Saturday, August 1, 2009
Monday, July 27, 2009
মুন্সীগঞ্জে ফুটবল মাঠে সংঘর্ষে খেলোয়াড়সহ আহত ২০
মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার শান্তিনগর গ্রামে ফুটবল খেলার সময় সংঘর্ষে একজন বিদেশি খেলোয়াড়সহ উভয়পক্ষের অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে আছেন- রিয়াজ ও সুদানি ফুটবলার রিচি মরিস। তারা দুজনই পূর্ব নয়াকান্দি শান্তি সংঘ ক্লাবের হয়ে খেলছিলেন।
আহতরা বিভিন্ন চিকিৎসা কেন্দ্র থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন।
গজারিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোজাম্মেল হোসেন জানান, পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এনেছে। তবে এখনও পর্যন্ত এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে তিনি জানান, শান্তিনগর গ্রামে ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনালে চরবাউশিয়া বড়কান্দি ফ্রেন্ডস ক্লাব এবং পূর্ব নয়াকান্দি শান্তি সংঘ ক্লাব খেলছিল।
খেলার ৫৫ মিনিটের সময় রিচি মরিসের গোল করে শান্তি সংঘ এগিয়ে যায়। পরে রিয়াজ আরেকটি গোল করার মুহূর্তে বিপক্ষ দলের খেলোয়ারা তাকে টেনে ধরে। এ নিয়ে দুদলের খেলোয়াড়দের মধ্যে সংষর্ঘ বেধে যায়।
রিচি মরিস দুপক্ষকে শান্ত করতে গেলে বিপক্ষের খেলোয়াড়রা তার উপরও হামলা চালায়। পরে দু’দলের সমর্থকদের মধ্যেও সংঘর্ষ বেধে যায়।
সংঘর্ষকারীরা গোলবার উপড়ে ফেলে এবং পুরস্কার বিতরণের মঞ্চ তছনছ করে বলে ওসি জানান।
ঘটনাস্থল থেকে রাত পৌনে ১০ টায় উপ-পরিদর্শক (এসআই) নাসিম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, খেলাপণ্ড হওয়ায় দু’গ্রামবাসীর মধ্যে এখনও উত্তেজনা বিরাজ করছে। তবে পরিস্থিতি মোকাবেলায় পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।
সাকুরা ফুলের দেশে - ইমদাদুল হক মিলন
ইমদাদুল হক মিলন
প্রথমবার
পি আর প্লাসিড সাহিত্যপ্রেমী যুবক। বহুদিন হয় সে জাপানে থাকে। বিবেকবার্তা নামে ছোট্ট একটা কাগজ করে। ২০০৪ সালের শুরুর দিকে সে আমার ফ্ল্যাটে এল। সঙ্গে অতি লম্বা, বয়স্ক এক জাপানি ভদ্রলোক আর প্লাসিডের অতি ক্ষুদ্র ছেলেটি। নাম থাইয়ো। তখন থাইয়োর বয়স তিন সাড়ে তিন হবে। কিন্তু চঞ্চলতায় তার বয়স হাজার খানেক। সেদিনের আগে এত চঞ্চল বাচ্চা আমি আর দেখিনি। আধাঘণ্টা খানেকের মধ্যে সমস্ত ফ্ল্যাট তছনছ করে ফেলল। একদিকে থাইয়ো আমার ফ্ল্যাট তছনছ করছে, অন্যদিকে খুবই নির্বিকার ভঙ্গিতে বসে প্লাসিড আমার সঙ্গে কথা বলছে। এপ্রিলে টোকিওতে বৈশাখী মেলা হচ্ছে কয়েক বছর ধরে। জাপানপ্রবাসী বাঙালিরা একত্র হয়ে করে। সেখানে সে একটা বইয়ের স্টল করবে এবং বিবেকবার্তার পক্ষ থেকে আমাকে একটা পুরস্কার দেবে। আমি যেতে রাজি আছি কি না, পুরস্কার গ্রহণে রাজি আছি কি না এটা জানার জন্য তার সপুত্র দেশে আগমন। আমার রাজি না হওয়ার কোনো কারণ নেই।
এপ্রিলের ১৫ তারিখে টোকিও পৌঁছে গেলাম। প্লাসিড আমাকে নিয়ে তুলল টুলুর বাড়িতে। সে থাকে মিকুরা এলাকায়। জাপানি স্ত্রীর নাম ওগাহারা আখিকো। পাঁচ বছর বয়সী ছেলেটির নাম হিরোকি। না, এই বাচ্চাটি শান্ত।
বৈশাখী মেলা ১৭ তারিখে। মাঝখানে একটা ফাঁকা দিন। টুলু আমাকে অমিয়া এলাকায় নিয়ে বিখ্যাত হিকাওয়া জিনজা (টেম্পল) দেখাল। সাকুরা বাগানে নিয়ে গেল। তখনো কোনো কোনো গাছে ফুটে আছে সাকুরা, জাপানের বিখ্যাত ফুল। ছোট এবং বড় করা যায়, সাইতামা এলাকার সিনথোসি স্টেডিয়ামটি হচ্ছে তেমন। টুলু আমাকে সেই স্টেডিয়াম দেখাল। পুরোটা দিন আমরা ঘুরেই কাটালাম। বিকেলের দিকে প্লাসিড এসে যোগ দিয়েছিল।
পরদিন বৈশাখী মেলা। মেলা হচ্ছে ইকেবুকোরো এলাকার নিশিগুচি পার্কে। প্লাসিডের জাপানি বউ ইউকি আমাদের নিয়ে গেল। সঙ্গে থাইয়ো আছে। ছেলেটি এত শার্প, আমার চেহারা মনে রেখেছে। দৌড়ে এসে আমার প্যান্ট টেনে ধরল। ধরল এত আন্তরিক ভঙ্গিতে কিন্তু আমি ভয় পেয়ে গেলাম। যাব্বাবা, টেনে খুলে ফেলবে নাকি!
নিশিগুচি পার্কে বৈশাখী মেলাটি সেবার বিশাল আয়োজনে হলো। জাপানের বিভিন্ন এলাকা থেকে বাঙালিরা এসেছে। টোকিওর মেয়র আছেন। তাঁর সঙ্গে আছে অনেক জাপানি গণ্যমান্য ব্যক্তি। আমাদের রাষ্ট্রদুত আছেন। পরিচয় হলো, কিন্তু তিনি আমাকে পাত্তাই দিলেন না। মনটা একটু খারাপই হলো।
সেবার দুই সপ্তাহ থাকলাম জাপানে। জাপানপ্রবাসী কবি, লেখক, সাংবাদিক, শিক্ষক−অনেকের সঙ্গে পরিচয় হলো। সেবারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো, যেখানে বৈশাখী মেলা হয়, সেই পার্কে একটা শহীদ মিনার তৈরির প্ল্যান করেছে বাঙালিরা। মেয়রের অনুমতির চেষ্টা চলছে। শহীদ মিনারের একটা মডেলও তৈরি করেছেন একজন বাঙালি আর্কিটেক্ট। শহীদ মিনারসংক্রান্ত একটা মিটিংয়ে আমি একদিন ছিলাম। ভাবতে ভালো লাগছিল যে আমাদের ভাষাশহীদদের স্নৃতির উদ্দেশে শহীদ মিনার হবে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম এক শহর টোকিওতে। স্বপ্ন শেষপর্যন্ত স্বপ্নই থেকে যাবে কি না কে জানে। না, আমাদের সেই স্বপ্ন স্বপ্ন থাকেনি। বাস্তবায়িত হয়েছে। টোকিওর ইকেবুকোরো এলাকার নিশিগুচি পার্কে শহীদ মিনার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেই শহীদ মিনারের সামনে গিয়ে দাঁড়ালে নিজেদের জন্য গর্ব হয়।
সেবার ‘বিবেকবার্তা পুরস্কার’ দেওয়া হলো দুপুরবেলা টোকিওর এক রেস্টুরেন্টে। মনজুরুল হকের হাত থেকে নিলাম। একদিন বিকেলবেলা এনএইচকেতে গেলাম। এনএইচকে রেডিওর জন্য মনজু ভাই আমার একটা সাক্ষাৎকার নিলেন। ফেরার সময় প্লাসিড আর আমি হাঁটছি। হেঁটে হেঁটে টোকিওর বিকেল দেখছি। বিশাল এক হোটেলের সামনের ফুটপাত দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি। হোটেলের নাম অ্যানা (অঘঅ)। কেন যে হোটেলটার দিকে তাকিয়ে মনে হলো, এই হোটেলে যদি একটা রাত অন্তত কাটানো যেত! কোনো কারণ নেই, তবু মনে হলো। দ্বিতীয়বার জাপানে গিয়ে এই হোটেলেই আমাকে উঠতে হয়েছিল। আশ্চর্য এক স্বপ্নপূরণ।
তাকেশি কাইকো স্নারক বক্তৃতা
১৯৩০ সালে পশ্চিম জাপানের ওসাকা শহরে জন্েনছিলেন তাকেশি কাইকো। এই লেখক তাঁর লেখালেখির জন্য যতটা বিখ্যাত, তাঁর বলিষ্ঠ রাজনৈতিক অবস্থানের জন্যও ততটাই বিখ্যাত। জাপানি সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ দুই স্বীকৃতি আকুতাগাওয়া সাহিত্য পুরস্কার এবং মায়নিচি সাহিত্য পুরস্কার−দুটোই তিনি বেঁচে থাকা অবস্থায় পেয়েছেন। সমকালীন জাপানি সাহিত্যের তিনি এক সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব। ইয়ুকিউ মিশিমার পরবর্তী প্রজন্েনর ঔপন্যাসিকদের মধ্যে অন্যতম প্রধান হিসেবে তাকেশি কাইকোকে গণ্য করা হয়। ষাটের দশকে সাংবাদিকতার দায়িত্ব পালনের জন্য তিনি ভিয়েতনামে অবস্থান করছিলেন। সে সময় এশীয় ভুখন্ডে মার্কিন আগ্রাসনের যে নগ্ন ছবি দেখেছিলেন তা তাঁকে মার্কিনবিরোধী অবস্থানের দিকে নিয়ে যায়। ভিয়েতনামের সেই অভিজ্ঞতার আলোকে অনবদ্য এক উপন্যাস রচনা করেন। উপন্যাসের নাম ওঘঞঙ অ ইখঅঈক ঝটঘ. এ উপন্যাস পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় অনুদিত হয়ে বোদ্ধা পাঠকের ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করে। তাকেশি কাইকো মৃত্যুবরণ করেন ১৯৮৯ সালে। ঔপন্যাসিক, গল্পকার, সমালোচক ও টিভিব্যক্তিত্ব কাইকো ওসাকা ইউনিভার্সিটি থেকে আইনশাস্ত্রে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন। শুরুর জীবনে কিছুকাল আইনের পেশায় যোগ দিলেও এই পেশায় তিনি থাকেননি। পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন সাংবাদিকতা। সাংবাদিকতা এবং সৃজনশীল সাহিত্য রচনাই ছিল মৃত্যুপর্যন্ত তাঁর প্রধান কাজ। পৃথিবীর ৪০টির মতো দেশ তিনি ভ্রমণ করেছেন। সেসব দেশের অধিকাংশই এশিয়া মহাদেশের। জাপানের বাইরে ওই সব দেশের পটভুমিতে তিনি রচনা করেন বেশ কিছু উপন্যাস। ফলে দেশগুলোর সঙ্গে গড়ে ওঠে তাঁর নিবিড় সম্পর্ক।
জাপান ফাউন্ডেশন জাপানের খুবই গুরুত্বপূর্ণ এক প্রতিষ্ঠান। তাকেশি কাইকোর মৃত্যুর পর তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে জাপান ফাউন্ডেশনকে বড় রকমের একটা অঙ্কের টাকা দেওয়া হয়। সেই টাকা থেকে বছরে একবার জাপান ফাউন্ডেশন আয়োজন করে ‘তাকেশি কাইকো মেমোরিয়াল এশিয়ান রাইটার্স লেকচার সিরিজ’। এশিয়ার কোনো এক দেশের একজন লেখককে আমন্ত্রণ জানায় জাপান ফাউন্ডেশন। সেই লেখক জাপানে গিয়ে তাঁর দেশের সাহিত্য এবং নিজের লেখা নিয়ে চারটা বক্তব্য দেন। বক্তব্যগুলো তিনি তাঁর নিজের ভাষায় লিখে জাপান ফাউন্ডেশনকে পাঠিয়ে দেন। ফাউন্ডেশন সেই বক্তব্য জাপানি ভাষায় অনুবাদ করে। লেখক তাঁর নিজের ভাষায় বক্তৃতা করেন, পাশে বসে একজন জাপানি ভাষার এক্সপার্ট সেই বক্তৃতার জাপানি অনুবাদ পাঠ করেন। ২০০৫ সালের জন্য বাংলাদেশকে নির্বাচন করে জাপান ফাউন্ডেশন। আর লেখক হিসেবে নির্বাচন করে আমাকে। ঢাকায় আমাকে আমন্ত্রণ জানাতে এলেন প্রফেসর কিউকো নিওয়া এবং মিস্টার মাসাকি হিরানো। ২০০৫ সালের বক্তব্য দিতে আমি জাপানে গেলাম ২০০৬-এর মার্চে। প্রথম বক্তৃতা হলো হিরোশিমা ইন্টারন্যাশনাল সেন্টারে। সেন্টারের পাশেই অ্যানা (অঘঅ) হোটেল। সেই হোটেলেই তোলা হলো আমাকে। ফাউন্ডেশন থেকে আমাকে একজন গাইড দিয়েছে। কচুর ডগার মতো নরম এক বাঙালি যুবক। নাম সুমন্ত ঘোষ। আরেক বাঙালি যুবক এবং শান্তিনিকেতনে পড়াশোনা করা প্রায় বাঙালি এক জাপানি ভদ্রমহিলাকে নিয়ে সুমন্ত আমাকে হিরোশিমা এয়ারপোর্টে রিসিভ করতে এল। তারিখ ১০ মার্চ ২০০৬।
হিরোশিমায় নেমে আমার গা কাঁটা দিয়ে উঠেছিল। এই সেই হিরোশিমা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে, ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট সকাল আটটা ১৫ মিনিটে পৃথিবীর প্রথম আণবিক বোমা নিক্ষিপ্ত হয় এই শহরে। মুহুর্তে পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল শহরের অধিকাংশ দালানকোঠা, নিহত হয় এক লাখ ২০ হাজার লোক, পরে প্রাণ হারায় তার দ্বিগুণ।
অ্যানা হোটেলের খুব কাছে সেই জায়গা, যেখানে নিক্ষিপ্ত হয়েছিল আণবিক বোমা। হেঁটে যেতে কয়েক মিনিট লাগে। হোটেলে লাগেজ রেখেই বেরিয়ে গিয়েছিলাম। এলাকাজুড়ে ‘পিস মেমোরিয়াল পার্ক’। ১৯৫৫ সালে এখানে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে ‘হিরোশিমা পিস মেমোরিয়াল মিউজিয়াম’। পৃথিবীর লাখ লাখ মানুষ এই মিউজিয়াম দেখতে আসে, আণবিক বোমার ভয়াবহতার কথা মনে করে হিরোশিমা ট্র্যাজেডির জন্য এখনো চোখের পানি ফেলে। শিশুরা পিস মনুমেন্টের সামনে দাঁড়িয়ে স্তব্ধ হয়ে থাকে। হিরোশিমা পিস মেমোরিয়াল পার্কে ঘুরতে ঘুরতে আমার মনে পড়েছিল আমার দেশের কথা। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের কথা। স্বজন হারানোর বেদনায় আমার বুক ভারী হয়েছিল।
পিস মেমোরিয়াল পার্কের এক পাশে দাঁড়িয়ে আছে চারতলা এক পুরোনো বাড়ির কঙ্কাল। সুমন্ত বলল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বাড়িটা ছিল পাবলিক লাইব্রেরি। আণবিক বোমার আঘাতে পুরো এলাকা ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর শুধু এই বাড়িটা এভাবে দাঁড়িয়ে ছিল। গা থেকে খসে পড়েছে আস্তরণ, দাঁড়িয়ে আছে শুধু কঙ্কাল। আমি সেই বাড়ির সামনে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকি।
পরদিন বক্তৃতা। প্রফেসর কিউকো নিওয়া এবং মিস্টার মাসাকি হিরানোর সঙ্গে টোকিও থেকে এসেছেন আনোয়ার জাহিদ। তিনি এনএইচকেতে কাজ করেন। আমার বক্তৃতার জাপানি অনুবাদ করেছেন। অসম্ভব সুন্দর কন্ঠের অধিকারী। স্টেজে বসে আমি এক প্যারা করে বক্তৃব্য পাঠ করি, আনোয়ার জাহিদ সঙ্গে সঙ্গে সেই এক প্যারার জাপানি অনুবাদ পড়েন। মিলনায়তন ভর্তি জাপানি লেখক, প্রকাশক, প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিক এবং হিরোশিমার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহিত্যের ছাত্রছাত্রী। বক্তৃতার আগে মাসাকি হিরানো আমার হাতে একগাদা টাকা ধরিয়ে দিয়েছেন। প্লেনের টিকিট আগেই আমাকে ঢাকায় পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। হোটেলের খরচ ইত্যাদি সবই বহন করছে জাপান ফাউন্ডেশন। এর বাইরে প্রতিদিনকার হাতখরচের টাকা দিচ্ছে, বক্তৃতার জন্য দিচ্ছে। প্রতিটি বক্তৃতার জন্য আমাকে একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দেওয়ার কথা। কিন্তু চারটি বক্তৃতা আমি লিখিনি। লিখেছি একটি। যেহেতু বক্তৃতার জায়গা ভিন্ন ভিন্ন, শ্রোতা ভিন্ন ভিন্ন, সুতরাং একটি বক্তৃতাই আমি পাঠ করব। এদিক দিয়ে আমার কিছুটা লস হয়ে গেল। চারটি ভিন্ন বক্তৃতা লিখলে তিন গুণ বেশি টাকা পাওয়া যেত। আর জাপানে থাকা অবস্থায় মারাটারা গেলে আমার পরিবার পেত বিশাল অঙ্কের টাকা। জাপান ফাউন্ডেশন আমার ইন্স্যুরেন্স দিয়েছিল ৩০ মিলিয়ন ইয়েনের। আর চমৎকার একটা স্যুভেনির বের করেছিল আমাকে নিয়ে।
চার দিন ছিলাম হিরোশিমায়। এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছি আর আমার শুধু মনে পড়ছে এই শহরের সেই ভয়ঙ্কর ট্র্যাজেডির কথা। এখনো সেই ভয়াবহ স্নৃতি নিয়ে বেঁচে আছেন কিছু মানুষ। আণবিক বোমার হাত থেকে বেঁচে যাওয়া সেসব মানুষকে বলা হয় ‘হিবাকুশা’। আণবিক বোমা হামলার সময় হিরোশিমা শহরের লোকসংখ্যা ছিল দুই লাখ ৫৫ হাজার। বোমাটির ওজন ছিল ৬০ কেজি। যে বিমানটি বোমা বহন করছিল তার নাম ‘এনোলা গে’। বোমাটির নাম ‘লিটল বয়’। বিমানের কমান্ডার কর্নেল পল টিবেটস। ১৯৪৫ সালের ৫ আগস্ট টিবেটস আনুষ্ঠানিকভাবে ৪৪-৮৬২৯২ নম্বরের বোমারু বিমানটির নামকরণ করেন ‘এনোলা গে’। ‘এনোলা গে’ ছিল তাঁর মায়ের নাম। টিবেটসের নানার একটি প্রিয় উপন্যাসের নায়িকার নাম ছিল ‘এনোলা গে’। উপন্যাসের নায়িকার নামে মেয়ের নাম রেখেছিলেন ভদ্রলোক। ভুপৃষ্ঠ থেকে দুই হাজার ফুট উঁচুতে ১৩ কিলোটন শক্তিতে বিস্কোরিত হয় ‘লিটল বয়’। হিরোশিমা শহরের কেন্দ্রস্থলে, যেখানে বিস্কোরিত হয় বোমা, সেই জায়গাটিকে বলা হয় ‘এ বোম্ব ডোম’। বোমা বিস্কোরণের পর ‘এনোলা গে’র কো-পাইলট রবার্ট লুই দেখতে পেলেন একটি বিশাল ছাতার মতো ভয়ঙ্কর ঘন মেঘে হিরোশিমা ঢাকা পড়ে গেছে। শহরটি ফুটছে, ঝলসে যাচ্ছে। এই দৃশ্য দেখে তিনি আপন মনে বলে উঠলেন, ‘হায় ঈশ্বর, আমরা এ কী করলাম!’
সাওরির সঙ্গে দেখা হলো ১৪ মার্চ ২০০৬। টোকিওর হানেদা এয়ারপোর্টে সে আমাকে রিসিভ করতে এসেছে। পুরো নাম সাওরি তাকাহাসি। বয়স ২৭ বছর। জাপান থেকে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য পড়তে এসেছিল। ফজিলাতুন্নেসা মুজিব হলে থাকত। পড়াশোনা শেষ না করেই জাপানে ফিরে গিয়েছিল। চমৎকার বাংলা বলে, চমৎকার রবীন্দ্রসংগীত গায়। সামান্য আনন্দেই শিশুর মতো হাততালি দেয়। আমার বাকি তিনটি বক্তৃতা হবে টোকিও, ওসাকা ও সেন্দাইতে। হাতে সময় ১০ দিন। এই ১০ দিন ২৪ ঘণ্টা সাওরি আমার সঙ্গে। এই তিন জায়গায় সে আমার গাইড। সাওরি এনএইচকেতে কাজ করে। দেখা হওয়ার মুহুর্তেই সাওরির সঙ্গে আমার ভাব হয়ে গেল। হানেদা থেকে ট্রেনে করে টোকিওর সেই আনা হোটেলে যাচ্ছি। ফাঁকা কামরায় আমি আর সাওরি; সাওরি আমাকে রবীন্দ্রসংগীত গেয়ে শোনাল−‘বড় আশা করে এসেছি গো কাছে ডেকে লও’।
প্রথমবার টোকিওতে এসে আমি অনেক কিছুই দেখেছিলাম। যেমন ‘টোকিও টাওয়ার’ ‘রূপপুঙ্গি হিলস’। সাওরি আমাকে দেখাল ‘মুরি আর্ট মিউজিয়াম’ ‘মেইজি জিইনগু’ (মন্দির)। ১৫ মার্চ বেলা তিনটায় জাপান ফাউন্ডেশন ভবনের নিজস্ব অডিটরিয়ামে বক্তৃতা। মিলনায়তন ভর্তি দর্শক-শ্রোতার মধ্যে তিন-চারজন মাত্র বাঙালি। মনজু ভাই, প্লাসিড, এমদাদ। কিন্তু সেদিন জাপানি রীতিনীতি ভেঙে বক্তৃতা শুরু করতে হলো পাঁচ মিনিট দেরিতে। কী কারণ? মাসাকি হিরানো হাসিমুখে বললেন, ‘তোমাদের রাষ্ট্রদুত সাহেব আসবেন। তিনি অনুরোধ করেছেন, পাঁচ মিনিটের মধ্যে এসে পৌঁছাবেন। তিনি এলে যেন বক্তৃতা শুরু হয়।’ আমি একটু বিরক্তই হলাম। এই সেই ভদ্রলোক, বৈশাখী মেলায় আমাকে পাত্তাই দেননি। ভদ্রতা করেও একটি কথা বলেননি। যা হোক, পাঁচ মিনিট পরে আমি মিলনায়তনে ঢুকলাম। সঙ্গে সঙ্গে আমার সম্মানে উঠে দাঁড়ালেন মিলনায়তন ভর্তি মানুষ। প্রথম সারিতে দাঁড়িয়ে আছেন আমাদের রাষ্ট্রদুত। তাঁর পাশে পরবর্তীকালে বাংলাদেশে যিনি জাপানি রাষ্ট্রদুত সেই ভদ্রলোক। আমি দুজনকেই অভিবাদন জানালাম। বলতে লজ্জা লাগছে, তবু বলি, পরবর্তীকালে বাংলাদেশে জাপানি রাষ্ট্রদুত ভদ্রলোক আমার বক্তব্য শুনে এতটা মুগ্ধ হলেন, আমার সঙ্গে হ্যান্ডশেক করার সময় উচ্ছ্বসিত গলায় বললেন, ‘আরে, তোমার তো… প্রাইজ পাওয়া উচিত।’ সাওরি আমার পাশে দাঁড়িয়ে হাততালি দিচ্ছিল।
সাওরি আমাকে টোকিওর এক সাকুরা বাগানে নিয়ে গিয়েছিল। তিন-চার ঘণ্টা সেই ফুলের বনে আমরা ঘুরে বেড়ালাম। একদিন জাপানের ঐতিহ্যবাহী কাভুকি নাটক দেখাল। সেই রাতে বসন্তের হাওয়া বইছিল পুব দিক থেকে। সাওরি বলল, এই হাওয়াকে জাপানি ভাষায় বলে ‘সুমপু’।
টোকিও থেকে ওসাকা গিয়েছিলাম ‘সিনকেনসেন’-এ। মানে বুলেট ট্রেনে। সেই পথে দেখা হলো ‘ফুজি মাউনটেন’। জাপানিরা শ্রদ্ধা করে বলে ‘ফুজি সান’। তারিখ ১৭ মার্চ ২০০৬। আমার শেষ বক্তৃতা ছিল ‘সেনদাই’তে। সেনদাই লিটারারি মিউজিয়ামে। সেখানে ঢুকেই দেখি নুরজাহানসহ আমার অনেক বই সাজিয়ে রাখা। আর দেয়ালে রবীন্দ্রনাথের বিশাল এক ছবি। আমাকে দেখে বেশ একটা সাড়া পড়ল দর্শক-শ্রোতাদের মধ্যে। একজনও বাঙালি নেই, সবাই জাপানি। আমার সঙ্গে ছবি তোলার জন্য ভালো রকম ব্যগ্র দেখলাম তাদের। সাওরি দুরে দাঁড়িয়ে শুধু মিটিমিটি হাসে। এই মেয়ে আমাকে ‘কিয়োটো’ নিয়ে গিয়েছিল। কিয়োটো জাপানের প্রাচীনতম এক শহর। মন্দিরের শহর। ওই শহরে দার্শনিকদের হাঁটার জন্য আলাদা একটা রাস্তা আছে, রুপার মন্দির আছে, সোনার মন্দির আছে। সাওরি আমাকে ঘুরে ঘুরে সব দেখাল। সেবার জাপানে সাওরির সঙ্গে ১০টি দিন আমার জীবনের শ্রেষ্ঠতম সময়।
তৃতীয়বার
২০০৮ সালের আগস্টে আবার গিয়েছি জাপানে। সেবার শুধু টোকিওতেই। জাপানে প্রচুর বিক্রমপুরের লোক। বিক্রমপুর সোসাইটি খুবই নামকরা সংগঠন। তাদের অভিষেক অনুষ্ঠানের পাশাপাশি আমাকে ‘রাইটার্স অ্যাওয়ার্ড’ দেওয়া হবে। সেই অ্যাওয়ার্ড নিতে গেছি। এমদাদ নামে আমার এক প্রিয়ভাজন অন্য একটি মেলার আয়োজন করেছে। সেই মেলায়ও আমি প্রধান অতিথি। প্রথমে এমদাদের অনুষ্ঠান। তার সঙ্গে থাকলাম চার দিন। তারপর বিক্রমপুর সোসাইটির অনুষ্ঠান। সোসাইটির সভাপতি নুর আলী আমাকে নিয়ে তুলল অন্য হোটেলে। ঢাকা থেকে কিছু নাচ-গানের শিল্পী, অভিনয়শিল্পীও এসেছেন এই অনুষ্ঠান উপলক্ষে। দেলোয়ার নামে আমার অতিপ্রিয় একটি ছেলে সারাক্ষণ আমার সঙ্গে। সেবারের ভ্রমণে দিনগুলো কেটেছিল বিক্রমপুরের ছেলেদের সঙ্গেই, খুব আনন্দে।
আপাতত শেষবার
আবার সেই পি আর প্লাসিড। ২০০৯ সালের বৈশাখী মেলা উপলক্ষে প্লাসিড প্রথমবারের মতোই আমার একক বইয়ের স্টল করল। দ্বিতীয়বারের মতো ‘বিবেকবার্তা পুরস্কার’ দিল আমাকে। আমার হাতে পুরস্কার তুলে দিলেন মিসেস ক্যাথরিন মারিনো। ‘ফরেন করেসপনডেন্টস ক্লাব অব জাপান’-এর প্রেসিডেন্ট তিনি। ইকেবুকোরো নিশিগুচি পার্কের যেখানটায় আমাদের শহীদ মিনার, তার প্রায় লাগোয়া একটি মিলনায়তনে এক মনোরম সন্ধ্যায় ক্যাথরিন আমার হাতে এই পুরস্কার তুলে দিলেন। তিনি আমেরিকান, স্বামী জাপানিজ। ভদ্রমহিলা যতটা জাঁদরেল, ভদ্রলোকটি ততটাই নম্র। স্ত্রীর প্রতিভায় খুবই মুগ্ধ ভদ্রলোক। দেশে ফিরে দেখি প্রতিটি ইংরেজি দৈনিকে ক্যাথরিন আমার হাতে পুরস্কার তুলে দিচ্ছেন এই ছবি ছাপা হয়েছে।
জাপানে এক বক্তৃতায় দেশটিকে বলেছিলাম ‘আমার দ্বিতীয় দেশ’। বলার কারণ হচ্ছে, বাংলাদেশের বাইরে এই একটি মাত্র দেশ, চারবার গিয়েছি সেই দেশে, চারবারই সাহিত্যের জন্য কোনো না কোনোভাবে সম্মানিত হয়েছি আমি। তাকেশি কাইকো স্নারক বক্তৃতার মতো বিশাল সম্মান জুটেছে। সুতরাং জাপানের কাছে আমার ঋণ অনেক।
এবার সাওরির সঙ্গে দেখা হয়নি। সাওরির বিয়ে হয়ে গেছে। স্বামীর সঙ্গে সে এখন ওসাকায়। ফোনে কথা হয়েছে। ফেরার সময় খুব মনে পড়ছিল তার কথা। কিয়োটোর সোনার মন্দিরে সে আমাকে নিয়ে গিয়েছিল। মন্দিরের সামনে দাঁড়িয়ে আমার মনে পড়েছিল রবীন্দ্রনাথের সেই বিখ্যাত গান−
আজি বাংলাদেশের হূদয় হতে কখন আপনি
তুমি এই অপরূপ রূপে বাহির হলে জননী!
ওগো মা, তোমায় দেখে দেখে আঁখি না ফিরে! তোমার দুয়ার আজি খুলে গেছে সোনার মন্দিরেু
http://www.munshigonj.com/MGarticles/Milon/2009/SakuraMilon.html
মাওয়ায় যানজটে যাত্রীর মর্মান্তিক মৃত্যু
মুন্সীগঞ্জ ফুটবল লীগে সমাবেশ জয়ী
‘ভালোটাই টিকে থাকবে’ আশাবাদী একজন মানুষ আব্দুল কাদের
বাংলা নাটকের স্বর্ণযুগ বলতে আসলে কোন সময়টাকে বোঝায় এখনই তা বলা কঠিন। তবুও একটা সময় ছিল যখন ঘরে ঘরে টেলিভিশন ছিল না, গ্রামেগঞ্জে বিদ্যুৎ ছিল না, তবুও মফস্বলের মানুষ ব্যাটারি জোগাড় করে, একটা সাদাকালো টেলিভিশনের সামনে মাদুর পেতে জটলা করে বসে দেখত বাংলা নাটক। মনে পড়ে সেই দিনগুলোর কথা যখন বাকের ভাই আর বদি ভাইকে ঘিরে চলতো তুমুল আড্ডা আর আলোচনা। আলোচিত সেই বদি ভাই বর্তমান, অতীত আর ভবিষ্যতের নাটক ও ব্যাক্তিগত জীবনের কথা বলেছেন জলছবির কাছে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আব্দুল্লাহ্ নূহ
নাটকে আপনার বর্তমান ব্যস্ততা দিয়েই শুরু করি…
আব্দুল কাদের : আসলে ব্যস্ততার ব্যাপারটা ব্যক্তির ওপর নির্ভর করে। কম-বেশি ব্যাপারটা আমি হিসাবে ধরি না। আমার তিরিশটা নাটক যদি এক মাসে যায় এবং সেগুলো একটাও মনে রাখার মতো না হয় তবে কোনো ভালো কিছু হলো বলে আমি মনে করি না। আবার মাসে যদি মাত্র একটা নাটক যায় এবং সেটি হিট হয় তবে আমি মনে করি ওই একটি কাজই আমি হিসাবের মধ্যে ধরি। সংখ্যা নয়, আমি মানে বিশ্বাস করি।
এখন নাটকের ব্যাপারটা আমার কাছে কেমন যেন এলোমেলো মনে হয়। অসংখ্য নাটক হচ্ছে। এর মধ্যে পজেটিভ নাটক যে হচ্ছে না, তা নয়। কিন্তু একশটার মধ্যে সেই সংখ্যা দশটা হয়। তবে সেই দশটা কখন হয় তা অনেকে জানে না। তবে আমি ভালো নাটক করার মানসিকতা রাখি, করছি এবং সামনে আরও করব।
আপনি বলছিলেন যে, নাটকে আসার সময়টা জানতে চায় সবাই। কিন্তু এই বিষয়টিই আমি যদি একটু ভিন্নভাবে জানতে চাই যে, নাটকে আসার গল্পটা যদি বলেন?
আব্দুল কাদের : স্কুলজীবনে নাটক করেছি। সেটা অনেকেই করে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই আমার আসলে নাটক করা শুরু। এবং আমরা নাটক আসলে পেশাগতভাবেই শুরু করেছিলাম। আমরা নাট্যচক্র করেছি। আমি মহসীন হলের নাট্যসম্পাদক ছিলাম। সব হল মিলে আমরা নাট্যচক্র করি এবং স্বাধীনতাউত্তর খুব ভালো নাটক করি। সেলিম আল দ্বীন, আল মনসুর তখন লিখতেন। তারপর থিয়েটারে জয়েন করি। আব্দুল্লাহ্ আল মামুন, রামেন্দু মজুমদার তাদের সঙ্গে কাজ শুরু করি। এবং আমি একেবারে ছোট চরিত্র ভূমিকা থেকে শুরু করেছি। সেখান থেকে কাজ শুরু করে ধীরে ধীরে নিজের উত্তরণ ঘটিয়েছি। পরিচালক আব্দুল্লাহ্ আল মামুনের চোখে পড়ি। তখন এমন হয়েছে যে, আমাকে হিসাবে রেখে নাটকের স্ক্রিপ্ট করা হতো। সেভাবে আমি মঞ্চে কাজ করতে করতে এসেছি। আমি শিখে এসেছি। আর নাটকের শিক্ষা তো মঞ্চেই হয়।
আমার নাটকে আসার গল্প বলতে এটাই যে, অন্তরের তীব্র আকাক্সক্ষা। নাটকের প্রতি আকর্ষণ, সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধ। নাটক তো শুধু বিনোদন নয়, নাটক সমাজের দর্পণ। নাটকের মাধ্যমে সমাজে মেসেজ পৌঁছে দেয়া হয়।
এখানে একটা কথা এসেছে যে, আপনাকে ধরে নাটকের স্ক্রিপ্ট লেখা হতো। এ ব্যাপারটা আসলে কেন? অর্থাৎ ঠিক কোন চরিত্রটায় আপনাকে বিবেচনা করা হতো?
আব্দুল কাদের : আমার মনে হয় একটা জিনিস নাট্যকাররা আমার মধ্যে খুঁজে পান। সেটা হলো যে, আমি নাটকে কখনো অভিনয় করি না। আমি চরিত্রটাকে চিত্রায়ণ করি। এই যেমন এখন আপনার সঙ্গে কথা বলছি, এটাও একটা চরিত্র। এখানে আমি যদি অভিনয় করি বাস্তবতা বাদ দিয়ে, সেটা মেকি হয়ে যাবে। এভাবে আমি সব সময় রাস্তায় চলতে চলতে সমাজের বিভিন্ন চরিত্র অবলোকন করি। বিভিন্ন জায়গায় যাচ্ছি, বিভিন্ন রকম মানুষের সঙ্গে মিশছি। সব চরিত্র লক্ষ্য করি এবং সময়মতো কাজে লাগিয়ে দিই।
এবারে একটু ব্যক্তিগত প্রসঙ্গে আসি। পরিবারের সদস্য কয়জন?
আব্দুল কাদের : আমার স্ত্রী খায়রুন কাদের। তিনি গৃহিণী, বিউটিশিয়ান ও অভিনেত্রী । আমার এক পুত্র, এক কন্যা। পুত্রের নাম শফিউল আজম, কন্যার নাম মেহেরুন নাহার। পুত্র-কন্যা দুজনেই নিজ নিজ পেশায় নিয়োজিত।
আপনার পরিবারের সদস্যরা আপনার নাটকগুলোর চরিত্র নিয়ে কি মন্তব্য করে?
আব্দুল কাদের : ওরা খুব মজা পায়। বসে বসে দেখে আর হাসে। কারণ আমার তো দুইটা ভূমিকা। একটা হচ্ছে অফিসে আমার একটা রোল। এখানে একজন এক্সিকিউটিভ আমি। গম্ভীর হয়ে থাকতে হয়। আর অভিনয়ে আরেকরকম। এটা আসলেই মজার ব্যাপার।
এখানে অফিসের অর্থাৎ আপনার চাকরিজীবনের প্রসঙ্গ এলো। সেটা নিয়ে একটু কথা বলি, বাটাতেও তো অনেক বড় দায়িত্ব পালন করছেন, এ সম্পর্কে যদি কিছু বলেন…
আব্দুল কাদের : বাটাতে আমি যোগ দিই ১৯৭৯ সালে। তারপর ধাপে ধাপে আমি ওপরে উঠি। রিটেইল জোন ম্যানেজার, রিটেইল ম্যানেজার এভাবে মার্কেটিং ম্যানেজার, তারপর এখন কনসালট্যান্ট বিজনেস ডেভেলপমেন্ট। এমনকি আমার অবসর হয়ে গেছে ৩০ মার্চ ২০০৯তে। তারপরও ওরা আমাকে অনেক সম্মান দিয়ে রেখেছে। আমি একদিনও অবসর নিতে পারিনি। যেদিন রিটায়ারমেন্ট হয়েছে তারপর দিন থেকেই আবার অফিস করছি।
বাংলাদেশে এই কোম্পানিটাকে যে অনেকটা আমিই গড়ে তুলেছি। বাটা বাজার, বাটা শপÑ এগুলো সব আমার লিডারশিপে করা। সব মিলিয়ে আমি আমার অফিসিয়াল কাজটিকে খুব এনজয় করি। এবং আমি চাই আমার কোম্পানি আরও ভালো করুক।
আগে কোনটা হয়েছিল? চাকরি না নাটক?
আব্দুল কাদের : আমি ১৯৭৩ সাল থেকে নাটক করি। ১৯৭৬ সালে বিটপিতে জয়েন করি। ১৯৭৯ তে বাটাতে আসি। কাজেই সবার আগে আমি নাটক শুরু করি। কিন্তু আমি দুটোই চালিয়ে গেছি এবং যাচ্ছি। এ ব্যাপারে অনেকেই অনেক সময় প্রশ্ন করে যে, আপনি সময় পান কখন?
এখানে আমি আসলে যেটা করি তা হলো, আমি অনেক পরিকল্পনা করে কাজ করি। যেটা আমার পরিকল্পনার ছকের মধ্যে পড়ে না সেটা আমি করি না। যেমন শুটিংয়ের কাজ করি শুক্র-শনিবারে। আর অন্য সময় যদি বিশেষ দরকার হয় তবে আমি ছুটি নিই কোম্পানি থেকে। কোম্পানি আমাকে সেই সহযোগিতা করে।
আবার পরিচালক ও অভিনেতা-অভিনেত্রীরা আমাকে খুব সহযোগিতা করে। তারা জানে যে, আমার সময় কম। তাই তারা আমার শটগুলো আগে নিয়ে সহযোগিতা করে।
আপনাকে তো বাটা ছাড়ছে না। বাটার জন্য তাহলে আপনারও নিশ্চয় বিশেষ পরিকল্পনা আছে?
আব্দুল কাদের : বাটার জন্য আমি যেটা করছি যে, ব্যবসার সমৃদ্ধিতে কাজ করা, আরও বাটা বাজার এবং বড় বড় বাটার দোকান করা, তারপর হাশ পাপিস। বাংলাদেশে বিশেষভাবে মার্কেটিং করছি আমরা। এমনিতে বাটার দোকানে বিক্রি করতামই আমরা, এখন হাশ পাপিসের আলাদা এক্সক্লুসিভ শোরুম করছি। গুলশানে একটা করেছি, বসুন্ধরা মলে একটা করেছি এবং ২০১১ সালের মধ্যে ২০টা হাশ পাপিস স্টোর করার পরিকল্পনা করেছি। আমরা বড় আকারের দোকান করব। বসুন্ধরা মলে যেমন করেছি ৭তলায় ১২ হাজার বর্গফুট জায়গা নিয়ে। যমুনা মলে চেষ্টা করছি। এভাবে বড় আকারের দোকান করার চেষ্টা করছি। যাতে ভালো ইমেজটা ধরে রাখা যায়। ব্র্যান্ড নিয়ে কাজ করছি। এগুলো প্রফেশনাল মার্কেটিং এপ্রোচ।
হাশ পাপিস তো ইন্টারন্যাশনাল ব্র্যান্ড?
আব্দুল কাদের : হ্যাঁ, এটা আমেরিকান কোম্পানি। বিশ্বের প্রায় ১০০টি দেশে তারা মার্কেটিং করে। বাংলাদেশে আমরা লাইসেন্সপ্রাপ্ত।
আবার একটু নাটকে আসি। নাটক নিয়ে আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
আব্দুল কাদের : ভালো নাটক করার মানসিকতা তো আছেই। তবে আমার একটা পরিকল্পনা আছে। এমন একটা সিরিয়াল করতে চাই যেটা মানুষকে খুব আনন্দ দেবে। কারণ আনন্দ দেয়াটা খুব কঠিন কাজ। আমি অনেক নাটকেই দেখেছি আনন্দ দেয়ার চেষ্টা করা হয় কিন্তু হয় না। কারণ এটা একটা বিশেষায়িত ব্যাপার, যা সবাই পারে না। সে জায়গাটায় আমার যে অভিজ্ঞতা ও পরিচিতি আছে তার মাধ্যমে আমি জানি যে, আমার নিজস্ব উদ্যোগে নিজের প্রোডাকশনে আমাকেই করতে হবে। এ রকম একটা পরিকল্পনা আমার আছে।
এ যাবৎ আপনার অভিনীত চরিত্রগুলোর মধ্যে আপনার কাছে কোন চরিত্রটা সেরা বলে মনে হয়?
আব্দুল কাদের : আমি চোখ বন্ধ করে বলতে পারি, টেলিভিশনে ‘কোথাও কেউ নেই’-এর বদি ভাই। এ ছাড়াও আমি অনেক ভালো নাটক করেছি। যেমন, আব্দুল্লাহ আল মামুনের অনেক নাটক, হুমায়ূন আহমেদের, ফেরদৌস হাসান, ডিএ তায়েব, ইমদাদুল হক মিলন ও আরও অনেক নাট্যকারের নাটক করেছি। কিন্তু ওই নাটকটা মানুষের মনে দাগ কেটে গেছে আরকি।
মঞ্চেও আমি অনেক নাটকই করেছি কিন্তু মেরাজ ফকিরের মা নাটকটা আমার কাছে মনে হয়েছে বেশি ইম্প্যাক্ট ফেলেছে। চলচ্চিত্র আমি বেশি করিনি। কিন্তু রং নাম্বার নামে একটা সিনেমায় অভিনয় করেছি। সেখানে আমার চরিত্রটা ছিল ‘বড় ভাই’-এর। কিছু বড় ভাই থাকে না যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকে। কখনো বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে যায় না। সবার সহযোগিতায় এগিয়ে যায় এবং সহযোগিতা করতে গিয়ে নানারকম মজার ঝামেলা সৃষ্টি করে ফেলে। সেটা ছিল একটা মজার চরিত্র। এ রকম অনেক ভালো কাজ করেছি।
এমন কিছু মুখ থাকে যা দেখলেই মনের মধ্যে এক ধরনের প্রশান্তি চলে আসে, এমন কিছু মুখ থাকে যেগুলো এমনিতেই যেন মনের মধ্যে খুশি ছড়িয়ে দেয়, আনন্দ লাগে। দর্শক আপনার মধ্যে সে রকম একটি মুখ দেখে। আপনি সেই জায়গাটিতে কাজও করছেন। আপনার কি মনে হয় এ রকম মুখ আমাদের মিডিয়াতে যথেষ্ট আছে?
আব্দুল কাদের : এটা একটা দারুণ ব্যাপার। আমাদের মাঝে কিছু কিছু এ রকম আছেন। তবে আমাদের অভিনয়ের মধ্যে একটা নিয়ন্ত্রণ রাখতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে যে, হাসির নাটক মানেই জোর করে হাসানোর চেষ্টা নয়। খুব একটা রঙিন পোশাক পরে ফেললাম, কিছুটা চিৎকার করে অভিনয় করলাম, একটু লাফালাফি করলাম এতে লোক হাসে না। একটু নিয়ন্ত্রিত অভিনয় করতে হবে।
আমি জানি এ রকম ভালো প্রতিভা আমাদের মধ্যে আছে এবং আমি তাদের দিয়ে কাজ করাতে পারব। আমার প্রতি তাদের শ্রদ্ধাও আছে যথেষ্ট।
আপনি বর্তমান নাটকে অস্থির সময়ের কথা বলছিলেন, আপনাদের সময়ের সঙ্গে এখনকার সময়ের পার্থক্যটা কী?
আব্দুল কাদের : এখন প্রচুর নাটক হচ্ছে। এর মধ্যে ভালো নাটকও কিন্তু হচ্ছে। যেহেতু অনেক নাটক হচ্ছে সেহেতু যেগুলো খুব ভালো সেগুলো অনেকেই মিস করছে। এখানে আমাদের টিভি চ্যানেলগুলোও বিজ্ঞাপন প্রচার করছে বেশি। করতে হচ্ছে। আমাকে যদি এর সমাধানের কথা বলেন তবে বলব যে, এত নাটক হওয়া উচিত না। নাটক করা উচিত স্ক্রিপ্ট দেখে বাছাই করে। একজন অভিনেতা-অভিনেত্রী কত অভিনয় করবে? সকালে একটা চরিত্রে অভিনয় করছে, রাতে আরেকটা চরিত্রে অভিনয় করছে। একদিনে দুটা চরিত্রে অভিনয় করা সম্ভব না। ক্লান্তির একটা ব্যাপার আছে। এর পরের ব্যাপারটি হলো, ভালো স্ক্রিপ্ট। এমনকি অতীতের হিট করা ভালো নাট্যকারেরা এখন সিনে নাই। তাদেরকে ব্যবহার করতে হবে। আগে দেখতাম প্রোডিউসাররা গিয়ে একটা ভালো নাট্যকারের কাছে বসত ভালো স্ক্রিপ্টের জন্য। তাদের অনুরোধে নাট্যকাররা লিখতেন সুন্দর করে। কিন্তু এখন যেন কিছুটা এলোমেলো। এখন যেহেতু সংখ্যা বেড়েছে, সেহেতু মান একটু মার খাচ্ছে। সমাধানটা একপর্যায়ে এমনিতেই বের হয়ে আসবে। ভালোটাই টিকে থাকবে।
ইয়াজ উদ্দিনকে মামলায় জড়ানোর কোনো পথ পাচ্ছে না বিএনপি
পদ্মা বহুমুখী সেতুর সঙ্গে রেলের গুরুত্ব
এস.এম গোলাম মুস্তফা
দেশ ও জাতির আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন সুষ্ঠু ও সমন্বিত সকল ধরনের যোগাযোগ ব্যবস্থা, কিন্তু পদ্মা নদী বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে রাজধানীসহ মূল ভূখণ্ড হতে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। ফলে এ অঞ্চলে প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ আধুনিক যোগাযোগের আশানুরূপ উন্নয়নের ছোঁয়া পায়নি, যেমন রেললাইনসহ উন্নত সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা। অথচ, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে রয়েছে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সামুদ্রিক বন্দর (মংলা) এবং সর্ববৃহৎ বেনাপোল স্থল বন্দর। তাই এই অঞ্চলের সাথে রাজধানীসহ অন্যান্য অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নের জন্য ঢাকা-মাওয়া-খুলনা এবং বরিশাল মহাসড়কের উন্নয়ন যদি ব্যাপকভাবে করা হয় এবং পদ্মা নদীর উপর রেললাইনসহ বহুমুখী সেতু নির্মিত হলে রাজধানী ঢাকাসহ মূল ভূখণ্ডের সাথে দক্ষিণাঞ্চলের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হবে। তাহলে সমগ্র দেশ সড়ক ও রেলওয়ে নেটওয়ার্কে চলে আসবে এবং যোগাযোগের ক্ষেত্রে এক বিপ্লব ঘটবে। উল্লেখ্য, প্রতি বছর এ অবহেলিত অঞ্চলের হাজার হাজার মানুষ লঞ্চডুবি ও ফেরি পারাপারের অবর্ণনীয় দুর্ভোগ হতে বেঁচে যাবে। তাছাড়া প্রতি বছর শত শত কোটি টাকা ফেরি চলাচলের জন্য ও নদী ড্রেজিং বাবদ যে ব্যয় হয়, তা সাশ্রয় হবে।
এ সেতুটির গুরুত্ব এমনই যে রাজধানীসহ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা-উপজেলা ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে যাতায়াতের দূরত্ব, সময় ও অর্থের অভাবনীয় হ্রাস পাবে, এর কারণ হলো পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া হয়ে ঢাকা-বরিশাল শহরের দূরত্ব ২৭৭ কিলোমিটার, আর মাওয়া হয়ে দূরত্ব ১৭৬ কিলোমিটার। বর্তমানে পাটুরিয়া হয়ে ঢাকা-খুলনার দূরত্ব ৩৪৬ কিলোমিটার, পক্ষান্তরে মাওয়া হয়ে এর দূরত্ব ২৪৫ কিলোমিটার। ঢাকা-বেনাপোলের দূরত্ব পাটুরীয়া হয়ে ২৭০ কিলোমিটার, যা মাওয়া হয়ে এর দূরত্ব ১৭৫ কিলোমিটার। পাটুরিয়া হয়ে মাদারিপুর শহরের দূরত্ব ২২০ কিলোমিটার যা মাওয়া হয়ে দাঁড়ায় মাত্র ৮০ কিলোমিটার। তাছাড়া মাওয়া হয়ে ঝিনাইদহ, নড়াইল, যশোহর, চুয়াডাঙ্গা, সাতক্ষীরা এবং মাগুরার দূরত্ব প্রায় ১০০ কিলোমিটার ও গোপালগঞ্জসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সকল জেলা শহর ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানের দূরত্ব ১০০-১৫০ কিলোমিটার কম হবে। বঙ্গবন্ধু বহুমুখী সেতু নির্মাণের ফলে দেশের উত্তরাঞ্চলের অবকাঠামোর যে অভাবনীয় উন্নতি হচ্ছে, তেমনি মাওয়ায় পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মিত হলে এ অবহেলিত অঞ্চলের অবকাঠামোর ব্যাপক উন্নতি হবে। এ ব্যতিত ঢাকার গেণ্ডারিয়া অথবা ফতুল্লা রেলস্টেশন হতে বুড়িগঙ্গা ও ধলেশ্বরী নদীর উপর দিয়ে মাওয়া হয়ে রেললাইন নির্মাণ করে বরিশাল ও মংলা বন্দরের সাথে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করা হলে পণ্য আনা-নেয়াসহ জনগণের চলাচলের সময় ও ব্যয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কমে যাবে। তাছাড়া রেললাইনবিহীন যথা-মুন্সীগঞ্জ, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, বরিশাল, ঝালকাঠি, বরগুনা, গোপালগঞ্জ ও বাগেরহাটসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার সাথে রেললাইন নির্মাণসহ ফরিদপুর-পুকুড়িয়া রেললাইনটি ভাঙা পর্যন্ত বর্ধিত করে পদ্মা বহুমুখী সেতু রেললাইনের সঙ্গে ভাঙ্গায় সংযুক্ত করে সরাসরি টেকেরহাট নিয়ে একটি শাখা গোপালগঞ্জ হয়ে মংলা এবং অপরটি মাদারীপুর জেলার উপর দিয়ে বরিশাল, পটুয়াখালি ও বরগুনা নেয়া হলে রেল যোগাযোগের ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক সৃষ্টি হবে। এখানে উল্লেখ্য যে, দীর্ঘ দিনের প্রস্তাবিত জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা-লাকসাম কডলাইন নির্মাণ করে পদ্মা সেতুর রেললাইনের সাথে সংযুক্ত করে দিলে চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে ঢাকার দূরত্ব ৮০ কিলোমিটার এবং মংলা বন্দরসহ অন্যান্য জেলা শহরের সাথে ১৫০ হতে ২০০ কিলোমিটার দূরত্ব কমে যাবে। তাছাড়া, চট্টগ্রামের নাজিরহাট হয়ে কক্সবাজার রেললাইন নির্মাণ করে এবং কুলাউড়া হয়ে শাহবাজপুর পর্যন্ত রেললাইনটি সংস্কার করা হলে ও যশোহর-ফরিদপুর আরেকটি কডলাইন নির্মাণ করে বেনাপোলের সাথে যদি সরাসরি সংযোগ স্থাপিত হয়, তাহলে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে বিরাট এক বিপ্লব সাধিত হবে। এছাড়া ভারত-বার্মার সাথে রেলওয়ের মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নতিসহ ট্রান্স-এশিয়া রেললাইনের সম্প্রসারণ ঘটবে। এর ফলে বেনাপোলের সঙ্গে ঢাকা-চট্টগ্রামসহ দেশের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ জেলা ও উপজেলার দূরত্ব অর্ধেকে নেমে আসবে এবং সময়, ব্যয়, জাতীয় নিরাপত্তা ও বিভিন্ন জাতীয় পণ্য পরিবহনে মারাত্মক সাফল্য বয়ে আনবে। এখানে উল্লেখ্য যে, ঢাকা-লাকসাম কডলাইন নির্মাণ করা হলে টঙ্গী-ভৈরল ডাবল লাইনের গুরুত্ব একেবারেই থাকবে না। এক্ষেত্রে টঙ্গী-ভৈরব ডাবল লাইন নির্মাণ না করে এ অর্থ জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা-লাকসাম কডলাইন নির্মাণে ব্যয় করা হলে তাতে দেশ ও জাতি উপকৃত হবে এবং টঙ্গী-ভৈরব ডাবল-লাইন নির্মাণের ব্যয় নিয়ে ভবিষ্যতে আর প্রশ্ন দেখা দিবে না। এছাড়াও বর্তমানে দেশের খাল-বিল, নদী-নালা ইত্যাদির নাব্যতা হ্রাস পাওয়ায় পূর্বের ন্যায় রেললাইন ও ব্রীজ নির্মাণের ব্যয় অনেক কম হবে। এখানে উল্লেখ্য যে, বৃটিশ শাসনামলে গভীর নদী-নালা ও খাল-বিল অতিক্রম করে রেললাইন নির্মাণ করেছিল, যা বাংলাদেশ রেলওয়েতে ভ্রমণ করলেই অনায়াসে বোঝা যাবে। সেক্ষেত্রে দক্ষিণাঞ্চলে রেললাইন নির্মাণ করা মোটেই অসম্ভব ছিল না, গভীর নদী-নালা ও খাল-বিলের অজুহাত দেখিয়ে বৃটিশ সরকার এ অঞ্চলে রেললাইন নির্মাণ করেনি।
পরবর্তীতে পাকিস্তান সরকার ফরিদপুর হতে বরিশাল পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণের একটি বৃহৎ প্রকল্প গ্রহণ করেছিল। এ প্রকল্পের অধীনে জরিপের মাধ্যমে বরিশাল পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণের জায়গা নির্ধারণপূর্বক পাকিস্তান ইস্টার্ন রেলওয়ে কর্তৃক পিলারও স্থাপন করা হয়েছিল। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর এ প্রকল্পের আওতায় ফরিদপুর হতে পুকুড়িযা পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণ করে ট্রেন চলাচল করা হয়েছিল, যা বিগত সরকারের সময় তা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এ ব্যতীত পুকুড়িয়া হতে ভাঙ্গা পর্যন্ত রেললাইনের জন্য মাটি কাটার কাজও সম্পন্ন করেছিল। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুরও এ প্রকল্প বাস্তবায়নের স্বপ্ন ছিল, কিন্তু দুঃখের বিষয়, ১৯৭৫ সালে জাতির জনক শহীদ হওয়ার পর এ প্রকল্পের কাজ নানা ষড়যন্ত্রে ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায়। এ প্রকল্পের আওতায় যে সকল অফিস, বাসাবাড়ি ও জায়গা-জমিসহ শত শত কোটি টাকার বিপুল পরিমাণ সম্পদ ছিল, তাও লুটপাট হয়ে আর অবশিষ্ট নেই। তাছাড়া এ পদ্মা সেতু উপলক্ষে দক্ষিণ অঞ্চলের সড়কপথের ব্যাপক উন্নয়ন হলে সুন্দরবন ও কুয়াকাটাকে কেন্দ্র করে কুতুবদিয়া, মহেশখালি, হাতিয়া ও কক্সবাজার হয়ে সেন্টমার্টিন পর্যন্ত বিশাল আন্তর্জাতিক পর্যটন শিল্প গড়ে উঠবে। এছাড়া বেনাপোল, ভোমরা ও দর্শনা স্থলবন্দর থেকে বিপুল পরিমাণ পণ্য রেল ও সড়ক পথে পরবহন করা সহজতর হবে। এ ব্যতীত ঢাকা-মাওয়া সড়কের সাথে সংযোগ রেখে রাজধানীর উত্তর ও দক্ষিণ দিকে দুটি বাইপাস সড়কের ব্যবস্থা করলে বেনাপোল ও মংলা থেকে চট্টগ্রাম ও দেশের অন্যান্য স্থানে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে সময় কম, দূরত্ব ও ব্যয়সহ রাজধানীর উপর দিয়ে যান চলাচলের চাপ অনেক হ্রাস পাবে এবং যানজটও কমে যাবে। এ ব্যতীত পদ্মা বহুমুখী সেতুর কারণে মংলা বন্দরের সাথে ঢাকাসহ অন্যান্য অঞ্চলের যোগাযোগ স্থাপিত হলে এতে চট্টগ্রাম বন্দরের উপর চাপও কমবে, ফলে মংলা বন্দরের কার্যক্রম বেড়ে যাবে। এছাড়া সার্কভুক্ত দেশ নেপাল এবং ভুটান বাংলাদেশে পঞ্চগড় ও দিনাজপুর জেলার স্থলবন্দরসমূহসহ রেলপথ ও সড়কপথ ব্যবহারের মাধ্যমে তাদের পণ্য পরিবহন করতে পারবে, এবং সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পাবে। এতে যে শুধু বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পাবে তা নয় কিন্তু সমগ্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সাথে সরাসরি ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণ ঘটবে। উপরন্তু এ সেতুর উপর দিয়ে গ্যাস এবং বিদ্যুৎ সরবরাহের মাধ্যমে এ অঞ্চলের মানুষ ভীষণভাবে উপকৃতসহ বিভিন্ন ধরনের শিল্প-কারখানা গড়ে উঠবে। ফলে বেকার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। তাছাড়া মাছ ও তরিতরকারিসহ কাঁচামাল, অন্যান্য পণ্যসামগ্রী ঝুঁকিমুক্ত ও সহজতর পরিবহনের সুবিধা সৃষ্টি হবে।
উল্লেখ্য যে, এ সেতুটি হবে দক্ষিণ বাংলার জনগণের প্রাণ কিন্তু বিগত দিনে এটি মাওয়ায় নির্মাণ নিয়ে প্রচুর ষড়যন্ত্র/ টালবাহানা হয়েছে যা দেশবাসী অবগত আছেন। যা হোক, বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা প্রথমেই বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে এবং এ সেতুটি নির্মাণের সর্বোচ্চ পদক্ষেপ নেন। এ কারণে বর্তমান সরকারের মাননীয় যোগাযোগ মন্ত্রী আলহাজ্ব সৈয়দ আবুল হোসেন সাহেবকে দায়িত্ব প্রদান করেন। মন্ত্রী মহোদয়ের অক্লান্ত পরিশ্রমে ইতোমধ্যে এ সেতুটি নির্মাণের প্রাথমিক কাজ অনেক দূর এগিয়ে নিয়েছেন। সেতুটির নকশা ও জমি অধিগ্রহণের কাজ শেষ হওয়ার পথে বলে জানা গেছে। মাননীয় মন্ত্রী মহোদয় উল্লেখ করেছেন যে, এ সেতুটির উপর দিয়ে রেললাইনসহ অন্যান্য সুবিধাদি থাকবে এবং এ সরকারের আমলেই এর কাজ শেষ হবে বলে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। তিনি আরো উল্লেখ করেছেন যে, এ সেতুটি হবে দৃষ্টিনন্দন ও রুচিসম্পন্ন। তাই সেতুটির নির্মাণ কাজের অগ্রগতিতে দক্ষিণ বাংলার জনগণের পক্ষ হতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও মাননীয় যোগাযোগ মন্ত্রী তাঁদের জানাই প্রাণঢালা অভিনন্দন ও মোবারকবাদ।
উল্লেখ্য যে, এ সেতুটি নির্মিত হবে মাওয়া-জাজিরার মধ্যে এবং দৈর্ঘ্য হবে ৫.৫৮ কিলোমিটার, প্রস্থ রেললাইনসহ ২৫ মিটার এবং সংযোগ সড়ক প্রায় ১৩ কিলোমিটার ও ব্যয় হবে প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা।
[লেখক: সাবেক রেলওয়ে কর্মকর্তা]