Sunday, July 05, 2009

মুন্সীগঞ্জ জেলা বিএনপি’র পাল্টাপাল্টি আহ্বায়ক কমিটির প্রস্তাব

মুন্সীগঞ্জ জেলা বিএনপি’র আহ্বায়ক কমিটি নিয়ে পাল্টাপাল্টি প্রস্তাব অনুমোদন জমা দেয়া হয়েছে। আহ্বায়ক মিজানুর রহমান সিনহার জমা দেয়া ৫১ সদস্যের কমিটি মনঃপুত না হওয়ায় শামসুল ইসলাম গ্রুপ পাল্টা কমিটি অনুমোদনের জন্য জমা দিয়েছে। এ নিয়ে উভয় গ্রুপের দ্বন্দ্ব এখন নেতাকর্মীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য এম শামসুল ইসলাম গ্রুপের জমা দেয়া কমিটিকে পকেট কমিটি হিসেবে দাবি করেছে তৃণমূল নেতাকর্মীদের একাংশ। এই কমিটিতে রয়েছে এম শামসুল ইসলাম, যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে তার ছেলে সাইফুল ইসলাম, শহর বিএনপি’র সভাপতি যুগ্ম আহ্বায়ক শাহজাহান সিকদার, তার বোন রহিমা বেগম সিকদার, যুগ্ম আহ্বায়ক কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক দলনেতা মীর সরফত আলী সপু ও তার ভাই মীর নেওয়াজ আলীর নাম। পরিবারের সদস্যদের কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করায় দারুণ ইমেজ সঙ্কটে পড়েছেন শামসুল ইসলাম। ওদিকে আহ্বায়ক সাবেক স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী মিজানুর রহমান সিনহার কমিটিতেও অনেক সিনিয়র নেতার স্থান হয়নি। এ কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক শাহজাহান সিকদার, যুগ্ম আহ্বায়ক সাইফুল ইসলাম বাবু, যুগ্ম আহ্বায়ক রহিমা বেগম সিকদার ও যুগ্ম আহ্বায়ক মীর সরাফত আলী সপু স্বাক্ষরিত পাল্টা কমিটিকে আহ্বায়ক মিজানুর রহমান সিনহাসহ ৯ যুগ্ম আহ্বায়কের নাম অপরিবর্তিত রেখে ৫১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি জমা দেয়া হয় গত ২৬শে জুন। তবে ৫১ সদস্যের উভয় কমিটিতে ২৩ জনের নামের মিল রয়েছে। এম শামসুল ইসলাম ও শাহজাহান সিকদার এবং মিজানুর রহমান সিনহা ও জেলা বিএনপি’র সাবেক সভাপতি যুগ্ম আহ্বায়ক আবদুল হাই গ্রুপের সৃষ্ট দ্বন্দ্বের প্রভাব বিস্তার ও ক্ষমতার লড়াই নিয়ে এ পাল্টাপাল্টি কমিটি গঠিত হয়েছে বলে নেতাকর্মীরা জানান।

প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্বগ্রহণ, ইয়াজউদ্দিনের বৈধতার বিষয়টি নিষ্পত্তি হয়নি আড়াই বছরেও

অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ রাষ্ট্রপতি থাকাকালে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্বগ্রহণের বৈধতার বিষয়টি এখনো নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে উচ্চ আদালতে। দীর্ঘ আড়াই বছর পার হলেও বিষয়টির এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। তবে এর সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রশ্ন জড়িত থাকায় এবং দেশের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে দ্রুত এ সংক্রান্ত রিট আবেদনটির নিষ্পত্তি হওয়া দরকার বলে মনে করছেন আইনজীবীরা। ২০০৬ সালের ২৬ নভেম্বর ১৪ দলের সমন্বয়ক ও আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল জলিলসহ সমমনা রাজনৈতিক দলের (১৪ দলীয় জোট) ১০ প্রতিনিধি হাইকোর্টে এ বিষয়ে রিট আবেদন করেন। রিটের প্রাথমিক শুনানি শেষে আদেশ দেয়ার আগ মুহূর্তে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ জে আর মোদাচ্ছির হোসেন রিটগুলোর সব কার্যক্রম স্থগিত করেন। এ নিয়ে সুপ্রিমকোর্টে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে। এর পর আর এই রিটের কোনো শুনানি হয়নি।
২০০৬ সালের ২৯ অক্টোবর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নেন। এর দুই দিন পর ৩১ অক্টোবর তার অধীনে ১০ উপদেষ্টা শপথ নেন। তাদের শপথ অনুষ্ঠানে বিএনপি-জামায়াতসহ চারদলীয় জোটের নেতারা উপস্থিত থাকলেও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের কেউ উপস্থিত ছিলেন না। অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিনের রাষ্ট্রপতির অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নেয়ার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জলিল, জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু, ওয়ার্কার্স
পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেননসহ ১৪ দল নেতা পঙ্কজ ভট্টাচার্য, মেজর (অব.) আবদুল মান্নান, নুরুল ইসলাম, দিলীপ বড়–য়া, মুন্সি আবদুল লতিফ, মিছবাহুর রহমান চৌধুরী ও জি এম কাদের তিনটি রিট দায়ের করেন।
রিট আবেদনগুলোতে বলা হয়, সংবিধানের ৫৮/গ অনুচ্ছেদে অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিদের মধ্যে যিনি সর্বশেষ অবসর নিয়েছেন এবং এই অনুচ্ছেদের অধীনে প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার যোগ্য রাষ্ট্রপতি তাকে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেবেন। তবে এমন অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি পাওয়া না গেলে বা তিনি প্রধান উপদেষ্টার পদ নিতে অসম্মতি জানালে তার পূর্বে অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিকে প্রধান উপদেষ্টার পদে নিয়োগ দেয়া হবে। ৫৮/গ(৪) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, যদি কোনো অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি পাওয়া না যায় বা তিনি প্রধান উপদেষ্টার পদ গ্রহণে অসম্মতি জানান তবে রাষ্ট্রপতি আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের মধ্যে যিনি সর্বশেষ অবসর গ্রহণ করেছেন এবং এই অনুচ্ছেদের অধীনে প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার যোগ্য তাকে নিয়োগ দেবেন। তবে এমন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিকে পাওয়া না গেলে বা তিনি অসম্মতি জানালে তার অব্যবহিত পূর্বে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিকে নিয়োগ দেবেন। ৫৮/গ(৫) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত কোনো বিচারপতিকে পাওয়া না গেলে বা অসম্মতি জানালে রাষ্ট্রপতি যতদূর সম্ভব সব প্রধান রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করে প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার যোগ্য এমন ব্যক্তিকে প্রধান উপদেষ্টা পদে নিয়োগ দেবেন। এই বিধানগুলো কার্যকর করা না গেলে রাষ্ট্রপতি এই সংবিধানের অধীনে তার নিজ দায়িত্বের অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ এই বিধানগুলো পর্যায়ক্রমে অনুসরণ না করে নিজেই প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ফলে অবৈধ ও অসাংবিধানিকভাবে তিনি রাষ্ট্রপতির অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন বলে উল্লেখ করা হয় রিট আবেদনে।
রিট আবেদনে আরো বলা হয়, সাবেক প্রধান বিচারপতি কে এম হাসান প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণে অপারগতা প্রকাশ করেন। সংবিধান অনুয়ায়ী তার পূর্ববর্তী প্রধান বিচারপতি মাহমুদুল আমীন চৌধুরীকে এই পদ গ্রহণের আহ্বান জানাতে হবে। কিন্তু তাকে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগের কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের মধ্য থেকে প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগেরও কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা না করেই রাষ্ট্রপতি প্রফেসর ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
এছাড়া রিট আবেদনগুলোতে আরো বলা হয়, সংবিধানের ৫৮/খ(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রধান উপদেষ্টা অপর ১০ উপদেষ্টার সঙ্গে আলোচনা করে রাষ্ট্রের নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন। কিন্তু প্রধান উপদেষ্টা অপর উপদেষ্টাদের সঙ্গে আলোচনা না করেই সব সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। এমনকি তার সিদ্ধান্তের বিষয়ে অপর উপদেষ্টাদের অবহিত পর্যন্ত করা হয়নি। সংবাদ মাধ্যম ও উপদেষ্টাদের বক্তব্যে এ বিষয়টি সুস্পষ্টভাবেই প্রতীয়মান হচ্ছে। ফলে তিনি সংবিধান পরিপন্থীভাবে প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন এবং দায়িত্ব পালন করছেন।
সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি এ এফ এম মেজবা উদ্দিন আহমেদ এ বিষয়ে বলেন, তৎকালীন রাষ্ট্রপতি প্রফেসর ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ যথাযথভাবে সংবিধান অনুসরণ না করেই প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। তিনি প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের জন্য পর্যায়ক্রমে যে সব ব্যবস্থা অনুসরণ করার বিধান রয়েছে তা অনুসরণ করেননি। এ বিষয়টি এখন সবার কাছেই প্রমাণিত। কিন্তু রিট তিনটি এখনো বিচারাধীন থাকায় আদালতের মাধ্যমে এ বিষয়টি এখনো সুরাহা হয়নি। এই রিট তিনটির সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রশ্ন জড়িত। তাই আদালতের মাধ্যমে এই রিটের নিষ্পত্তি হওয়া জরুরি। এ কারণে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে দ্রুত রিট আবেদনটির নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন।

পদ্মায় অস্বাভাবিক পানি বৃদ্ধি

মাওয়া-কাওড়াকান্দি রুটে ভারী যান বন্ধ
গত ২৪ ঘণ্টায় পদ্মা নদীতে ৪০ সেন্টিমিটার পানি বৃদ্ধি পেয়ে ও টানা বৃষ্টিতে যান পারাপারে মারাত্মক অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। পানি বৃদ্ধির ফলে ও টানা বৃষ্টিতে এ রুটের ৩টি ঘাট প্লাবিত হওয়াসহ সবগুলো ঘাট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ও পদ্মা নদীতে ঢেউসহ স্রোত থাকায় বৃহস্পতিবার রাত থেকেই এরুটে ভারী যানবাহন বিশেষ করে ভারী পণ্যবাহী ট্রাক পারাপার বন্ধ রয়েছে। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত মাওয়ার ২টি ফেরি ঘাট এখনো অচল রয়েছে। ফলে শুধুমাত্র একটি ঘাট সচল থাকায় যানবাহন লোড আনলোডের ক্ষেত্রে দেড় থেকে দুঘণ্টা সময় লাগছে। এর সঙ্গে ডাম্ব ফেরি রানীক্ষেত ও রানীগঞ্জ বিকল থাকায় যানজট পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। উভয় পাড়ে যাত্রীবাহী পরিবহনসহ প্রায় সাড়ে চার শতাধিক যানবাহন আটকা পড়েছে।

ট্রাক চালকরা জানান, গত বৃহস্পতিবার দুপুরের পর থেকে কাঁচামালবাহী ট্রাক, রফতানিমুখী ট্রাকসহ সব ট্রাক পারাপার বন্ধ রয়েছে।

বিআইডব্লিউটিএ সহকারী ম্যানেজার শাহনেওয়াজ চৌধুরী বলেন, অতি বৃষ্টি ও পদ্মায় পানি বৃদ্ধির ফলে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে আমরা জোড় প্রচেষ্টা চালাচ্ছি।

ফখরুদ্দীন সরকারের কার্যক্রম তদন্তে উচ্চ পর্যায়ের কমিটি হচ্ছে

ফখরুদ্দীনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ের সকল অবৈধ কার্যক্রম তদন্তে উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করার বিষয়ে সরকারের মধ্যে আলোচনা চলছে। মাইনাস টু ফর্মুলা, শীর্ষনেত্রীদের খাবারে বিষ, নতুন রাজনৈতিক দল গঠন ও অর্থ সরবরাহ, রাজনৈতিক নেতাদের ওপর নির্যাতন, শিল্পপতিদের কাছ থেকে অর্থ আদায় এবং অতি উৎসাহী গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করার প্রক্রিয়া চলছে। আগামীকাল সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠকে এসব বিষয়ে আলোচনা হতে পারে বলে সরকারের একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী জানিয়েছেন। তিনি জানান, বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ের উপদেষ্টাসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের অভিযোগ খতিয়ে দেখার কাজ চলছে। ইতোমধ্যে কয়েকজন উপদেষ্টার দুর্নীতি তদন্তের বিষয়ে সংসদীয় উপকমিটি গঠন করা হয়েছে। সরকার চাচ্ছে বিগত সরকারের সময়ে সংঘটিত ঘটনাসমূহের সঠিক তথ্য প্রকাশ করতে। তিনি বলেন, ওই সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অনেক নেতাদের ওপর নির্যাতন হয়েছে- যা আগে কখনও ঘটেনি। কেউ যদি এ বিষয়ে কমিশন গঠনের দাবি করে তাহলে সরকার হয়তো মতামত নিয়ে তা করতে পারে। সরকারের অপর একজন নীতিনির্ধারক বলেন, ফখরুদ্দীনের সময়ে সরকারের ছত্রছায়ায় কয়েকটি রাজনৈতিক দলের জš§ হয়েছিল। তাদের পেছনে তারা কত টাকা ব্যয় করেছে, কোন কোন উৎস থেকে তা সরবরাহ করা হয়েছে তা চিহ্নিত করার প্রক্রিয়া চলছে। এছাড়া এর সঙ্গে কোন কোন সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা জড়িত ছিলেন তাও চিহ্নিত হচ্ছে এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, শিল্পপতিদের কাছ থেকে ওই সময়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে বিপুল অর্থ আদায় করা হয়েছে। যদিও সরকারের ভাষ্যে তখন ১৩০০ কোটি টাকা আদায় করা হয়েছে এবং তা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেয়া হয়েছে বলে জানানো হয়েছিল।

এদিকে বুধবার একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলে সাংসদ ড. মহীউদ্দিন খান আলমগীরও বলেছেন, ফখরুদ্দীন সরকারের আমলে নতুন রাজনৈতক দল গঠনে কারা জড়িত ছিলেন এবং তাদের পেছনে কী পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়েছে- সে বিষয়ে খোঁজ খবর নেয়া হচ্ছে।

মাওয়াঘাটের যাত্রীরা স্বস্তিতে

১৮ বছর পর মাওয়াঘাটের চিত্র পাল্টেছে। লঞ্চের ভাড়া এখন লঞ্চ কর্তৃপক্ষই স্বাভাবিকভাবে আদায় করছে। তাই ব্যস্ততম এই ঘাটে যাত্রী হয়রানি অনেক হ্রাস পেয়েছে। গত বুধবার থেকে এই ভিন্ন চিত্র বিরাজ করছে এখানে। এর আগে মাওয়া-কাওড়াকান্দি নৌ রুটে চলাচলকারী লঞ্চগুলো যাত্রী বহন করলেও লঞ্চে ভাড়া আদায় করতে পারছিল না। টাকার ভাগবাটোয়ারা নিয়ে অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াও যাত্রী হয়রানির ঘটনা ছিল নিত্য দিনের।

জেলা পরিষদের খেয়া ঘাট এবং বিআইডব্লিউটিএ’র লঞ্চ ঘাট ইজারাদার লঞ্চের ভাড়া আদায় করে নিত। পরে জনপতি হিসাব করে সামান্য ভাড়া পরিশোধ করা হত। এখন জেলা পরিষদের খেয়া ঘাট ৩ টাকা, বিআইডব্লিউটিএ’র লঞ্চ ঘাট ইজারাদার ২ টাকা করে নিয়মানুযায়ী ভাড়া কাটে। আর লঞ্চের ভাড়া লঞ্চ টিকিট মাস্টার (কেরানী) জনপ্রতি ১২ টাকা করে আদায় করছে। এতে যাত্রীদের যেমন হয়রানি বন্ধ হয়েছে,তেমনি লঞ্চ মালিকরা তাদের অধিকার ফিরে পেয়েছে। এব্যাপারে এমএল নিপ্পন লঞ্চের মালিক এবং লঞ্চ মালিক সমিতির মাওয়া জোনের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন খান সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, আমরা অনেক খুশি এখন। ইজারাদার সিন্ডিকেটের রাহুগ্রাসের অবসান ঘটলো দীর্ঘ ১৮ বছর পর। জেলা প্রশাসক মো. মোশারফ হোসেন বলেন, আমরা আইনের মধ্যে থেকে জনস্বার্থে সব রকম প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। মুন্সীগঞ্জ জেলা পরিষদের খেয়া ঘাটের টোল আদায় করছে এখন জেলা পরিষদেরই লোকজন।

পদ্মা সেতুতে রেলপথ কেন

জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী
পদ্মা সেতুতে, যমুনা সেতুর মতোই, রেললাইনও থাকবে, ঘোষণাটা অনেক দিনের। পদ্মা সেতুর কোনো দিকেই রেললাইন নেই, এবং ভবিষ্যতে রেল যোগাযোগ কতদিন হবে, বা আদৌ হবে কি-না, বিষয়টা একেবারেই অস্পষ্ট। দেশের একজন বিশিষ্ট ইঞ্জিনিয়ার কিছুদিন আগে একটি তথ্যপূর্ণ লেখায় দেখিয়েছিলেন, বিভিন্ন দেশে যত দীর্ঘ সেতু তৈরি হয়েছে, সেগুলি কত প্রকারের, এবং বলেছিলেন, প্রস্তাবিত পদ্মা সেতু কী প্রকারের হবে, বা হওয়া উচিত, সেতুতে আদৌ রেললাইন থাকার যৌক্তিকতা আছে কি-না, গভীর বিবেচনার পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তিনি পদ্মা সেতুর ওপর রেললাইনের যৌক্তিকতা খুঁজে পাননি। সেতুর উভয় দিকে রেললাইন সংযোগ দেওয়া সহজ হবে না, অত্যন্ত ব্যয়বহুল হবে। বরং তাঁর বিবেচনায় পদ্মা সেতুর রেললাইন অংশটি বাদ দিয়ে যে অর্থ সাশ্রয় হবে, সেটা আরিচা-পাটুরিয়া-দৌলতদিয়ায় যে দ্বিতীয় সেতুর প্রস্তাব হয়েছে, সেইদিকে সরিয়ে নেওয়া যায়। দৌলতদিয়ার নিকটবর্তী গোয়ালন্দ পর্যন্ত রেললাইন ত' আছেই, এদিকেও ঢাকা পর্যন্ত রেললাইন টেনে আনা_ সাটুরিয়া থেকেই হোক, আরিচা থেকেই হোক_ তুলনামূলকভাবে অর্থ সাশ্রয়ী হবে।
আমি যেহেতু মাওয়া হয়ে একবার টুঙ্গিবাড়ীর পথে গিয়েছি, এবং আরিচা বা সাটুরিয়া-দৌলতদিয়া পথে বহুবার চলাচলের অভিজ্ঞতা আমার আছে, আমার কাছে উক্ত বিশিষ্ট ইঞ্জিনিয়ারের যুক্তিটা গ্রহণযোগ্য, এমনকি অকাট্য মনে হয়েছে। যতদূর জানি, তাঁর লেখাটি ডেইলি স্টারে প্রকাশের পর, কর্তৃপক্ষের নজরে পড়েছিল। কর্তৃপক্ষ সম্ভবত যমুনা সেতুর ফাটল প্রসঙ্গে উক্ত ইঞ্জিনিয়ার-অধ্যাপকের মন্তব্য উপেক্ষা করতে পারেননি। সেজন্য পদ্মা সেতু বিষয়ে সর্বশেষ সংবাদে দেখতে পাচ্ছি, সেতুটি দ্বিতল হবে। নিচতলায় থাকবে রেললাইন, উপরের তলায় সড়ক_ হালকা যানবাহন চলাচলের জন্য। অর্থাৎ কর্তৃপক্ষ কোনোমতেই পদ্মা সেতুর পরিকল্পনায়, রেললাইন বাদ দিতে চান না। যেটা জানতে ইচ্ছা হয় অথচ জানতে পারিনি। সেতুর উভয়দিকে রেললাইন টানতে হলে যে ব্যয় হবে সেই অর্থের জোগান কে দেবে, এ বিষয়ে আদৌ কোনো কথাবার্তা হয়েছে কি-না। এ বিষয়ে কোনো স্পষ্ট ধারণা বা প্রতিশ্রুতি ছাড়া দ্বিতল সেতু, এবং রেললাইনসহ অনেকটা ঘোড়ার আগে গাড়ির মতো শোনায়।
আমি স্বীকার করছি যে, অসম্পূর্ণ সংবাদের ওপর ভিত্তি করে এ লেখা কারও কোনো কাজে দেবে না। আমি যে প্রশ্নগুলি করেছি, তার উত্তর যদি কোনো সূত্র থেকে পাই, আমি অত্যন্ত কৃতজ্ঞ হবো। আমার একান্ত নির্ভরতা সংবাদপত্রের ওপর। চার-পাঁচটি সংবাদপত্র আমি যথেষ্ট মনোযোগ সহকারে পড়ে থাকি। এ পর্যন্ত দু'দিকে রেল-যোগাযোগ বিশিষ্ট পদ্মা সেতুর প্রসঙ্গে এই প্রয়োজনীয় তথ্যটি কোথাও পড়েছি বলে আমার মনে পড়ে না। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতিকল্পে কর্তৃপক্ষের অনেক চমকপ্রদ চিন্তার সংবাদ আমরা পাচ্ছি। কিন্তু বড়ই অসম্পূর্ণ সংবাদ।
সবচেয়ে হতাশাজনক হলো, রেলওয়ে সংক্রান্ত যে সকল আশাব্যঞ্জক সংবাদ পরিবেশন করা হয়েছে বিগত বছরগুলোতে, বাস্তবে, বাংলাদেশের রেলওয়ে-ব্যবস্থা এক করুণ অবস্থায় পড়ে আছে দীর্ঘকাল যাবৎ। সড়কপথের বিস্তৃতি ঘটেছে এবং বিস্তৃতির মাত্রাও ঈর্ষণীয়। একই সঙ্গে, রেলপথের সংকোচন ও অবহেলার দৃশ্যটি দুঃখজনক বললেও যথেষ্ট বলা হয় না। চূড়ান্ত অবহেলা-অব্যবস্থাপনা-দুর্নীতির শিকার হয়েছে রেলপথ। যতগুলি সরকার ক্ষমতায় এসেছে, সবাই রেলপথকে অবহেলা করেছে। কেন রেলগাড়িতে চড়ব নামে একটি লেখা পড়লাম একটি দৈনিকে। কী পরিমাণ দায়িত্বহীনতা ঘিরে আছে আমাদের রেলপথ ব্যবস্থাপনায়, তার এক ভয়াবহ ছবি এঁকেছেন লেখক। খুলনা থেকে দিনাজপুর যাত্রী, তাঁর অভিজ্ঞতার বিবরণ দিয়ে। এক সময় আমি ঢাকা-রাজশাহী, ঢাকা-চট্টগ্রাম পথে রেলগাড়িতে যাতায়াত করেছি। সর্বশেষ চট্টগ্রাম-ঢাকা যাত্রা_ রাতের ট্রেনে, খুবই কষ্টকর ও হতাশাজনক_ সর্বশেষ ঢাকা-রাজশাহী যাত্রা, অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। এ থেকে যে সিদ্ধান্ত টানা যায়, আমরা চাইলে রেলপথে ভালো সেবা দিতে পারি। তবে যদি না দিই, আমি কর্মচারী, আমাকে দুষবেন না। আসল দায়িত্ব যাঁর, বা যাঁদের, দুষবেন তাঁদেরকে।
আমাদের গার্মেন্ট শিল্প_ যদিও এটা শিল্পপদবাচ্য কি-না, প্রশ্ন রয়েছে, এবং একজন সাবেক অর্থমন্ত্রীর মতে, মোটেও নয়_ দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বৈদেশিক মুদ্রার শতকরা পঁচাত্তর ভাগ যদি এই খাত থেকে আসে, তাহলে এর গুরুত্ব কতখানি, যে কেউ বুঝতে পারবে।
আশুলিয়ায় ক'দিন আগে একটি গার্মেন্ট কারখানা জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দিয়েছে একদল শ্রমিক। এই কারখানাটি সম্বন্ধে বলা হয়েছে, এর শ্রমিকরা নিয়মিত বেতন পায়, এর নারী শ্রমিকেরা বলেছে, তাদের শিশু-সন্তানদের জন্য এখানে ভালো ব্যবস্থা আছে, মালিকদের প্রতি তাদের কোনো নালিশ নেই। এটি একটি সোয়েটার ফ্যাক্টরি, এখানকার শ্রমিকেরা এই অগি্নসংযোগের সঙ্গে জড়িত ছিল না কেউ। বহিরাগত একদল শ্রমিক, এবং ঝুট-ব্যবসায়ী একদল লোক এবং সেই সঙ্গে সব রকম দুষ্কর্মে হাত পাকিয়েছে, এমন কিছু লোক, এই কাণ্ড ঘটিয়েছে। ওই কারখানার শ্রমিকেরা সাধ্যমতো বাধা দিয়েছে আক্রমণকারী দলকে, কিন্তু শেষ রক্ষা করতে পারেনি। সংবাদপত্রে লিখেছে, পুলিশ দাঁড়িয়ে দেখেছে, বাধা দেয়নি। আরও লিখেছে, যেসব কারখানা থেকে পুলিশ নিয়মিত টাকা পায়, সেগুলি রক্ষার দায়িত্ব তারা ঠিকই পালন করে।
যারা পুলিশকে নিয়মিত বখরা দেয় না, পুলিশ তাদের চেনে না। গুরুতর অভিযোগ।
বিশেষ করে আশুলিয়া এলাকায় এ ধরনের হামলা ও ক্ষয়ক্ষতির শিকার হচ্ছে এলাকার গার্মেন্ট-কারখানাগুলি। বলা হচ্ছে, একটি স্বার্থান্বেষী মহল এটা করছে ইচ্ছাকৃতভাবে_ এর সঙ্গে শ্রমিকদের চাওয়া-পাওয়াজনিত ক্ষোভের কোনো সম্পর্ক নেই। এই স্বার্থান্বেষী মহল কারা হতে পারে? কেউ স্পষ্ট করে কিছু বলছে না। তবে আশুলিয়া এলাকায় এত বেশি এ ধরনের অগি্নসংযোগ-ভাংচুরের ঘটনা ঘটেছে যে, এ সম্পর্কে একটা গভীর তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। সরকার বলছে, তারা এই গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকে ভবিষ্যৎ উচ্ছৃঙ্খলা থেকে রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে এবং ইতিমধ্যেই তা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু শ্রমিকদের ক্ষোভের বিষয়টি হালকাভাবে নেওয়া উচিত হবে না। ক্ষোভ আছে বলেই ক্ষুব্ধ শ্রমিকদের উত্তেজিত করা সম্ভব হয়েছে। কারখানার মালিকরা সবাই যে শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা দিচ্ছেন, তা হয়তো নয়।
শ্রমিকেরা যেন তাদের নূ্যনতম পাওনা পায়, সে উদ্দেশ্যে বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকার কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল। কিছুটা ফলপ্রসূ হয়েছিল সে উদ্যোগ। তবে মালিকপক্ষের সকলকে নিয়মনীতির পথে আনতে পারেনি বলেই জেনেছি ওই সরকার। এ সরকার, নির্বাচিত ও জনগণের সরকার, যদি এদিকে মনোযোগ দেয়, সেটা প্রশংসনীয় কাজ হবে। নির্বাচিত নতুন সংসদে ব্যবসায়ীদের আধিপত্য রয়েছে, এ সংসদ সাধারণ শ্রমিকদের সঙ্গত দাবি-দাওয়ার প্রতি কতটা সংবেদনশীল হবে, সেটা সরকারের গৃহীত কার্যক্রমেই স্পষ্ট হবে। শ্রমিকদের অভুক্ত-অসন্তুষ্ট রেখে গার্মেন্ট শিল্প নিজের বিপদ নিজেই ডেকে আনবে, এটা মালিকপক্ষ নিশ্চয়ই চান না।
বাংলাদেশের দরিদ্র-বঞ্চিত নারীদের শ্রম-ঘামে এ দেশের গার্মেন্ট শিল্প তার বর্তমান অবস্থানে এসে পেঁৗছেছে। সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় নারী এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত আছে। নারীর ক্ষমতায়নে এ শিল্পের বড় ভূমিকা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। সেদিক দিয়ে এই শিল্প যাতে টিকে থাকে, আরও বিকশিত হয়, আরও উন্নত হয়, সেটা দেখা সরকারের কর্তব্য। এই শিল্পের সুবাদে বাংলাদেশের নারী আত্মবিশ্বাস অর্জন করেছে, নিজের পায়ে দাঁড়াতে শিখেছে। এর সামাজিক মূল্য অপরিসীম।
আশুলিয়া এলাকা সম্বন্ধে আমার ধারণা, এখানে সমাজবিরোধী ব্যক্তির সংখ্যা অনেক। এখানে অপরাধের চিত্রটি রীতিমতো উদ্বেগজনক। ইপিজেড ছাড়াও এ এলাকায় বেশ কিছু শিল্প গড়ে উঠেছে টঙ্গী-নয়ারহাট, টঙ্গী-আশুলিয়া সড়কগুলি বরাবর। অত্যন্ত অপরাধপ্রবণ এই এলাকায় পুলিশের নজরদারি বাড়ানো দরকার।
হা-মীম গ্রুপের কারখানায় যে ধ্বংসযজ্ঞ ঘটেছে, সেজন্য ওই গ্রুপের মালিকপক্ষের প্রতি নেত্রীস্থানীয় অনেক ব্যক্তি সহানুভূতি জানিয়েছেন। আমিও জানাচ্ছি আমার সহানুভূতি। সকল ক্ষয়ক্ষতি জয় করে এই গ্রুপ আবার মাথা তুলে দাঁড়াবে, তার স্পষ্ট ইঙ্গিত ইতিমধ্যেই দেখতে পাচ্ছি। সকলের শুভেচ্ছা মাথায় নিয়ে তাঁরা নতুন উদ্যমে যাত্রা শুরু করবেন, সন্ত্রাসের কাছে পরাজয় স্বীকার করবেন না, এ আমার প্রার্থনা, এ আমার বিশ্বাস।
লেখক : শিক্ষাবিদ

Saturday, July 04, 2009

টেঙ্গরশাহী জামে মসজিদ

রাজিব পাল রনি
ঐতিহ্যবাহী বিক্রমপুরের হাজারো ঐতিহ্য আর অসংখ্য স্থাপনার মধ্যে মুন্সীগঞ্জ সদর থানার অন্তর্গত মিরকাদিম পৌরসভার টেঙ্গর নামক স্থানে টেঙ্গরশাহী মসজিদটি অন্যতম। এটি পাঠান সুলতান কররানীর শাসন আমলের ( ১৫৬৯ খ্রিস্টাব্দে ) মালেক আব্দুল্লাহ নামক একজন কাজী নির্মাণ করেন। বিক্রমপুরে পাল বংশের শাসনামলে বিক্রমপুর থেকে হিন্দু ধর্ম বিলুপ্ত হয়ে রাষ্ট্রধর্ম বৌদ্ধ মত প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তী সময়ে পাল বংশ পতনের সঙ্গে সঙ্গে বৌদ্ধ ধর্মের নাম-নিশানা বিক্রমপুর থেকে মুছে যায়। এমনিভাবে মুছে যায় যেন কোনো কালেই এর কোনো অস্তিত্ব ছিল না। পাল বংশের পতনের পর সেন রাজবংশ উদ্ভবের সঙ্গে সঙ্গে পুনরাবির্ভাব ঘটেছিল সে সম্পর্কে ‘আইন-ই আকবরী’তে উল্লেখ রয়েছে। সেন বংশীয় রাজাদের সর্বশেষ রাজা বল্লাল সেনের রাজধানী ছিল রামপাল। কোনো এক কিংবদন্তি ঘটনার মধ্য দিয়ে হিন্দু রাজত্বের অবসান ঘটে এবং মুসলিম রাজত্বের আবির্ভাব হয়। সেন বংশের অবসানের পর বিক্রমপুর মূলত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সামন্ত ভূস্বামী ও জমিদাররাই শাসন করতে থাকেন। বিক্রমপুরে পাঠান রাজত্বের অবসান ও বার ভুইয়া, চাঁদ রায়, কেদার রায়ের পরাজয়ের পর এখানে মুঘল রাজত্বের সূচনা হয়। তখন পুরো বিক্রমপুর একটি পরগনায় পরিণত হয়। বর্তমানে এটি মুন্সীগঞ্জ জেলা হিসেবে পরিচিত লাভ করেছে। একটি প্রাচীরবেষ্টিত ভূমিতে এ মসজিদটি অবস্থিত। এ মসজিদটির দৈর্ঘ্য ৩৬ ফুট ও প্রস্থ ৩৪ ফুট। মসজিদের পূর্বে চারটি, পশ্চিমে চারটি এবং উত্তর ও দক্ষিণে দুটি করে মোট ১২টি খিলানের ওপর মসজিদটি নির্মিত। মসজিদের দেয়াল ৫ ফুট পুরু, চতুর্দিকে বেষ্টিত একটি মজবুত স্থাপনা। বর্গাকৃতি এই মসজিদের প্রতিটি বাহু ৩১ ফুট। এক গম্বুজবিশিষ্ট এই মসজিদের মূল আকর্ষণ গম্বুজেই অনেকটা নিহিত রয়েছে। এটির সর্বোচ্চ শিখরে একটি কারুকার্যম-িত শিখর দ- বিদ্যমান। গম্বুজের উপরের গোলার্ধে ও নিচের অংশে চিনামাটির মধ্যযুগের কারুকাজ এখনো চোখে পড়ে। মসজিদের ভেতরে বর্গাকৃতি অবকাঠামোতে এক একটি খিলানের ৮ ফুট উপর থেকে গম্বুজের স্থাপনাশৈলী পর্যায়ক্রমে গম্বুজের কেন্দ্রবিন্দুতে মিলিত হয়েছে। অপরূপ কারুকার্যম-িত মসজিদের ভেতরেও মধ্যযুগীয় ত্রিভুজাকৃতির সৌন্দর্যের শোভা লক্ষ্যণীয়। পূর্ব দিকে মসজিদের একটি প্রবেশ পথ রয়েছে। দুপাশে দুটি করে জানালা এবং উত্তর ও দক্ষিণে একটি করে আরো মোট দুটি জানালা রয়েছে। মসজিদের ভেতরের পশ্চিম দিকে মধ্যভাগে একটি বড় মিম্বর এবং দুপাশে অনুরূপ দুটি ছোট মিম্বর রয়েছে। মসজিদের উত্তর ও দক্ষিণ পাশে জানালার দুপ্রান্তে দুটি করে মোট চারটি চূড়ঙ্গী রয়েছে। এগুলোতে মসজিদের সংরক্ষিত কোরআন, কিতাব ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। এ জামে মসজিদটি সুদীর্ঘকাল থেকে স্থানীয় মুসল্লিদের একমাত্র নামাজ আদায়ের পীঠস্থান। এ মসজিদে একটি মিনার রয়েছে তার উচ্চতা ৬০ ফুট। প্রতিদিন অসংখ্য লোক এখানে নামাজ আদায় করেন। তাছাড়া এ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকেও ঐতিহ্যবাহী এ মসজিদটি দেখার জন্য বহু লোকের সমাগম ঘটে। অভিযোগ আছে যে, মসজিদের শিলালিপিটি জোর করে পশ্চিম পাড়ার লোকজন নিয়ে যায়। তাই মূল মসজিদের গায়ে আরবি শিলালিপি দেখা যায় না। পরবর্তী সময়ে এখানে একটি বাংলা শিলালিপি স্থাপন করা হয়েছে। বাংলা শিলালিপিটি এরূপÑ ‘টেঙ্গর শাহী মসজিদ। স্থাপিত ৮৭৫ বাংলা, রিকাবী বাজার মুন্সিগঞ্জ।’ বাংলা শিলালিপির সঙ্গে আরবি শিলালিপির তেমন কোনো মিল নেই। মোয়াজ্জেম শামীম হুজুর জানান, অর্থ সংকটে মসজিদের অনেক কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না। মসজিদটি সংস্কার করা প্রয়োজন বলে তিনি জানালেন। ৪৩৬ বছরের পুরনো এ মুসলিম নিদর্শন। টেঙ্গর শাহী মসজিদটি শুধু মুন্সীগঞ্জের ইতিহাসই বহন করে না, সারা বাংলাদেশের মুসলমানদের ইতিহাস বহন করে চলেছে।

মুন্সীগঞ্জের নৌপথে চোরাচালন

মুন্সীগঞ্জের নৌপথে চোরাকারবারিদের অবৈধ ব্যবসার মহোৎসব চলছে। স্থানীয় প্রশাসন ও প্রভাবশালীদের ম্যানেজ করে অনায়াসেই সরকারি জাহাজ থেকে জ্বালানি তেল ও সিমেন্ট ফ্যাক্টরির কাঁচামাল খালাস করে নিচ্ছে। চোরাকারবারিরা অবৈধ মালামাল খালাসের জন্য নিরাপদ রুট হিসেবে বেছে নিয়েছে মুন্সীগঞ্জ সদরের ধলেশ্বরী, গজারিয়া, মেঘনা, বন্দর ও সোনারগাঁও থানার শীতলক্ষ্যা তীরবর্তী বিভিন্ন এলাকা। তত্ত্বাবধায়ক জমানায় এ অবৈধ ব্যবসা বন্ধ ছিল। রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় আসার পর আবার তারা সক্রিয় হয়ে ওঠে। জানা গেছে, চট্টগ্রাম থেকে সরকারি জাহাজে ফতুল্লার মেঘনা ও যমুনা ডিপোতে জ্বালানি তেল খালাসের আগেই মেঘনা, ধলেশ্বরী শীতলক্ষ্যা নদীতে জাহাজ এসে নোঙর করে। এরপর জাহাজের কর্মচারীদের সহযোগিতায় চোরাকারবারিরা নির্ধারিত পরিমাণ জ্বালানি তেল খালাস করে নেয়। জাহাজের কর্মচারীদের বিক্রি করে দেয়া এ জ্বালানি তেল তারা ট্রলারের মাধ্যমে নিয়ে যায়। রাত থেকে ভোর পর্যন্ত যে কোন সময়ে এ জ্বালানি তেল খালাস হয়। এ তেল সরানোর কাজে প্রধান গজারিয়া উপজেলার টানবলাকির গিয়াস ইম্মানিরচরের রিপন, গোয়ালগাঁওয়ের মাসুম গং বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে। এরা মেঘনাঘাট, ইম্মানিরচর, হোসেন্দি বাজার, ফতুল্লা খেয়াঘাট, নারায়ণগঞ্জের ধর্মগঞ্জ এলাকায় গড়ে তুলে জ্বালানি তেল চুরির পয়েন্ট। এর মধ্যে সোনারগাঁ থানার চরকিশোরগঞ্জ (বালুরঘাট), মুন্সীগঞ্জ শহরের চরকিশোরগঞ্জ (মোল্লারচর), হাটলক্ষীগঞ্জ ও বলেশ্বরী শীতলক্ষ্যা মোহনায় তেল খালাস করার নিরাপদস্থান। চোরচালান সিন্ডিকেটের প্রধান নুর মোহাম্মদ ওরফে নুরু যখন যে দল ক্ষমতায় আসে সে দলের প্রভাবশালীদের ম্যানেজ করে এ অবৈধ ব্যবসা চালিয়ে যায়। বিগত বিএনপি সরকারের আমলে জেলা বিএনপি’র সাবেক সহসভাপতি গুলজার হাজী ও তার ভাই আমির সওদাগর গংকে সঙ্গে নিয়ে এ ব্যবসা মাতিয়ে তুলে। বন্দরের একরামপুর গ্রামের নুরু ও গজারিয়ার টানবলাকি গ্রামের গিয়াসউদ্দিন ওরফে গিয়াস জাতীয় পার্টির আমল থেকে জ্বালানি তেল, ক্লিঙ্কার, সার পাচারসহ নৌপথে নানা রকম চোরাচালান ব্যবসা করে আসছে। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তারা নেতা পরিবর্তন করে। চোরাচালান ব্যবসা করে তারা এখন কয়েক শ’ কোটি টাকার মালিক। জানা গেছে, সরকারি জাহাজ থেকে পাচার করে নেয়া ডিজেল, পেট্রোল, কেরোসিন ট্যাঙ্ক লরির মাধ্যমে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দাউদকান্দি, নারায়ণগঞ্জসহ ১০-১২টি পেট্রোল পাম্প এবং বড় বাজারগুলোতে ওই মালামাল সরবরাহ করে। একই সঙ্গে অবৈধ ক্লিঙ্কার সরবরাহ করে গজারিয়ার বিভিন্ন সিমেন্ট ফ্যাক্টরিতে।

সংগ্রামী জীবনশিল্পী মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়


এ ম এ আ জি জ মি য়া
বাংলা সাহিত্যে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯০৮-১৯৫৬) এক বিস্ময়কর প্রতিভা, অনন্য কথাশিল্পী। শোষিত, বঞ্চিত ও নিপীড়িত মানুষের জীবনযাত্রা ও লড়াই-সংগ্রাম তিনি সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন এবং নিপুণ শিল্পীর ন্যায় কলমের অাঁচড়ে তা জীবন্ত করে তুলেছেন। সেখানে তাঁর মানবপ্রেম, সামাজিক অঙ্গীকারবোধ এবং শ্রেণী দৃষ্টি ভঙ্গি সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। লেখক জীবনের শুরুতে তার মধ্যে ফ্রয়েডীয় রেখাপাত দেখা গেলেও অচিরেই তিনি তা কাটিয়ে ওঠেন। নিছক শিল্পের জন্য শিল্প নয়, তিনি বিশ্বাসী ছিলেন মানুষের জন্য শিল্প বা জীবনের জন্য শিল্প অভিধায়। এক্ষেত্রে মানুষ বলতে তিনি মেহনতী গণমানুষকে বুঝিয়েছেন। তার এ মানসগঠনে ছাত্রজীবনে বিজ্ঞান অধ্যয়ন এবং পরে দেশী-বিদেশেী সাহিত্য ও দর্শন পাঠ বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল। এজন্য কল্লোল যুগের (১৯২৩-১৯৩০) হয়েও তিনি কল্লোলীয় তরঙ্গে আন্দোলিত হননি, স্পন্দিত হননি পূর্ব-দিগন্তের প্রখর রবিরশ্মি দ্বারা। প্রথমদিকে তিনি প্রগতি লেখক সংঘের আন্দোলনে সম্পৃক্ত না হলেও চলি্লশের দশকে প্রগতি লেখক ও শিল্পী সংঘের কর্মকান্ডে ব্যাপকভাবে জড়িয়ে পড়েন। তিনি যোগ দেন কম্যুনিস্ট পার্টিতে। তখন লেখালেখির পাশাপাশি পার্টির সমাজবদলের কর্মকান্ডই তার জীবনের প্রধান অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে। আর এজন্য তাকে বরণ করে নিতে হয়েছিল চরম দারিদ্র্যক্লিষ্ট জীবন। গণমানুষের জীবনের শরিক হয়ে একজন কলমপেশা শ্রমিকের ন্যায় তিনি সারাটি জীবন অর্থকষ্টে কাটিয়েছেন; তবুও কোনো মোহ বা প্রলোভনের পঙ্কিল পথে পা বাড়াননি। ব্যতিক্রম মানিক জীবনের বৈশিষ্ট্য এখানেই। আর এজন্যই বাংলা সাহিত্যে মানিক, মানিক রতন হয়ে রয়েছেন। শত বছরের মানিক মারাও গেছেন অর্ধশত বছরের বেশি হয়ে গেল। কিন্তু আজও তার দীপ্তি ছড়িয়ে পড়ছে অবিশ্রান্ত ধারায়। তিনি জন্মেছিলেন ১৯০৮ সালের ১৯ মে সাঁওতাল পরগনার দুমকা শহরে এবং মারা যান ১৯৫৬ সালের ৩ ডিসেম্বর কলকাতায়। তার সাড়ে ৪৮ বছরের স্বল্পায়ু জীবনে তিনি সাহিত্যচর্চা করেছেন ৩২ বছর। তার মধ্যে কিশোর বয়সে ৪ বছর নীরব কাব্যচর্চা (১৯২৪-১৯২৮), কলেজ জীবনে ৪ বছর শৌখিন সাহিত্যচর্চা (১৯২৮-১৯৩২) এবং অবশিষ্ট ২৪ বছর তিনি নিরবচ্ছিন্ন সাহিত্যচর্চা (১৯৩২-১৯৫৬) করেছেন। এ সময়কালে তিনি বাংলা সাহিত্যে যে অবদান রেখে গেছেন গুণ, মান ও সংখ্যায় তা অভাবনীয় ও বিস্ময়কর। তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ৮৩। তার মধ্যে উপন্যাস-৪০ (অসম্পূর্ণ-৩), গল্পগ্রন্থ-২২, প্রবন্ধ সংকলন-৩, নাটক-১, কাব্যগ্রন্থ-১ এবং অন্যান্য-১৬।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পৈতৃক বাড়ি ছিল বিক্রমপুর (মুন্সিগঞ্জ)-এর মালপদিয়া গ্রামে। তার পূর্বপুরুষরা ছিলেন সিমুলিয়া গ্রামের অধিবাসী। তার পিতার নাম হরিহর বন্দ্যোপাধ্যায় ও মা নীরদাদেবী। তার মাও ছিলেন বিক্রমপুরের গাওদিয়া গ্রামের মেয়ে। তাই মানিকের শেকড় গ্রথিত ছিল প্রাচীন বাংলার ইতিহাসখ্যাত শত ঐতিহ্যমণ্ডিত বিক্রমপুরে এবং এখানকার মাটি থেকেই তার জীবনরস সিঞ্চিত হয়েছে; আত্মপ্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে তা ফুলে ফলে সুশোভিত হয়েছে। অাঁতুর ঘরে কালো গায়ের রং-এর মধ্যেও তার ঔজ্জ্বল্য প্রকাশ পেয়েছিল। তাই তার নামকরণ হয়েছিল ‘কালো মানিক’। কিন্তু পিতৃপ্রদত্ত নাম ছিল প্রবোধ কুমার। ডাক নাম মানিক হলেও লেখক নাম মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। বিশ বছর বয়সে কলেজে পড়াকালে বন্ধুদের সঙ্গে বাজি ধরে লিখে ফেলেন ‘অতসী মামী’ গল্পটি। তা ১৩৩৫ সালের পৌষ সংখ্যা ‘বিচিত্রা’য় প্রকাশিত হলে সকলে চমকে ওঠেন।
লেখালেখির জগতে মানিকের এই যে অগ্রযাত্রা প্রাণস্পন্দন থেমে না যাওয়া পর্যন্ত তা অব্যাহত ছিল। যেসব পত্রপত্রিকায় তার লেখা প্রকাশিত হয়েছে তার মধ্যে বিচিত্রা, বঙ্গশ্রী, পূর্বাশা, ভারতবর্ষ, পরিচয়, যুগান্তর, প্রভাতী, আনন্দবাজার, স্বাধীনতা, বসুমতী, ছোটদের রংমশাল, অভিদারা, অনন্যা, এলোমেলো, এখন, আগামী প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। তার প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ (উপন্যাস) ‘জননী’ এবং গল্পগ্রন্থ ‘অতসী মামী ও অন্যান্য গল্প’। তার অসম্পূর্ণ উপন্যাস ‘মাটি ঘেঁষা মানুষ’ সম্পূর্ণ করেন সুধীর রঞ্জন মুখোপাধ্যায়। কিশোর উপন্যাস ‘মশাল’ কে সম্পূর্ণ করেছেন তা জানা যায়নি। তবে কিশোর উপন্যাস ‘মাটির কাছে কিশোর কবি’ সম্পূর্ণ করেছেন খগেন্দ্রনাথ মিত্র। তার লেখা দুটি উপন্যাসের ভূমিকা অসম্পূর্ণ ছিল, সম্পূর্ণ নয় অগ্রন্থিত রচনার তালিকা। কিছু লেখা হয়তো এখনও অনাবিষ্কৃত রয়ে গেছে।

চাকুরিজীবী পিতার কর্মস্থান পরিবর্তিত হওয়ায় তিনিও বিভিন্ন স্থানে লেখাপড়া করেছেন। ফলে লেখাপড়ায় অনেকটা বিঘ্ন ঘটলেও নানান অঞ্চলের মানুষের সাথে মেলামেশা করে যে বাস্তবজ্ঞান অর্জন করেছিলেন সে সব অভিজ্ঞতা তার পরবর্তীকালের লেখক জীবনে সহায়ক হয়েছিল। ছোটবেলা থেকে তিনি মেধাবী ছিলেন এবং পরীক্ষায় ভাল ফল করেছেন। ১৯২৪ সালে মা মারা গেলে তিনি অনেকটা শোকাচ্ছন্ন হয়ে পড়েন এবং সম্ভবত এ সময়ে নীরবে কাব্যচর্চা শুরু করেন। ১৯২৬ সালে মেদেনীপুর স্কুল থেকে তিনি প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করেন। নৈর্বাচনিক ও আবশ্যিক গণিতে লাভ করেন লেটার মার্ক। ১৯২৮ সালে বাঁকুরা ওয়েস লিয়ন মিশন কলেজ থেকে তিনি আইএসসি পাস করেন প্রথম বিভাগে। তিনি ভর্তি হলেন প্রেসিডেন্সি কলেজে গণিত বিষয়ে বিএসসি সম্মান শ্রেণীতে। কিন্তু এ সময়ে তিনি ধরাবাঁধা লেখাপড়ায় আগ্রহ হারিয়ে দেশ-বিদেশের সাহিত্য পাঠে মনোনিবেশ করেন। ফলে পরপর দু’বছর বিএসসি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হন। এ জন্য নিকট ছাত্ররাও তার প্রতি বিরাগভাজন হয়ে পড়েছিলেন। ইতোমধ্যে তার লেখালেখিও শুরু হয়ে গিয়েছিল পুরোদমে। জীবনধারণের জন্য চাকুরি করেন নবারুন (১৯৩৪) ও বঙ্গশ্রী (১৯৩৭-১৯৩৯) পত্রিকায় সহকারী সম্পাদক হিসেবে। কিন্তু মৃগী রোগাক্রান্ত মানিককে ডা. বিধানচন্দ্র রায় বিয়ে করার পরামর্শ দিলেন। ১৯৩৮ সালের ১১ মে বিক্রমপুরের পঞ্চসার গ্রামের সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কন্যা কমলা দেবীর সঙ্গে তার বিয়ে হয়। শরীরও অনেকটা সুস্থ হয়ে এলো। ইতোমধ্যে তার লেখক খ্যাতি দেশময় ছড়িয়ে পড়েছে। পেশা হিসেবে লেখালেখিকেই বেছে নিয়েছেন। আর্থিক অসচ্ছলতা ঘোচাতে ১৯৩৯ সালে তিনি একবার প্রেসব্যবসা শুরু করেছিলেন। উদ্দেশ্য সেখান থেকেই বই ও একটি পত্রিকা প্রকাশ করবেন। কিন্তু এক বছর না যেতেই প্রেস ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায়। লেখালেখির অর্থে সংসার চলে না। অবসরপ্রাপ্ত বৃদ্ধ পিতাও স্বেচ্ছায় আশ্রয় নিয়েছেন। পিতার সেবাযত্নেও এতটুকু অবহেলা তিনি করেননি। ১৯৪৩ সালে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের সময় কিছুকাল তিনি ওয়ার ফ্রন্টের প্রভিন্সিয়াল অর্গানাইজার এবং বেঙ্গল দফতরে পাবলিসিটি এসিস্যান্ট হিসেবে চাকরি করেছেন। আকাশ বাণী কলকাতা কেন্দ্রে যুদ্ধ বিষয়ক প্রচার ও নানাবিধ বেতার অনুষ্ঠানে যোগদান করেছেন। কিন্তু সে সময় ফরমায়েসি কাজে তার পোষায়নি। তিনি স্বেচ্ছায় কেটে পড়েছেন। লেখালেখি করে অধিক অর্থ উপার্জনের চেষ্টা করেছেন। তার লেখায় যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ, দুর্ভিক্ষ, কালোবাজারী, মুনাফালোভীর চিত্র ফুটে ওঠে। তাছাড়া ফ্যাসিবাদ, উগ্র জাতীয়তাবাদ ও সামপ্রদায়িকতার বিষবাষ্পে ভূলুণ্ঠিত মানবতা বিশেষ করে কৃষক-শ্রমিক মেহনতী মানুষের জীবন সংগ্রাম মূর্তমান হয়ে ওঠে। তার সাহিত্যখ্যাতিও দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে।

১৯৪২ সালের ৮ মার্চ ঢাকাতে ফ্যাসিবিরোধী সমাবেশে যোগদানের জন্য তরুণ লেখক ও কম্যুনিস্টকর্মী সৌমেন চন্দ (১৯২০-১৯৪৮) মিছিল নিয়ে আসার পথে ফরোয়ার্ড ব্লকের গু াদের হাতে রাজপথে নৃশংসভাবে নিহত হয়। সে প্রেক্ষাপটে কলকাতায় গঠিত হয়েছিল ফ্যাসিবিরোধী লেখক ও শিল্পীগোষ্ঠী। প্রথম দিকে প্রগতি লেখক সংঘের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা না থাকলেও পরবর্তীকালে এ সব সংগঠনের সঙ্গে নিজকে সম্পৃক্ত করে নেন। বুখারিনের বস্তুবাদ ও লিয়েনতিয়েনের মার্কসীয় অর্থনীতি পাঠ করে মার্কসীয় দর্শনের প্রতি তিনি আস্থাশীল হয়ে ওঠেন। ১৯৪৪ সালে তিনি কম্যুনিস্ট পার্টিতে যোগদান করেন। মার্কসীয় দর্শনের বইপত্র পড়ে তিনি সম্পূর্ণ বদলে যান। ‘সাহিত্য করার আগে’ শীর্ষক লেখায় তিনি বলেছেন, মার্কসবাদ যতটুকু বুঝেছি তাতেই আমার কাছে ধরা পড়ে গিয়েছে যে, আমার সৃষ্টিতে কত মিথ্যা বিভ্রান্তি আর আবর্জনা আমি আমদানী করেছি জীবন ও সাহিত্যকে একান্ত নিষ্ঠার সঙ্গে ভালবেসে ও জীবন ও সাহিত্যকে এগিয়ে নেয়ার উদ্দেশ্য থাকা সত্ত্বেও। ১৯৪৪ সালের ১৪-১৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত ফ্যাসিবিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘের দ্বিতীয় বার্ষিক সম্মেলনে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তার সভাপতিম লীর অন্যতম সদস্য নির্বাচিত হন। সে বছর ২৫-২৭ আগস্ট অনুষ্ঠিত পূর্ববঙ্গ প্রগতি লেখক ও শিল্পী সম্মেলনে তিনি যোগদান করেন। ১৯৪৫ সালের ৩-৮ মার্চ ভারতীয় প্রগতি লেখক সংঘের অন্যতম যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৪৬ সালে ভয়াবহ দাঙ্গা প্রতিরোধে তিনি অসুস্থ শরীর নিয়ে এগিয়ে যান এবং বহু সভা সমাবেশে যোগদান করেন। ১৯৪৯ সালের ২২ এপ্রিল প্রগতি লেখক সংঘের চতুর্থ বার্ষিক সম্মেলনে পুলিশী হানার মধ্যেও তিনি ডেলিগেট অধিবেশনে যোগদান করেন। ২২ নভেম্বর ট্রাম বাড়িতে অনুষ্ঠিত প্রগতি লেখক সংঘের শান্তি সম্মেলনে তিনি সভাপতিত্ব করেন। সভাপতিত্ব করেছিলেন ১৯৫৩ সালে অনুষ্ঠিত প্রগতি লেখক সংঘের পঞ্চম বার্ষিকী সম্মেলনে। লেখার চাপ ছাড়াও পার্টি এবং অন্যান্য সাগংঠনিক কাজে বেশি বেশি পরিশ্রম করার ফলে তার শরীর ভাঙতে শুরু করে। পার্টির পক্ষ থেকে তাকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি করে দেয়া হয়। কিন্তু হাসপাতালে তিনি কখনও স্বস্তিবোধ করেননি। নিজ দায়িত্বেই তিনি বাসায় ফিরে এসেছেন। তারপর ১৯৫৬ সালের ৩০ নভেম্বর তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়েন। অসহায় পারিবারিক পরিবেশে দুই দিন থাকার পর ২ ডিসেম্বর রাত ১০টায় নীলরতন সরকার হাসপাতালে তাকে ভর্তি করা হয়। না সেখানে আর তাকে বেশি সময় কাটাতে হয়নি। ৩ ডিসেম্বর ভোর চারটায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। সময় পেলেন না কাকা বাবুর (কমরেড মুজাফফর আহমদ) জীবনী লেখার।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে সাহিত্য চর্চার বয়স হল ৩০ বছর। এ সম্পর্কে তিনি বলেছেন, ‘তিরশ বছর বয়সের আগে কারো লেখা উচিত নয়। আমি সেই বয়সে লিখবো। এর মধ্যে তৈরি হয়ে নিতে হবে সব দিক দিয়ে। কেবল অভিজ্ঞতা সঞ্চয় নয়। নিশ্চিত মনে যাতে সাহিত্যচর্চা করতে পারি তার বাস্তব ব্যবস্থাগুলো ঠিক করে ফেলবো।’ কিন্তু সে সুযোগ তিনি পাননি। অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে ত্রিশ বছরের বহু পূর্বেই তিনি লেখালেখিকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। কিশোর বয়সে কবিতা ও গল্প লিখেছেন। কিন্তু ঔপন্যাসিক হওয়ার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছেন তার ‘উপন্যাসের ধারা’_ লেখায় ‘… সাধ করলে কবি হয়তো আমি হতে পারি; কিন্তু ঔপন্যাসিক হওয়াটাই আমার পক্ষে হবে উচিত ও স্বাভাবিক।’ তার স্বপ্ন সত্যে পরিণত হয়েছে ঔপন্যাসিক হিসেবে তিনি সুখ্যাতি অর্জন করেছেন। বিজ্ঞানের ছাত্র মানিকের বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি উপন্যাস রচনায় সহায়ক ভূমিকা সম্পর্কে তিনি বলেছেন, উপন্যাস লেখার জন্য দরকার খানিকটা বৈজ্ঞানিক বিচারবোধ, বিজ্ঞানচর্চা না করলেও সম্পূর্ণভাবে নিজের অজ্ঞাতসারে হলেও ঔপন্যাসিক খানিকটা বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করবেন, তাতে বিস্ময়ের কিছু নেই।

মানবতাবাদী মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সামপ্রদায়িকতা, ফ্যাসিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধকে অন্তর থেকে ঘৃণা করেছেন। অসুস্থ শরীরে জীবনের ঝুঁকি নিয়েও তিনি সামপ্রদায়িক দাঙ্গার বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। তিনি ডায়েরিতে লিখেছেন, ‘দাঙ্গার কথা শুনে মনটা খারাপ হয়ে গেল। … বিকালে এ অঞ্চলে শান্তিসভা হবে শুনলাম। খুশি হয়ে নিজে রাজি হলাম যতটা পারি সাহায্য করতে। যাকে দেখছি তাকে বলছি মিটমাটের জন্য সভায় যেতে। মসজিদের কাছে আনোয়ারশা রোডের একদল মুসলিম স্বীকার করলেন মিটমাট দরকার_ কয়েকজন উত্তেজিতভাবে বললেন মেরে পুড়িয়ে এখন মিটমাটের কথা কেন? অন্যরা তাদের থামালেন। ফাঁড়ি পেরিয়ে পুলের নিচে যেতে এল বিরোধিতা_ হিন্দুদের কাছ থেকে। কিসের মিটমাট মুসলমানরা এই করেছে ঐ করেছে। ব্যাটা কম্যুনিস্ট বলে আমায় মারে আর কি। প্রায় দেড়শ লোক মিলে ধরেছিল।’ ভারত ভাগের পর ১৯৫০ সালেও কলকাতায় সামপ্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছে। এ ব্যাপারে তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল খুবই স্পষ্ট। তিনি ডায়েরিতে লিখেছেন, সামপ্রদায়িকতার উপরটাই লোকে দেখছে। পিছনে কি গভীর ও ব্যাপক ষড়যন্ত্র, চোখে পড়ে না। যে উদ্দেশ্যে ভারত বিভাগ, সেই উদ্দেশ্যেই ভারত পাকিস্তানের বিবাদ বাড়িয়ে চলা বৃটিশ আমেরিকান সামপ্রাজ্যবাদ দুই রাষ্ট্রের ঘাড়ে চেপে থাকতে পারে। সামপ্রদায়িকতার ভিত্তিতে দেশ ভাগ ছিল তার অসহ্য। তার লেখায় তা সুস্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে : ‘কানাই বলে মাঠে একটা ফ্লাগ উড়াই? আমি বলি ব্লাক ফ্লাগ উড়াও। কানাইয়ের ভাই বলাই বলে ঠিক। উদ্বাস্তুরা কি স্বাধীনতা পেয়েছে? সাত আট বছরের ছেলে। ফ্লাগ কিছু কিছু উড়েছে_ কিন্তু চার দিক ঝিমানো।’

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাদাসিধে জীবনযাপন সম্পর্কে অনেকেই লিখেছেন। রথীন্দ্রকান্ত ঘটক চৌধুরী তার ‘একটি গল্পের জন্মকথা’য় লিখেছেন, ‘ছোট একটা পুরাতন একতলা দালান। সামনের দিকে অল্প পরিসর একটা কোঠা মানিক বাবুর লেখার ঘর। মাদুর বিছানো সাধারণ একটা তক্তপোষ ঘরের এক পাশে। মান্দাতার আমলের হতশ্রী লেখার টেবিল একটা_ তার একটিমাত্র বসার চেয়ারের অবস্থাও একই রকমের। গোটা তিনেক বইয়ের আলমারী পিছনটাতে। বইয়ের সংখ্যা সামান্য। বাঁধাই ‘প্রবাসী’, ‘ভারতবর্ষে’র সংখ্যাই বেশি।

বাজার থেকে ফিরে এলেন মানিক বাবু অল্প কিছুক্ষণ বাদে। গায়ে আধময়লা গেঞ্জি, পরনে লুঙ্গি। এক হাতে আট-নয় বছরের মেয়ের হাত ধরেছেন আর এক হাতে বাজারের চটের থলে। লম্বা প্রায় ছয় ফুট, বলিষ্ঠ কালো কুঁদানো শরীর, চাষাভূষাদের মতন। খোঁচা খোঁচা দাড়ি-গোঁফে মুখম ল আবৃত্ত তবে কুশ্রীতা নেই কোথাও প্রাণোচ্ছল সাজিবতায় ভরপুর। কালো ফ্রেমের চশমা ভেদকরা এক জোড়া নিবিষ্ট চোখ। অনাবৃত বাহুযুগলের পেশিতে যৌবনোচিত দৃঢ়তা। বেশভূষা, চেহারা সবটাই মিলিয়ে আবার নতুন করে যেন দেখলাম মানিক বাবুকে। খারাপ লাগেনি তবুও বাজারের থলেটাকে বাংলাদেশের প্রথম সারির একজন কথাশিল্পীর হাতে কেমন যেন বেমানান মনে হয়েছিল। … তার অনাড়ম্বর জীবনযাত্রার পরিচয় পেয়ে প্রকৃতই অন্তরঙ্গতা অনুভব করেছিলাম সেদিন।’

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সারা জীবন অর্থকষ্টে ভুগেছেন। অনেক সময় অসুখ হলে নিজের বা পরিবারের সদস্যদের সুচিকিৎসারও ব্যবস্থা করতে পারেননি। কোনো কোনো সময় পার্টি, কবি-সাহিত্যিক বন্ধু বা শুভানুধ্যায়ীরা সহায়তার হাত প্রসারিত করেছেন। তারপরও এককালীন কিছু টাকা পেলে পুরোটাই পার্টি ফান্ডে জমা করে দিতেন। পৈতৃক বাড়ি বিক্রির টাকা তিনি পারিবারিক সদস্যদের অজ্ঞাতেই পার্টিকে দিয়েছিলেন। পার্টির প্রতি তিনি এতটাই অনুরক্ত ছিলেন। অন্যদিকে যে কোনভাবে টাকাপয়সা আয় করা তার রুচিবোধের বাইরে ছিল। রথীন্দ্রকান্ত ঘটক চৌধুরীর সঙ্গে আলাপকালে তার এ দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ পেয়েছে : ‘এখন সংসার চালাতে হয় শুধু এই দিয়েই। আর তো পেশা নেই কোন। তাছাড়া সব কাগজে লিখিনে এখন আর, কারণ তাতে লেখক সম্বন্ধে পাঠকের ধারণা নিচু হয়ে যায়_ সম্ভাবনা থাকে ভুল বুঝবার। তা যদি লিখতাম তা হলে অনেক টাকা রোজগার করতে পারতাম। অভাব থাকতো না কোন, দেখলেন তো কত সাহিত্যিক বাড়ি করলেন, গাড়ি করলেন_ আমি গরিবই রয়ে গেলাম সারা জীবন। অনেক সময় তিনি পয়সার অভাবে ওষুধ কিনে খেতে পারেননি। এমনকি একটি অসহায় অবস্থা নিজ ডায়েরিতে উলি্লখিত হয়েছে। ক’দিন থেকে শরীর খুব খারাপ, … কি যে দুর্বল বলা যায় না, বিছানা থেকে উঠবারও শক্তি নেই_ এদিকে ঘরে পয়সা নেই। জোর করে তো বেরোলাম ফিরবো কিনা না জেনে।’ তারপর সর্বশেষ যখন আর্থিক অসহায়ত্বের কারণে দুই দিন নিজ বাড়িতে অজ্ঞান হয়ে থাকবার পর হাসপাতালে ভর্তির সংবাদ পেয়ে কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় তাকে দেখতে গিয়েছিলেন। এমন অবস্থায় টেলিফোন না করার কারণ জিজ্ঞাসা করায় মানিক পত্নী অস্ফুট স্বরে হেসেই উত্তর দিয়েছিলেন, ‘তাতে যে পাঁচআনা পয়সা লাগে ভাই।’

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন শ্রেণী-সংগ্রামে বিশ্বাসী লেখক। তার অনেক লেখায় তা পরিলক্ষিত হয়। শ্রেণী-সংগ্রামের বিজয়ে প্রত্যয়ী মানিক বন্দোপাধ্যায় তার ‘নেতা’ গল্পে লিখেছেন, ‘… আমরা কোন দাবি ছাড়বো না। আমরা কি শুধু রুজির জন্য লড়ি? আমাদের দাবির পিছনে_’ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহিত্যকর্মের মূল্যায়ন করেছেন অনেকেই। তবে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সাহিত্য সমালোচক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, ‘মানিক প্রান্তিক মানুষের অর্থনৈতিক জীবনকে জানতেন এবং তাদের সামাজিক অবস্থা সম্বন্ধে প্রচ্ছন্ন জ্ঞান রাখতেন। এই বাস্তবতাকে তিনি তার কথাসাহিত্যে উপস্থিত করেছেন। তিনি তা কেবল বাস্তবতাকে উপস্থিত করার প্রয়োজনে উপস্থিত করেননি করেছেন বাস্তবতাকে বদলাবার প্রয়োজনেও।’

http://www.munshigonj.com/Special/Manik100/AzizManik.html