, উগ্র জাতীয়তাবাদ ও সামপ্রদায়িকতার বিষবাষ্পে ভূলুণ্ঠিত মানবতা বিশেষ করে কৃষক-শ্রমিক মেহনতী মানুষের জীবন সংগ্রাম মূর্তমান হয়ে ওঠে। তার সাহিত্যখ্যাতিও দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে।

১৯৪২ সালের ৮ মার্চ ঢাকাতে ফ্যাসিবিরোধী সমাবেশে যোগদানের জন্য তরুণ লেখক ও কম্যুনিস্টকর্মী সৌমেন চন্দ (১৯২০-১৯৪৮) মিছিল নিয়ে আসার পথে ফরোয়ার্ড ব্লকের গু াদের হাতে রাজপথে নৃশংসভাবে নিহত হয়। সে প্রেক্ষাপটে কলকাতায় গঠিত হয়েছিল ফ্যাসিবিরোধী লেখক ও শিল্পীগোষ্ঠী। প্রথম দিকে প্রগতি লেখক সংঘের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা না থাকলেও পরবর্তীকালে এ সব সংগঠনের সঙ্গে নিজকে সম্পৃক্ত করে নেন। বুখারিনের বস্তুবাদ ও লিয়েনতিয়েনের মার্কসীয় অর্থনীতি পাঠ করে মার্কসীয় দর্শনের প্রতি তিনি আস্থাশীল হয়ে ওঠেন। ১৯৪৪ সালে তিনি কম্যুনিস্ট পার্টিতে যোগদান করেন। মার্কসীয় দর্শনের বইপত্র পড়ে তিনি সম্পূর্ণ বদলে যান। ‘সাহিত্য করার আগে’ শীর্ষক লেখায় তিনি বলেছেন, মার্কসবাদ যতটুকু বুঝেছি তাতেই আমার কাছে ধরা পড়ে গিয়েছে যে, আমার সৃষ্টিতে কত মিথ্যা বিভ্রান্তি আর আবর্জনা আমি আমদানী করেছি জীবন ও সাহিত্যকে একান্ত নিষ্ঠার সঙ্গে ভালবেসে ও জীবন ও সাহিত্যকে এগিয়ে নেয়ার উদ্দেশ্য থাকা সত্ত্বেও। ১৯৪৪ সালের ১৪-১৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত ফ্যাসিবিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘের দ্বিতীয় বার্ষিক সম্মেলনে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তার সভাপতিম লীর অন্যতম সদস্য নির্বাচিত হন। সে বছর ২৫-২৭ আগস্ট অনুষ্ঠিত পূর্ববঙ্গ প্রগতি লেখক ও শিল্পী সম্মেলনে তিনি যোগদান করেন। ১৯৪৫ সালের ৩-৮ মার্চ ভারতীয় প্রগতি লেখক সংঘের অন্যতম যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৪৬ সালে ভয়াবহ দাঙ্গা প্রতিরোধে তিনি অসুস্থ শরীর নিয়ে এগিয়ে যান এবং বহু সভা সমাবেশে যোগদান করেন। ১৯৪৯ সালের ২২ এপ্রিল প্রগতি লেখক সংঘের চতুর্থ বার্ষিক সম্মেলনে পুলিশী হানার মধ্যেও তিনি ডেলিগেট অধিবেশনে যোগদান করেন। ২২ নভেম্বর ট্রাম বাড়িতে অনুষ্ঠিত প্রগতি লেখক সংঘের শান্তি সম্মেলনে তিনি সভাপতিত্ব করেন। সভাপতিত্ব করেছিলেন ১৯৫৩ সালে অনুষ্ঠিত প্রগতি লেখক সংঘের পঞ্চম বার্ষিকী সম্মেলনে। লেখার চাপ ছাড়াও পার্টি এবং অন্যান্য সাগংঠনিক কাজে বেশি বেশি পরিশ্রম করার ফলে তার শরীর ভাঙতে শুরু করে। পার্টির পক্ষ থেকে তাকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি করে দেয়া হয়। কিন্তু হাসপাতালে তিনি কখনও স্বস্তিবোধ করেননি। নিজ দায়িত্বেই তিনি বাসায় ফিরে এসেছেন। তারপর ১৯৫৬ সালের ৩০ নভেম্বর তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়েন। অসহায় পারিবারিক পরিবেশে দুই দিন থাকার পর ২ ডিসেম্বর রাত ১০টায় নীলরতন সরকার হাসপাতালে তাকে ভর্তি করা হয়। না সেখানে আর তাকে বেশি সময় কাটাতে হয়নি। ৩ ডিসেম্বর ভোর চারটায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। সময় পেলেন না কাকা বাবুর (কমরেড মুজাফফর আহমদ) জীবনী লেখার।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে সাহিত্য চর্চার বয়স হল ৩০ বছর। এ সম্পর্কে তিনি বলেছেন, ‘তিরশ বছর বয়সের আগে কারো লেখা উচিত নয়। আমি সেই বয়সে লিখবো। এর মধ্যে তৈরি হয়ে নিতে হবে সব দিক দিয়ে। কেবল অভিজ্ঞতা সঞ্চয় নয়। নিশ্চিত মনে যাতে সাহিত্যচর্চা করতে পারি তার বাস্তব ব্যবস্থাগুলো ঠিক করে ফেলবো।’ কিন্তু সে সুযোগ তিনি পাননি। অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে ত্রিশ বছরের বহু পূর্বেই তিনি লেখালেখিকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। কিশোর বয়সে কবিতা ও গল্প লিখেছেন। কিন্তু ঔপন্যাসিক হওয়ার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছেন তার ‘উপন্যাসের ধারা’_ লেখায় ‘… সাধ করলে কবি হয়তো আমি হতে পারি; কিন্তু ঔপন্যাসিক হওয়াটাই আমার পক্ষে হবে উচিত ও স্বাভাবিক।’ তার স্বপ্ন সত্যে পরিণত হয়েছে ঔপন্যাসিক হিসেবে তিনি সুখ্যাতি অর্জন করেছেন। বিজ্ঞানের ছাত্র মানিকের বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি উপন্যাস রচনায় সহায়ক ভূমিকা সম্পর্কে তিনি বলেছেন, উপন্যাস লেখার জন্য দরকার খানিকটা বৈজ্ঞানিক বিচারবোধ, বিজ্ঞানচর্চা না করলেও সম্পূর্ণভাবে নিজের অজ্ঞাতসারে হলেও ঔপন্যাসিক খানিকটা বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করবেন, তাতে বিস্ময়ের কিছু নেই।

মানবতাবাদী মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সামপ্রদায়িকতা, ফ্যাসিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধকে অন্তর থেকে ঘৃণা করেছেন। অসুস্থ শরীরে জীবনের ঝুঁকি নিয়েও তিনি সামপ্রদায়িক দাঙ্গার বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। তিনি ডায়েরিতে লিখেছেন, ‘দাঙ্গার কথা শুনে মনটা খারাপ হয়ে গেল। … বিকালে এ অঞ্চলে শান্তিসভা হবে শুনলাম। খুশি হয়ে নিজে রাজি হলাম যতটা পারি সাহায্য করতে। যাকে দেখছি তাকে বলছি মিটমাটের জন্য সভায় যেতে। মসজিদের কাছে আনোয়ারশা রোডের একদল মুসলিম স্বীকার করলেন মিটমাট দরকার_ কয়েকজন উত্তেজিতভাবে বললেন মেরে পুড়িয়ে এখন মিটমাটের কথা কেন? অন্যরা তাদের থামালেন। ফাঁড়ি পেরিয়ে পুলের নিচে যেতে এল বিরোধিতা_ হিন্দুদের কাছ থেকে। কিসের মিটমাট মুসলমানরা এই করেছে ঐ করেছে। ব্যাটা কম্যুনিস্ট বলে আমায় মারে আর কি। প্রায় দেড়শ লোক মিলে ধরেছিল।’ ভারত ভাগের পর ১৯৫০ সালেও কলকাতায় সামপ্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছে। এ ব্যাপারে তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল খুবই স্পষ্ট। তিনি ডায়েরিতে লিখেছেন, সামপ্রদায়িকতার উপরটাই লোকে দেখছে। পিছনে কি গভীর ও ব্যাপক ষড়যন্ত্র, চোখে পড়ে না। যে উদ্দেশ্যে ভারত বিভাগ, সেই উদ্দেশ্যেই ভারত পাকিস্তানের বিবাদ বাড়িয়ে চলা বৃটিশ আমেরিকান সামপ্রাজ্যবাদ দুই রাষ্ট্রের ঘাড়ে চেপে থাকতে পারে। সামপ্রদায়িকতার ভিত্তিতে দেশ ভাগ ছিল তার অসহ্য। তার লেখায় তা সুস্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে : ‘কানাই বলে মাঠে একটা ফ্লাগ উড়াই? আমি বলি ব্লাক ফ্লাগ উড়াও। কানাইয়ের ভাই বলাই বলে ঠিক। উদ্বাস্তুরা কি স্বাধীনতা পেয়েছে? সাত আট বছরের ছেলে। ফ্লাগ কিছু কিছু উড়েছে_ কিন্তু চার দিক ঝিমানো।’

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাদাসিধে জীবনযাপন সম্পর্কে অনেকেই লিখেছেন। রথীন্দ্রকান্ত ঘটক চৌধুরী তার ‘একটি গল্পের জন্মকথা’য় লিখেছেন, ‘ছোট একটা পুরাতন একতলা দালান। সামনের দিকে অল্প পরিসর একটা কোঠা মানিক বাবুর লেখার ঘর। মাদুর বিছানো সাধারণ একটা তক্তপোষ ঘরের এক পাশে। মান্দাতার আমলের হতশ্রী লেখার টেবিল একটা_ তার একটিমাত্র বসার চেয়ারের অবস্থাও একই রকমের। গোটা তিনেক বইয়ের আলমারী পিছনটাতে। বইয়ের সংখ্যা সামান্য। বাঁধাই ‘প্রবাসী’, ‘ভারতবর্ষে’র সংখ্যাই বেশি।

বাজার থেকে ফিরে এলেন মানিক বাবু অল্প কিছুক্ষণ বাদে। গায়ে আধময়লা গেঞ্জি, পরনে লুঙ্গি। এক হাতে আট-নয় বছরের মেয়ের হাত ধরেছেন আর এক হাতে বাজারের চটের থলে। লম্বা প্রায় ছয় ফুট, বলিষ্ঠ কালো কুঁদানো শরীর, চাষাভূষাদের মতন। খোঁচা খোঁচা দাড়ি-গোঁফে মুখম ল আবৃত্ত তবে কুশ্রীতা নেই কোথাও প্রাণোচ্ছল সাজিবতায় ভরপুর। কালো ফ্রেমের চশমা ভেদকরা এক জোড়া নিবিষ্ট চোখ। অনাবৃত বাহুযুগলের পেশিতে যৌবনোচিত দৃঢ়তা। বেশভূষা, চেহারা সবটাই মিলিয়ে আবার নতুন করে যেন দেখলাম মানিক বাবুকে। খারাপ লাগেনি তবুও বাজারের থলেটাকে বাংলাদেশের প্রথম সারির একজন কথাশিল্পীর হাতে কেমন যেন বেমানান মনে হয়েছিল। … তার অনাড়ম্বর জীবনযাত্রার পরিচয় পেয়ে প্রকৃতই অন্তরঙ্গতা অনুভব করেছিলাম সেদিন।’

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সারা জীবন অর্থকষ্টে ভুগেছেন। অনেক সময় অসুখ হলে নিজের বা পরিবারের সদস্যদের সুচিকিৎসারও ব্যবস্থা করতে পারেননি। কোনো কোনো সময় পার্টি, কবি-সাহিত্যিক বন্ধু বা শুভানুধ্যায়ীরা সহায়তার হাত প্রসারিত করেছেন। তারপরও এককালীন কিছু টাকা পেলে পুরোটাই পার্টি ফান্ডে জমা করে দিতেন। পৈতৃক বাড়ি বিক্রির টাকা তিনি পারিবারিক সদস্যদের অজ্ঞাতেই পার্টিকে দিয়েছিলেন। পার্টির প্রতি তিনি এতটাই অনুরক্ত ছিলেন। অন্যদিকে যে কোনভাবে টাকাপয়সা আয় করা তার রুচিবোধের বাইরে ছিল। রথীন্দ্রকান্ত ঘটক চৌধুরীর সঙ্গে আলাপকালে তার এ দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ পেয়েছে : ‘এখন সংসার চালাতে হয় শুধু এই দিয়েই। আর তো পেশা নেই কোন। তাছাড়া সব কাগজে লিখিনে এখন আর, কারণ তাতে লেখক সম্বন্ধে পাঠকের ধারণা নিচু হয়ে যায়_ সম্ভাবনা থাকে ভুল বুঝবার। তা যদি লিখতাম তা হলে অনেক টাকা রোজগার করতে পারতাম। অভাব থাকতো না কোন, দেখলেন তো কত সাহিত্যিক বাড়ি করলেন, গাড়ি করলেন_ আমি গরিবই রয়ে গেলাম সারা জীবন। অনেক সময় তিনি পয়সার অভাবে ওষুধ কিনে খেতে পারেননি। এমনকি একটি অসহায় অবস্থা নিজ ডায়েরিতে উলি্লখিত হয়েছে। ক’দিন থেকে শরীর খুব খারাপ, … কি যে দুর্বল বলা যায় না, বিছানা থেকে উঠবারও শক্তি নেই_ এদিকে ঘরে পয়সা নেই। জোর করে তো বেরোলাম ফিরবো কিনা না জেনে।’ তারপর সর্বশেষ যখন আর্থিক অসহায়ত্বের কারণে দুই দিন নিজ বাড়িতে অজ্ঞান হয়ে থাকবার পর হাসপাতালে ভর্তির সংবাদ পেয়ে কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় তাকে দেখতে গিয়েছিলেন। এমন অবস্থায় টেলিফোন না করার কারণ জিজ্ঞাসা করায় মানিক পত্নী অস্ফুট স্বরে হেসেই উত্তর দিয়েছিলেন, ‘তাতে যে পাঁচআনা পয়সা লাগে ভাই।’

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন শ্রেণী-সংগ্রামে বিশ্বাসী লেখক। তার অনেক লেখায় তা পরিলক্ষিত হয়। শ্রেণী-সংগ্রামের বিজয়ে প্রত্যয়ী মানিক বন্দোপাধ্যায় তার ‘নেতা’ গল্পে লিখেছেন, ‘… আমরা কোন দাবি ছাড়বো না। আমরা কি শুধু রুজির জন্য লড়ি? আমাদের দাবির পিছনে_’ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহিত্যকর্মের মূল্যায়ন করেছেন অনেকেই। তবে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সাহিত্য সমালোচক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, ‘মানিক প্রান্তিক মানুষের অর্থনৈতিক জীবনকে জানতেন এবং তাদের সামাজিক অবস্থা সম্বন্ধে প্রচ্ছন্ন জ্ঞান রাখতেন। এই বাস্তবতাকে তিনি তার কথাসাহিত্যে উপস্থিত করেছেন। তিনি তা কেবল বাস্তবতাকে উপস্থিত করার প্রয়োজনে উপস্থিত করেননি করেছেন বাস্তবতাকে বদলাবার প্রয়োজনেও।’

http://www.munshigonj.com/Special/Manik100/Manik100.htm