জেলা পরিষদের খেয়া ঘাট এবং বিআইডব্লিউটিএ’র লঞ্চ ঘাট ইজারাদার লঞ্চের ভাড়া আদায় করে নিত। পরে জনপতি হিসাব করে সামান্য ভাড়া পরিশোধ করা হত। এখন জেলা পরিষদের খেয়া ঘাট ৩ টাকা, বিআইডব্লিউটিএ’র লঞ্চ ঘাট ইজারাদার ২ টাকা করে নিয়মানুযায়ী ভাড়া কাটে। আর লঞ্চের ভাড়া লঞ্চ টিকিট মাস্টার (কেরানী) জনপ্রতি ১২ টাকা করে আদায় করছে। এতে যাত্রীদের যেমন হয়রানি বন্ধ হয়েছে,তেমনি লঞ্চ মালিকরা তাদের অধিকার ফিরে পেয়েছে। এব্যাপারে এমএল নিপ্পন লঞ্চের মালিক এবং লঞ্চ মালিক সমিতির মাওয়া জোনের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন খান সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, আমরা অনেক খুশি এখন। ইজারাদার সিন্ডিকেটের রাহুগ্রাসের অবসান ঘটলো দীর্ঘ ১৮ বছর পর। জেলা প্রশাসক মো. মোশারফ হোসেন বলেন, আমরা আইনের মধ্যে থেকে জনস্বার্থে সব রকম প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। মুন্সীগঞ্জ জেলা পরিষদের খেয়া ঘাটের টোল আদায় করছে এখন জেলা পরিষদেরই লোকজন।
বিক্রমপুরের ইতিহাস শুধু একটি পরগনার ইতিহাস নহে, ইহা বঙ্গেরই ইতিহাস...
Sunday, July 05, 2009
মাওয়াঘাটের যাত্রীরা স্বস্তিতে
পদ্মা সেতুতে রেলপথ কেন
আমি যেহেতু মাওয়া হয়ে একবার টুঙ্গিবাড়ীর পথে গিয়েছি, এবং আরিচা বা সাটুরিয়া-দৌলতদিয়া পথে বহুবার চলাচলের অভিজ্ঞতা আমার আছে, আমার কাছে উক্ত বিশিষ্ট ইঞ্জিনিয়ারের যুক্তিটা গ্রহণযোগ্য, এমনকি অকাট্য মনে হয়েছে। যতদূর জানি, তাঁর লেখাটি ডেইলি স্টারে প্রকাশের পর, কর্তৃপক্ষের নজরে পড়েছিল। কর্তৃপক্ষ সম্ভবত যমুনা সেতুর ফাটল প্রসঙ্গে উক্ত ইঞ্জিনিয়ার-অধ্যাপকের মন্তব্য উপেক্ষা করতে পারেননি। সেজন্য পদ্মা সেতু বিষয়ে সর্বশেষ সংবাদে দেখতে পাচ্ছি, সেতুটি দ্বিতল হবে। নিচতলায় থাকবে রেললাইন, উপরের তলায় সড়ক_ হালকা যানবাহন চলাচলের জন্য। অর্থাৎ কর্তৃপক্ষ কোনোমতেই পদ্মা সেতুর পরিকল্পনায়, রেললাইন বাদ দিতে চান না। যেটা জানতে ইচ্ছা হয় অথচ জানতে পারিনি। সেতুর উভয়দিকে রেললাইন টানতে হলে যে ব্যয় হবে সেই অর্থের জোগান কে দেবে, এ বিষয়ে আদৌ কোনো কথাবার্তা হয়েছে কি-না। এ বিষয়ে কোনো স্পষ্ট ধারণা বা প্রতিশ্রুতি ছাড়া দ্বিতল সেতু, এবং রেললাইনসহ অনেকটা ঘোড়ার আগে গাড়ির মতো শোনায়।
আমি স্বীকার করছি যে, অসম্পূর্ণ সংবাদের ওপর ভিত্তি করে এ লেখা কারও কোনো কাজে দেবে না। আমি যে প্রশ্নগুলি করেছি, তার উত্তর যদি কোনো সূত্র থেকে পাই, আমি অত্যন্ত কৃতজ্ঞ হবো। আমার একান্ত নির্ভরতা সংবাদপত্রের ওপর। চার-পাঁচটি সংবাদপত্র আমি যথেষ্ট মনোযোগ সহকারে পড়ে থাকি। এ পর্যন্ত দু'দিকে রেল-যোগাযোগ বিশিষ্ট পদ্মা সেতুর প্রসঙ্গে এই প্রয়োজনীয় তথ্যটি কোথাও পড়েছি বলে আমার মনে পড়ে না। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতিকল্পে কর্তৃপক্ষের অনেক চমকপ্রদ চিন্তার সংবাদ আমরা পাচ্ছি। কিন্তু বড়ই অসম্পূর্ণ সংবাদ।
সবচেয়ে হতাশাজনক হলো, রেলওয়ে সংক্রান্ত যে সকল আশাব্যঞ্জক সংবাদ পরিবেশন করা হয়েছে বিগত বছরগুলোতে, বাস্তবে, বাংলাদেশের রেলওয়ে-ব্যবস্থা এক করুণ অবস্থায় পড়ে আছে দীর্ঘকাল যাবৎ। সড়কপথের বিস্তৃতি ঘটেছে এবং বিস্তৃতির মাত্রাও ঈর্ষণীয়। একই সঙ্গে, রেলপথের সংকোচন ও অবহেলার দৃশ্যটি দুঃখজনক বললেও যথেষ্ট বলা হয় না। চূড়ান্ত অবহেলা-অব্যবস্থাপনা-দুর্নীতির শিকার হয়েছে রেলপথ। যতগুলি সরকার ক্ষমতায় এসেছে, সবাই রেলপথকে অবহেলা করেছে। কেন রেলগাড়িতে চড়ব নামে একটি লেখা পড়লাম একটি দৈনিকে। কী পরিমাণ দায়িত্বহীনতা ঘিরে আছে আমাদের রেলপথ ব্যবস্থাপনায়, তার এক ভয়াবহ ছবি এঁকেছেন লেখক। খুলনা থেকে দিনাজপুর যাত্রী, তাঁর অভিজ্ঞতার বিবরণ দিয়ে। এক সময় আমি ঢাকা-রাজশাহী, ঢাকা-চট্টগ্রাম পথে রেলগাড়িতে যাতায়াত করেছি। সর্বশেষ চট্টগ্রাম-ঢাকা যাত্রা_ রাতের ট্রেনে, খুবই কষ্টকর ও হতাশাজনক_ সর্বশেষ ঢাকা-রাজশাহী যাত্রা, অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। এ থেকে যে সিদ্ধান্ত টানা যায়, আমরা চাইলে রেলপথে ভালো সেবা দিতে পারি। তবে যদি না দিই, আমি কর্মচারী, আমাকে দুষবেন না। আসল দায়িত্ব যাঁর, বা যাঁদের, দুষবেন তাঁদেরকে।
আমাদের গার্মেন্ট শিল্প_ যদিও এটা শিল্পপদবাচ্য কি-না, প্রশ্ন রয়েছে, এবং একজন সাবেক অর্থমন্ত্রীর মতে, মোটেও নয়_ দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বৈদেশিক মুদ্রার শতকরা পঁচাত্তর ভাগ যদি এই খাত থেকে আসে, তাহলে এর গুরুত্ব কতখানি, যে কেউ বুঝতে পারবে।
আশুলিয়ায় ক'দিন আগে একটি গার্মেন্ট কারখানা জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দিয়েছে একদল শ্রমিক। এই কারখানাটি সম্বন্ধে বলা হয়েছে, এর শ্রমিকরা নিয়মিত বেতন পায়, এর নারী শ্রমিকেরা বলেছে, তাদের শিশু-সন্তানদের জন্য এখানে ভালো ব্যবস্থা আছে, মালিকদের প্রতি তাদের কোনো নালিশ নেই। এটি একটি সোয়েটার ফ্যাক্টরি, এখানকার শ্রমিকেরা এই অগি্নসংযোগের সঙ্গে জড়িত ছিল না কেউ। বহিরাগত একদল শ্রমিক, এবং ঝুট-ব্যবসায়ী একদল লোক এবং সেই সঙ্গে সব রকম দুষ্কর্মে হাত পাকিয়েছে, এমন কিছু লোক, এই কাণ্ড ঘটিয়েছে। ওই কারখানার শ্রমিকেরা সাধ্যমতো বাধা দিয়েছে আক্রমণকারী দলকে, কিন্তু শেষ রক্ষা করতে পারেনি। সংবাদপত্রে লিখেছে, পুলিশ দাঁড়িয়ে দেখেছে, বাধা দেয়নি। আরও লিখেছে, যেসব কারখানা থেকে পুলিশ নিয়মিত টাকা পায়, সেগুলি রক্ষার দায়িত্ব তারা ঠিকই পালন করে।
যারা পুলিশকে নিয়মিত বখরা দেয় না, পুলিশ তাদের চেনে না। গুরুতর অভিযোগ।
বিশেষ করে আশুলিয়া এলাকায় এ ধরনের হামলা ও ক্ষয়ক্ষতির শিকার হচ্ছে এলাকার গার্মেন্ট-কারখানাগুলি। বলা হচ্ছে, একটি স্বার্থান্বেষী মহল এটা করছে ইচ্ছাকৃতভাবে_ এর সঙ্গে শ্রমিকদের চাওয়া-পাওয়াজনিত ক্ষোভের কোনো সম্পর্ক নেই। এই স্বার্থান্বেষী মহল কারা হতে পারে? কেউ স্পষ্ট করে কিছু বলছে না। তবে আশুলিয়া এলাকায় এত বেশি এ ধরনের অগি্নসংযোগ-ভাংচুরের ঘটনা ঘটেছে যে, এ সম্পর্কে একটা গভীর তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। সরকার বলছে, তারা এই গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকে ভবিষ্যৎ উচ্ছৃঙ্খলা থেকে রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে এবং ইতিমধ্যেই তা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু শ্রমিকদের ক্ষোভের বিষয়টি হালকাভাবে নেওয়া উচিত হবে না। ক্ষোভ আছে বলেই ক্ষুব্ধ শ্রমিকদের উত্তেজিত করা সম্ভব হয়েছে। কারখানার মালিকরা সবাই যে শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা দিচ্ছেন, তা হয়তো নয়।
শ্রমিকেরা যেন তাদের নূ্যনতম পাওনা পায়, সে উদ্দেশ্যে বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকার কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল। কিছুটা ফলপ্রসূ হয়েছিল সে উদ্যোগ। তবে মালিকপক্ষের সকলকে নিয়মনীতির পথে আনতে পারেনি বলেই জেনেছি ওই সরকার। এ সরকার, নির্বাচিত ও জনগণের সরকার, যদি এদিকে মনোযোগ দেয়, সেটা প্রশংসনীয় কাজ হবে। নির্বাচিত নতুন সংসদে ব্যবসায়ীদের আধিপত্য রয়েছে, এ সংসদ সাধারণ শ্রমিকদের সঙ্গত দাবি-দাওয়ার প্রতি কতটা সংবেদনশীল হবে, সেটা সরকারের গৃহীত কার্যক্রমেই স্পষ্ট হবে। শ্রমিকদের অভুক্ত-অসন্তুষ্ট রেখে গার্মেন্ট শিল্প নিজের বিপদ নিজেই ডেকে আনবে, এটা মালিকপক্ষ নিশ্চয়ই চান না।
বাংলাদেশের দরিদ্র-বঞ্চিত নারীদের শ্রম-ঘামে এ দেশের গার্মেন্ট শিল্প তার বর্তমান অবস্থানে এসে পেঁৗছেছে। সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় নারী এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত আছে। নারীর ক্ষমতায়নে এ শিল্পের বড় ভূমিকা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। সেদিক দিয়ে এই শিল্প যাতে টিকে থাকে, আরও বিকশিত হয়, আরও উন্নত হয়, সেটা দেখা সরকারের কর্তব্য। এই শিল্পের সুবাদে বাংলাদেশের নারী আত্মবিশ্বাস অর্জন করেছে, নিজের পায়ে দাঁড়াতে শিখেছে। এর সামাজিক মূল্য অপরিসীম।
আশুলিয়া এলাকা সম্বন্ধে আমার ধারণা, এখানে সমাজবিরোধী ব্যক্তির সংখ্যা অনেক। এখানে অপরাধের চিত্রটি রীতিমতো উদ্বেগজনক। ইপিজেড ছাড়াও এ এলাকায় বেশ কিছু শিল্প গড়ে উঠেছে টঙ্গী-নয়ারহাট, টঙ্গী-আশুলিয়া সড়কগুলি বরাবর। অত্যন্ত অপরাধপ্রবণ এই এলাকায় পুলিশের নজরদারি বাড়ানো দরকার।
হা-মীম গ্রুপের কারখানায় যে ধ্বংসযজ্ঞ ঘটেছে, সেজন্য ওই গ্রুপের মালিকপক্ষের প্রতি নেত্রীস্থানীয় অনেক ব্যক্তি সহানুভূতি জানিয়েছেন। আমিও জানাচ্ছি আমার সহানুভূতি। সকল ক্ষয়ক্ষতি জয় করে এই গ্রুপ আবার মাথা তুলে দাঁড়াবে, তার স্পষ্ট ইঙ্গিত ইতিমধ্যেই দেখতে পাচ্ছি। সকলের শুভেচ্ছা মাথায় নিয়ে তাঁরা নতুন উদ্যমে যাত্রা শুরু করবেন, সন্ত্রাসের কাছে পরাজয় স্বীকার করবেন না, এ আমার প্রার্থনা, এ আমার বিশ্বাস।
লেখক : শিক্ষাবিদ
Saturday, July 04, 2009
টেঙ্গরশাহী জামে মসজিদ
ঐতিহ্যবাহী বিক্রমপুরের হাজারো ঐতিহ্য আর অসংখ্য স্থাপনার মধ্যে মুন্সীগঞ্জ সদর থানার অন্তর্গত মিরকাদিম পৌরসভার টেঙ্গর নামক স্থানে টেঙ্গরশাহী মসজিদটি অন্যতম। এটি পাঠান সুলতান কররানীর শাসন আমলের ( ১৫৬৯ খ্রিস্টাব্দে ) মালেক আব্দুল্লাহ নামক একজন কাজী নির্মাণ করেন। বিক্রমপুরে পাল বংশের শাসনামলে বিক্রমপুর থেকে হিন্দু ধর্ম বিলুপ্ত হয়ে রাষ্ট্রধর্ম বৌদ্ধ মত প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তী সময়ে পাল বংশ পতনের সঙ্গে সঙ্গে বৌদ্ধ ধর্মের নাম-নিশানা বিক্রমপুর থেকে মুছে যায়। এমনিভাবে মুছে যায় যেন কোনো কালেই এর কোনো অস্তিত্ব ছিল না। পাল বংশের পতনের পর সেন রাজবংশ উদ্ভবের সঙ্গে সঙ্গে পুনরাবির্ভাব ঘটেছিল সে সম্পর্কে ‘আইন-ই আকবরী’তে উল্লেখ রয়েছে। সেন বংশীয় রাজাদের সর্বশেষ রাজা বল্লাল সেনের রাজধানী ছিল রামপাল। কোনো এক কিংবদন্তি ঘটনার মধ্য দিয়ে হিন্দু রাজত্বের অবসান ঘটে এবং মুসলিম রাজত্বের আবির্ভাব হয়। সেন বংশের অবসানের পর বিক্রমপুর মূলত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সামন্ত ভূস্বামী ও জমিদাররাই শাসন করতে থাকেন। বিক্রমপুরে পাঠান রাজত্বের অবসান ও বার ভুইয়া, চাঁদ রায়, কেদার রায়ের পরাজয়ের পর এখানে মুঘল রাজত্বের সূচনা হয়। তখন পুরো বিক্রমপুর একটি পরগনায় পরিণত হয়। বর্তমানে এটি মুন্সীগঞ্জ জেলা হিসেবে পরিচিত লাভ করেছে। একটি প্রাচীরবেষ্টিত ভূমিতে এ মসজিদটি অবস্থিত। এ মসজিদটির দৈর্ঘ্য ৩৬ ফুট ও প্রস্থ ৩৪ ফুট। মসজিদের পূর্বে চারটি, পশ্চিমে চারটি এবং উত্তর ও দক্ষিণে দুটি করে মোট ১২টি খিলানের ওপর মসজিদটি নির্মিত। মসজিদের দেয়াল ৫ ফুট পুরু, চতুর্দিকে বেষ্টিত একটি মজবুত স্থাপনা। বর্গাকৃতি এই মসজিদের প্রতিটি বাহু ৩১ ফুট। এক গম্বুজবিশিষ্ট এই মসজিদের মূল আকর্ষণ গম্বুজেই অনেকটা নিহিত রয়েছে। এটির সর্বোচ্চ শিখরে একটি কারুকার্যম-িত শিখর দ- বিদ্যমান। গম্বুজের উপরের গোলার্ধে ও নিচের অংশে চিনামাটির মধ্যযুগের কারুকাজ এখনো চোখে পড়ে। মসজিদের ভেতরে বর্গাকৃতি অবকাঠামোতে এক একটি খিলানের ৮ ফুট উপর থেকে গম্বুজের স্থাপনাশৈলী পর্যায়ক্রমে গম্বুজের কেন্দ্রবিন্দুতে মিলিত হয়েছে। অপরূপ কারুকার্যম-িত মসজিদের ভেতরেও মধ্যযুগীয় ত্রিভুজাকৃতির সৌন্দর্যের শোভা লক্ষ্যণীয়। পূর্ব দিকে মসজিদের একটি প্রবেশ পথ রয়েছে। দুপাশে দুটি করে জানালা এবং উত্তর ও দক্ষিণে একটি করে আরো মোট দুটি জানালা রয়েছে। মসজিদের ভেতরের পশ্চিম দিকে মধ্যভাগে একটি বড় মিম্বর এবং দুপাশে অনুরূপ দুটি ছোট মিম্বর রয়েছে। মসজিদের উত্তর ও দক্ষিণ পাশে জানালার দুপ্রান্তে দুটি করে মোট চারটি চূড়ঙ্গী রয়েছে। এগুলোতে মসজিদের সংরক্ষিত কোরআন, কিতাব ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। এ জামে মসজিদটি সুদীর্ঘকাল থেকে স্থানীয় মুসল্লিদের একমাত্র নামাজ আদায়ের পীঠস্থান। এ মসজিদে একটি মিনার রয়েছে তার উচ্চতা ৬০ ফুট। প্রতিদিন অসংখ্য লোক এখানে নামাজ আদায় করেন। তাছাড়া এ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকেও ঐতিহ্যবাহী এ মসজিদটি দেখার জন্য বহু লোকের সমাগম ঘটে। অভিযোগ আছে যে, মসজিদের শিলালিপিটি জোর করে পশ্চিম পাড়ার লোকজন নিয়ে যায়। তাই মূল মসজিদের গায়ে আরবি শিলালিপি দেখা যায় না। পরবর্তী সময়ে এখানে একটি বাংলা শিলালিপি স্থাপন করা হয়েছে। বাংলা শিলালিপিটি এরূপÑ ‘টেঙ্গর শাহী মসজিদ। স্থাপিত ৮৭৫ বাংলা, রিকাবী বাজার মুন্সিগঞ্জ।’ বাংলা শিলালিপির সঙ্গে আরবি শিলালিপির তেমন কোনো মিল নেই। মোয়াজ্জেম শামীম হুজুর জানান, অর্থ সংকটে মসজিদের অনেক কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না। মসজিদটি সংস্কার করা প্রয়োজন বলে তিনি জানালেন। ৪৩৬ বছরের পুরনো এ মুসলিম নিদর্শন। টেঙ্গর শাহী মসজিদটি শুধু মুন্সীগঞ্জের ইতিহাসই বহন করে না, সারা বাংলাদেশের মুসলমানদের ইতিহাস বহন করে চলেছে।
মুন্সীগঞ্জের নৌপথে চোরাচালন
সংগ্রামী জীবনশিল্পী মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়

এ ম এ আ জি জ মি য়া
বাংলা সাহিত্যে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯০৮-১৯৫৬) এক বিস্ময়কর প্রতিভা, অনন্য কথাশিল্পী। শোষিত, বঞ্চিত ও নিপীড়িত মানুষের জীবনযাত্রা ও লড়াই-সংগ্রাম তিনি সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন এবং নিপুণ শিল্পীর ন্যায় কলমের অাঁচড়ে তা জীবন্ত করে তুলেছেন। সেখানে তাঁর মানবপ্রেম, সামাজিক অঙ্গীকারবোধ এবং শ্রেণী দৃষ্টি ভঙ্গি সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। লেখক জীবনের শুরুতে তার মধ্যে ফ্রয়েডীয় রেখাপাত দেখা গেলেও অচিরেই তিনি তা কাটিয়ে ওঠেন। নিছক শিল্পের জন্য শিল্প নয়, তিনি বিশ্বাসী ছিলেন মানুষের জন্য শিল্প বা জীবনের জন্য শিল্প অভিধায়। এক্ষেত্রে মানুষ বলতে তিনি মেহনতী গণমানুষকে বুঝিয়েছেন। তার এ মানসগঠনে ছাত্রজীবনে বিজ্ঞান অধ্যয়ন এবং পরে দেশী-বিদেশেী সাহিত্য ও দর্শন পাঠ বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল। এজন্য কল্লোল যুগের (১৯২৩-১৯৩০) হয়েও তিনি কল্লোলীয় তরঙ্গে আন্দোলিত হননি, স্পন্দিত হননি পূর্ব-দিগন্তের প্রখর রবিরশ্মি দ্বারা। প্রথমদিকে তিনি প্রগতি লেখক সংঘের আন্দোলনে সম্পৃক্ত না হলেও চলি্লশের দশকে প্রগতি লেখক ও শিল্পী সংঘের কর্মকান্ডে ব্যাপকভাবে জড়িয়ে পড়েন। তিনি যোগ দেন কম্যুনিস্ট পার্টিতে। তখন লেখালেখির পাশাপাশি পার্টির সমাজবদলের কর্মকান্ডই তার জীবনের প্রধান অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে। আর এজন্য তাকে বরণ করে নিতে হয়েছিল চরম দারিদ্র্যক্লিষ্ট জীবন। গণমানুষের জীবনের শরিক হয়ে একজন কলমপেশা শ্রমিকের ন্যায় তিনি সারাটি জীবন অর্থকষ্টে কাটিয়েছেন; তবুও কোনো মোহ বা প্রলোভনের পঙ্কিল পথে পা বাড়াননি। ব্যতিক্রম মানিক জীবনের বৈশিষ্ট্য এখানেই। আর এজন্যই বাংলা সাহিত্যে মানিক, মানিক রতন হয়ে রয়েছেন। শত বছরের মানিক মারাও গেছেন অর্ধশত বছরের বেশি হয়ে গেল। কিন্তু আজও তার দীপ্তি ছড়িয়ে পড়ছে অবিশ্রান্ত ধারায়। তিনি জন্মেছিলেন ১৯০৮ সালের ১৯ মে সাঁওতাল পরগনার দুমকা শহরে এবং মারা যান ১৯৫৬ সালের ৩ ডিসেম্বর কলকাতায়। তার সাড়ে ৪৮ বছরের স্বল্পায়ু জীবনে তিনি সাহিত্যচর্চা করেছেন ৩২ বছর। তার মধ্যে কিশোর বয়সে ৪ বছর নীরব কাব্যচর্চা (১৯২৪-১৯২৮), কলেজ জীবনে ৪ বছর শৌখিন সাহিত্যচর্চা (১৯২৮-১৯৩২) এবং অবশিষ্ট ২৪ বছর তিনি নিরবচ্ছিন্ন সাহিত্যচর্চা (১৯৩২-১৯৫৬) করেছেন। এ সময়কালে তিনি বাংলা সাহিত্যে যে অবদান রেখে গেছেন গুণ, মান ও সংখ্যায় তা অভাবনীয় ও বিস্ময়কর। তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ৮৩। তার মধ্যে উপন্যাস-৪০ (অসম্পূর্ণ-৩), গল্পগ্রন্থ-২২, প্রবন্ধ সংকলন-৩, নাটক-১, কাব্যগ্রন্থ-১ এবং অন্যান্য-১৬। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পৈতৃক বাড়ি ছিল বিক্রমপুর (মুন্সিগঞ্জ)-এর মালপদিয়া গ্রামে। তার পূর্বপুরুষরা ছিলেন সিমুলিয়া গ্রামের অধিবাসী। তার পিতার নাম হরিহর বন্দ্যোপাধ্যায় ও মা নীরদাদেবী। তার মাও ছিলেন বিক্রমপুরের গাওদিয়া গ্রামের মেয়ে। তাই মানিকের শেকড় গ্রথিত ছিল প্রাচীন বাংলার ইতিহাসখ্যাত শত ঐতিহ্যমণ্ডিত বিক্রমপুরে এবং এখানকার মাটি থেকেই তার জীবনরস সিঞ্চিত হয়েছে; আত্মপ্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে তা ফুলে ফলে সুশোভিত হয়েছে। অাঁতুর ঘরে কালো গায়ের রং-এর মধ্যেও তার ঔজ্জ্বল্য প্রকাশ পেয়েছিল। তাই তার নামকরণ হয়েছিল ‘কালো মানিক’। কিন্তু পিতৃপ্রদত্ত নাম ছিল প্রবোধ কুমার। ডাক নাম মানিক হলেও লেখক নাম মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। বিশ বছর বয়সে কলেজে পড়াকালে বন্ধুদের সঙ্গে বাজি ধরে লিখে ফেলেন ‘অতসী মামী’ গল্পটি। তা ১৩৩৫ সালের পৌষ সংখ্যা ‘বিচিত্রা’য় প্রকাশিত হলে সকলে চমকে ওঠেন। লেখালেখির জগতে মানিকের এই যে অগ্রযাত্রা প্রাণস্পন্দন থেমে না যাওয়া পর্যন্ত তা অব্যাহত ছিল। যেসব পত্রপত্রিকায় তার লেখা প্রকাশিত হয়েছে তার মধ্যে বিচিত্রা, বঙ্গশ্রী, পূর্বাশা, ভারতবর্ষ, পরিচয়, যুগান্তর, প্রভাতী, আনন্দবাজার, স্বাধীনতা, বসুমতী, ছোটদের রংমশাল, অভিদারা, অনন্যা, এলোমেলো, এখন, আগামী প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। তার প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ (উপন্যাস) ‘জননী’ এবং গল্পগ্রন্থ ‘অতসী মামী ও অন্যান্য গল্প’। তার অসম্পূর্ণ উপন্যাস ‘মাটি ঘেঁষা মানুষ’ সম্পূর্ণ করেন সুধীর রঞ্জন মুখোপাধ্যায়। কিশোর উপন্যাস ‘মশাল’ কে সম্পূর্ণ করেছেন তা জানা যায়নি। তবে কিশোর উপন্যাস ‘মাটির কাছে কিশোর কবি’ সম্পূর্ণ করেছেন খগেন্দ্রনাথ মিত্র। তার লেখা দুটি উপন্যাসের ভূমিকা অসম্পূর্ণ ছিল, সম্পূর্ণ নয় অগ্রন্থিত রচনার তালিকা। কিছু লেখা হয়তো এখনও অনাবিষ্কৃত রয়ে গেছে।
চাকুরিজীবী পিতার কর্মস্থান পরিবর্তিত হওয়ায় তিনিও বিভিন্ন স্থানে লেখাপড়া করেছেন। ফলে লেখাপড়ায় অনেকটা বিঘ্ন ঘটলেও নানান অঞ্চলের মানুষের সাথে মেলামেশা করে যে বাস্তবজ্ঞান অর্জন করেছিলেন সে সব অভিজ্ঞতা তার পরবর্তীকালের লেখক জীবনে সহায়ক হয়েছিল। ছোটবেলা থেকে তিনি মেধাবী ছিলেন এবং পরীক্ষায় ভাল ফল করেছেন। ১৯২৪ সালে মা মারা গেলে তিনি অনেকটা শোকাচ্ছন্ন হয়ে পড়েন এবং সম্ভবত এ সময়ে নীরবে কাব্যচর্চা শুরু করেন। ১৯২৬ সালে মেদেনীপুর স্কুল থেকে তিনি প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করেন। নৈর্বাচনিক ও আবশ্যিক গণিতে লাভ করেন লেটার মার্ক। ১৯২৮ সালে বাঁকুরা ওয়েস লিয়ন মিশন কলেজ থেকে তিনি আইএসসি পাস করেন প্রথম বিভাগে। তিনি ভর্তি হলেন প্রেসিডেন্সি কলেজে গণিত বিষয়ে বিএসসি সম্মান শ্রেণীতে। কিন্তু এ সময়ে তিনি ধরাবাঁধা লেখাপড়ায় আগ্রহ হারিয়ে দেশ-বিদেশের সাহিত্য পাঠে মনোনিবেশ করেন। ফলে পরপর দু’বছর বিএসসি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হন। এ জন্য নিকট ছাত্ররাও তার প্রতি বিরাগভাজন হয়ে পড়েছিলেন। ইতোমধ্যে তার লেখালেখিও শুরু হয়ে গিয়েছিল পুরোদমে। জীবনধারণের জন্য চাকুরি করেন নবারুন (১৯৩৪) ও বঙ্গশ্রী (১৯৩৭-১৯৩৯) পত্রিকায় সহকারী সম্পাদক হিসেবে। কিন্তু মৃগী রোগাক্রান্ত মানিককে ডা. বিধানচন্দ্র রায় বিয়ে করার পরামর্শ দিলেন। ১৯৩৮ সালের ১১ মে বিক্রমপুরের পঞ্চসার গ্রামের সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কন্যা কমলা দেবীর সঙ্গে তার বিয়ে হয়। শরীরও অনেকটা সুস্থ হয়ে এলো। ইতোমধ্যে তার লেখক খ্যাতি দেশময় ছড়িয়ে পড়েছে। পেশা হিসেবে লেখালেখিকেই বেছে নিয়েছেন। আর্থিক অসচ্ছলতা ঘোচাতে ১৯৩৯ সালে তিনি একবার প্রেসব্যবসা শুরু করেছিলেন। উদ্দেশ্য সেখান থেকেই বই ও একটি পত্রিকা প্রকাশ করবেন। কিন্তু এক বছর না যেতেই প্রেস ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায়। লেখালেখির অর্থে সংসার চলে না। অবসরপ্রাপ্ত বৃদ্ধ পিতাও স্বেচ্ছায় আশ্রয় নিয়েছেন। পিতার সেবাযত্নেও এতটুকু অবহেলা তিনি করেননি। ১৯৪৩ সালে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের সময় কিছুকাল তিনি ওয়ার ফ্রন্টের প্রভিন্সিয়াল অর্গানাইজার এবং বেঙ্গল দফতরে পাবলিসিটি এসিস্যান্ট হিসেবে চাকরি করেছেন। আকাশ বাণী কলকাতা কেন্দ্রে যুদ্ধ বিষয়ক প্রচার ও নানাবিধ বেতার অনুষ্ঠানে যোগদান করেছেন। কিন্তু সে সময় ফরমায়েসি কাজে তার পোষায়নি। তিনি স্বেচ্ছায় কেটে পড়েছেন। লেখালেখি করে অধিক অর্থ উপার্জনের চেষ্টা করেছেন। তার লেখায় যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ, দুর্ভিক্ষ, কালোবাজারী, মুনাফালোভীর চিত্র ফুটে ওঠে। তাছাড়া ফ্যাসিবাদ, উগ্র জাতীয়তাবাদ ও সামপ্রদায়িকতার বিষবাষ্পে ভূলুণ্ঠিত মানবতা বিশেষ করে কৃষক-শ্রমিক মেহনতী মানুষের জীবন সংগ্রাম মূর্তমান হয়ে ওঠে। তার সাহিত্যখ্যাতিও দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে।
১৯৪২ সালের ৮ মার্চ ঢাকাতে ফ্যাসিবিরোধী সমাবেশে যোগদানের জন্য তরুণ লেখক ও কম্যুনিস্টকর্মী সৌমেন চন্দ (১৯২০-১৯৪৮) মিছিল নিয়ে আসার পথে ফরোয়ার্ড ব্লকের গু াদের হাতে রাজপথে নৃশংসভাবে নিহত হয়। সে প্রেক্ষাপটে কলকাতায় গঠিত হয়েছিল ফ্যাসিবিরোধী লেখক ও শিল্পীগোষ্ঠী। প্রথম দিকে প্রগতি লেখক সংঘের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা না থাকলেও পরবর্তীকালে এ সব সংগঠনের সঙ্গে নিজকে সম্পৃক্ত করে নেন। বুখারিনের বস্তুবাদ ও লিয়েনতিয়েনের মার্কসীয় অর্থনীতি পাঠ করে মার্কসীয় দর্শনের প্রতি তিনি আস্থাশীল হয়ে ওঠেন। ১৯৪৪ সালে তিনি কম্যুনিস্ট পার্টিতে যোগদান করেন। মার্কসীয় দর্শনের বইপত্র পড়ে তিনি সম্পূর্ণ বদলে যান। ‘সাহিত্য করার আগে’ শীর্ষক লেখায় তিনি বলেছেন, মার্কসবাদ যতটুকু বুঝেছি তাতেই আমার কাছে ধরা পড়ে গিয়েছে যে, আমার সৃষ্টিতে কত মিথ্যা বিভ্রান্তি আর আবর্জনা আমি আমদানী করেছি জীবন ও সাহিত্যকে একান্ত নিষ্ঠার সঙ্গে ভালবেসে ও জীবন ও সাহিত্যকে এগিয়ে নেয়ার উদ্দেশ্য থাকা সত্ত্বেও। ১৯৪৪ সালের ১৪-১৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত ফ্যাসিবিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘের দ্বিতীয় বার্ষিক সম্মেলনে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তার সভাপতিম লীর অন্যতম সদস্য নির্বাচিত হন। সে বছর ২৫-২৭ আগস্ট অনুষ্ঠিত পূর্ববঙ্গ প্রগতি লেখক ও শিল্পী সম্মেলনে তিনি যোগদান করেন। ১৯৪৫ সালের ৩-৮ মার্চ ভারতীয় প্রগতি লেখক সংঘের অন্যতম যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৪৬ সালে ভয়াবহ দাঙ্গা প্রতিরোধে তিনি অসুস্থ শরীর নিয়ে এগিয়ে যান এবং বহু সভা সমাবেশে যোগদান করেন। ১৯৪৯ সালের ২২ এপ্রিল প্রগতি লেখক সংঘের চতুর্থ বার্ষিক সম্মেলনে পুলিশী হানার মধ্যেও তিনি ডেলিগেট অধিবেশনে যোগদান করেন। ২২ নভেম্বর ট্রাম বাড়িতে অনুষ্ঠিত প্রগতি লেখক সংঘের শান্তি সম্মেলনে তিনি সভাপতিত্ব করেন। সভাপতিত্ব করেছিলেন ১৯৫৩ সালে অনুষ্ঠিত প্রগতি লেখক সংঘের পঞ্চম বার্ষিকী সম্মেলনে। লেখার চাপ ছাড়াও পার্টি এবং অন্যান্য সাগংঠনিক কাজে বেশি বেশি পরিশ্রম করার ফলে তার শরীর ভাঙতে শুরু করে। পার্টির পক্ষ থেকে তাকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি করে দেয়া হয়। কিন্তু হাসপাতালে তিনি কখনও স্বস্তিবোধ করেননি। নিজ দায়িত্বেই তিনি বাসায় ফিরে এসেছেন। তারপর ১৯৫৬ সালের ৩০ নভেম্বর তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়েন। অসহায় পারিবারিক পরিবেশে দুই দিন থাকার পর ২ ডিসেম্বর রাত ১০টায় নীলরতন সরকার হাসপাতালে তাকে ভর্তি করা হয়। না সেখানে আর তাকে বেশি সময় কাটাতে হয়নি। ৩ ডিসেম্বর ভোর চারটায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। সময় পেলেন না কাকা বাবুর (কমরেড মুজাফফর আহমদ) জীবনী লেখার।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে সাহিত্য চর্চার বয়স হল ৩০ বছর। এ সম্পর্কে তিনি বলেছেন, ‘তিরশ বছর বয়সের আগে কারো লেখা উচিত নয়। আমি সেই বয়সে লিখবো। এর মধ্যে তৈরি হয়ে নিতে হবে সব দিক দিয়ে। কেবল অভিজ্ঞতা সঞ্চয় নয়। নিশ্চিত মনে যাতে সাহিত্যচর্চা করতে পারি তার বাস্তব ব্যবস্থাগুলো ঠিক করে ফেলবো।’ কিন্তু সে সুযোগ তিনি পাননি। অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে ত্রিশ বছরের বহু পূর্বেই তিনি লেখালেখিকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। কিশোর বয়সে কবিতা ও গল্প লিখেছেন। কিন্তু ঔপন্যাসিক হওয়ার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছেন তার ‘উপন্যাসের ধারা’_ লেখায় ‘… সাধ করলে কবি হয়তো আমি হতে পারি; কিন্তু ঔপন্যাসিক হওয়াটাই আমার পক্ষে হবে উচিত ও স্বাভাবিক।’ তার স্বপ্ন সত্যে পরিণত হয়েছে ঔপন্যাসিক হিসেবে তিনি সুখ্যাতি অর্জন করেছেন। বিজ্ঞানের ছাত্র মানিকের বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি উপন্যাস রচনায় সহায়ক ভূমিকা সম্পর্কে তিনি বলেছেন, উপন্যাস লেখার জন্য দরকার খানিকটা বৈজ্ঞানিক বিচারবোধ, বিজ্ঞানচর্চা না করলেও সম্পূর্ণভাবে নিজের অজ্ঞাতসারে হলেও ঔপন্যাসিক খানিকটা বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করবেন, তাতে বিস্ময়ের কিছু নেই।
মানবতাবাদী মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সামপ্রদায়িকতা, ফ্যাসিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধকে অন্তর থেকে ঘৃণা করেছেন। অসুস্থ শরীরে জীবনের ঝুঁকি নিয়েও তিনি সামপ্রদায়িক দাঙ্গার বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। তিনি ডায়েরিতে লিখেছেন, ‘দাঙ্গার কথা শুনে মনটা খারাপ হয়ে গেল। … বিকালে এ অঞ্চলে শান্তিসভা হবে শুনলাম। খুশি হয়ে নিজে রাজি হলাম যতটা পারি সাহায্য করতে। যাকে দেখছি তাকে বলছি মিটমাটের জন্য সভায় যেতে। মসজিদের কাছে আনোয়ারশা রোডের একদল মুসলিম স্বীকার করলেন মিটমাট দরকার_ কয়েকজন উত্তেজিতভাবে বললেন মেরে পুড়িয়ে এখন মিটমাটের কথা কেন? অন্যরা তাদের থামালেন। ফাঁড়ি পেরিয়ে পুলের নিচে যেতে এল বিরোধিতা_ হিন্দুদের কাছ থেকে। কিসের মিটমাট মুসলমানরা এই করেছে ঐ করেছে। ব্যাটা কম্যুনিস্ট বলে আমায় মারে আর কি। প্রায় দেড়শ লোক মিলে ধরেছিল।’ ভারত ভাগের পর ১৯৫০ সালেও কলকাতায় সামপ্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছে। এ ব্যাপারে তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল খুবই স্পষ্ট। তিনি ডায়েরিতে লিখেছেন, সামপ্রদায়িকতার উপরটাই লোকে দেখছে। পিছনে কি গভীর ও ব্যাপক ষড়যন্ত্র, চোখে পড়ে না। যে উদ্দেশ্যে ভারত বিভাগ, সেই উদ্দেশ্যেই ভারত পাকিস্তানের বিবাদ বাড়িয়ে চলা বৃটিশ আমেরিকান সামপ্রাজ্যবাদ দুই রাষ্ট্রের ঘাড়ে চেপে থাকতে পারে। সামপ্রদায়িকতার ভিত্তিতে দেশ ভাগ ছিল তার অসহ্য। তার লেখায় তা সুস্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে : ‘কানাই বলে মাঠে একটা ফ্লাগ উড়াই? আমি বলি ব্লাক ফ্লাগ উড়াও। কানাইয়ের ভাই বলাই বলে ঠিক। উদ্বাস্তুরা কি স্বাধীনতা পেয়েছে? সাত আট বছরের ছেলে। ফ্লাগ কিছু কিছু উড়েছে_ কিন্তু চার দিক ঝিমানো।’
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাদাসিধে জীবনযাপন সম্পর্কে অনেকেই লিখেছেন। রথীন্দ্রকান্ত ঘটক চৌধুরী তার ‘একটি গল্পের জন্মকথা’য় লিখেছেন, ‘ছোট একটা পুরাতন একতলা দালান। সামনের দিকে অল্প পরিসর একটা কোঠা মানিক বাবুর লেখার ঘর। মাদুর বিছানো সাধারণ একটা তক্তপোষ ঘরের এক পাশে। মান্দাতার আমলের হতশ্রী লেখার টেবিল একটা_ তার একটিমাত্র বসার চেয়ারের অবস্থাও একই রকমের। গোটা তিনেক বইয়ের আলমারী পিছনটাতে। বইয়ের সংখ্যা সামান্য। বাঁধাই ‘প্রবাসী’, ‘ভারতবর্ষে’র সংখ্যাই বেশি।
বাজার থেকে ফিরে এলেন মানিক বাবু অল্প কিছুক্ষণ বাদে। গায়ে আধময়লা গেঞ্জি, পরনে লুঙ্গি। এক হাতে আট-নয় বছরের মেয়ের হাত ধরেছেন আর এক হাতে বাজারের চটের থলে। লম্বা প্রায় ছয় ফুট, বলিষ্ঠ কালো কুঁদানো শরীর, চাষাভূষাদের মতন। খোঁচা খোঁচা দাড়ি-গোঁফে মুখম ল আবৃত্ত তবে কুশ্রীতা নেই কোথাও প্রাণোচ্ছল সাজিবতায় ভরপুর। কালো ফ্রেমের চশমা ভেদকরা এক জোড়া নিবিষ্ট চোখ। অনাবৃত বাহুযুগলের পেশিতে যৌবনোচিত দৃঢ়তা। বেশভূষা, চেহারা সবটাই মিলিয়ে আবার নতুন করে যেন দেখলাম মানিক বাবুকে। খারাপ লাগেনি তবুও বাজারের থলেটাকে বাংলাদেশের প্রথম সারির একজন কথাশিল্পীর হাতে কেমন যেন বেমানান মনে হয়েছিল। … তার অনাড়ম্বর জীবনযাত্রার পরিচয় পেয়ে প্রকৃতই অন্তরঙ্গতা অনুভব করেছিলাম সেদিন।’
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সারা জীবন অর্থকষ্টে ভুগেছেন। অনেক সময় অসুখ হলে নিজের বা পরিবারের সদস্যদের সুচিকিৎসারও ব্যবস্থা করতে পারেননি। কোনো কোনো সময় পার্টি, কবি-সাহিত্যিক বন্ধু বা শুভানুধ্যায়ীরা সহায়তার হাত প্রসারিত করেছেন। তারপরও এককালীন কিছু টাকা পেলে পুরোটাই পার্টি ফান্ডে জমা করে দিতেন। পৈতৃক বাড়ি বিক্রির টাকা তিনি পারিবারিক সদস্যদের অজ্ঞাতেই পার্টিকে দিয়েছিলেন। পার্টির প্রতি তিনি এতটাই অনুরক্ত ছিলেন। অন্যদিকে যে কোনভাবে টাকাপয়সা আয় করা তার রুচিবোধের বাইরে ছিল। রথীন্দ্রকান্ত ঘটক চৌধুরীর সঙ্গে আলাপকালে তার এ দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ পেয়েছে : ‘এখন সংসার চালাতে হয় শুধু এই দিয়েই। আর তো পেশা নেই কোন। তাছাড়া সব কাগজে লিখিনে এখন আর, কারণ তাতে লেখক সম্বন্ধে পাঠকের ধারণা নিচু হয়ে যায়_ সম্ভাবনা থাকে ভুল বুঝবার। তা যদি লিখতাম তা হলে অনেক টাকা রোজগার করতে পারতাম। অভাব থাকতো না কোন, দেখলেন তো কত সাহিত্যিক বাড়ি করলেন, গাড়ি করলেন_ আমি গরিবই রয়ে গেলাম সারা জীবন। অনেক সময় তিনি পয়সার অভাবে ওষুধ কিনে খেতে পারেননি। এমনকি একটি অসহায় অবস্থা নিজ ডায়েরিতে উলি্লখিত হয়েছে। ক’দিন থেকে শরীর খুব খারাপ, … কি যে দুর্বল বলা যায় না, বিছানা থেকে উঠবারও শক্তি নেই_ এদিকে ঘরে পয়সা নেই। জোর করে তো বেরোলাম ফিরবো কিনা না জেনে।’ তারপর সর্বশেষ যখন আর্থিক অসহায়ত্বের কারণে দুই দিন নিজ বাড়িতে অজ্ঞান হয়ে থাকবার পর হাসপাতালে ভর্তির সংবাদ পেয়ে কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় তাকে দেখতে গিয়েছিলেন। এমন অবস্থায় টেলিফোন না করার কারণ জিজ্ঞাসা করায় মানিক পত্নী অস্ফুট স্বরে হেসেই উত্তর দিয়েছিলেন, ‘তাতে যে পাঁচআনা পয়সা লাগে ভাই।’
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন শ্রেণী-সংগ্রামে বিশ্বাসী লেখক। তার অনেক লেখায় তা পরিলক্ষিত হয়। শ্রেণী-সংগ্রামের বিজয়ে প্রত্যয়ী মানিক বন্দোপাধ্যায় তার ‘নেতা’ গল্পে লিখেছেন, ‘… আমরা কোন দাবি ছাড়বো না। আমরা কি শুধু রুজির জন্য লড়ি? আমাদের দাবির পিছনে_’ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহিত্যকর্মের মূল্যায়ন করেছেন অনেকেই। তবে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সাহিত্য সমালোচক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, ‘মানিক প্রান্তিক মানুষের অর্থনৈতিক জীবনকে জানতেন এবং তাদের সামাজিক অবস্থা সম্বন্ধে প্রচ্ছন্ন জ্ঞান রাখতেন। এই বাস্তবতাকে তিনি তার কথাসাহিত্যে উপস্থিত করেছেন। তিনি তা কেবল বাস্তবতাকে উপস্থিত করার প্রয়োজনে উপস্থিত করেননি করেছেন বাস্তবতাকে বদলাবার প্রয়োজনেও।’
কথাসাহিত্যিক আলাউদ্দিন আল আজাদ
সরকার মাসুদ
পঞ্চাশের দশকের শেষদিকে আজাদের শিল্পচেতনা উল্লেখযোগ্য মোড় নেয়। ফলে পাল্টে যায় তার লেখার বিষয় ও ভাবনারীতি। আর্তবিপন্ন মানুষের জীবনসংগ্রাম, মনোবিশ্লেষণ, ফ্রয়েডীয় যৌনতত্ত্ব, আত্মহনন, সুবিধাবাদী রাজনীতি, মানুষের নাছোড় উচ্চাশা, স্বপ্ন আর স্বপ্নভঙ্গের বেদনা বেশি করে জায়গা পায় তার গল্প-উপন্যাসে। উত্তরকালে শওকত আলী, হাসান আজিজুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, কায়েস আহমেদ, শহীদুল জহির প্রমুখ লেখক তাদের শিল্পরুচি ও সামর্থ্য দিয়ে বাংলা কথাসাহিত্যের যে উঁচু মান তৈরি করেছেন, তার পথনির্দেশক তো আজাদের মতো অগ্রজ লেখকরাই। পরের প্রজন্মের শক্তিমান লেখকরা যেমন তাদের শক্তিমত্তা দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়েছেন, তেমনি তাদের ভ্রান্তি থেকেও শিখেছেন অনেক কিছু।
ছাব্বিশ-সাতাশ বছর ধরে আলাউদ্দিন আল আজাদের সাহিত্যকর্ম পড়ে আসছি, বিশেষ করে তার উপন্যাস এবং ছোট গল্প। কিন্তু যখন থেকে আমরা তার রচনার সঙ্গে পরিচিত, তারও প্রায় ত্রিশ বছর আগে তিনি লেখাজোকা শুরু করেছিলেন। এখনো, এই বয়সেও অন্যূন ৭৫ বছর, তিনি লেখার ব্যাপারে উদ্যমী, নতুন পরিকল্পনার সূচক এবং সাধ্যমতো তার রূপায়ণকারী। তার সাম্প্রতিককালের কিংবা একেবারে এই মুহূর্তের লেখায় বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ কিছু নাও মিলতে পারে। কেননা শিল্পীর সৃজনসামর্থ্য সারাজীবন একইরকম থাকে না, বরং শেষ জীবনে তা অনেকটাই ক্ষয়ে আসে। ব্যতিক্রমীরা এ ক্ষেত্রে খুবই বিরল দৃষ্টান্ত। কিন্তু যে আগ্রহ তার শিল্পীজনোচিত আর্তি ও আকাক্সক্ষা এই লেখক তার ভেতরে জ্বালিয়ে রেখেছেন, আজো তা নিঃসন্দেহে শ্রদ্ধেয়।
সব্যসাচী লেখক পৃথিবীর সব ভাষার সাহিত্যেই বিরল। বাংলাদেশে বোধহয় বিরলতর। আলাউদ্দিন আল আজাদ সেই বিরল সাহিত্যিকদেরই একজন। শুধু তা-ই নয়, তিনি অগ্রগণ্য লেখকদের মধ্যে পড়েন। আজাদ লিখছেন অল্প বয়স থেকে। ছাত্রজীবনেই গল্প লিখে পাঠকের মনোযোগ কেড়েছিলেন। ছাত্রাবস্থায় প্রকাশিত হয় তার প্রথম গল্পের বই ‘জেগে আছি’। বইটি সে সময় যথার্থ প্রতিশ্রুতিবান তরুণ লেখকের সম্মান কুড়াতে সক্ষম হয়েছিল। তারপর থেকে সৃজনশীলতার সন্ধিৎসু আবেগে তিনি লিখে চলেন একটার পর একটা ছোটগল্প; খানিকটা পরিণত হয়ে উপন্যাস। আজাদ কয়েকটি নিরীক্ষাধর্মী নাটক এবং অসংখ্য কবিতাও লিখেছেন। কবি হিসেবেও তার অবস্থান স্পষ্ট। তিনি পঞ্চাশের দশকের কবিদের প্রথম সারির না হলেও দ্বিতীয় সারির প্রথমদিকের একজন বলে মনে করি।
লেখক জীবনের গোড়ার বছরগুলোতে কবি হিসেবে সুপরিচিতি পেলেও আলাউদ্দিন আল আজাদ পরবর্তী চার দশকে বিবর্তিত হয়েছেন একজন শক্তিমন্ত কথাসাহিত্যিক রূপে। তার ছোটগল্পের অনেকগুলোতেই ‘বিন্দুর ভেতরে সিন্ধু’ থিওরির প্রমাণ মিলবে; মিলবে ভাবের দিক থেকে, দৃষ্টিভঙ্গির আধুনিকতার নিরিখে। সমাজভাবনা, চরিত্রপাত্রের বিশ্লেষণ আর শিল্পোদ্বেগÑ এ তিনে মিলে তার ছোটগল্প হয়েছে আকর্ষণীয়। সেগুলোর আকর্ষণী হওয়ার পেছনে অন্য কারণও আছে। তা হচ্ছে ভাষার ব্যবহার। হ্যাঁ, আঠালো এবং বীক্ষণমূলক একটি গল্পভাষা আরো করেছিলেন তিনি, যা না থাকলে কাহিনীকার হওয়া সম্ভব, কথাশিল্পী নয়। আজাদের ‘বৃষ্টি’ নামে একটি গল্পের কথা বলবো। ষাট বছর বয়সী এক বৃদ্ধের তৃতীয় পক্ষের বাইশ বছরের স্ত্রীর সঙ্গে তার প্রথম পক্ষের ছেলের দেহমনের সম্পর্ক চিত্রিত হয়েছে এ গল্পে। জীবন বাস্তবতা আর অনতিক্রম্য মানস পরিস্থিতি দক্ষ হাতে রূপায়িত হয়েছে এখানে। মানব-মানবীর যৌন তাড়না, অবদমিত মনের ইচ্ছা এবং রহস্যময় পরিস্থিতি যথেষ্ট খোলামেলাভাবে হাজির করেছেন লেখক। বিষয়ের প্রতীকী ব্যঞ্জনা, প্রযুক্ত গদ্যভাষার ধরনটির অনিবার্যতা গল্পটিকে করে তুলেছে অসামান্য। তার গল্পে প্রাচুর্য আমাদের সমীহা জাগায়। একইসঙ্গে গল্পগুলোর ভেতরের ভাবস্বাতন্ত্র্যও আমাদের দৃষ্টি এড়াতে পারে না। তাই দেখা যায়, ভাষার প্রসাদ, কবিসুলভ কল্পনা, সৃজনী আবেগ, পরিপার্শ্বচেতনা, সমাজবীক্ষাÑ এ সবকিছু নিয়েও তার একটি গল্প আরেকটি থেকে কতো আলাদা। সেটা সম্ভব হয়েছে ট্রিটমেন্টের কারণে, কথাশিল্পীসুলভ অ্যাপ্রোচের কারণে। ‘অন্ধকার ‘সিঁড়ি’, ‘টেকনাফ’, ‘লাল জুতো’, ‘নীল জমিন’, ‘পতন’ নামের ছোটগল্পগুলোতে আমার এই বক্তব্যের সমর্থন মিলবে।
ছোটগল্প, গত শতাব্দীর বিখ্যাত ইংরেজ সমালোচক ডেভিড ডেইচেসের ভাষায় ‘ধ ংষরপব ড়ভ ষরভব’। কথাটির সূত্র ধরে আমরা বলতে পারি, জীবনের খুবই তাৎপর্যময় কিছু মুহূর্তের শৈল্পিক রূপায়ণ হচ্ছে ছোটগল্পের কাজ। তা ধারণ করে কোনো একটি ছোট ঘটনা কিংবা চিন্তাসূত্র কিংবা কল্পনানিবিড় মনের উদ্ভাস। তার ভেতর দিয়ে কেবল রচনাকর্মটির বৈশিষ্ট্যই নয়, লেখকমনের কাঠামোও পরিস্ফুট হয়। ক্ষমতাবান সাহিত্যিক অভিজ্ঞতার নির্যাস তুলে আনেন স্বপ্নের ছোঁয়ালাগা বাস্তবানুগ বর্ণনায়। সুতরাং গ্রহণ-বর্জনের বিষয়টি এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্ববহ। সচেতন অভিজ্ঞতাই একজন লেখককে আপাত অপ্রাসঙ্গিক, দূরবর্তী জিনিসকেও গল্পের প্রাসঙ্গিকতায় যুক্ত করতে প্ররোচিত করে। আবার বৃত্তান্তের বাহুল্য অথবা অনুষঙ্গের অতিরেক বিষয়েও গুণী লেখক সচেতন আজাদের বেশকিছু গল্পে (ইতিমধ্যে উল্লিখিত) প্রাগুক্ত গ্রহণ-বর্জনের ভারসাম্য সুন্দরভাবে রক্ষিত হয়েছে। তার ছোটগল্পের শিল্পসিদ্ধি সম্বন্ধে আরো দুটি কথা বলা প্রয়াজন। ‘বৃষ্টি’ গল্পের পটভূমি খরার সময়ে লেখকের গ্রামে সংঘটিত একটি সামাজিক ঘটনা। এটা খরার সময়ের গল্প, কিন্তু মানব-মানবীর যৌনক্রিয়া ও প্রজনন ক্ষমতার আইডিয়ার সঙ্গে উর্বরতার সূত্রটি (ঋবৎঃরষরঃু পঁষঃ) প্রতীকীভাবে ব্যবহৃত হয়েছে এখানে। গল্পের শেষে যে যুৎসই সংলাপ বক্রোক্তির বলিষ্ঠতা নিয়ে অস্তিত্বমান, তা ওই রচনাটির শক্তি বাড়িয়ে দিয়েছে অনেকখানি।
এবার আলাউদ্দিন আল আজাদের উপন্যাস নিয়ে কথা বলা যাক। স্বভাবের বিচারে তার উপন্যাসগুলো রোমান্টিক। একইসঙ্গে জীবনবাদী। লেখকের নিজের জীবন সম্বন্ধে বলা যায়, তা একইসঙ্গে জ্ঞানমুখী বিদ্যা ও কলাবিদ্যার পরিচর্যার শক্তি আর দুর্বলতাÑ দুয়ে মিলেই মোটামুটি সার্থক। এ পর্যন্ত ত্রিশটি উপন্যাস লিখেছেন আজাদ। তার মধ্যে আছে দৈনিক পত্রিকার ঈদ ম্যাগাজিনের জন্য লিখিত বেশ কয়েকটি উপন্যাস; যেগুলোকে উপন্যাস নয়, দীর্ঘ গল্প বললে সঠিক বলা হয়। ‘তেইশ নম্বর তৈলচিত্র’ তার জনপ্রিয় উপন্যাস। শিল্পীর অপূর্ণতাবোধ, বেদনা এবং অশেষ সৌন্দর্যতৃষ্ণা এ উপন্যাসের প্রধানতম থিম। ‘শীতের শেষ রাত বসন্তের প্রথম দিন’ও বেশ আলোচিত উপন্যাস। এর অন্যতম কারণ উপন্যাসে অবচেতনাগত লিবিডোচিত্রের প্রবল উপস্থিতি। এ দুটিই বই, পাশাপাশি আঞ্চলিক উপন্যাস ‘কর্ণফুলী’ এবং এপিক বৈশিষ্ট্যের ছোঁয়ালাগা উপন্যাস ‘ক্ষুধা ও আশা’ আজাদের লেখক ইমেজে পিলারের ভূমিকা রাখছে। উপন্যাস চতুষ্টয় যেন মজবুতভাবে তৈরি গৃহের চারটি স্তম্ভ। এগুলোই তার অগ্রগণ্য সাহিত্যকর্ম। এগুলোর ভেতরেই তিনি বেঁচে থাকার প্রেরণা খুঁজে পেয়েছেন। তার লেখাজোকার, বিশেষত গদ্যের অন্যতম চারিত্র হচ্ছে ভাবালুতাবর্জিত আধুনিক জীবনদৃষ্টি। বিষয়ভাবনা, লেখার স্টইল এবং চিন্তাচেতনার প্রগতিশীলতাÑ সব দিক থেকেই আজাদ একজন আধুনিক মানুষ। খোলা চোখ এবং সংস্কারমুক্ত মন নিয়ে, সেই মনে শিল্পীজনোচিত জিজ্ঞাসা ধারণ করে তিনি এখনো নিরলস লিখে চলেছেন গদ্য-পদ্য।
শিল্পীর মনের টানাপড়েন এবং নতুন ধরনের মূল্যবোধের কারণে ‘তেইশ নম্বর তৈলচিত্র’ প্রসিদ্ধ হলেও এ উপন্যাসের অন্য উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে এর নায়ক পরিকল্পনা। নায়কের পালাবদল ঘটেছিল সেই চল্লিশের দশকে, সমরেশ বসুর ‘বিবর’ উপন্যাসের মধ্য দিয়ে। তার আগে নায়ক বলতে আমরা বুঝতাম আদর্শবাদী চরিত্র। সমরেশ বসুই প্রথম একটি লম্পট ও প্রতারক চরিত্রকে নায়কের মর্যাদা দেন। দেশ ভাগ পরবর্তী বাংলাদেশের (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের) উপন্যাসে সৈয়দ শামসুল হক, আলাউদ্দিন আল আজাদ, রশীদ করিম প্রমুখের হাত ধরে এলো এমন নায়ক যিনি মধ্যবিত্ত শ্রেণীর প্রতিনিধি। তারা শুধু মধ্যবিত্ত নয়, একইসঙ্গে বাঙালি মুসলমানও। তা সত্ত্বেও বাবর আলী (উপন্যাস: ‘খেলারাম খেলে যা’, সৈয়দ হক), জাহেদুল ইসলাম (‘তেইশ নম্বর তৈলচিত্র’-এর নায়ক), কামাল (উপন্যাস: ‘শীতের শেষ রাত বসন্তের প্রথম দিন’, আলাউদ্দিন আল আজাদ) প্রমুখ ব্যক্তি আদর্শ ও মূল্যবোধের দিক থেকে প্রথাগত চরিত্র নয়। চিন্তাভাবনায় তারা আধুনিক ও উদারনৈতিক। ‘তেইশ নম্বর তৈলচিত্র’তে দেখা যাচ্ছে, জাহেদ স্ত্রীর তলপেটে বিয়ের আগে সন্তান ধারণের চিহ্ন দেখে মানসিক দ্বন্দ্বে জর্জরিত। কিন্তু অনেক দিন-রাত্রির মানসিক টানাপড়েনের পর শিল্পীশোভন ভালোবাসা আর মানবিকতার দ্বারা প্রণোদিত হয়ে সে ওই দুশ্চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দেয়। জয়ী হয় আধুনিক শিল্পীর মূল্যবোধ। কিন্তু এসবের ভেতর দিয়ে ঔপন্যাসিক মধ্যবিত্ত নাগরিক জীবনেরই বিশ্বাস্য ছবি এঁকেছেন।
‘শীতের শেষ রাত বসন্তের প্রথম দিন’-এও আমরা অল্পবিস্তর একই চিত্র পাই। তবে এটা আজাদের পরিণততর উপন্যাস। আগের মতো আদর্শবাদী রোমান্টিকতা এখানে নেই। আছে সামাজিক বাস্তবতার নিপুণ ছবি আর গ্লানিময় জীবনের অপ্রিয় সত্য। কাহিনীটা একটু বলি। স্বামীহীনা মধ্যবয়সী বিলকিস বানু দুই সন্তানের মা। মামাতো বড় বোনের (জেবু আপা) ছেলে কামাল কিছুদিনের জন্য থাকতে এসেছে তার বাসায়। কামালের প্রতি বিলকিস বানু আকর্ষণ অনুভব করে। কিছুতেই এ আকর্ষণ সে এড়াতে পারে না, বরং মানসিক দ্বন্দ্বে ভোগে। বিলকিস কামালকে বাস্তবে কাছে পায় না, পায় স্বপ্নে। স্বপ্নে তার সান্নিধ্যে আসামাত্র বিলসিক বানুর দেহে রোমাঞ্চ জাগে, মনে ঝড় ওঠে। পরমুহূর্তেই স্বপ্নটি ভেঙে যায়। জেগে ওঠে তিনি আবিষ্কার করেন, কামাল ও তারই মেয়ে পারভিন প্রেমের আলিঙ্গনে আবদ্ধ। বিলকিস বানুর এ উপলব্ধি হয় যে, তার জীবনে শখ-আহ্লাদের মৌসুম বিগতপ্রায়; কিন্তু পারভীন-কামালের মতো তরুণ-তরুণীর জীবনে বসন্ত সমাগত। এবং জীবনের স্বাভাবিক ধর্ম এটাই। বইটিতে প্রধান চরিত্রের যে আত্মসমীক্ষা এবং কেন্দ্রীয় চরিত্রে বিলকিসের যে আত্মোপলব্ধি পাওয়া যায়, তা লেখকের বিস্তৃত জীবনাভিজ্ঞতারই ফসল।
একাধিক সমালোচক ‘ক্ষুধা ও আশা’কে মহাকাব্যিক বলেছেন কেন? উপন্যাসটি আকৃতিতে ঢাউস বলে? নাকি লেখক বিস্তৃত পটভূমিতে জীবনের সমগ্রতাকে স্পর্শ করতে চেয়েছেন বলে? মহাকাব্যে একটি কাহিনী বয়ানের স্বার্থে কবিকে ‘অজস্র পঙ্ক্তি লিখতে হয়। সামর্থ্যবান ঔপন্যাসিকও একটি বড় বিষয়কে ধরার জন্য শত শত পৃষ্ঠা ব্যয় করেন। কিন্তু দেখতে হবে পৃষ্ঠাগুলো ব্যয়িত হয়েছে কীভাবে, কী রকম ভাষা ও জীবনপ্রত্যয়ের ভেতর দিয়ে অগ্রসর হয়েছে সেই উপন্যাস। মনে রাখা খুবই জরুরি যে, কেবল বিশাল পটভূমি অসংখ্য চরিত্রসমেত প্রলম্বিত কাহিনী আর ঘটনার প্রাচুর্যই নয়, বরং বড় ক্যানভাসে যুগধর্ম এবং জীবনদর্শনের সমন্বিত শিল্পরূপ এপিক নভেলের লক্ষ্যযোগ্য বৈশিষ্ট্য। মহাকাব্যিক উপন্যাস বেড়ে ওঠে সুনির্দিষ্ট থিম, ভাষা ও কুশীলবদের নিয়ে। তার ভাব ও বিশ্বাস অনেকখানি আদর্শায়িতও বটে। সন্দেহ নেই ‘ক্ষুধা ও আশা’ লেখকের সুপরিকল্পনা আর পরিশ্রমের ফসল।
সমকালের অনুভব রাশিকে চিরকালের তারে বেঁধে দেয়ার আন্তরিক প্রয়াসও এখানে লক্ষ্য করা যায়। এসব সত্ত্বেও আমার ধারণা, এপিক নভেলের উপযোগী ব্যতিক্রমী জীবনভাবনা ও আত্মদর্শন এখানে অনুপস্থিত। এই মোটা বই, অতএব, ঠিক মহাকাব্যিক উপন্যাস নয়। এটাকে বরং এপিক নভেলের কতিপয় লক্ষণে আক্রান্ত রচনা বলা যেতে পারে। আজাদের এই উচ্চাশী উপন্যাসে চল্লিশ দশকের বড় বড় ঘটনা আছে। দুর্ভিক্ষ, মহামারী, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, রাজনৈতিক আন্দোলন-অনশন… প্রায় সবই এতে উপস্থিত। বলা চলে, সমাজ বাস্তবতার বর্ণনায় তিনি নিখুঁত হতে চেয়েছেন। মানুষের সব প্রবৃত্তি এখানে প্রকাশিত। কিন্তু বেশিরভাগ চরিত্রকে বাস্তব মনে হয় না। কোথায় যেন একটা কমতি আছে। সে কারণে বইটি মনের মধ্যে প্রগাঢ় ছাপ ফেলতে পারে না।
‘কর্ণফুলী’ আলাউদ্দিন আল আজাদের অন্য উল্লেখযোগ্য উপন্যাস। এর পটভূমি চট্টগ্রাম। চট্টগ্রামের দুর্বোধ্য মুখের ভাষা এখানে অবিকল ব্যবহৃত হয়েছে। ভাষা ধারণ করে মনের আবেগ, হৃদয়ের অনুভূতি। সেদিকটা বিবেচনা করলে আঞ্চলিক ভাষার প্রয়োগ এখানে যথার্থ। ফর্ম কিংবা লিপিকৌশলের দিক থেকে ‘তেইশ নম্বর তৈলচিত্র’তে অভিনবত্ব নেই। কিন্তু থিমের বেলায় এর নতুনত্ব স্বীকার করতেই হবে। চিত্রশিল্পীর জীবন ও তার মানসিক দ্বন্দ্ব নিয়ে বাংলা ভাষায় আজাদের আগে কেউ উপন্যাস লেখেননি। সৃজনশীল মানুষের তাড়নাচ্ছিন্ন জীবন ও শিল্পকর্মের ভেতর একটি সমন্বয় স্থাপনের সৎচেষ্টা এতে লক্ষণীয়। আলাউদ্দিন আল আজাদ যে লেখক হিসেবে বৈচিত্র্যসন্ধানী, সেটা তিনি আরেকবার প্রমাণ করেছেন ‘কর্ণফুলী’ লিখে। কর্ণফুলী নদী তীরবর্তী এক বিশেষ অঞ্চলের ভূ-প্রকৃতি সেখানকার মানুষের প্রাত্যহিক জীবন, সেই জীবনের আশা-আনন্দ, বেদনা-বিষাদের বর্ণোজ্জ্বল একটি চিত্র পাওয়া যায় উপন্যাসটিতে। তারপরও প্রশ্ন থেকেই যায় আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার এবং বিষয়বস্তুগত আঞ্চলিকতা নিয়ে। এ দেশে একটি প্রবাদ সুবিদিত। তা হচ্ছে, এক জায়গার বুলি অন্য জায়গার গালি। ‘কর্ণফুলী’ পড়তে পড়তে কথাটির মর্মার্থ অনুভব করি। এ উপন্যাসে প্রযুক্ত ডায়ালেক্ট অকৃত্রিম। কোথাও কোথাও তা খাপও খেয়েছে চমৎকার; কিন্তু চট্টগ্রাম অঞ্চলের মানুষের মুখের ভাষা সম্বন্ধে সামান্য ধারণাও নেই, এমন পাঠকের কাছে কর্ণফুলীর অনেক চরিত্র সত্যিকার অর্থে দুর্বোধ্য ঠেকবে। এবার আঞ্চলিকতার প্রশ্ন। কোনো বিশেষ আঞ্চলকে পটভূমি করে রচিত হলেই তা প্রকৃত আঞ্চলিক উপন্যাস হয় না; দেখতে হবে তার আবেগ ও মূল সুরটি আরো অনেক অঞ্চলের মানুষকে স্পর্শ করছে কি না, অর্থাৎ শেষ বিচারে অনুভবের সর্বজনীনতাই আসল কথা। তা না থাকলে ‘আঞ্চলিক উপন্যাস’ শব্দবন্ধটির প্রয়োগ পাঠকের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়াবে শুধু। ইংল্যান্ডের একটি জনপদ সাসেক্সকে ভিত্তি করে রচিত টমাস হার্ডির ঞবংং ড়ভ ঃযব উ’ঁৎনবৎারষষবং, অদ্বৈত মল্লবর্মণের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ কিংবা অমিয়ভূষণ মজুমদারের ‘মহিষকুড়ার উপকথা’ বোধহয় সার্থক আঞ্চলিক উপন্যাসের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। কেননা এসব লেখার বিষয়বস্তু, উপস্থাপনা, সর্বোপরি জীবনদৃষ্টি সব দেশের সবকালের মানুষকে নাড়া দিতে সক্ষম। সে ধরনের সক্ষমতা কি ‘কর্ণফুলী’ ধারণ করে?
উপন্যাসটিতে লালন, ধলাবির মতো চাকমা ভাষায় কথা বলা চরিত্রও আছে, যাদের মুখের ভাষা সরাসরি ব্যবহার করা হয়েছে। চাকমা কিন্তু চট্টগ্রাম অঞ্চলের উপভাষা নয়। আদিবাসী চাকমাদের ভাষার চেহারা সম্পূর্ণ আলাদা। এ ভাষার শব্দাবলী আলাদা, ব্যাকরণ আলাদা। বাক্য গঠনরীতি বাংলা উপভাষা থেকে পৃথক। এতে আছে প্রধানত বার্মিজ (আরাকানি) শব্দে কিছু চট্টগ্রামি উপভাষার শব্দ আর যৎসামান্য বাংলা শব্দ। সে জন্য সাধারণ পাঠকের কাছে বইটির সংলাপমুখর অনেক অংশ দুর্ভেদ্য মনে হওয়া স্বাভাবিক। ঔপন্যাসিক যদি বইয়ের শুরুতেই চাকমা ভাষার এবং চট্টগ্রামের উপভাষার শব্দগুলোর (যেগুলো বইয়ে পৌনপুনিকভাবে ব্যবহৃত) একটা তালিকা দিতেন, তা হতো দূরদর্শিতার পরিচায়ক। সেটা না করে তিনি পাঠককে বিভ্রান্তিতে ভোগার সুযোগ করে দিয়েছেন।
আজাদ প্রথাগত রচনাশৈলীকেই তার কথাসাহিত্যে কাজে লাগিয়েছেন নিজের মতো করে। তার যা কিছু অর্জন তা প্রধানত বিষয়বস্তুভিত্তিক জীবনদর্শন ও শিল্পবিশ্বাসভিত্তিক।
পাঁচের দশকের কথাসাহিত্য প্রসঙ্গে দুটি দিক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এক. বাঙালি মুসলমান লেখকের আগমন। আর্থ-সামাজিক, ধর্মীয় ও শিক্ষাগত কারণে এ আগমন যথেষ্ট বিলম্বিত হয়েছিল। দুই. পাশ্চাত্যের ভাবধারা প্রভাবিত আধুনিক সাহিত্যের শক্ত ভিত স্থাপন। ভিত অবশ্য কিছুটা তৈরি হয়েছিল মুখ্যত সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, শওকত ওসমান, গৌনত আবু রুশদ, মাহবুবুল আলম, শাহেদ আলী প্রমুখের হাতে। পঞ্চাশের কথাকাররা তাতে বলিষ্ঠতা যোগ করেন। আলাউদ্দিন আল আজাদসহ তার প্রজন্মের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য ঔপন্যাসিকের বোঝার স্বার্থে, তাদের রচনাকর্মের উৎকর্ষ অনুধাবন এবং রস গ্রহণের সুবিধার্থে উপরের কথাগুলো মনে রাখা প্রয়োজন।
পাশাপাশি এটাও বিস্মৃত হলে চলবে না যে, সদ্য স্থাপিত পাকিস্তানের মুসলিম জাগরণবাদের যুগের আজাদ নৌকা বেয়েছেন স্রোতের উজানে। বাইরে থেকে চাপিয়ে দেয়া সস্তা ভাববাদ দ্বারা প্ররোচিত না হয়ে তিনি শিক্ষা নিয়েছেন জীবনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে। ওই নতুন অভিজ্ঞতা রসদ জুগিয়েছে নতুন যুগের বার্তাবহ নতুন সাহিত্যের। সে সময় মুক্তমনা আধুনিক ভাবুকদের মিছিলে শামিল হয়েছিলেন অনেকেই। কিন্তু আজাদ তাদের ভেতরেও ব্যতিক্রমী। কেননা সৃষ্টিশীল লেখালেখি ছাড়াও সাহিত্যের রূপ নির্মাণ ও রসনিষ্পত্তি বিষয়ে এবং নান্দনিকতার ব্যাখ্যার ওপর বেশকিছু প্রবন্ধ তিনি লিখেছেন। সেগুলো ‘শিল্পীর সাধনা’, ‘সাহিত্যের আগন্তুক ঋতু’ প্রভৃতি বইয়ে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
পঞ্চাশের দশকের শেষদিকে আজাদের শিল্পচেতনা উল্লেখযোগ্য মোড় নেয়। ফলে পাল্টে যায় তার লেখার বিষয় ও ভাবনারীতি। আর্তবিপন্ন মানুষের জীবনসংগ্রাম, মনোবিশ্লেষণ, ফ্রয়েডীয় যৌনতত্ত্ব, আত্মহনন, সুবিধাবাদী রাজনীতি, মানুষের নাছোড় উচ্চাশা, স্বপ্ন আর স্বপ্নভঙ্গের বেদনা বেশি করে জায়গা পায় তার গল্প-উপন্যাসে। উত্তরকালে শওকত আলী, হাসান আজিজুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, কায়েস আহমেদ, শহীদুল জহির প্রমুখ লেখক তাদের শিল্পরুচি ও সামর্থ্য দিয়ে বাংলা কথাসাহিত্যের যে উঁচু মান তৈরি করেছেন, তার পথনির্দেশক তো আজাদের মতো অগ্রজ লেখকরাই। পরের প্রজন্মের শক্তিমান লেখকরা যেমন তাদের শক্তিমত্তা দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়েছেন, তেমনি তাদের ভ্রান্তি থেকেও শিখেছেন অনেক কিছু।
বাংলাদেশের সামগ্রিক সাহিত্যরুচির বিচারে আলাউদ্দিন আল আজাদ একজন অগ্রণী লেখক। বলা উচিত, ষাটের দশকের প্রাগ্রসর গদ্যশিল্পীদের কাছাকাছি তার অবস্থান। গল্প-উপন্যাসে কবিত্বময় ভাষা, বাকনির্মাণের চমৎকারিত্ব যুগোপযোগী ভাবুকতা তাকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। খুঁটিয়ে পড়লে দেখা যাবে, তার কথাসাহিত্যে নানারকম ত্রুটি আছে। ত্রুটি-বিচ্যুতি কার লেখায় নেই? কিন্তু জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা, বিষয়ভাবনা আর লিপিকুশলতার সমন্বয়েই গড়ে উঠেছে তার ভাবমূর্তি। সেটা বহুদিন পর্যন্ত উজ্জ্বল থাকবে বলেই মনে হয়।
পদ্মায় পানি বাড়ায় ৩ ফেরি ঘাট প্লাবিত
গত ২৪ ঘণ্টায় পদ্মায় ২০ সে. মিটার পানি বৃদ্ধি পেয়ে মাওয়া-কাওড়াকান্দির ৩টি ফেরি ঘাট প্লাবিত হয়েছে। টানা বর্ষণে ডাম্ব ফেরি রানীক্ষেত ও রানীগঞ্জ বিকল হয়ে পড়ায় সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করছে। এতে করে মাওয়া-কাওড়াকান্দি ঘাটে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। গতকাল উভয় ঘাটে যাত্রীবাহী পরিবহনসহ প্রায় আড়াই শতাধিক যানবাহন আটকে পড়েছে বলে বিআইডব্লিউটিএ সূত্র জানায়।
বিআইডব্লিউটিএ কাওড়াকান্দি ঘাট সূত্র জানায়, টানা বর্ষণে পদ্মায় গত ২৪ ঘণ্টায় ২০ সে. মিটার পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। এ নিয়ে গত ৪৮ ঘণ্টায় পদ্মায় ৩৮ সেন্টিমিটার পানি বেড়ে কাওড়াকান্দি ৩নং ফেরিঘাট ও মাওয়ার ১নং ও ৩নং ফেরিঘাট প্লাবিত হয়। ঘাট তিনটি বিকল হয়ে পড়ায় গতকাল বিকেলে পন্টুনগুলো লো ল্যান্ড থেকে হাই ল্যান্ডে স্থানান্তর করা হয়েছে। এসময় ফেরি লোড আনলোডে মারাত্মক অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়। এদিকে পদ্মায় স্রোত থাকায় এবং ফেরি পন্টুনের র্যাম সংযোগ কর্দমাক্ত হয়ে পড়ায় ফেরি পারাপার ও লোড আনলোডের ক্ষেত্রে দেড় ঘণ্টার স্থলে আড়াই ঘণ্টার উপরে সময় লাগছে বলে ফেরি চালকরা জানান।