Wednesday, July 08, 2009

শাহ মোয়াজ্জেম হোসেনের স্ত্রী সালেহা হোসেনের ইন্তেকাল


বিএনপি নেতা শাহ মোয়াজ্জেমের স্ত্রী সালেহা হোসেনের ইন্তেকালের খবর পেয়ে দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ও দলীয় নেতৃবৃন্দ গতকাল তার বাসভবনে যান
সাবেক উপপ্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি নেতা শাহ মোয়াজ্জেম হোসেনের স্ত্রী বেগম সালেহা হোসেন (৬২) গতকাল বিকেল পৌনে ৬টায় গুলশানের নিজ বাসভবনে ইন্তেকাল করেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। তিনি স্বামী, এক ছেলে, এক মেয়ে ও নাতি-নাতনী রেখে গেছেন। তার মৃত্যুতে বিএনপি চেয়াপারসন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। বেগম জিয়া রাত ৯টা ১৫ মিনিটে শাহ মোয়াজ্জেম হোসেনের গুলশানের বাসভবনে যান। বেগম জিয়া সেখানে ৩০ মিনিট অবস্খান করে মরহুমার শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের সান্তবনা দেন। তিনি শাহ মোয়াজ্জেম হোসেনকে বলেন, আপনি একজন রাজনীতিক হিসেবে জীবনে বহুজনকে সান্তবনা দিয়েছেন। এখন নিজের পরিবারের শোকাহত সদস্যদের সান্তবনা দিন।
বেগম সালেহা হোসেন উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা ছিলেন। তিনি একজন সুসাহিত্যিক ছিলেন। তার রচিত গ্রন্থের সংখ্যা ২৩। আজ বাদ আসর গুলশানের আজাদ মসজিদে মরহুমার জানাজা শেষে বনানী কবরস্খানে তাকে দাফন করা হবে।
তার মৃত্যুতে এক শোকবার্তায় বেগম জিয়া বলেন, মরহুমা সালেহা হোসেন শিক্ষা বিস্তারে ব্যাপক অবদান রেখে গেছেন। তিনি মরহুমার রূহের মাগফিরাত কামনা করে শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেন।
অপর এক শোকবার্তায় বিএনপি মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনও গভীর শোক প্রকাশ করে মরহুমার রূহের মাগফিরাত কামনা করেন। তিনি মরহুমার শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানান।
গতকাল গুলশানের বাসভবনে গিয়ে মরহুমার শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান বিএনপি স্খায়ী কমিটি সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, দলের ভাইস চেয়ারম্যান এম কে আনোয়ার, আ স ম হান্নান শাহ, সাবেক প্রধানমন্ত্রী কাজী জাফর আহমদ, বিএনপি যুগ্ম মহাসচিব সেলিমা রহমান, ঢাকার মেয়র সাদেক হোসেন খোকা, বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ জয়নাল আবেদিন ফারুক, জাগপা সভাপতি শফিউল আলম প্রধান, জাপা মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদার, বিজেপি মহাসচিব শামিম আল মামুন, জাগপা সাধারণ সম্পাদক লুৎফর রহমান, বিএনপি সহপ্রচার সম্পাদক মহিউদ্দিন খান মোহন, চেয়ারপারসনের প্রেস সচিব মারুফ কামাল খান, ব্যবসায়ী নেতা ফজলুর রহমান, বিএনপি নেত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম, আশির দশকের ছাত্রনেতা সরওয়ার আজম খান, শাজাহান মিয়া সম্রাট, অ্যাডভোকেট আহসান হাবিব, আলী আকবর চুন্নু, আলী আহম্মদসহ বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনগুলোর বহু নেতাকর্মী। এ ছাড়া মুন্সীগঞ্জ থেকে হাজার হাজার লোক খবর পেয়ে মরহুমার বাসভবনে ছুটে আসেন।
বিএনপি নেতা মশিউর রহমানের চাচার ইন্তেকালে শোক : ঝিনাইদহ জেলার বিএনপি’র আহ্বায়ক মশিউর রহমানের চাচা ইনতাজ আলী বিশ্বাসের ইন্তেকালে বিএনপি মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার গভীর শোক প্রকাশ করে মরহুমের রূহের মাগফিরাত কামনা করেন। তিনি মরহুমের পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করেন।
জাসাস নেতার পিতার মৃত্যুতে শোক : জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্খা জাসাস ঢাকা মহানগর নেতা জাকির হোসেন রোকনের পিতা মুকুল হোসেনের মৃত্যুতে বিএনপি মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি মরহুমের রূহের মাগফিরাত কামনা করে তার শোকাহত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।

তিনি ৬ মাসে ৩ বার ভারপ্রাপ্ত…

মুন্সীগঞ্জে ছয় মাসে তিনজন সিভিল সার্জন অবসরে যাওয়ায় এক ডাক্তারকে তিনবার ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন হতে হয়েছে। এতে জেলার স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে। অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছে মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালসহ জেলার সবক’টি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান। জেলার ১৫ লক্ষাধিক মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। ডাক্তাররা তাদের কর্মস্থলে থাকছেন গড়হাজির। এমনকি সিভিল সার্জন না থাকায় ডাক্তার ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সঠিক সময়ে তাদের বেতন উত্তোলন করতে পারছেন না।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সিভিল সার্জন মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে থাকেন। সিভিল সার্জন ডা. এনায়েত করিম ৩০ ডিসেম্বর ২০০৮-এ অবসরগ্রহণ করেন। ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের ইএনটি কনসালট্যান্ট ডা. আবদুর রশীদ। ২১ ফেব্রুয়ারি ডা. সাজেদুল ইসলাম সিভিল সার্জন হিসেবে মুন্সীগঞ্জে যোগ দেন। তিনি ২৮ মে অবসরে চলে গেলে আবার ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন হন ডা. আবদুর রশীদ। ২২ জুন ডা. সুদীপ কুমার বোস সিভিল সার্জন যোগ দেয়ার আটদিন পর এলপিয়ারে চলে যান। ৩০ জুন বিকাল থেকে ডা. আবদুুর রশীদ ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন।
সিভিল সার্জনের পিএ মো. মিজান জানান, তিনি (সিভিল সার্জন) ঘনঘন চলে যাওয়ায় সঠিক সময়ে বেতন তোলা যায় না। এতে কর্মচারীদের অসুবিধা হয়।

সারা বিশ্বের মানুষ যে কোনো বাঁধের বিরুদ্ধে অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

কোনো বাঁধই মানুষের বৃহত্তর কল্যাণে আসেনি। যে কারণে সারা বিশ্বের মানুষ আজ যে কোনো বাঁধের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে কথা বলছে। সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবে সমাজ রূপান্তর অধ্যয়ন কেন্দ্রের আয়োজেন ‘টিপাইমুখ বাঁধ ও দেশের স্বার্থে করণীয়’ শীর্ষক সংলাপে সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এ কথা বলেছেন। এতে বক্তব্য রাখেন অধ্যাপক আহমেদ কামাল, অধ্যাপক আনু মোহাম্মদ, ইঞ্জিনিয়ার শেখ মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ, মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, হায়দার আকবর খান রনো, বাসদ আহ্বায়ক খালেকুজ্জামান, টিপু বিশ্বাস, অধ্যাপক পিয়াস করিম, প্রবন্ধকার জোনায়েদ সাকি, প্রকৌশলী ম ইনামুল হক প্রমুখ। অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, বারাক উপত্যকা বিপদে আছে। টিপাইমুখে বাঁধ দেয়া হলে কুশিয়ারা, সুরমা, মেঘনাসহ বিভিন্ন নদীর ওপর এর প্রভাব পড়বে। ১৯৮৯ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ সে দেশের বাঁধগুলোকে কার্যকর না করার কথা ভাবছে। দেশের জনগণ ফারাক্কা থেকে শিক্ষা নিয়ে টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে। জনগণের মতামত রাজনৈতিকভাবে প্রতিফলনের দায়িত্ব সরকারের। টিপাইমুখ বাঁধ হলে এর প্রভাব পড়বে জীববৈচিত্র্যে। বাংলাদেশে ৫৭টি নদী রয়েছে। এর মধ্যে ৫৪টি এসেছে প্রতিবেশী ভারত থেকে। ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। যে কোনো মূল্যে ভারতের টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণ বন্ধ করতে হবে। প্রবন্ধকার জোনায়েদ সাকি বলেন, দুনিয়াব্যাপী বড় বাঁধের বিরুদ্ধে নানা ধরনের প্রতিবাদ, বিক্ষোভের প্রেক্ষিতে বাঁধ নির্মাণে বেশিরভাগ অর্থায়নকারী বিশ্বব্যাংক এডিবিসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও আওয়াজ উঠেছে। তারা নিজেদের পিঠ বাঁচাতে ওয়ার্ল্ড কমিশন অন ড্যাম নামে একটি প্রতিষ্ঠানের জন্ম দিয়েছে। টিপাইমুখ বাঁধের ফলে মনিপুরের আদিবাসী জনগোষ্ঠী তাদের শত বছরের পুরোনো বাপ-দাদার ভিটে থেকে উচ্ছেদ হবে। নদীকেন্দ্রিক তাদের জীবন ও সংস্কৃতির ওপর তা হবে মারাত্মক আঘাত। আর টিপাইমুখের বিদ্যুৎ কেন্দ্রে যে বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে তাও মনিপুরবাসীর জন্য নয়। মনিপুরবাসীর চাহিদা যেখানে ১৫০ মেগাওয়াট সেখানে, ওই বাঁধের বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা হতে যাচ্ছে ১৫০০ মেগাওয়াট। ফলে এ বিদ্যুৎ চলে যাবে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে বোম্বে ও দিল্লির ঝলমলে বাতির নগরীগুলোর জৌলুস বাড়াতে। অন্যদিকে ৫০ হাজারের বেশি মনিপুরবাসীর জীবন পড়বে ঘোর অমানিশার মুখে।

মুন্সীগঞ্জে গৃহবধূ নির্যাতন

মুন্সীগঞ্জের রমজানবেগ এলাকায় এক গৃহবধূকে নির্যাতন চালিয়েছে তার স্বামী। আহত গৃহবধূ রুমা বেগম হাসপাতালে এখন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। গতকাল হাসপাতালে ভর্তি হলেও সন্ধ্যায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত গৃহবধূ অচেতন অবস্থায় ছিল। জানা গেছে, পৌরসভার রমজানবেগ এলাকার আবদুল খালেক ভূঁইয়ার মেয়ে রুমা আক্তারের সঙ্গে একই গ্রামের ময়নাল হক ভূঁইয়ার বিয়ে হয়। বিয়ের সময় যৌতুক হিসেবে নগদ ২ লাখ টাকা ও ৫ ভরি স্বর্ণ দেয়া হয়। সম্প্রতি শ্বশুরবাড়ি থেকে আরও ৫ লাখ টাকা এনে দেয়ার জন্য চাপ দিতে থাকে। এতে স্ত্রী রুমা আক্তার অপারগতা প্রকাশ করলে রোববার রাতে স্বামী ময়নাল হক তাকে প্রহার করে। এতে রুমা আক্তার সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়লে গতকাল তাকে হাসপাতালে ভর্তি করে তার স্বজনরা। এ ঘটনায় থানায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।

Tuesday, July 07, 2009

ফুঁসে উঠেছে কীর্তিনাশা পদ্মা


ভাঙছে নদী, বাড়ছে মানুষের আহাজারি। ফুঁসে উঠেছে পদ্মা। কীর্তিনাশার রুদ্রমূর্তি নদী তীরবর্তী মানুষের জন্য এখন আতংক। শেষ সম্বল ভিটেমাটিটুকু রক্ষার প্রাণান্ত চেষ্টায় মরিয়া নদীসিকস্তি বাসিন্দারা। কিন্তু তাদের এই প্রয়াস ব্যর্থ হচ্ছে ফুলে ফেঁপে ওঠা রাক্ষুসী পদ্মার ভয়ংকর গ্রাসের কাছে। সর্বহারা উদ্বাস্তুদের মতো খোলা আকাশের নিচে বসবাস আর দিনযাপন এখন তাদের ভাগ্যলিখন। সোমবার সরেজমিন এমনই অসহায়ত্বের চিত্র দেখা গেছে মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার ভাঙনকবলিত ভাগ্যকুল ও বাঘড়া এলাকায়। নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে পরিবারের লোকজন যখন ঘরবাড়ি ভেঙে অন্যত্র নেয়ার কাজে ব্যস্ত, তার পাশেই পদ্মার তীরে রোদ-বৃষ্টির মাঝে খোলা আকাশের নিচে ছাউনিবিহীন পঞ্চাশোর্ধ্ব মমতাজ বেগম রান্নার কাজে নিয়োজিত। এ সময় কান্নাজড়িত কণ্ঠে ভাগ্যকুলের বাসিন্দা মমতাজ বেগম বললেন, জমিজমা সবই গেছে। এখন ১০ শতাংশের শেষ ভিটেমাটি। তাও পদ্মা কেড়ে নিল।
একই গ্রামের সত্তরোর্ধ্ব উন্নত নেছা জীবিকার অবলম্বন গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি রক্ষায় অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার সময় সাংবাদিকদের বলেন, সবই তো গেল এখন অন্যের বাড়িতে ঠিকানা খুঁজতাছি। সমবয়সী ননী গোপাল জানান, জšে§র পর এরকম ভাঙন আর দেখিনি। বাপ-দাদার রেখে যাওয়া চার একর জমি, ২৫ শতাংশের বাড়িÑ সবই কেড়ে নিয়েছে পদ্মা।
উপজেলার ভাঙনকবলিত ভাগ্যকুল ও বাঘড়া ইউনিয়নের ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামবাসী জানান, গত কয়েকদিনের ব্যবধানে পদ্মার ভয়াবহ ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে শত শত বসতভিটাসহ বিস্তীর্ণ ফসলি জমি। প্রতি মুহূর্তেই পদ্মার প্রবল ঢেউয়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রচণ্ড ঘূর্ণাবর্তে বিলীন হয়ে যাচ্ছে একের পর এক গ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা। এরই মধ্যে পদ্মা কেড়ে নিয়েছে উপজেলার কবুতরখোলা থেকে বাঘড়াবাজার পর্যন্ত ৭ কিলোমিটার এলাকার ৩ হাজার একর বিস্তীর্ণ ফসলি জমি। গত কয়েকদিনের ব্যবধানে নদী তীরবর্তী উত্তর কামারগাঁও, ভাগ্যকুল, পূর্ব বাঘড়া, বাঘড়া, কেদারপুর, মাগডাল, মান্দ্রা, কবুতরখোলা গ্রামের শতাধিক বাড়িঘর অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হয়েছে। তীব্র হুমকির মুখে পড়েছে জেলার ঐতিহ্যবাহী ভাগ্যকুল ও বাঘড়া বাজারের ৭ শতাধিক দোকানপাট। হুমকির মুখে রয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউট, ভাগ্যকুল হরেন্দ্রলাল উচ্চ বিদ্যালয়, বাঘড়া বাসুদেব মন্দির, স্বরূপ চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়, কামারগাঁও রাধা গোবিন্দ মন্দির, ৯টি মসজিদ, একাধিক প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ঢাকা-দোহার সড়কসহ দুই সহস াধিক বাড়িঘর।
ভাগ্যকুল ও বাঘড়া বাজার রক্ষায় সরকারিভাবে ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ হলেও ভাঙনকবলিত গ্রামগুলো রক্ষায় স্থানীয় প্রশাসন থেকে এখন পর্যন্ত কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। গ্রামবাসী নানা পন্থায় বাঁশের বেড়া বেঁধে ভাঙন ঠেকাতে আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ভাগ্যকুল ও বাঘড়া বাজারের ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেন, নদীভাঙন রোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রস্তাবিত ৫০ লাখ টাকার জিও ব্যাগ ফেলার পরিবর্তে ১০ লাখ টাকার গজারি প্রোটেকশন প্রকল্প কোন কাজেই আসছে না।
অবিরাম বর্ষণ ও উজান নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে গত ২৪ ঘণ্টায় পদ্মার ভাগ্যকুল পয়েন্টে ৪০ সেন্টিমিটার পানি বৃদ্ধি পেয়ে গত ১ সপ্তাহের ব্যবধানে ২ মিটার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নদীরভাঙন প্রকট আকার ধারণ করেছে। ব্রিটিশ আমলের দেশের অন্যতম প্রখ্যাত নৌবন্দর ঐতিহ্যবাহী ভাগ্যকুলের মানুষের ভাগ্য এখন বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছে। তাদের ভাগ্য বিপর্যয়ের কারণ হয়েছে রাক্ষুসী পদ্মা।
লৌহজং থেকে যুগান্তর প্রতিনিধি শেখ সাইদুর রহমান টুটুল জানান, পদ্মার পানি বাড়তে শুরু করার পর এবং বর্ষা মৌসুম শুরু হতেই পদ্মা রুদ্রমূর্তি ধারণ করেছে। গত এক সপ্তাহে পদ্মা গ্রাস করেছে লৌহজংয়ের বিস্তীর্ণ এলাকা। বসতভিটা, ব্যবসা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সরকারি স্থাপনা ভাঙনের গর্জন নিয়ে পদ্মা ধেয়ে আসছে মাওয়া-কবুতরখোলার দিকে। ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে মুন্সীগঞ্জ তথা বিক্রমপুরের মানচিত্র। সম্প্রতি মাওয়া-ভাগ্যকুল, কবুতরখোলা, বাগড়া এলাকায় প্রায় ৭ কিমি. এলাকাজুড়ে ভাঙনের খেলা চলছে। এভাবে ভাঙন চলতে থাকলে কিছুদিনের মধ্যেই মাওয়া-কবুতরখোলা-ভাগ্যকুল প্রকল্প বাঁধ রক্ষা করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
ভাঙনের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় নদীর তীরবর্তী মান্দ্রা, কবুতরখোলা, কামারগাঁও, মাঘঢার, মাওয়াকান্দিপাড়া, যশলদিয়া গ্রামের দেড় সহস াধিক পরিবারে চরম আতংক দেখা দেয়। গত ১৫ বছরে লৌহজং উপজেলার ৩টি ইউনিয়নের ৩৮টি গ্রাম পদ্মা নদীর ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙনকবলিত ইউনিয়নগুলো হচ্ছেÑ ধাইদা, তেউটিয়া, লৌহজং, গাওদিয়া ইউনিয়নের আংশিক ও কনকসার ইউনিয়নের আংশিক, কুমারভোগ ইউনিয়নের আংশিক। এসব ইউনিয়নের ৭টি সম্পূর্ণ এবং সদর ইউনিয়নের ১৪টি গ্রাম চলে গেছে নদীগর্ভে। এসব এলাকার হাজার হাজার পরিবার সহায়-সম্বলহীন হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে।
গাওদিয়ায় ছাত্তার মিয়া (৭০) সঙ্গে আলাপকালে তিনি জানান, পরপর চারবার ভাঙনের পর এবার এসে উঠেছি গাওদিয়া গ্রামে। এই ইউনিয়নের ৬টি গ্রাম পদ্মায় বিলীন হয়ে গেছে।
পদ্মা পাড়ের শত শত বাসিন্দা ভাঙনের কবলে পড়ে সহায়-সম্বলহীন হয়েছে। বর্তমানে কনকসারের শত বছরের ঐতিহ্যবাহী ব্রাহ্মণগাঁও উচ্চ বিদ্যালয়ের একটি অংশ ইতিমধ্যে পদ্মায় বিলীন হয়ে গেছে। অপর অংশটি ভাঙনের মুখে পড়েছে। অপরদিকে লৌহজং থানা ভবন, সাবরেজিস্ট্রি অফিস, সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিস হুমকির মুখে রয়েছে। ডহরী, কলমা, সামুরবাড়ি এলাকায় নতুন করে ভাঙন দেখা দিয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন নদীভাঙন রোধে এখনও কোন ব্যবস্থা না নেয়ায় তীরবর্তী বাসিন্দারা নানা পন্থায় এবং বাঁশের বেড়া দিয়ে ভাঙন ঠেকাতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

পদ্মার ভাগ্যকুল পয়েন্টে পানি বৃদ্ধি

গত তিনদিনে পদ্মা নদীর ভাগ্যকুল পয়েন্টে ১০ সে.মি. পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে উপজেলার বাঘরা, ভাগ্যকুল, চারিপাড়া, কামারগাঁও, মাণ্ডা, কবুতরখোলাসহ নদীর তীরবর্তী ৩ কিলোমিটার এলাকায় শুরু হয়েছে ভাঙন। এছাড়া, ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে ভাগ্যকুল পানি উন্নয়ন বোর্ড, বাঘরা স্বরূপ চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়, ভাগ্যকুল হরেন্দ্র লাল উচ্চ বিদ্যালয়, কামারগাঁও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ৪টি প্রাইমারি স্কুল, ৯টি মসজিদসহ বাঘরা ও ভাগ্যকুল বাজারের ৪ শতাধিক দোকানপাট। ভাঙন প্রতিরোধে গত ২ মাস আগে ৫ লাখ টাকা সরকারি বরাদ্দ প্রদান করা হলেও কাজ চলছে ঢিমেতালে। ভাগ্যকুল এলাকার লোকজন অভিযোগ করেছেন, সাহায্য চেয়ে স্থানীয় এমপি সুকুমার রঞ্জন ঘোষের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ কমিটির সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন।

মুন্সিগঞ্জ ফুটবল লীগে সমাবেশ ক্লাব জয়ী

মুন্সিগঞ্জ ফুটবল লীগের গতকাল সমাবেশ ক্লাব জয়ী হয়েছে। মুন্সিগঞ্জ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত খেলায় তারা ৩-১ গোলে দক্ষিণ কোর্টগাও তরুণ সংঘকে হারায়। খেলার প্রথমার্ধে বিজয়ী দল ২-১ গোলে এগিয়ে ছিল। জয়ী দলের পক্ষে শংকর, রাশেদ ও মামুন অপরপক্ষের সাঈদ গোল করেন। আজকের খেলা: বর্ণালী ক্রীড়াচক্র বনাম মাকহাটি ক্রীড়াচক্র।

Monday, July 06, 2009

গ্যাসসহ বিভিন্ন দাবিতে মুন্সীগঞ্জে মানববন্ধন

মুন্সীগঞ্জ, জুলাই ০৬ (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম) - গ্যাস সংকট নিরসনসহ বিভিন্ন দাবিতে সোমবার সকালে মুন্সীগঞ্জে মানববন্ধন হয়েছে।

সকাল ১১ টার দিকে শহরের পুরনো কাছারী এলাকা থেকে প্রেসক্লাব চত্বর পর্যন্ত প্রায় আধা কিলোমিটার জুড়ে এ মানববন্ধনে রাজনীতিক, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থীসহ সর্বস্তরের মানুষ অংশ নেন।

কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) এর মুন্সীগঞ্জ শাখা আয়োজিত মানববন্ধনে অংশ গ্রহণকারীরা বিভিন্ন দাবি সংবলিত ব্যানার বহন করেন।

গ্যাস সংকট নিরসন ছাড়া অন্য দাবিগুলো হল- নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়া-মুক্তারপুর সংযোগ সড়ক নির্মাণ, পল্লী বিদ্যুতের অতিরিক্ত মিটার ভাড়া বাতিল, শহরের জলবদ্ধতা নিরসন এবং দ্রুত রাস্তা-ঘাট মেরামত।

প্রায় এক ঘণ্টাব্যাপী এ কর্মসূচির শেষ পর্যায়ে থানা প্রাঙ্গণে বক্তব্য রাখেন- জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. জামাল হোসেন ও মুন্সীগঞ্জ শাখা ক্যাব এর সভাপতি জাহাঙ্গীর সরকার।

++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++

মুন্সীগঞ্জে গ্যাস সঙ্কট
শিল্পকারখানা বìধ : বাসাবাড়িতে রান্না বিঘিíত
আবুসাঈদ সোহান মুন্সীগঞ্জ
মুন্সীগঞ্জে গ্যাস সঙ্কট চরম আকার ধারণ করেছে। এতে গ্যাসচালিত শিল্পকারখানা বìধ হয়ে গেছে। অনেক বাসাবাড়ির রান্না বিঘিíত হচ্ছে। খড়ি দিয়ে কিছু পরিবার রান্না করলেও অনেকে বাইরে থেকে খাবার এনে জীবনধারণ করছেন। গ্যাস সঙ্কটের ব্যাপারে তিতাস গ্যাস আঞ্চলিক ব্যবস্খাপক অজিত চন্দ্র দেব জানান, মুন্সীগঞ্জ সংযোগ পাইপলাইন সরু থাকায় এবং প্রয়োজনের তুলনায় গ্যাস সরবরাহ কম হওয়ায় এ অবস্খার সৃষ্টি হয়েছে। তবে শিগগিরই এর সমাধানে নারায়ণগঞ্জের পঞ্চবটি থেকে মুক্তারপুর পর্যন্ত সাড়ে সাত কিলোমিটার ১২ ইঞ্চি প্যারালাল গ্যাস লাইনের কাজ শেষ হবে বলে তিনি জানান।
প্রায় আট হাজার সংযোগ রয়েছে মুন্সীগঞ্জ শহর ও আশপাশের এলাকায়। এর মধ্যে ৩৭টি শিল্পকারখানা গ্যাসচালিত। প্রায় এক কোটি ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে মাত্র ২০-২৫ শতাংশ সরবরাহ হচ্ছে। সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন এবং নারায়ণগঞ্জ হয়ে ধলেশ্বরী নদীর তলদেশ দিয়ে মুন্সীগঞ্জে গ্যাস আসে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রে সরবরাহ বাড়িয়ে দেয়ায় এবং নারায়ণগঞ্জে চাহিদা অনেক বেশি থাকায় মুন্সীগঞ্জের এ অবস্খা বলে তিনি জানান।
শহরের শ্রীপল্লী বাসিন্দা জাহানারা বেগম জানান, কিছু দিন ধরেই গ্যাসের সঙ্কট চলছে। তবে রাতে কিছু গ্যাস পাওয়া যেত। রাতের রান্না করা খাবারে সারা দিন চলত। কিন্তু এখন গ্যাস একবারেই আসছে না। তাই চুলা কিনে এখন খড়ি দিয়ে কোনোমতে রান্না চলছে। একই অবস্খার কথা জানান নয়াপাড়ার গৃহবধূ সুবিতা রানী। মধ্য কোর্টগাঁও বাসিন্দা হামিদা খাতুন জানান, গ্যাসের জন্য প্রহর গুনতে হয়। সময় সময় গ্যাস যখন আসে, তখনই রান্না সেরে নিতে হয়। নতুবা বাইরের পাউরুটি, পরোটা বা বিþুকট খেয়ে ছেলেমেয়ে নিয়ে দিন কাটাতে হয়।
শহরের খালইস্ট, মাঠপাড়া, ইসলামপুর, দেওভোগ, শিলমন্দি, কাটাখালী, রনছ, মালপাড়া, গোয়ালপাড়া, কোর্টগাঁও, গণকপাড়া, হাটলক্ষ্মীগঞ্জ, ইদ্রাকপুর, মানিকপুর, থানা কাউন্সিল, জমিদারপাড়ায়ও একই অবস্খা। এ পরিস্খিতিতে মুক্তারপুরের গ্যাসচালিত শিল্পকারখানর উৎপাদন বìধপ্রায়। এশিয়ান গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের পরিচালক শাহ আলম জানান, গ্যাস না থাকায় তার ফ্যাক্টরির উৎপাদন এখন বìধই বলা চলে। এ ছাড়া ক্রাউন, শাহ সিমেন্ট, প্রিমিয়ার ও এমিরাত সিমেন্ট ফ্যাক্টরিতে গ্যাসচালিত জেনারেটর বìধ হয়ে গেছে। তাই এখন ডেসার বিদ্যুতের ওপর নির্ভর করে এখানকার সিমেন্ট কারখানাগুলো চলছে।
স্বাভাবিক অবস্খা থাকতেও শহরের শ্রীপল্লীতে গ্যাস সরবরাহ বিঘিíত হচ্ছিল। এ পরিস্খিতি নিরসনে এম ইদ্রিস আলী উদ্যোগ নেন। এখানে নতুন পাইপলাইন স্খাপনের প্রক্রিয়া শুরু হলেও পদ্ধতিগত কারণে বিলম্বিত হচ্ছে।
গ্যাসের পরিস্খিতির কথা স্বীকার করে জেলা প্রশাসক মোশারফ হোসেন জানান, সমস্যা সমাধানে তিতাস গ্যাসের এমডি’র সাথে তার দফায় দফায় আলোচনা হচ্ছে। পঞ্চবটি থেকে মুক্তারপুর পর্যন্ত ৬৩ লাখ টাকা ব্যয়ে নতুন পাইপলাইন স্খাপনের ওয়ার্ক অর্ডার হয়ে গেছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে সব রকম চেষ্টা চলছে।

গ্যাস সংকটে মুন্সীগঞ্জের অর্ধশতাধিক শিল্প-কারখানার উৎপাদন বন্ধ

গ্যাস সংকট মুন্সীগঞ্জের অর্ধশতাধিক শিল্পকারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। এছাড়া শহরের বিভিন্ন বাসাবাড়িতেও রান্না করা যাচ্ছে না। ফলে বিপাকে পড়েছে শিল্পাঞ্চলের ব্যবসায়ী ও গৃহিনীরা।

ব্যবসায়ীরা জানান, মুক্তারপুরে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়া গ্যাসচালিত শিল্পকারখানার মধ্যে ক্রাউন, প্রিমিয়ার ও শাহ সিমেন্ট, এমিরাত সিমেন্ট ফ্যাক্টরি ও মাস্টার ইন্ডাস্ট্রিজ উল্লেখযোগ্য। তাই বিদ্যুৎই এখন এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদনের ভরসা।

সূত্র জানায়, প্রায় ৮ হাজার গ্যাস সংযোগ রয়েছে মুন্সীগঞ্জ শহর ও আশপাশ এলাকায়। এরমধ্যে ৩৭টি শিল্পকারখানা রয়েছে গ্যাসচালিত। এখানে এক কোটি ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে মাত্র ২০/২৫ শতাংশ সরবরাহ করা হচ্ছে। সূত্র আরো জানায়, বিদ্যুৎকেন্দ্রে সরবরাহ বাড়িয়ে দেয়া ও নারায়ণগঞ্জে অনেক বেশি চাহিদা থাকায় মুন্সীগঞ্জের এই অবস্থা।

গ্যাস সংকট প্রসঙ্গে তিতাস গ্যাসের কর্মকর্তারা জানান, মুন্সীগঞ্জের সংযোগ পাইপলাইন সরু হওয়ায় এবং প্রয়োজনের তুলনায় গ্যাস সরবরাহ কম হওয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। তবে শিগগিরই নারায়ণগঞ্জের পঞ্চবটি থেকে মুক্তারপুর পর্যন্ত সাত কিলোমিটার ১২ ইঞ্চি প্যারালাল গ্যাসলাইনের কাজ সম্পন্ন হবে। এ লক্ষ্যে ৬৩ লাখ টাকা ব্যয়ে নতুন পাইপ লাইন স্থাপনের ওয়ার্ক অর্ডার হয়ে গেছে।

মুন্সীগঞ্জে হরগঙ্গা কলেজে অনার্স মাস্টার্স কোর্সে পাঠদান ব্যাহত

মুন্সীগঞ্জে সরকারি হরগঙ্গা কলেজে শিক্ষকদের অনুপস্থিতির কারণে অনার্স ও মাস্টার্সের শিক্ষার্থীদের পাঠদান বিঘি্নত হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, শিক্ষকরা তাদের খেয়াল খুশিমত ক্লাস করান। প্রায় সময়ই বিভাগগুলোতে ক্লাস হচ্ছে না। কলেজে বহিরাগতদের উৎপাত বেড়ে গেছে। প্রায় প্রতিদিন বহিরাগতদের সঙ্গে কলেজের ছাত্রদের সঙ্গে মারামারি হচ্ছে। ফলে দিন দিন হারিয়ে ফেলতে বসেছে ঐতিহ্যবাহী কলেজটি তার সুনাম।

কলেজে ১১টি বিষয়ে অনার্স ও মাস্টার্স কোর্স চালু রয়েছে। এছাড়া উচ্চ মাধ্যমিক ও ডিগ্রি কোর্স রয়েছে। উচ্চ মাধ্যমিক ও ডিগ্রির জন্য অতিরিক্ত দর্শন, ইসলামের ইতিহাস, ইসলামী শিক্ষা, গণিত ও ভুগোল বিভাগ রয়েছে। অনার্স ও মাস্টার্সের বিষয়য়গুলো হচ্ছে বাংলা, ইংরেজি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, অর্থনীতি, সমাজকল্যাণ, ব্যবস্থাপনা, হিসাব বিজ্ঞান, পদার্থ, রসায়ন, প্রাণী ও উদ্ভিদ বিজ্ঞান। এসব বিষয়ে ৮৪ জন শিক্ষক রয়েছে।

ইংরেজি বিভাগের অনার্স ৪র্থ বর্ষের ছাত্র নুর ই আলম খান জানায়, তাদের ডিপার্টমেন্টের শিক্ষকরা প্রায় সময় উপস্থিত থাকেন না। গত শনিবার বেলা ১১টার দিকে কলেজে প্রবেশপত্র আনতে গিয়ে বিভাগের শিক্ষকদের কক্ষে তালা ঝুলছে।

সমাজকল্যাণের ছাত্র কাজল চৌধুরী জানায়, তাদের বিভাগের শিক্ষরা প্রায়ই উপস্থিত থাকেন না। মাঝে মধ্যে তাদের ডিপার্টমেন্টের ৪ শিক্ষক পালা করে ক্লাস করেন। এই সমস্যা বর্তমানে কলেজের সব বিভাগে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কলেজের অধ্যক্ষের পদটি ৮ এপ্রিল থেকে শূন্য রয়েছে। কলেজের অধ্যক্ষ থাকা অবস্থায় কলেজটি শিক্ষকরা ঠিকমত কলেজে আসতেন। উপাধ্যক্ষ মো. শাহজাহান মিয়া দায়িত্বে রয়েছেন। গতকাল শনিবার সরজমিনে কলেজে গিয়ে উপাধ্যক্ষ শাহজাহান মিয়াকে অনুপস্থিত পাওয়া যায়। বিভাগগুলো ঘুরে শিক্ষক শূনতা দেখা যায়। কলেজের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান সুখেন ব্যানার্জি জানান, আমার বিভাগে তো শিক্ষক আছে, তবে অন্য বিভাগের কথা জানেন না। ডিগ্রির পরীক্ষা চলছে, তাই ক্লাস বন্ধ রাখা হয়েছে।

মাওয়া-কাওড়াকান্দি রুটে যাত্রী দুর্ভোগ চরমে

উজান থেকে নেমে আসা পানি ও বৃষ্টিতে পদ্মা নদীর ভাগ্যকুল পয়েন্টে ৩৫ সেন্টিমিটার পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। পানিতে প্লাবিত হয়ে কাওড়াকান্দির ২নং ফেরিঘাটসহ প্রচ- স্রোতে মাওয়া ৩নং ফেরিঘাট অচল হয়ে পড়েছে। বাকি ঘাটগুলো হাইল্যান্ডে স্থানান্তর করে সচল রাখা হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পদ্মায় পানি বৃদ্ধির কারণে কাওড়াকান্দি ২নং ঘাট ও মাওয়া ৩নং ঘাট অচল হয়ে পড়েছে। এছাড়া প্রতিটি ঘাটই কর্দমাক্ত হয়ে যানবাহন ওঠানামায় ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। ফলে ফেরি পারাপার হওয়ার পর লোড-আনলোডে বাড়তি সময় ব্যয় হচ্ছে। তবে ডাম্ব ফেরি রানীক্ষেত শনিবার দুপুরে সচল হওয়ায় ও বৃষ্টি থেমে রোদ ওঠায় পরিস্থিতি উন্নতি হচ্ছে। ৪ দিন পর ট্রাক পারাপার শুরু হলেও উভয় পাড়ে যাত্রীবাহী পরিবহনসহ কাঁচামাল, রফতানিমুখী ট্রাকসহ এখনো ৪ শতাধিক যানবাহন আটকে আছে। ছুটির দিন শেষ হওয়ায় রোববার সকাল থেকে এ রুটে যানবাহনের চাপও বেড়েছে। ফলে ঘাটে আটকেপড়া যাত্রী ও শ্রমিকরা বিশুদ্ধ পানি, খাদ্য ও টয়লেট সমস্যায় চরম দুর্ভোগ পোহাতে দেখা গেছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার অনেক যাত্রী দীর্ঘ সময় ঘাটে আটকে পড়ায় অতিষ্ঠ হয়ে অতিরিক্তি ভাড়া দিয়ে বিকল্প উপায়ে পদ্মা পাড়ি দিচ্ছে।

Sunday, July 05, 2009

মুন্সীগঞ্জ জেলা বিএনপি’র পাল্টাপাল্টি আহ্বায়ক কমিটির প্রস্তাব

মুন্সীগঞ্জ জেলা বিএনপি’র আহ্বায়ক কমিটি নিয়ে পাল্টাপাল্টি প্রস্তাব অনুমোদন জমা দেয়া হয়েছে। আহ্বায়ক মিজানুর রহমান সিনহার জমা দেয়া ৫১ সদস্যের কমিটি মনঃপুত না হওয়ায় শামসুল ইসলাম গ্রুপ পাল্টা কমিটি অনুমোদনের জন্য জমা দিয়েছে। এ নিয়ে উভয় গ্রুপের দ্বন্দ্ব এখন নেতাকর্মীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য এম শামসুল ইসলাম গ্রুপের জমা দেয়া কমিটিকে পকেট কমিটি হিসেবে দাবি করেছে তৃণমূল নেতাকর্মীদের একাংশ। এই কমিটিতে রয়েছে এম শামসুল ইসলাম, যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে তার ছেলে সাইফুল ইসলাম, শহর বিএনপি’র সভাপতি যুগ্ম আহ্বায়ক শাহজাহান সিকদার, তার বোন রহিমা বেগম সিকদার, যুগ্ম আহ্বায়ক কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক দলনেতা মীর সরফত আলী সপু ও তার ভাই মীর নেওয়াজ আলীর নাম। পরিবারের সদস্যদের কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করায় দারুণ ইমেজ সঙ্কটে পড়েছেন শামসুল ইসলাম। ওদিকে আহ্বায়ক সাবেক স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী মিজানুর রহমান সিনহার কমিটিতেও অনেক সিনিয়র নেতার স্থান হয়নি। এ কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক শাহজাহান সিকদার, যুগ্ম আহ্বায়ক সাইফুল ইসলাম বাবু, যুগ্ম আহ্বায়ক রহিমা বেগম সিকদার ও যুগ্ম আহ্বায়ক মীর সরাফত আলী সপু স্বাক্ষরিত পাল্টা কমিটিকে আহ্বায়ক মিজানুর রহমান সিনহাসহ ৯ যুগ্ম আহ্বায়কের নাম অপরিবর্তিত রেখে ৫১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি জমা দেয়া হয় গত ২৬শে জুন। তবে ৫১ সদস্যের উভয় কমিটিতে ২৩ জনের নামের মিল রয়েছে। এম শামসুল ইসলাম ও শাহজাহান সিকদার এবং মিজানুর রহমান সিনহা ও জেলা বিএনপি’র সাবেক সভাপতি যুগ্ম আহ্বায়ক আবদুল হাই গ্রুপের সৃষ্ট দ্বন্দ্বের প্রভাব বিস্তার ও ক্ষমতার লড়াই নিয়ে এ পাল্টাপাল্টি কমিটি গঠিত হয়েছে বলে নেতাকর্মীরা জানান।

প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্বগ্রহণ, ইয়াজউদ্দিনের বৈধতার বিষয়টি নিষ্পত্তি হয়নি আড়াই বছরেও

অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ রাষ্ট্রপতি থাকাকালে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্বগ্রহণের বৈধতার বিষয়টি এখনো নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে উচ্চ আদালতে। দীর্ঘ আড়াই বছর পার হলেও বিষয়টির এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। তবে এর সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রশ্ন জড়িত থাকায় এবং দেশের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে দ্রুত এ সংক্রান্ত রিট আবেদনটির নিষ্পত্তি হওয়া দরকার বলে মনে করছেন আইনজীবীরা। ২০০৬ সালের ২৬ নভেম্বর ১৪ দলের সমন্বয়ক ও আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল জলিলসহ সমমনা রাজনৈতিক দলের (১৪ দলীয় জোট) ১০ প্রতিনিধি হাইকোর্টে এ বিষয়ে রিট আবেদন করেন। রিটের প্রাথমিক শুনানি শেষে আদেশ দেয়ার আগ মুহূর্তে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ জে আর মোদাচ্ছির হোসেন রিটগুলোর সব কার্যক্রম স্থগিত করেন। এ নিয়ে সুপ্রিমকোর্টে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে। এর পর আর এই রিটের কোনো শুনানি হয়নি।
২০০৬ সালের ২৯ অক্টোবর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নেন। এর দুই দিন পর ৩১ অক্টোবর তার অধীনে ১০ উপদেষ্টা শপথ নেন। তাদের শপথ অনুষ্ঠানে বিএনপি-জামায়াতসহ চারদলীয় জোটের নেতারা উপস্থিত থাকলেও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের কেউ উপস্থিত ছিলেন না। অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিনের রাষ্ট্রপতির অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নেয়ার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জলিল, জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু, ওয়ার্কার্স
পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেননসহ ১৪ দল নেতা পঙ্কজ ভট্টাচার্য, মেজর (অব.) আবদুল মান্নান, নুরুল ইসলাম, দিলীপ বড়–য়া, মুন্সি আবদুল লতিফ, মিছবাহুর রহমান চৌধুরী ও জি এম কাদের তিনটি রিট দায়ের করেন।
রিট আবেদনগুলোতে বলা হয়, সংবিধানের ৫৮/গ অনুচ্ছেদে অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিদের মধ্যে যিনি সর্বশেষ অবসর নিয়েছেন এবং এই অনুচ্ছেদের অধীনে প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার যোগ্য রাষ্ট্রপতি তাকে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেবেন। তবে এমন অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি পাওয়া না গেলে বা তিনি প্রধান উপদেষ্টার পদ নিতে অসম্মতি জানালে তার পূর্বে অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিকে প্রধান উপদেষ্টার পদে নিয়োগ দেয়া হবে। ৫৮/গ(৪) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, যদি কোনো অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি পাওয়া না যায় বা তিনি প্রধান উপদেষ্টার পদ গ্রহণে অসম্মতি জানান তবে রাষ্ট্রপতি আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের মধ্যে যিনি সর্বশেষ অবসর গ্রহণ করেছেন এবং এই অনুচ্ছেদের অধীনে প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার যোগ্য তাকে নিয়োগ দেবেন। তবে এমন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিকে পাওয়া না গেলে বা তিনি অসম্মতি জানালে তার অব্যবহিত পূর্বে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিকে নিয়োগ দেবেন। ৫৮/গ(৫) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত কোনো বিচারপতিকে পাওয়া না গেলে বা অসম্মতি জানালে রাষ্ট্রপতি যতদূর সম্ভব সব প্রধান রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করে প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার যোগ্য এমন ব্যক্তিকে প্রধান উপদেষ্টা পদে নিয়োগ দেবেন। এই বিধানগুলো কার্যকর করা না গেলে রাষ্ট্রপতি এই সংবিধানের অধীনে তার নিজ দায়িত্বের অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ এই বিধানগুলো পর্যায়ক্রমে অনুসরণ না করে নিজেই প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ফলে অবৈধ ও অসাংবিধানিকভাবে তিনি রাষ্ট্রপতির অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন বলে উল্লেখ করা হয় রিট আবেদনে।
রিট আবেদনে আরো বলা হয়, সাবেক প্রধান বিচারপতি কে এম হাসান প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণে অপারগতা প্রকাশ করেন। সংবিধান অনুয়ায়ী তার পূর্ববর্তী প্রধান বিচারপতি মাহমুদুল আমীন চৌধুরীকে এই পদ গ্রহণের আহ্বান জানাতে হবে। কিন্তু তাকে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগের কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের মধ্য থেকে প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগেরও কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা না করেই রাষ্ট্রপতি প্রফেসর ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
এছাড়া রিট আবেদনগুলোতে আরো বলা হয়, সংবিধানের ৫৮/খ(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রধান উপদেষ্টা অপর ১০ উপদেষ্টার সঙ্গে আলোচনা করে রাষ্ট্রের নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন। কিন্তু প্রধান উপদেষ্টা অপর উপদেষ্টাদের সঙ্গে আলোচনা না করেই সব সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। এমনকি তার সিদ্ধান্তের বিষয়ে অপর উপদেষ্টাদের অবহিত পর্যন্ত করা হয়নি। সংবাদ মাধ্যম ও উপদেষ্টাদের বক্তব্যে এ বিষয়টি সুস্পষ্টভাবেই প্রতীয়মান হচ্ছে। ফলে তিনি সংবিধান পরিপন্থীভাবে প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন এবং দায়িত্ব পালন করছেন।
সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি এ এফ এম মেজবা উদ্দিন আহমেদ এ বিষয়ে বলেন, তৎকালীন রাষ্ট্রপতি প্রফেসর ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ যথাযথভাবে সংবিধান অনুসরণ না করেই প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। তিনি প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের জন্য পর্যায়ক্রমে যে সব ব্যবস্থা অনুসরণ করার বিধান রয়েছে তা অনুসরণ করেননি। এ বিষয়টি এখন সবার কাছেই প্রমাণিত। কিন্তু রিট তিনটি এখনো বিচারাধীন থাকায় আদালতের মাধ্যমে এ বিষয়টি এখনো সুরাহা হয়নি। এই রিট তিনটির সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রশ্ন জড়িত। তাই আদালতের মাধ্যমে এই রিটের নিষ্পত্তি হওয়া জরুরি। এ কারণে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে দ্রুত রিট আবেদনটির নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন।

পদ্মায় অস্বাভাবিক পানি বৃদ্ধি

মাওয়া-কাওড়াকান্দি রুটে ভারী যান বন্ধ
গত ২৪ ঘণ্টায় পদ্মা নদীতে ৪০ সেন্টিমিটার পানি বৃদ্ধি পেয়ে ও টানা বৃষ্টিতে যান পারাপারে মারাত্মক অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। পানি বৃদ্ধির ফলে ও টানা বৃষ্টিতে এ রুটের ৩টি ঘাট প্লাবিত হওয়াসহ সবগুলো ঘাট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ও পদ্মা নদীতে ঢেউসহ স্রোত থাকায় বৃহস্পতিবার রাত থেকেই এরুটে ভারী যানবাহন বিশেষ করে ভারী পণ্যবাহী ট্রাক পারাপার বন্ধ রয়েছে। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত মাওয়ার ২টি ফেরি ঘাট এখনো অচল রয়েছে। ফলে শুধুমাত্র একটি ঘাট সচল থাকায় যানবাহন লোড আনলোডের ক্ষেত্রে দেড় থেকে দুঘণ্টা সময় লাগছে। এর সঙ্গে ডাম্ব ফেরি রানীক্ষেত ও রানীগঞ্জ বিকল থাকায় যানজট পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। উভয় পাড়ে যাত্রীবাহী পরিবহনসহ প্রায় সাড়ে চার শতাধিক যানবাহন আটকা পড়েছে।

ট্রাক চালকরা জানান, গত বৃহস্পতিবার দুপুরের পর থেকে কাঁচামালবাহী ট্রাক, রফতানিমুখী ট্রাকসহ সব ট্রাক পারাপার বন্ধ রয়েছে।

বিআইডব্লিউটিএ সহকারী ম্যানেজার শাহনেওয়াজ চৌধুরী বলেন, অতি বৃষ্টি ও পদ্মায় পানি বৃদ্ধির ফলে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে আমরা জোড় প্রচেষ্টা চালাচ্ছি।

ফখরুদ্দীন সরকারের কার্যক্রম তদন্তে উচ্চ পর্যায়ের কমিটি হচ্ছে

ফখরুদ্দীনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ের সকল অবৈধ কার্যক্রম তদন্তে উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করার বিষয়ে সরকারের মধ্যে আলোচনা চলছে। মাইনাস টু ফর্মুলা, শীর্ষনেত্রীদের খাবারে বিষ, নতুন রাজনৈতিক দল গঠন ও অর্থ সরবরাহ, রাজনৈতিক নেতাদের ওপর নির্যাতন, শিল্পপতিদের কাছ থেকে অর্থ আদায় এবং অতি উৎসাহী গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করার প্রক্রিয়া চলছে। আগামীকাল সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠকে এসব বিষয়ে আলোচনা হতে পারে বলে সরকারের একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী জানিয়েছেন। তিনি জানান, বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ের উপদেষ্টাসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের অভিযোগ খতিয়ে দেখার কাজ চলছে। ইতোমধ্যে কয়েকজন উপদেষ্টার দুর্নীতি তদন্তের বিষয়ে সংসদীয় উপকমিটি গঠন করা হয়েছে। সরকার চাচ্ছে বিগত সরকারের সময়ে সংঘটিত ঘটনাসমূহের সঠিক তথ্য প্রকাশ করতে। তিনি বলেন, ওই সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অনেক নেতাদের ওপর নির্যাতন হয়েছে- যা আগে কখনও ঘটেনি। কেউ যদি এ বিষয়ে কমিশন গঠনের দাবি করে তাহলে সরকার হয়তো মতামত নিয়ে তা করতে পারে। সরকারের অপর একজন নীতিনির্ধারক বলেন, ফখরুদ্দীনের সময়ে সরকারের ছত্রছায়ায় কয়েকটি রাজনৈতিক দলের জš§ হয়েছিল। তাদের পেছনে তারা কত টাকা ব্যয় করেছে, কোন কোন উৎস থেকে তা সরবরাহ করা হয়েছে তা চিহ্নিত করার প্রক্রিয়া চলছে। এছাড়া এর সঙ্গে কোন কোন সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা জড়িত ছিলেন তাও চিহ্নিত হচ্ছে এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, শিল্পপতিদের কাছ থেকে ওই সময়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে বিপুল অর্থ আদায় করা হয়েছে। যদিও সরকারের ভাষ্যে তখন ১৩০০ কোটি টাকা আদায় করা হয়েছে এবং তা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেয়া হয়েছে বলে জানানো হয়েছিল।

এদিকে বুধবার একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলে সাংসদ ড. মহীউদ্দিন খান আলমগীরও বলেছেন, ফখরুদ্দীন সরকারের আমলে নতুন রাজনৈতক দল গঠনে কারা জড়িত ছিলেন এবং তাদের পেছনে কী পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়েছে- সে বিষয়ে খোঁজ খবর নেয়া হচ্ছে।

মাওয়াঘাটের যাত্রীরা স্বস্তিতে

১৮ বছর পর মাওয়াঘাটের চিত্র পাল্টেছে। লঞ্চের ভাড়া এখন লঞ্চ কর্তৃপক্ষই স্বাভাবিকভাবে আদায় করছে। তাই ব্যস্ততম এই ঘাটে যাত্রী হয়রানি অনেক হ্রাস পেয়েছে। গত বুধবার থেকে এই ভিন্ন চিত্র বিরাজ করছে এখানে। এর আগে মাওয়া-কাওড়াকান্দি নৌ রুটে চলাচলকারী লঞ্চগুলো যাত্রী বহন করলেও লঞ্চে ভাড়া আদায় করতে পারছিল না। টাকার ভাগবাটোয়ারা নিয়ে অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াও যাত্রী হয়রানির ঘটনা ছিল নিত্য দিনের।

জেলা পরিষদের খেয়া ঘাট এবং বিআইডব্লিউটিএ’র লঞ্চ ঘাট ইজারাদার লঞ্চের ভাড়া আদায় করে নিত। পরে জনপতি হিসাব করে সামান্য ভাড়া পরিশোধ করা হত। এখন জেলা পরিষদের খেয়া ঘাট ৩ টাকা, বিআইডব্লিউটিএ’র লঞ্চ ঘাট ইজারাদার ২ টাকা করে নিয়মানুযায়ী ভাড়া কাটে। আর লঞ্চের ভাড়া লঞ্চ টিকিট মাস্টার (কেরানী) জনপ্রতি ১২ টাকা করে আদায় করছে। এতে যাত্রীদের যেমন হয়রানি বন্ধ হয়েছে,তেমনি লঞ্চ মালিকরা তাদের অধিকার ফিরে পেয়েছে। এব্যাপারে এমএল নিপ্পন লঞ্চের মালিক এবং লঞ্চ মালিক সমিতির মাওয়া জোনের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন খান সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, আমরা অনেক খুশি এখন। ইজারাদার সিন্ডিকেটের রাহুগ্রাসের অবসান ঘটলো দীর্ঘ ১৮ বছর পর। জেলা প্রশাসক মো. মোশারফ হোসেন বলেন, আমরা আইনের মধ্যে থেকে জনস্বার্থে সব রকম প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। মুন্সীগঞ্জ জেলা পরিষদের খেয়া ঘাটের টোল আদায় করছে এখন জেলা পরিষদেরই লোকজন।

পদ্মা সেতুতে রেলপথ কেন

জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী
পদ্মা সেতুতে, যমুনা সেতুর মতোই, রেললাইনও থাকবে, ঘোষণাটা অনেক দিনের। পদ্মা সেতুর কোনো দিকেই রেললাইন নেই, এবং ভবিষ্যতে রেল যোগাযোগ কতদিন হবে, বা আদৌ হবে কি-না, বিষয়টা একেবারেই অস্পষ্ট। দেশের একজন বিশিষ্ট ইঞ্জিনিয়ার কিছুদিন আগে একটি তথ্যপূর্ণ লেখায় দেখিয়েছিলেন, বিভিন্ন দেশে যত দীর্ঘ সেতু তৈরি হয়েছে, সেগুলি কত প্রকারের, এবং বলেছিলেন, প্রস্তাবিত পদ্মা সেতু কী প্রকারের হবে, বা হওয়া উচিত, সেতুতে আদৌ রেললাইন থাকার যৌক্তিকতা আছে কি-না, গভীর বিবেচনার পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তিনি পদ্মা সেতুর ওপর রেললাইনের যৌক্তিকতা খুঁজে পাননি। সেতুর উভয় দিকে রেললাইন সংযোগ দেওয়া সহজ হবে না, অত্যন্ত ব্যয়বহুল হবে। বরং তাঁর বিবেচনায় পদ্মা সেতুর রেললাইন অংশটি বাদ দিয়ে যে অর্থ সাশ্রয় হবে, সেটা আরিচা-পাটুরিয়া-দৌলতদিয়ায় যে দ্বিতীয় সেতুর প্রস্তাব হয়েছে, সেইদিকে সরিয়ে নেওয়া যায়। দৌলতদিয়ার নিকটবর্তী গোয়ালন্দ পর্যন্ত রেললাইন ত' আছেই, এদিকেও ঢাকা পর্যন্ত রেললাইন টেনে আনা_ সাটুরিয়া থেকেই হোক, আরিচা থেকেই হোক_ তুলনামূলকভাবে অর্থ সাশ্রয়ী হবে।
আমি যেহেতু মাওয়া হয়ে একবার টুঙ্গিবাড়ীর পথে গিয়েছি, এবং আরিচা বা সাটুরিয়া-দৌলতদিয়া পথে বহুবার চলাচলের অভিজ্ঞতা আমার আছে, আমার কাছে উক্ত বিশিষ্ট ইঞ্জিনিয়ারের যুক্তিটা গ্রহণযোগ্য, এমনকি অকাট্য মনে হয়েছে। যতদূর জানি, তাঁর লেখাটি ডেইলি স্টারে প্রকাশের পর, কর্তৃপক্ষের নজরে পড়েছিল। কর্তৃপক্ষ সম্ভবত যমুনা সেতুর ফাটল প্রসঙ্গে উক্ত ইঞ্জিনিয়ার-অধ্যাপকের মন্তব্য উপেক্ষা করতে পারেননি। সেজন্য পদ্মা সেতু বিষয়ে সর্বশেষ সংবাদে দেখতে পাচ্ছি, সেতুটি দ্বিতল হবে। নিচতলায় থাকবে রেললাইন, উপরের তলায় সড়ক_ হালকা যানবাহন চলাচলের জন্য। অর্থাৎ কর্তৃপক্ষ কোনোমতেই পদ্মা সেতুর পরিকল্পনায়, রেললাইন বাদ দিতে চান না। যেটা জানতে ইচ্ছা হয় অথচ জানতে পারিনি। সেতুর উভয়দিকে রেললাইন টানতে হলে যে ব্যয় হবে সেই অর্থের জোগান কে দেবে, এ বিষয়ে আদৌ কোনো কথাবার্তা হয়েছে কি-না। এ বিষয়ে কোনো স্পষ্ট ধারণা বা প্রতিশ্রুতি ছাড়া দ্বিতল সেতু, এবং রেললাইনসহ অনেকটা ঘোড়ার আগে গাড়ির মতো শোনায়।
আমি স্বীকার করছি যে, অসম্পূর্ণ সংবাদের ওপর ভিত্তি করে এ লেখা কারও কোনো কাজে দেবে না। আমি যে প্রশ্নগুলি করেছি, তার উত্তর যদি কোনো সূত্র থেকে পাই, আমি অত্যন্ত কৃতজ্ঞ হবো। আমার একান্ত নির্ভরতা সংবাদপত্রের ওপর। চার-পাঁচটি সংবাদপত্র আমি যথেষ্ট মনোযোগ সহকারে পড়ে থাকি। এ পর্যন্ত দু'দিকে রেল-যোগাযোগ বিশিষ্ট পদ্মা সেতুর প্রসঙ্গে এই প্রয়োজনীয় তথ্যটি কোথাও পড়েছি বলে আমার মনে পড়ে না। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতিকল্পে কর্তৃপক্ষের অনেক চমকপ্রদ চিন্তার সংবাদ আমরা পাচ্ছি। কিন্তু বড়ই অসম্পূর্ণ সংবাদ।
সবচেয়ে হতাশাজনক হলো, রেলওয়ে সংক্রান্ত যে সকল আশাব্যঞ্জক সংবাদ পরিবেশন করা হয়েছে বিগত বছরগুলোতে, বাস্তবে, বাংলাদেশের রেলওয়ে-ব্যবস্থা এক করুণ অবস্থায় পড়ে আছে দীর্ঘকাল যাবৎ। সড়কপথের বিস্তৃতি ঘটেছে এবং বিস্তৃতির মাত্রাও ঈর্ষণীয়। একই সঙ্গে, রেলপথের সংকোচন ও অবহেলার দৃশ্যটি দুঃখজনক বললেও যথেষ্ট বলা হয় না। চূড়ান্ত অবহেলা-অব্যবস্থাপনা-দুর্নীতির শিকার হয়েছে রেলপথ। যতগুলি সরকার ক্ষমতায় এসেছে, সবাই রেলপথকে অবহেলা করেছে। কেন রেলগাড়িতে চড়ব নামে একটি লেখা পড়লাম একটি দৈনিকে। কী পরিমাণ দায়িত্বহীনতা ঘিরে আছে আমাদের রেলপথ ব্যবস্থাপনায়, তার এক ভয়াবহ ছবি এঁকেছেন লেখক। খুলনা থেকে দিনাজপুর যাত্রী, তাঁর অভিজ্ঞতার বিবরণ দিয়ে। এক সময় আমি ঢাকা-রাজশাহী, ঢাকা-চট্টগ্রাম পথে রেলগাড়িতে যাতায়াত করেছি। সর্বশেষ চট্টগ্রাম-ঢাকা যাত্রা_ রাতের ট্রেনে, খুবই কষ্টকর ও হতাশাজনক_ সর্বশেষ ঢাকা-রাজশাহী যাত্রা, অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। এ থেকে যে সিদ্ধান্ত টানা যায়, আমরা চাইলে রেলপথে ভালো সেবা দিতে পারি। তবে যদি না দিই, আমি কর্মচারী, আমাকে দুষবেন না। আসল দায়িত্ব যাঁর, বা যাঁদের, দুষবেন তাঁদেরকে।
আমাদের গার্মেন্ট শিল্প_ যদিও এটা শিল্পপদবাচ্য কি-না, প্রশ্ন রয়েছে, এবং একজন সাবেক অর্থমন্ত্রীর মতে, মোটেও নয়_ দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বৈদেশিক মুদ্রার শতকরা পঁচাত্তর ভাগ যদি এই খাত থেকে আসে, তাহলে এর গুরুত্ব কতখানি, যে কেউ বুঝতে পারবে।
আশুলিয়ায় ক'দিন আগে একটি গার্মেন্ট কারখানা জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দিয়েছে একদল শ্রমিক। এই কারখানাটি সম্বন্ধে বলা হয়েছে, এর শ্রমিকরা নিয়মিত বেতন পায়, এর নারী শ্রমিকেরা বলেছে, তাদের শিশু-সন্তানদের জন্য এখানে ভালো ব্যবস্থা আছে, মালিকদের প্রতি তাদের কোনো নালিশ নেই। এটি একটি সোয়েটার ফ্যাক্টরি, এখানকার শ্রমিকেরা এই অগি্নসংযোগের সঙ্গে জড়িত ছিল না কেউ। বহিরাগত একদল শ্রমিক, এবং ঝুট-ব্যবসায়ী একদল লোক এবং সেই সঙ্গে সব রকম দুষ্কর্মে হাত পাকিয়েছে, এমন কিছু লোক, এই কাণ্ড ঘটিয়েছে। ওই কারখানার শ্রমিকেরা সাধ্যমতো বাধা দিয়েছে আক্রমণকারী দলকে, কিন্তু শেষ রক্ষা করতে পারেনি। সংবাদপত্রে লিখেছে, পুলিশ দাঁড়িয়ে দেখেছে, বাধা দেয়নি। আরও লিখেছে, যেসব কারখানা থেকে পুলিশ নিয়মিত টাকা পায়, সেগুলি রক্ষার দায়িত্ব তারা ঠিকই পালন করে।
যারা পুলিশকে নিয়মিত বখরা দেয় না, পুলিশ তাদের চেনে না। গুরুতর অভিযোগ।
বিশেষ করে আশুলিয়া এলাকায় এ ধরনের হামলা ও ক্ষয়ক্ষতির শিকার হচ্ছে এলাকার গার্মেন্ট-কারখানাগুলি। বলা হচ্ছে, একটি স্বার্থান্বেষী মহল এটা করছে ইচ্ছাকৃতভাবে_ এর সঙ্গে শ্রমিকদের চাওয়া-পাওয়াজনিত ক্ষোভের কোনো সম্পর্ক নেই। এই স্বার্থান্বেষী মহল কারা হতে পারে? কেউ স্পষ্ট করে কিছু বলছে না। তবে আশুলিয়া এলাকায় এত বেশি এ ধরনের অগি্নসংযোগ-ভাংচুরের ঘটনা ঘটেছে যে, এ সম্পর্কে একটা গভীর তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। সরকার বলছে, তারা এই গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকে ভবিষ্যৎ উচ্ছৃঙ্খলা থেকে রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে এবং ইতিমধ্যেই তা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু শ্রমিকদের ক্ষোভের বিষয়টি হালকাভাবে নেওয়া উচিত হবে না। ক্ষোভ আছে বলেই ক্ষুব্ধ শ্রমিকদের উত্তেজিত করা সম্ভব হয়েছে। কারখানার মালিকরা সবাই যে শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা দিচ্ছেন, তা হয়তো নয়।
শ্রমিকেরা যেন তাদের নূ্যনতম পাওনা পায়, সে উদ্দেশ্যে বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকার কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল। কিছুটা ফলপ্রসূ হয়েছিল সে উদ্যোগ। তবে মালিকপক্ষের সকলকে নিয়মনীতির পথে আনতে পারেনি বলেই জেনেছি ওই সরকার। এ সরকার, নির্বাচিত ও জনগণের সরকার, যদি এদিকে মনোযোগ দেয়, সেটা প্রশংসনীয় কাজ হবে। নির্বাচিত নতুন সংসদে ব্যবসায়ীদের আধিপত্য রয়েছে, এ সংসদ সাধারণ শ্রমিকদের সঙ্গত দাবি-দাওয়ার প্রতি কতটা সংবেদনশীল হবে, সেটা সরকারের গৃহীত কার্যক্রমেই স্পষ্ট হবে। শ্রমিকদের অভুক্ত-অসন্তুষ্ট রেখে গার্মেন্ট শিল্প নিজের বিপদ নিজেই ডেকে আনবে, এটা মালিকপক্ষ নিশ্চয়ই চান না।
বাংলাদেশের দরিদ্র-বঞ্চিত নারীদের শ্রম-ঘামে এ দেশের গার্মেন্ট শিল্প তার বর্তমান অবস্থানে এসে পেঁৗছেছে। সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় নারী এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত আছে। নারীর ক্ষমতায়নে এ শিল্পের বড় ভূমিকা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। সেদিক দিয়ে এই শিল্প যাতে টিকে থাকে, আরও বিকশিত হয়, আরও উন্নত হয়, সেটা দেখা সরকারের কর্তব্য। এই শিল্পের সুবাদে বাংলাদেশের নারী আত্মবিশ্বাস অর্জন করেছে, নিজের পায়ে দাঁড়াতে শিখেছে। এর সামাজিক মূল্য অপরিসীম।
আশুলিয়া এলাকা সম্বন্ধে আমার ধারণা, এখানে সমাজবিরোধী ব্যক্তির সংখ্যা অনেক। এখানে অপরাধের চিত্রটি রীতিমতো উদ্বেগজনক। ইপিজেড ছাড়াও এ এলাকায় বেশ কিছু শিল্প গড়ে উঠেছে টঙ্গী-নয়ারহাট, টঙ্গী-আশুলিয়া সড়কগুলি বরাবর। অত্যন্ত অপরাধপ্রবণ এই এলাকায় পুলিশের নজরদারি বাড়ানো দরকার।
হা-মীম গ্রুপের কারখানায় যে ধ্বংসযজ্ঞ ঘটেছে, সেজন্য ওই গ্রুপের মালিকপক্ষের প্রতি নেত্রীস্থানীয় অনেক ব্যক্তি সহানুভূতি জানিয়েছেন। আমিও জানাচ্ছি আমার সহানুভূতি। সকল ক্ষয়ক্ষতি জয় করে এই গ্রুপ আবার মাথা তুলে দাঁড়াবে, তার স্পষ্ট ইঙ্গিত ইতিমধ্যেই দেখতে পাচ্ছি। সকলের শুভেচ্ছা মাথায় নিয়ে তাঁরা নতুন উদ্যমে যাত্রা শুরু করবেন, সন্ত্রাসের কাছে পরাজয় স্বীকার করবেন না, এ আমার প্রার্থনা, এ আমার বিশ্বাস।
লেখক : শিক্ষাবিদ

Saturday, July 04, 2009

টেঙ্গরশাহী জামে মসজিদ

রাজিব পাল রনি
ঐতিহ্যবাহী বিক্রমপুরের হাজারো ঐতিহ্য আর অসংখ্য স্থাপনার মধ্যে মুন্সীগঞ্জ সদর থানার অন্তর্গত মিরকাদিম পৌরসভার টেঙ্গর নামক স্থানে টেঙ্গরশাহী মসজিদটি অন্যতম। এটি পাঠান সুলতান কররানীর শাসন আমলের ( ১৫৬৯ খ্রিস্টাব্দে ) মালেক আব্দুল্লাহ নামক একজন কাজী নির্মাণ করেন। বিক্রমপুরে পাল বংশের শাসনামলে বিক্রমপুর থেকে হিন্দু ধর্ম বিলুপ্ত হয়ে রাষ্ট্রধর্ম বৌদ্ধ মত প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তী সময়ে পাল বংশ পতনের সঙ্গে সঙ্গে বৌদ্ধ ধর্মের নাম-নিশানা বিক্রমপুর থেকে মুছে যায়। এমনিভাবে মুছে যায় যেন কোনো কালেই এর কোনো অস্তিত্ব ছিল না। পাল বংশের পতনের পর সেন রাজবংশ উদ্ভবের সঙ্গে সঙ্গে পুনরাবির্ভাব ঘটেছিল সে সম্পর্কে ‘আইন-ই আকবরী’তে উল্লেখ রয়েছে। সেন বংশীয় রাজাদের সর্বশেষ রাজা বল্লাল সেনের রাজধানী ছিল রামপাল। কোনো এক কিংবদন্তি ঘটনার মধ্য দিয়ে হিন্দু রাজত্বের অবসান ঘটে এবং মুসলিম রাজত্বের আবির্ভাব হয়। সেন বংশের অবসানের পর বিক্রমপুর মূলত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সামন্ত ভূস্বামী ও জমিদাররাই শাসন করতে থাকেন। বিক্রমপুরে পাঠান রাজত্বের অবসান ও বার ভুইয়া, চাঁদ রায়, কেদার রায়ের পরাজয়ের পর এখানে মুঘল রাজত্বের সূচনা হয়। তখন পুরো বিক্রমপুর একটি পরগনায় পরিণত হয়। বর্তমানে এটি মুন্সীগঞ্জ জেলা হিসেবে পরিচিত লাভ করেছে। একটি প্রাচীরবেষ্টিত ভূমিতে এ মসজিদটি অবস্থিত। এ মসজিদটির দৈর্ঘ্য ৩৬ ফুট ও প্রস্থ ৩৪ ফুট। মসজিদের পূর্বে চারটি, পশ্চিমে চারটি এবং উত্তর ও দক্ষিণে দুটি করে মোট ১২টি খিলানের ওপর মসজিদটি নির্মিত। মসজিদের দেয়াল ৫ ফুট পুরু, চতুর্দিকে বেষ্টিত একটি মজবুত স্থাপনা। বর্গাকৃতি এই মসজিদের প্রতিটি বাহু ৩১ ফুট। এক গম্বুজবিশিষ্ট এই মসজিদের মূল আকর্ষণ গম্বুজেই অনেকটা নিহিত রয়েছে। এটির সর্বোচ্চ শিখরে একটি কারুকার্যম-িত শিখর দ- বিদ্যমান। গম্বুজের উপরের গোলার্ধে ও নিচের অংশে চিনামাটির মধ্যযুগের কারুকাজ এখনো চোখে পড়ে। মসজিদের ভেতরে বর্গাকৃতি অবকাঠামোতে এক একটি খিলানের ৮ ফুট উপর থেকে গম্বুজের স্থাপনাশৈলী পর্যায়ক্রমে গম্বুজের কেন্দ্রবিন্দুতে মিলিত হয়েছে। অপরূপ কারুকার্যম-িত মসজিদের ভেতরেও মধ্যযুগীয় ত্রিভুজাকৃতির সৌন্দর্যের শোভা লক্ষ্যণীয়। পূর্ব দিকে মসজিদের একটি প্রবেশ পথ রয়েছে। দুপাশে দুটি করে জানালা এবং উত্তর ও দক্ষিণে একটি করে আরো মোট দুটি জানালা রয়েছে। মসজিদের ভেতরের পশ্চিম দিকে মধ্যভাগে একটি বড় মিম্বর এবং দুপাশে অনুরূপ দুটি ছোট মিম্বর রয়েছে। মসজিদের উত্তর ও দক্ষিণ পাশে জানালার দুপ্রান্তে দুটি করে মোট চারটি চূড়ঙ্গী রয়েছে। এগুলোতে মসজিদের সংরক্ষিত কোরআন, কিতাব ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। এ জামে মসজিদটি সুদীর্ঘকাল থেকে স্থানীয় মুসল্লিদের একমাত্র নামাজ আদায়ের পীঠস্থান। এ মসজিদে একটি মিনার রয়েছে তার উচ্চতা ৬০ ফুট। প্রতিদিন অসংখ্য লোক এখানে নামাজ আদায় করেন। তাছাড়া এ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকেও ঐতিহ্যবাহী এ মসজিদটি দেখার জন্য বহু লোকের সমাগম ঘটে। অভিযোগ আছে যে, মসজিদের শিলালিপিটি জোর করে পশ্চিম পাড়ার লোকজন নিয়ে যায়। তাই মূল মসজিদের গায়ে আরবি শিলালিপি দেখা যায় না। পরবর্তী সময়ে এখানে একটি বাংলা শিলালিপি স্থাপন করা হয়েছে। বাংলা শিলালিপিটি এরূপÑ ‘টেঙ্গর শাহী মসজিদ। স্থাপিত ৮৭৫ বাংলা, রিকাবী বাজার মুন্সিগঞ্জ।’ বাংলা শিলালিপির সঙ্গে আরবি শিলালিপির তেমন কোনো মিল নেই। মোয়াজ্জেম শামীম হুজুর জানান, অর্থ সংকটে মসজিদের অনেক কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না। মসজিদটি সংস্কার করা প্রয়োজন বলে তিনি জানালেন। ৪৩৬ বছরের পুরনো এ মুসলিম নিদর্শন। টেঙ্গর শাহী মসজিদটি শুধু মুন্সীগঞ্জের ইতিহাসই বহন করে না, সারা বাংলাদেশের মুসলমানদের ইতিহাস বহন করে চলেছে।

মুন্সীগঞ্জের নৌপথে চোরাচালন

মুন্সীগঞ্জের নৌপথে চোরাকারবারিদের অবৈধ ব্যবসার মহোৎসব চলছে। স্থানীয় প্রশাসন ও প্রভাবশালীদের ম্যানেজ করে অনায়াসেই সরকারি জাহাজ থেকে জ্বালানি তেল ও সিমেন্ট ফ্যাক্টরির কাঁচামাল খালাস করে নিচ্ছে। চোরাকারবারিরা অবৈধ মালামাল খালাসের জন্য নিরাপদ রুট হিসেবে বেছে নিয়েছে মুন্সীগঞ্জ সদরের ধলেশ্বরী, গজারিয়া, মেঘনা, বন্দর ও সোনারগাঁও থানার শীতলক্ষ্যা তীরবর্তী বিভিন্ন এলাকা। তত্ত্বাবধায়ক জমানায় এ অবৈধ ব্যবসা বন্ধ ছিল। রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় আসার পর আবার তারা সক্রিয় হয়ে ওঠে। জানা গেছে, চট্টগ্রাম থেকে সরকারি জাহাজে ফতুল্লার মেঘনা ও যমুনা ডিপোতে জ্বালানি তেল খালাসের আগেই মেঘনা, ধলেশ্বরী শীতলক্ষ্যা নদীতে জাহাজ এসে নোঙর করে। এরপর জাহাজের কর্মচারীদের সহযোগিতায় চোরাকারবারিরা নির্ধারিত পরিমাণ জ্বালানি তেল খালাস করে নেয়। জাহাজের কর্মচারীদের বিক্রি করে দেয়া এ জ্বালানি তেল তারা ট্রলারের মাধ্যমে নিয়ে যায়। রাত থেকে ভোর পর্যন্ত যে কোন সময়ে এ জ্বালানি তেল খালাস হয়। এ তেল সরানোর কাজে প্রধান গজারিয়া উপজেলার টানবলাকির গিয়াস ইম্মানিরচরের রিপন, গোয়ালগাঁওয়ের মাসুম গং বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে। এরা মেঘনাঘাট, ইম্মানিরচর, হোসেন্দি বাজার, ফতুল্লা খেয়াঘাট, নারায়ণগঞ্জের ধর্মগঞ্জ এলাকায় গড়ে তুলে জ্বালানি তেল চুরির পয়েন্ট। এর মধ্যে সোনারগাঁ থানার চরকিশোরগঞ্জ (বালুরঘাট), মুন্সীগঞ্জ শহরের চরকিশোরগঞ্জ (মোল্লারচর), হাটলক্ষীগঞ্জ ও বলেশ্বরী শীতলক্ষ্যা মোহনায় তেল খালাস করার নিরাপদস্থান। চোরচালান সিন্ডিকেটের প্রধান নুর মোহাম্মদ ওরফে নুরু যখন যে দল ক্ষমতায় আসে সে দলের প্রভাবশালীদের ম্যানেজ করে এ অবৈধ ব্যবসা চালিয়ে যায়। বিগত বিএনপি সরকারের আমলে জেলা বিএনপি’র সাবেক সহসভাপতি গুলজার হাজী ও তার ভাই আমির সওদাগর গংকে সঙ্গে নিয়ে এ ব্যবসা মাতিয়ে তুলে। বন্দরের একরামপুর গ্রামের নুরু ও গজারিয়ার টানবলাকি গ্রামের গিয়াসউদ্দিন ওরফে গিয়াস জাতীয় পার্টির আমল থেকে জ্বালানি তেল, ক্লিঙ্কার, সার পাচারসহ নৌপথে নানা রকম চোরাচালান ব্যবসা করে আসছে। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তারা নেতা পরিবর্তন করে। চোরাচালান ব্যবসা করে তারা এখন কয়েক শ’ কোটি টাকার মালিক। জানা গেছে, সরকারি জাহাজ থেকে পাচার করে নেয়া ডিজেল, পেট্রোল, কেরোসিন ট্যাঙ্ক লরির মাধ্যমে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দাউদকান্দি, নারায়ণগঞ্জসহ ১০-১২টি পেট্রোল পাম্প এবং বড় বাজারগুলোতে ওই মালামাল সরবরাহ করে। একই সঙ্গে অবৈধ ক্লিঙ্কার সরবরাহ করে গজারিয়ার বিভিন্ন সিমেন্ট ফ্যাক্টরিতে।

সংগ্রামী জীবনশিল্পী মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়


এ ম এ আ জি জ মি য়া
বাংলা সাহিত্যে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯০৮-১৯৫৬) এক বিস্ময়কর প্রতিভা, অনন্য কথাশিল্পী। শোষিত, বঞ্চিত ও নিপীড়িত মানুষের জীবনযাত্রা ও লড়াই-সংগ্রাম তিনি সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন এবং নিপুণ শিল্পীর ন্যায় কলমের অাঁচড়ে তা জীবন্ত করে তুলেছেন। সেখানে তাঁর মানবপ্রেম, সামাজিক অঙ্গীকারবোধ এবং শ্রেণী দৃষ্টি ভঙ্গি সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। লেখক জীবনের শুরুতে তার মধ্যে ফ্রয়েডীয় রেখাপাত দেখা গেলেও অচিরেই তিনি তা কাটিয়ে ওঠেন। নিছক শিল্পের জন্য শিল্প নয়, তিনি বিশ্বাসী ছিলেন মানুষের জন্য শিল্প বা জীবনের জন্য শিল্প অভিধায়। এক্ষেত্রে মানুষ বলতে তিনি মেহনতী গণমানুষকে বুঝিয়েছেন। তার এ মানসগঠনে ছাত্রজীবনে বিজ্ঞান অধ্যয়ন এবং পরে দেশী-বিদেশেী সাহিত্য ও দর্শন পাঠ বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল। এজন্য কল্লোল যুগের (১৯২৩-১৯৩০) হয়েও তিনি কল্লোলীয় তরঙ্গে আন্দোলিত হননি, স্পন্দিত হননি পূর্ব-দিগন্তের প্রখর রবিরশ্মি দ্বারা। প্রথমদিকে তিনি প্রগতি লেখক সংঘের আন্দোলনে সম্পৃক্ত না হলেও চলি্লশের দশকে প্রগতি লেখক ও শিল্পী সংঘের কর্মকান্ডে ব্যাপকভাবে জড়িয়ে পড়েন। তিনি যোগ দেন কম্যুনিস্ট পার্টিতে। তখন লেখালেখির পাশাপাশি পার্টির সমাজবদলের কর্মকান্ডই তার জীবনের প্রধান অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে। আর এজন্য তাকে বরণ করে নিতে হয়েছিল চরম দারিদ্র্যক্লিষ্ট জীবন। গণমানুষের জীবনের শরিক হয়ে একজন কলমপেশা শ্রমিকের ন্যায় তিনি সারাটি জীবন অর্থকষ্টে কাটিয়েছেন; তবুও কোনো মোহ বা প্রলোভনের পঙ্কিল পথে পা বাড়াননি। ব্যতিক্রম মানিক জীবনের বৈশিষ্ট্য এখানেই। আর এজন্যই বাংলা সাহিত্যে মানিক, মানিক রতন হয়ে রয়েছেন। শত বছরের মানিক মারাও গেছেন অর্ধশত বছরের বেশি হয়ে গেল। কিন্তু আজও তার দীপ্তি ছড়িয়ে পড়ছে অবিশ্রান্ত ধারায়। তিনি জন্মেছিলেন ১৯০৮ সালের ১৯ মে সাঁওতাল পরগনার দুমকা শহরে এবং মারা যান ১৯৫৬ সালের ৩ ডিসেম্বর কলকাতায়। তার সাড়ে ৪৮ বছরের স্বল্পায়ু জীবনে তিনি সাহিত্যচর্চা করেছেন ৩২ বছর। তার মধ্যে কিশোর বয়সে ৪ বছর নীরব কাব্যচর্চা (১৯২৪-১৯২৮), কলেজ জীবনে ৪ বছর শৌখিন সাহিত্যচর্চা (১৯২৮-১৯৩২) এবং অবশিষ্ট ২৪ বছর তিনি নিরবচ্ছিন্ন সাহিত্যচর্চা (১৯৩২-১৯৫৬) করেছেন। এ সময়কালে তিনি বাংলা সাহিত্যে যে অবদান রেখে গেছেন গুণ, মান ও সংখ্যায় তা অভাবনীয় ও বিস্ময়কর। তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ৮৩। তার মধ্যে উপন্যাস-৪০ (অসম্পূর্ণ-৩), গল্পগ্রন্থ-২২, প্রবন্ধ সংকলন-৩, নাটক-১, কাব্যগ্রন্থ-১ এবং অন্যান্য-১৬।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পৈতৃক বাড়ি ছিল বিক্রমপুর (মুন্সিগঞ্জ)-এর মালপদিয়া গ্রামে। তার পূর্বপুরুষরা ছিলেন সিমুলিয়া গ্রামের অধিবাসী। তার পিতার নাম হরিহর বন্দ্যোপাধ্যায় ও মা নীরদাদেবী। তার মাও ছিলেন বিক্রমপুরের গাওদিয়া গ্রামের মেয়ে। তাই মানিকের শেকড় গ্রথিত ছিল প্রাচীন বাংলার ইতিহাসখ্যাত শত ঐতিহ্যমণ্ডিত বিক্রমপুরে এবং এখানকার মাটি থেকেই তার জীবনরস সিঞ্চিত হয়েছে; আত্মপ্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে তা ফুলে ফলে সুশোভিত হয়েছে। অাঁতুর ঘরে কালো গায়ের রং-এর মধ্যেও তার ঔজ্জ্বল্য প্রকাশ পেয়েছিল। তাই তার নামকরণ হয়েছিল ‘কালো মানিক’। কিন্তু পিতৃপ্রদত্ত নাম ছিল প্রবোধ কুমার। ডাক নাম মানিক হলেও লেখক নাম মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। বিশ বছর বয়সে কলেজে পড়াকালে বন্ধুদের সঙ্গে বাজি ধরে লিখে ফেলেন ‘অতসী মামী’ গল্পটি। তা ১৩৩৫ সালের পৌষ সংখ্যা ‘বিচিত্রা’য় প্রকাশিত হলে সকলে চমকে ওঠেন।
লেখালেখির জগতে মানিকের এই যে অগ্রযাত্রা প্রাণস্পন্দন থেমে না যাওয়া পর্যন্ত তা অব্যাহত ছিল। যেসব পত্রপত্রিকায় তার লেখা প্রকাশিত হয়েছে তার মধ্যে বিচিত্রা, বঙ্গশ্রী, পূর্বাশা, ভারতবর্ষ, পরিচয়, যুগান্তর, প্রভাতী, আনন্দবাজার, স্বাধীনতা, বসুমতী, ছোটদের রংমশাল, অভিদারা, অনন্যা, এলোমেলো, এখন, আগামী প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। তার প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ (উপন্যাস) ‘জননী’ এবং গল্পগ্রন্থ ‘অতসী মামী ও অন্যান্য গল্প’। তার অসম্পূর্ণ উপন্যাস ‘মাটি ঘেঁষা মানুষ’ সম্পূর্ণ করেন সুধীর রঞ্জন মুখোপাধ্যায়। কিশোর উপন্যাস ‘মশাল’ কে সম্পূর্ণ করেছেন তা জানা যায়নি। তবে কিশোর উপন্যাস ‘মাটির কাছে কিশোর কবি’ সম্পূর্ণ করেছেন খগেন্দ্রনাথ মিত্র। তার লেখা দুটি উপন্যাসের ভূমিকা অসম্পূর্ণ ছিল, সম্পূর্ণ নয় অগ্রন্থিত রচনার তালিকা। কিছু লেখা হয়তো এখনও অনাবিষ্কৃত রয়ে গেছে।

চাকুরিজীবী পিতার কর্মস্থান পরিবর্তিত হওয়ায় তিনিও বিভিন্ন স্থানে লেখাপড়া করেছেন। ফলে লেখাপড়ায় অনেকটা বিঘ্ন ঘটলেও নানান অঞ্চলের মানুষের সাথে মেলামেশা করে যে বাস্তবজ্ঞান অর্জন করেছিলেন সে সব অভিজ্ঞতা তার পরবর্তীকালের লেখক জীবনে সহায়ক হয়েছিল। ছোটবেলা থেকে তিনি মেধাবী ছিলেন এবং পরীক্ষায় ভাল ফল করেছেন। ১৯২৪ সালে মা মারা গেলে তিনি অনেকটা শোকাচ্ছন্ন হয়ে পড়েন এবং সম্ভবত এ সময়ে নীরবে কাব্যচর্চা শুরু করেন। ১৯২৬ সালে মেদেনীপুর স্কুল থেকে তিনি প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করেন। নৈর্বাচনিক ও আবশ্যিক গণিতে লাভ করেন লেটার মার্ক। ১৯২৮ সালে বাঁকুরা ওয়েস লিয়ন মিশন কলেজ থেকে তিনি আইএসসি পাস করেন প্রথম বিভাগে। তিনি ভর্তি হলেন প্রেসিডেন্সি কলেজে গণিত বিষয়ে বিএসসি সম্মান শ্রেণীতে। কিন্তু এ সময়ে তিনি ধরাবাঁধা লেখাপড়ায় আগ্রহ হারিয়ে দেশ-বিদেশের সাহিত্য পাঠে মনোনিবেশ করেন। ফলে পরপর দু’বছর বিএসসি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হন। এ জন্য নিকট ছাত্ররাও তার প্রতি বিরাগভাজন হয়ে পড়েছিলেন। ইতোমধ্যে তার লেখালেখিও শুরু হয়ে গিয়েছিল পুরোদমে। জীবনধারণের জন্য চাকুরি করেন নবারুন (১৯৩৪) ও বঙ্গশ্রী (১৯৩৭-১৯৩৯) পত্রিকায় সহকারী সম্পাদক হিসেবে। কিন্তু মৃগী রোগাক্রান্ত মানিককে ডা. বিধানচন্দ্র রায় বিয়ে করার পরামর্শ দিলেন। ১৯৩৮ সালের ১১ মে বিক্রমপুরের পঞ্চসার গ্রামের সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কন্যা কমলা দেবীর সঙ্গে তার বিয়ে হয়। শরীরও অনেকটা সুস্থ হয়ে এলো। ইতোমধ্যে তার লেখক খ্যাতি দেশময় ছড়িয়ে পড়েছে। পেশা হিসেবে লেখালেখিকেই বেছে নিয়েছেন। আর্থিক অসচ্ছলতা ঘোচাতে ১৯৩৯ সালে তিনি একবার প্রেসব্যবসা শুরু করেছিলেন। উদ্দেশ্য সেখান থেকেই বই ও একটি পত্রিকা প্রকাশ করবেন। কিন্তু এক বছর না যেতেই প্রেস ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায়। লেখালেখির অর্থে সংসার চলে না। অবসরপ্রাপ্ত বৃদ্ধ পিতাও স্বেচ্ছায় আশ্রয় নিয়েছেন। পিতার সেবাযত্নেও এতটুকু অবহেলা তিনি করেননি। ১৯৪৩ সালে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের সময় কিছুকাল তিনি ওয়ার ফ্রন্টের প্রভিন্সিয়াল অর্গানাইজার এবং বেঙ্গল দফতরে পাবলিসিটি এসিস্যান্ট হিসেবে চাকরি করেছেন। আকাশ বাণী কলকাতা কেন্দ্রে যুদ্ধ বিষয়ক প্রচার ও নানাবিধ বেতার অনুষ্ঠানে যোগদান করেছেন। কিন্তু সে সময় ফরমায়েসি কাজে তার পোষায়নি। তিনি স্বেচ্ছায় কেটে পড়েছেন। লেখালেখি করে অধিক অর্থ উপার্জনের চেষ্টা করেছেন। তার লেখায় যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ, দুর্ভিক্ষ, কালোবাজারী, মুনাফালোভীর চিত্র ফুটে ওঠে। তাছাড়া ফ্যাসিবাদ, উগ্র জাতীয়তাবাদ ও সামপ্রদায়িকতার বিষবাষ্পে ভূলুণ্ঠিত মানবতা বিশেষ করে কৃষক-শ্রমিক মেহনতী মানুষের জীবন সংগ্রাম মূর্তমান হয়ে ওঠে। তার সাহিত্যখ্যাতিও দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে।

১৯৪২ সালের ৮ মার্চ ঢাকাতে ফ্যাসিবিরোধী সমাবেশে যোগদানের জন্য তরুণ লেখক ও কম্যুনিস্টকর্মী সৌমেন চন্দ (১৯২০-১৯৪৮) মিছিল নিয়ে আসার পথে ফরোয়ার্ড ব্লকের গু াদের হাতে রাজপথে নৃশংসভাবে নিহত হয়। সে প্রেক্ষাপটে কলকাতায় গঠিত হয়েছিল ফ্যাসিবিরোধী লেখক ও শিল্পীগোষ্ঠী। প্রথম দিকে প্রগতি লেখক সংঘের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা না থাকলেও পরবর্তীকালে এ সব সংগঠনের সঙ্গে নিজকে সম্পৃক্ত করে নেন। বুখারিনের বস্তুবাদ ও লিয়েনতিয়েনের মার্কসীয় অর্থনীতি পাঠ করে মার্কসীয় দর্শনের প্রতি তিনি আস্থাশীল হয়ে ওঠেন। ১৯৪৪ সালে তিনি কম্যুনিস্ট পার্টিতে যোগদান করেন। মার্কসীয় দর্শনের বইপত্র পড়ে তিনি সম্পূর্ণ বদলে যান। ‘সাহিত্য করার আগে’ শীর্ষক লেখায় তিনি বলেছেন, মার্কসবাদ যতটুকু বুঝেছি তাতেই আমার কাছে ধরা পড়ে গিয়েছে যে, আমার সৃষ্টিতে কত মিথ্যা বিভ্রান্তি আর আবর্জনা আমি আমদানী করেছি জীবন ও সাহিত্যকে একান্ত নিষ্ঠার সঙ্গে ভালবেসে ও জীবন ও সাহিত্যকে এগিয়ে নেয়ার উদ্দেশ্য থাকা সত্ত্বেও। ১৯৪৪ সালের ১৪-১৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত ফ্যাসিবিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘের দ্বিতীয় বার্ষিক সম্মেলনে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তার সভাপতিম লীর অন্যতম সদস্য নির্বাচিত হন। সে বছর ২৫-২৭ আগস্ট অনুষ্ঠিত পূর্ববঙ্গ প্রগতি লেখক ও শিল্পী সম্মেলনে তিনি যোগদান করেন। ১৯৪৫ সালের ৩-৮ মার্চ ভারতীয় প্রগতি লেখক সংঘের অন্যতম যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৪৬ সালে ভয়াবহ দাঙ্গা প্রতিরোধে তিনি অসুস্থ শরীর নিয়ে এগিয়ে যান এবং বহু সভা সমাবেশে যোগদান করেন। ১৯৪৯ সালের ২২ এপ্রিল প্রগতি লেখক সংঘের চতুর্থ বার্ষিক সম্মেলনে পুলিশী হানার মধ্যেও তিনি ডেলিগেট অধিবেশনে যোগদান করেন। ২২ নভেম্বর ট্রাম বাড়িতে অনুষ্ঠিত প্রগতি লেখক সংঘের শান্তি সম্মেলনে তিনি সভাপতিত্ব করেন। সভাপতিত্ব করেছিলেন ১৯৫৩ সালে অনুষ্ঠিত প্রগতি লেখক সংঘের পঞ্চম বার্ষিকী সম্মেলনে। লেখার চাপ ছাড়াও পার্টি এবং অন্যান্য সাগংঠনিক কাজে বেশি বেশি পরিশ্রম করার ফলে তার শরীর ভাঙতে শুরু করে। পার্টির পক্ষ থেকে তাকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি করে দেয়া হয়। কিন্তু হাসপাতালে তিনি কখনও স্বস্তিবোধ করেননি। নিজ দায়িত্বেই তিনি বাসায় ফিরে এসেছেন। তারপর ১৯৫৬ সালের ৩০ নভেম্বর তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়েন। অসহায় পারিবারিক পরিবেশে দুই দিন থাকার পর ২ ডিসেম্বর রাত ১০টায় নীলরতন সরকার হাসপাতালে তাকে ভর্তি করা হয়। না সেখানে আর তাকে বেশি সময় কাটাতে হয়নি। ৩ ডিসেম্বর ভোর চারটায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। সময় পেলেন না কাকা বাবুর (কমরেড মুজাফফর আহমদ) জীবনী লেখার।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে সাহিত্য চর্চার বয়স হল ৩০ বছর। এ সম্পর্কে তিনি বলেছেন, ‘তিরশ বছর বয়সের আগে কারো লেখা উচিত নয়। আমি সেই বয়সে লিখবো। এর মধ্যে তৈরি হয়ে নিতে হবে সব দিক দিয়ে। কেবল অভিজ্ঞতা সঞ্চয় নয়। নিশ্চিত মনে যাতে সাহিত্যচর্চা করতে পারি তার বাস্তব ব্যবস্থাগুলো ঠিক করে ফেলবো।’ কিন্তু সে সুযোগ তিনি পাননি। অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে ত্রিশ বছরের বহু পূর্বেই তিনি লেখালেখিকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। কিশোর বয়সে কবিতা ও গল্প লিখেছেন। কিন্তু ঔপন্যাসিক হওয়ার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছেন তার ‘উপন্যাসের ধারা’_ লেখায় ‘… সাধ করলে কবি হয়তো আমি হতে পারি; কিন্তু ঔপন্যাসিক হওয়াটাই আমার পক্ষে হবে উচিত ও স্বাভাবিক।’ তার স্বপ্ন সত্যে পরিণত হয়েছে ঔপন্যাসিক হিসেবে তিনি সুখ্যাতি অর্জন করেছেন। বিজ্ঞানের ছাত্র মানিকের বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি উপন্যাস রচনায় সহায়ক ভূমিকা সম্পর্কে তিনি বলেছেন, উপন্যাস লেখার জন্য দরকার খানিকটা বৈজ্ঞানিক বিচারবোধ, বিজ্ঞানচর্চা না করলেও সম্পূর্ণভাবে নিজের অজ্ঞাতসারে হলেও ঔপন্যাসিক খানিকটা বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করবেন, তাতে বিস্ময়ের কিছু নেই।

মানবতাবাদী মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সামপ্রদায়িকতা, ফ্যাসিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধকে অন্তর থেকে ঘৃণা করেছেন। অসুস্থ শরীরে জীবনের ঝুঁকি নিয়েও তিনি সামপ্রদায়িক দাঙ্গার বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। তিনি ডায়েরিতে লিখেছেন, ‘দাঙ্গার কথা শুনে মনটা খারাপ হয়ে গেল। … বিকালে এ অঞ্চলে শান্তিসভা হবে শুনলাম। খুশি হয়ে নিজে রাজি হলাম যতটা পারি সাহায্য করতে। যাকে দেখছি তাকে বলছি মিটমাটের জন্য সভায় যেতে। মসজিদের কাছে আনোয়ারশা রোডের একদল মুসলিম স্বীকার করলেন মিটমাট দরকার_ কয়েকজন উত্তেজিতভাবে বললেন মেরে পুড়িয়ে এখন মিটমাটের কথা কেন? অন্যরা তাদের থামালেন। ফাঁড়ি পেরিয়ে পুলের নিচে যেতে এল বিরোধিতা_ হিন্দুদের কাছ থেকে। কিসের মিটমাট মুসলমানরা এই করেছে ঐ করেছে। ব্যাটা কম্যুনিস্ট বলে আমায় মারে আর কি। প্রায় দেড়শ লোক মিলে ধরেছিল।’ ভারত ভাগের পর ১৯৫০ সালেও কলকাতায় সামপ্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছে। এ ব্যাপারে তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল খুবই স্পষ্ট। তিনি ডায়েরিতে লিখেছেন, সামপ্রদায়িকতার উপরটাই লোকে দেখছে। পিছনে কি গভীর ও ব্যাপক ষড়যন্ত্র, চোখে পড়ে না। যে উদ্দেশ্যে ভারত বিভাগ, সেই উদ্দেশ্যেই ভারত পাকিস্তানের বিবাদ বাড়িয়ে চলা বৃটিশ আমেরিকান সামপ্রাজ্যবাদ দুই রাষ্ট্রের ঘাড়ে চেপে থাকতে পারে। সামপ্রদায়িকতার ভিত্তিতে দেশ ভাগ ছিল তার অসহ্য। তার লেখায় তা সুস্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে : ‘কানাই বলে মাঠে একটা ফ্লাগ উড়াই? আমি বলি ব্লাক ফ্লাগ উড়াও। কানাইয়ের ভাই বলাই বলে ঠিক। উদ্বাস্তুরা কি স্বাধীনতা পেয়েছে? সাত আট বছরের ছেলে। ফ্লাগ কিছু কিছু উড়েছে_ কিন্তু চার দিক ঝিমানো।’

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাদাসিধে জীবনযাপন সম্পর্কে অনেকেই লিখেছেন। রথীন্দ্রকান্ত ঘটক চৌধুরী তার ‘একটি গল্পের জন্মকথা’য় লিখেছেন, ‘ছোট একটা পুরাতন একতলা দালান। সামনের দিকে অল্প পরিসর একটা কোঠা মানিক বাবুর লেখার ঘর। মাদুর বিছানো সাধারণ একটা তক্তপোষ ঘরের এক পাশে। মান্দাতার আমলের হতশ্রী লেখার টেবিল একটা_ তার একটিমাত্র বসার চেয়ারের অবস্থাও একই রকমের। গোটা তিনেক বইয়ের আলমারী পিছনটাতে। বইয়ের সংখ্যা সামান্য। বাঁধাই ‘প্রবাসী’, ‘ভারতবর্ষে’র সংখ্যাই বেশি।

বাজার থেকে ফিরে এলেন মানিক বাবু অল্প কিছুক্ষণ বাদে। গায়ে আধময়লা গেঞ্জি, পরনে লুঙ্গি। এক হাতে আট-নয় বছরের মেয়ের হাত ধরেছেন আর এক হাতে বাজারের চটের থলে। লম্বা প্রায় ছয় ফুট, বলিষ্ঠ কালো কুঁদানো শরীর, চাষাভূষাদের মতন। খোঁচা খোঁচা দাড়ি-গোঁফে মুখম ল আবৃত্ত তবে কুশ্রীতা নেই কোথাও প্রাণোচ্ছল সাজিবতায় ভরপুর। কালো ফ্রেমের চশমা ভেদকরা এক জোড়া নিবিষ্ট চোখ। অনাবৃত বাহুযুগলের পেশিতে যৌবনোচিত দৃঢ়তা। বেশভূষা, চেহারা সবটাই মিলিয়ে আবার নতুন করে যেন দেখলাম মানিক বাবুকে। খারাপ লাগেনি তবুও বাজারের থলেটাকে বাংলাদেশের প্রথম সারির একজন কথাশিল্পীর হাতে কেমন যেন বেমানান মনে হয়েছিল। … তার অনাড়ম্বর জীবনযাত্রার পরিচয় পেয়ে প্রকৃতই অন্তরঙ্গতা অনুভব করেছিলাম সেদিন।’

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সারা জীবন অর্থকষ্টে ভুগেছেন। অনেক সময় অসুখ হলে নিজের বা পরিবারের সদস্যদের সুচিকিৎসারও ব্যবস্থা করতে পারেননি। কোনো কোনো সময় পার্টি, কবি-সাহিত্যিক বন্ধু বা শুভানুধ্যায়ীরা সহায়তার হাত প্রসারিত করেছেন। তারপরও এককালীন কিছু টাকা পেলে পুরোটাই পার্টি ফান্ডে জমা করে দিতেন। পৈতৃক বাড়ি বিক্রির টাকা তিনি পারিবারিক সদস্যদের অজ্ঞাতেই পার্টিকে দিয়েছিলেন। পার্টির প্রতি তিনি এতটাই অনুরক্ত ছিলেন। অন্যদিকে যে কোনভাবে টাকাপয়সা আয় করা তার রুচিবোধের বাইরে ছিল। রথীন্দ্রকান্ত ঘটক চৌধুরীর সঙ্গে আলাপকালে তার এ দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ পেয়েছে : ‘এখন সংসার চালাতে হয় শুধু এই দিয়েই। আর তো পেশা নেই কোন। তাছাড়া সব কাগজে লিখিনে এখন আর, কারণ তাতে লেখক সম্বন্ধে পাঠকের ধারণা নিচু হয়ে যায়_ সম্ভাবনা থাকে ভুল বুঝবার। তা যদি লিখতাম তা হলে অনেক টাকা রোজগার করতে পারতাম। অভাব থাকতো না কোন, দেখলেন তো কত সাহিত্যিক বাড়ি করলেন, গাড়ি করলেন_ আমি গরিবই রয়ে গেলাম সারা জীবন। অনেক সময় তিনি পয়সার অভাবে ওষুধ কিনে খেতে পারেননি। এমনকি একটি অসহায় অবস্থা নিজ ডায়েরিতে উলি্লখিত হয়েছে। ক’দিন থেকে শরীর খুব খারাপ, … কি যে দুর্বল বলা যায় না, বিছানা থেকে উঠবারও শক্তি নেই_ এদিকে ঘরে পয়সা নেই। জোর করে তো বেরোলাম ফিরবো কিনা না জেনে।’ তারপর সর্বশেষ যখন আর্থিক অসহায়ত্বের কারণে দুই দিন নিজ বাড়িতে অজ্ঞান হয়ে থাকবার পর হাসপাতালে ভর্তির সংবাদ পেয়ে কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় তাকে দেখতে গিয়েছিলেন। এমন অবস্থায় টেলিফোন না করার কারণ জিজ্ঞাসা করায় মানিক পত্নী অস্ফুট স্বরে হেসেই উত্তর দিয়েছিলেন, ‘তাতে যে পাঁচআনা পয়সা লাগে ভাই।’

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন শ্রেণী-সংগ্রামে বিশ্বাসী লেখক। তার অনেক লেখায় তা পরিলক্ষিত হয়। শ্রেণী-সংগ্রামের বিজয়ে প্রত্যয়ী মানিক বন্দোপাধ্যায় তার ‘নেতা’ গল্পে লিখেছেন, ‘… আমরা কোন দাবি ছাড়বো না। আমরা কি শুধু রুজির জন্য লড়ি? আমাদের দাবির পিছনে_’ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহিত্যকর্মের মূল্যায়ন করেছেন অনেকেই। তবে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সাহিত্য সমালোচক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, ‘মানিক প্রান্তিক মানুষের অর্থনৈতিক জীবনকে জানতেন এবং তাদের সামাজিক অবস্থা সম্বন্ধে প্রচ্ছন্ন জ্ঞান রাখতেন। এই বাস্তবতাকে তিনি তার কথাসাহিত্যে উপস্থিত করেছেন। তিনি তা কেবল বাস্তবতাকে উপস্থিত করার প্রয়োজনে উপস্থিত করেননি করেছেন বাস্তবতাকে বদলাবার প্রয়োজনেও।’

http://www.munshigonj.com/Special/Manik100/AzizManik.html

কথাসাহিত্যিক আলাউদ্দিন আল আজাদ

সরকার মাসুদ
পঞ্চাশের দশকের শেষদিকে আজাদের শিল্পচেতনা উল্লেখযোগ্য মোড় নেয়। ফলে পাল্টে যায় তার লেখার বিষয় ও ভাবনারীতি। আর্তবিপন্ন মানুষের জীবনসংগ্রাম, মনোবিশ্লেষণ, ফ্রয়েডীয় যৌনতত্ত্ব, আত্মহনন, সুবিধাবাদী রাজনীতি, মানুষের নাছোড় উচ্চাশা, স্বপ্ন আর স্বপ্নভঙ্গের বেদনা বেশি করে জায়গা পায় তার গল্প-উপন্যাসে। উত্তরকালে শওকত আলী, হাসান আজিজুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, কায়েস আহমেদ, শহীদুল জহির প্রমুখ লেখক তাদের শিল্পরুচি ও সামর্থ্য দিয়ে বাংলা কথাসাহিত্যের যে উঁচু মান তৈরি করেছেন, তার পথনির্দেশক তো আজাদের মতো অগ্রজ লেখকরাই। পরের প্রজন্মের শক্তিমান লেখকরা যেমন তাদের শক্তিমত্তা দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়েছেন, তেমনি তাদের ভ্রান্তি থেকেও শিখেছেন অনেক কিছু।

ছাব্বিশ-সাতাশ বছর ধরে আলাউদ্দিন আল আজাদের সাহিত্যকর্ম পড়ে আসছি, বিশেষ করে তার উপন্যাস এবং ছোট গল্প। কিন্তু যখন থেকে আমরা তার রচনার সঙ্গে পরিচিত, তারও প্রায় ত্রিশ বছর আগে তিনি লেখাজোকা শুরু করেছিলেন। এখনো, এই বয়সেও অন্যূন ৭৫ বছর, তিনি লেখার ব্যাপারে উদ্যমী, নতুন পরিকল্পনার সূচক এবং সাধ্যমতো তার রূপায়ণকারী। তার সাম্প্রতিককালের কিংবা একেবারে এই মুহূর্তের লেখায় বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ কিছু নাও মিলতে পারে। কেননা শিল্পীর সৃজনসামর্থ্য সারাজীবন একইরকম থাকে না, বরং শেষ জীবনে তা অনেকটাই ক্ষয়ে আসে। ব্যতিক্রমীরা এ ক্ষেত্রে খুবই বিরল দৃষ্টান্ত। কিন্তু যে আগ্রহ তার শিল্পীজনোচিত আর্তি ও আকাক্সক্ষা এই লেখক তার ভেতরে জ্বালিয়ে রেখেছেন, আজো তা নিঃসন্দেহে শ্রদ্ধেয়।
সব্যসাচী লেখক পৃথিবীর সব ভাষার সাহিত্যেই বিরল। বাংলাদেশে বোধহয় বিরলতর। আলাউদ্দিন আল আজাদ সেই বিরল সাহিত্যিকদেরই একজন। শুধু তা-ই নয়, তিনি অগ্রগণ্য লেখকদের মধ্যে পড়েন। আজাদ লিখছেন অল্প বয়স থেকে। ছাত্রজীবনেই গল্প লিখে পাঠকের মনোযোগ কেড়েছিলেন। ছাত্রাবস্থায় প্রকাশিত হয় তার প্রথম গল্পের বই ‘জেগে আছি’। বইটি সে সময় যথার্থ প্রতিশ্রুতিবান তরুণ লেখকের সম্মান কুড়াতে সক্ষম হয়েছিল। তারপর থেকে সৃজনশীলতার সন্ধিৎসু আবেগে তিনি লিখে চলেন একটার পর একটা ছোটগল্প; খানিকটা পরিণত হয়ে উপন্যাস। আজাদ কয়েকটি নিরীক্ষাধর্মী নাটক এবং অসংখ্য কবিতাও লিখেছেন। কবি হিসেবেও তার অবস্থান স্পষ্ট। তিনি পঞ্চাশের দশকের কবিদের প্রথম সারির না হলেও দ্বিতীয় সারির প্রথমদিকের একজন বলে মনে করি।
লেখক জীবনের গোড়ার বছরগুলোতে কবি হিসেবে সুপরিচিতি পেলেও আলাউদ্দিন আল আজাদ পরবর্তী চার দশকে বিবর্তিত হয়েছেন একজন শক্তিমন্ত কথাসাহিত্যিক রূপে। তার ছোটগল্পের অনেকগুলোতেই ‘বিন্দুর ভেতরে সিন্ধু’ থিওরির প্রমাণ মিলবে; মিলবে ভাবের দিক থেকে, দৃষ্টিভঙ্গির আধুনিকতার নিরিখে। সমাজভাবনা, চরিত্রপাত্রের বিশ্লেষণ আর শিল্পোদ্বেগÑ এ তিনে মিলে তার ছোটগল্প হয়েছে আকর্ষণীয়। সেগুলোর আকর্ষণী হওয়ার পেছনে অন্য কারণও আছে। তা হচ্ছে ভাষার ব্যবহার। হ্যাঁ, আঠালো এবং বীক্ষণমূলক একটি গল্পভাষা আরো করেছিলেন তিনি, যা না থাকলে কাহিনীকার হওয়া সম্ভব, কথাশিল্পী নয়। আজাদের ‘বৃষ্টি’ নামে একটি গল্পের কথা বলবো। ষাট বছর বয়সী এক বৃদ্ধের তৃতীয় পক্ষের বাইশ বছরের স্ত্রীর সঙ্গে তার প্রথম পক্ষের ছেলের দেহমনের সম্পর্ক চিত্রিত হয়েছে এ গল্পে। জীবন বাস্তবতা আর অনতিক্রম্য মানস পরিস্থিতি দক্ষ হাতে রূপায়িত হয়েছে এখানে। মানব-মানবীর যৌন তাড়না, অবদমিত মনের ইচ্ছা এবং রহস্যময় পরিস্থিতি যথেষ্ট খোলামেলাভাবে হাজির করেছেন লেখক। বিষয়ের প্রতীকী ব্যঞ্জনা, প্রযুক্ত গদ্যভাষার ধরনটির অনিবার্যতা গল্পটিকে করে তুলেছে অসামান্য। তার গল্পে প্রাচুর্য আমাদের সমীহা জাগায়। একইসঙ্গে গল্পগুলোর ভেতরের ভাবস্বাতন্ত্র্যও আমাদের দৃষ্টি এড়াতে পারে না। তাই দেখা যায়, ভাষার প্রসাদ, কবিসুলভ কল্পনা, সৃজনী আবেগ, পরিপার্শ্বচেতনা, সমাজবীক্ষাÑ এ সবকিছু নিয়েও তার একটি গল্প আরেকটি থেকে কতো আলাদা। সেটা সম্ভব হয়েছে ট্রিটমেন্টের কারণে, কথাশিল্পীসুলভ অ্যাপ্রোচের কারণে। ‘অন্ধকার ‘সিঁড়ি’, ‘টেকনাফ’, ‘লাল জুতো’, ‘নীল জমিন’, ‘পতন’ নামের ছোটগল্পগুলোতে আমার এই বক্তব্যের সমর্থন মিলবে।
ছোটগল্প, গত শতাব্দীর বিখ্যাত ইংরেজ সমালোচক ডেভিড ডেইচেসের ভাষায় ‘ধ ংষরপব ড়ভ ষরভব’। কথাটির সূত্র ধরে আমরা বলতে পারি, জীবনের খুবই তাৎপর্যময় কিছু মুহূর্তের শৈল্পিক রূপায়ণ হচ্ছে ছোটগল্পের কাজ। তা ধারণ করে কোনো একটি ছোট ঘটনা কিংবা চিন্তাসূত্র কিংবা কল্পনানিবিড় মনের উদ্ভাস। তার ভেতর দিয়ে কেবল রচনাকর্মটির বৈশিষ্ট্যই নয়, লেখকমনের কাঠামোও পরিস্ফুট হয়। ক্ষমতাবান সাহিত্যিক অভিজ্ঞতার নির্যাস তুলে আনেন স্বপ্নের ছোঁয়ালাগা বাস্তবানুগ বর্ণনায়। সুতরাং গ্রহণ-বর্জনের বিষয়টি এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্ববহ। সচেতন অভিজ্ঞতাই একজন লেখককে আপাত অপ্রাসঙ্গিক, দূরবর্তী জিনিসকেও গল্পের প্রাসঙ্গিকতায় যুক্ত করতে প্ররোচিত করে। আবার বৃত্তান্তের বাহুল্য অথবা অনুষঙ্গের অতিরেক বিষয়েও গুণী লেখক সচেতন আজাদের বেশকিছু গল্পে (ইতিমধ্যে উল্লিখিত) প্রাগুক্ত গ্রহণ-বর্জনের ভারসাম্য সুন্দরভাবে রক্ষিত হয়েছে। তার ছোটগল্পের শিল্পসিদ্ধি সম্বন্ধে আরো দুটি কথা বলা প্রয়াজন। ‘বৃষ্টি’ গল্পের পটভূমি খরার সময়ে লেখকের গ্রামে সংঘটিত একটি সামাজিক ঘটনা। এটা খরার সময়ের গল্প, কিন্তু মানব-মানবীর যৌনক্রিয়া ও প্রজনন ক্ষমতার আইডিয়ার সঙ্গে উর্বরতার সূত্রটি (ঋবৎঃরষরঃু পঁষঃ) প্রতীকীভাবে ব্যবহৃত হয়েছে এখানে। গল্পের শেষে যে যুৎসই সংলাপ বক্রোক্তির বলিষ্ঠতা নিয়ে অস্তিত্বমান, তা ওই রচনাটির শক্তি বাড়িয়ে দিয়েছে অনেকখানি।
এবার আলাউদ্দিন আল আজাদের উপন্যাস নিয়ে কথা বলা যাক। স্বভাবের বিচারে তার উপন্যাসগুলো রোমান্টিক। একইসঙ্গে জীবনবাদী। লেখকের নিজের জীবন সম্বন্ধে বলা যায়, তা একইসঙ্গে জ্ঞানমুখী বিদ্যা ও কলাবিদ্যার পরিচর্যার শক্তি আর দুর্বলতাÑ দুয়ে মিলেই মোটামুটি সার্থক। এ পর্যন্ত ত্রিশটি উপন্যাস লিখেছেন আজাদ। তার মধ্যে আছে দৈনিক পত্রিকার ঈদ ম্যাগাজিনের জন্য লিখিত বেশ কয়েকটি উপন্যাস; যেগুলোকে উপন্যাস নয়, দীর্ঘ গল্প বললে সঠিক বলা হয়। ‘তেইশ নম্বর তৈলচিত্র’ তার জনপ্রিয় উপন্যাস। শিল্পীর অপূর্ণতাবোধ, বেদনা এবং অশেষ সৌন্দর্যতৃষ্ণা এ উপন্যাসের প্রধানতম থিম। ‘শীতের শেষ রাত বসন্তের প্রথম দিন’ও বেশ আলোচিত উপন্যাস। এর অন্যতম কারণ উপন্যাসে অবচেতনাগত লিবিডোচিত্রের প্রবল উপস্থিতি। এ দুটিই বই, পাশাপাশি আঞ্চলিক উপন্যাস ‘কর্ণফুলী’ এবং এপিক বৈশিষ্ট্যের ছোঁয়ালাগা উপন্যাস ‘ক্ষুধা ও আশা’ আজাদের লেখক ইমেজে পিলারের ভূমিকা রাখছে। উপন্যাস চতুষ্টয় যেন মজবুতভাবে তৈরি গৃহের চারটি স্তম্ভ। এগুলোই তার অগ্রগণ্য সাহিত্যকর্ম। এগুলোর ভেতরেই তিনি বেঁচে থাকার প্রেরণা খুঁজে পেয়েছেন। তার লেখাজোকার, বিশেষত গদ্যের অন্যতম চারিত্র হচ্ছে ভাবালুতাবর্জিত আধুনিক জীবনদৃষ্টি। বিষয়ভাবনা, লেখার স্টইল এবং চিন্তাচেতনার প্রগতিশীলতাÑ সব দিক থেকেই আজাদ একজন আধুনিক মানুষ। খোলা চোখ এবং সংস্কারমুক্ত মন নিয়ে, সেই মনে শিল্পীজনোচিত জিজ্ঞাসা ধারণ করে তিনি এখনো নিরলস লিখে চলেছেন গদ্য-পদ্য।
শিল্পীর মনের টানাপড়েন এবং নতুন ধরনের মূল্যবোধের কারণে ‘তেইশ নম্বর তৈলচিত্র’ প্রসিদ্ধ হলেও এ উপন্যাসের অন্য উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে এর নায়ক পরিকল্পনা। নায়কের পালাবদল ঘটেছিল সেই চল্লিশের দশকে, সমরেশ বসুর ‘বিবর’ উপন্যাসের মধ্য দিয়ে। তার আগে নায়ক বলতে আমরা বুঝতাম আদর্শবাদী চরিত্র। সমরেশ বসুই প্রথম একটি লম্পট ও প্রতারক চরিত্রকে নায়কের মর্যাদা দেন। দেশ ভাগ পরবর্তী বাংলাদেশের (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের) উপন্যাসে সৈয়দ শামসুল হক, আলাউদ্দিন আল আজাদ, রশীদ করিম প্রমুখের হাত ধরে এলো এমন নায়ক যিনি মধ্যবিত্ত শ্রেণীর প্রতিনিধি। তারা শুধু মধ্যবিত্ত নয়, একইসঙ্গে বাঙালি মুসলমানও। তা সত্ত্বেও বাবর আলী (উপন্যাস: ‘খেলারাম খেলে যা’, সৈয়দ হক), জাহেদুল ইসলাম (‘তেইশ নম্বর তৈলচিত্র’-এর নায়ক), কামাল (উপন্যাস: ‘শীতের শেষ রাত বসন্তের প্রথম দিন’, আলাউদ্দিন আল আজাদ) প্রমুখ ব্যক্তি আদর্শ ও মূল্যবোধের দিক থেকে প্রথাগত চরিত্র নয়। চিন্তাভাবনায় তারা আধুনিক ও উদারনৈতিক। ‘তেইশ নম্বর তৈলচিত্র’তে দেখা যাচ্ছে, জাহেদ স্ত্রীর তলপেটে বিয়ের আগে সন্তান ধারণের চিহ্ন দেখে মানসিক দ্বন্দ্বে জর্জরিত। কিন্তু অনেক দিন-রাত্রির মানসিক টানাপড়েনের পর শিল্পীশোভন ভালোবাসা আর মানবিকতার দ্বারা প্রণোদিত হয়ে সে ওই দুশ্চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দেয়। জয়ী হয় আধুনিক শিল্পীর মূল্যবোধ। কিন্তু এসবের ভেতর দিয়ে ঔপন্যাসিক মধ্যবিত্ত নাগরিক জীবনেরই বিশ্বাস্য ছবি এঁকেছেন।
‘শীতের শেষ রাত বসন্তের প্রথম দিন’-এও আমরা অল্পবিস্তর একই চিত্র পাই। তবে এটা আজাদের পরিণততর উপন্যাস। আগের মতো আদর্শবাদী রোমান্টিকতা এখানে নেই। আছে সামাজিক বাস্তবতার নিপুণ ছবি আর গ্লানিময় জীবনের অপ্রিয় সত্য। কাহিনীটা একটু বলি। স্বামীহীনা মধ্যবয়সী বিলকিস বানু দুই সন্তানের মা। মামাতো বড় বোনের (জেবু আপা) ছেলে কামাল কিছুদিনের জন্য থাকতে এসেছে তার বাসায়। কামালের প্রতি বিলকিস বানু আকর্ষণ অনুভব করে। কিছুতেই এ আকর্ষণ সে এড়াতে পারে না, বরং মানসিক দ্বন্দ্বে ভোগে। বিলকিস কামালকে বাস্তবে কাছে পায় না, পায় স্বপ্নে। স্বপ্নে তার সান্নিধ্যে আসামাত্র বিলসিক বানুর দেহে রোমাঞ্চ জাগে, মনে ঝড় ওঠে। পরমুহূর্তেই স্বপ্নটি ভেঙে যায়। জেগে ওঠে তিনি আবিষ্কার করেন, কামাল ও তারই মেয়ে পারভিন প্রেমের আলিঙ্গনে আবদ্ধ। বিলকিস বানুর এ উপলব্ধি হয় যে, তার জীবনে শখ-আহ্লাদের মৌসুম বিগতপ্রায়; কিন্তু পারভীন-কামালের মতো তরুণ-তরুণীর জীবনে বসন্ত সমাগত। এবং জীবনের স্বাভাবিক ধর্ম এটাই। বইটিতে প্রধান চরিত্রের যে আত্মসমীক্ষা এবং কেন্দ্রীয় চরিত্রে বিলকিসের যে আত্মোপলব্ধি পাওয়া যায়, তা লেখকের বিস্তৃত জীবনাভিজ্ঞতারই ফসল।
একাধিক সমালোচক ‘ক্ষুধা ও আশা’কে মহাকাব্যিক বলেছেন কেন? উপন্যাসটি আকৃতিতে ঢাউস বলে? নাকি লেখক বিস্তৃত পটভূমিতে জীবনের সমগ্রতাকে স্পর্শ করতে চেয়েছেন বলে? মহাকাব্যে একটি কাহিনী বয়ানের স্বার্থে কবিকে ‘অজস্র পঙ্ক্তি লিখতে হয়। সামর্থ্যবান ঔপন্যাসিকও একটি বড় বিষয়কে ধরার জন্য শত শত পৃষ্ঠা ব্যয় করেন। কিন্তু দেখতে হবে পৃষ্ঠাগুলো ব্যয়িত হয়েছে কীভাবে, কী রকম ভাষা ও জীবনপ্রত্যয়ের ভেতর দিয়ে অগ্রসর হয়েছে সেই উপন্যাস। মনে রাখা খুবই জরুরি যে, কেবল বিশাল পটভূমি অসংখ্য চরিত্রসমেত প্রলম্বিত কাহিনী আর ঘটনার প্রাচুর্যই নয়, বরং বড় ক্যানভাসে যুগধর্ম এবং জীবনদর্শনের সমন্বিত শিল্পরূপ এপিক নভেলের লক্ষ্যযোগ্য বৈশিষ্ট্য। মহাকাব্যিক উপন্যাস বেড়ে ওঠে সুনির্দিষ্ট থিম, ভাষা ও কুশীলবদের নিয়ে। তার ভাব ও বিশ্বাস অনেকখানি আদর্শায়িতও বটে। সন্দেহ নেই ‘ক্ষুধা ও আশা’ লেখকের সুপরিকল্পনা আর পরিশ্রমের ফসল।
সমকালের অনুভব রাশিকে চিরকালের তারে বেঁধে দেয়ার আন্তরিক প্রয়াসও এখানে লক্ষ্য করা যায়। এসব সত্ত্বেও আমার ধারণা, এপিক নভেলের উপযোগী ব্যতিক্রমী জীবনভাবনা ও আত্মদর্শন এখানে অনুপস্থিত। এই মোটা বই, অতএব, ঠিক মহাকাব্যিক উপন্যাস নয়। এটাকে বরং এপিক নভেলের কতিপয় লক্ষণে আক্রান্ত রচনা বলা যেতে পারে। আজাদের এই উচ্চাশী উপন্যাসে চল্লিশ দশকের বড় বড় ঘটনা আছে। দুর্ভিক্ষ, মহামারী, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, রাজনৈতিক আন্দোলন-অনশন… প্রায় সবই এতে উপস্থিত। বলা চলে, সমাজ বাস্তবতার বর্ণনায় তিনি নিখুঁত হতে চেয়েছেন। মানুষের সব প্রবৃত্তি এখানে প্রকাশিত। কিন্তু বেশিরভাগ চরিত্রকে বাস্তব মনে হয় না। কোথায় যেন একটা কমতি আছে। সে কারণে বইটি মনের মধ্যে প্রগাঢ় ছাপ ফেলতে পারে না।
‘কর্ণফুলী’ আলাউদ্দিন আল আজাদের অন্য উল্লেখযোগ্য উপন্যাস। এর পটভূমি চট্টগ্রাম। চট্টগ্রামের দুর্বোধ্য মুখের ভাষা এখানে অবিকল ব্যবহৃত হয়েছে। ভাষা ধারণ করে মনের আবেগ, হৃদয়ের অনুভূতি। সেদিকটা বিবেচনা করলে আঞ্চলিক ভাষার প্রয়োগ এখানে যথার্থ। ফর্ম কিংবা লিপিকৌশলের দিক থেকে ‘তেইশ নম্বর তৈলচিত্র’তে অভিনবত্ব নেই। কিন্তু থিমের বেলায় এর নতুনত্ব স্বীকার করতেই হবে। চিত্রশিল্পীর জীবন ও তার মানসিক দ্বন্দ্ব নিয়ে বাংলা ভাষায় আজাদের আগে কেউ উপন্যাস লেখেননি। সৃজনশীল মানুষের তাড়নাচ্ছিন্ন জীবন ও শিল্পকর্মের ভেতর একটি সমন্বয় স্থাপনের সৎচেষ্টা এতে লক্ষণীয়। আলাউদ্দিন আল আজাদ যে লেখক হিসেবে বৈচিত্র্যসন্ধানী, সেটা তিনি আরেকবার প্রমাণ করেছেন ‘কর্ণফুলী’ লিখে। কর্ণফুলী নদী তীরবর্তী এক বিশেষ অঞ্চলের ভূ-প্রকৃতি সেখানকার মানুষের প্রাত্যহিক জীবন, সেই জীবনের আশা-আনন্দ, বেদনা-বিষাদের বর্ণোজ্জ্বল একটি চিত্র পাওয়া যায় উপন্যাসটিতে। তারপরও প্রশ্ন থেকেই যায় আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার এবং বিষয়বস্তুগত আঞ্চলিকতা নিয়ে। এ দেশে একটি প্রবাদ সুবিদিত। তা হচ্ছে, এক জায়গার বুলি অন্য জায়গার গালি। ‘কর্ণফুলী’ পড়তে পড়তে কথাটির মর্মার্থ অনুভব করি। এ উপন্যাসে প্রযুক্ত ডায়ালেক্ট অকৃত্রিম। কোথাও কোথাও তা খাপও খেয়েছে চমৎকার; কিন্তু চট্টগ্রাম অঞ্চলের মানুষের মুখের ভাষা সম্বন্ধে সামান্য ধারণাও নেই, এমন পাঠকের কাছে কর্ণফুলীর অনেক চরিত্র সত্যিকার অর্থে দুর্বোধ্য ঠেকবে। এবার আঞ্চলিকতার প্রশ্ন। কোনো বিশেষ আঞ্চলকে পটভূমি করে রচিত হলেই তা প্রকৃত আঞ্চলিক উপন্যাস হয় না; দেখতে হবে তার আবেগ ও মূল সুরটি আরো অনেক অঞ্চলের মানুষকে স্পর্শ করছে কি না, অর্থাৎ শেষ বিচারে অনুভবের সর্বজনীনতাই আসল কথা। তা না থাকলে ‘আঞ্চলিক উপন্যাস’ শব্দবন্ধটির প্রয়োগ পাঠকের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়াবে শুধু। ইংল্যান্ডের একটি জনপদ সাসেক্সকে ভিত্তি করে রচিত টমাস হার্ডির ঞবংং ড়ভ ঃযব উ’ঁৎনবৎারষষবং, অদ্বৈত মল্লবর্মণের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ কিংবা অমিয়ভূষণ মজুমদারের ‘মহিষকুড়ার উপকথা’ বোধহয় সার্থক আঞ্চলিক উপন্যাসের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। কেননা এসব লেখার বিষয়বস্তু, উপস্থাপনা, সর্বোপরি জীবনদৃষ্টি সব দেশের সবকালের মানুষকে নাড়া দিতে সক্ষম। সে ধরনের সক্ষমতা কি ‘কর্ণফুলী’ ধারণ করে?
উপন্যাসটিতে লালন, ধলাবির মতো চাকমা ভাষায় কথা বলা চরিত্রও আছে, যাদের মুখের ভাষা সরাসরি ব্যবহার করা হয়েছে। চাকমা কিন্তু চট্টগ্রাম অঞ্চলের উপভাষা নয়। আদিবাসী চাকমাদের ভাষার চেহারা সম্পূর্ণ আলাদা। এ ভাষার শব্দাবলী আলাদা, ব্যাকরণ আলাদা। বাক্য গঠনরীতি বাংলা উপভাষা থেকে পৃথক। এতে আছে প্রধানত বার্মিজ (আরাকানি) শব্দে কিছু চট্টগ্রামি উপভাষার শব্দ আর যৎসামান্য বাংলা শব্দ। সে জন্য সাধারণ পাঠকের কাছে বইটির সংলাপমুখর অনেক অংশ দুর্ভেদ্য মনে হওয়া স্বাভাবিক। ঔপন্যাসিক যদি বইয়ের শুরুতেই চাকমা ভাষার এবং চট্টগ্রামের উপভাষার শব্দগুলোর (যেগুলো বইয়ে পৌনপুনিকভাবে ব্যবহৃত) একটা তালিকা দিতেন, তা হতো দূরদর্শিতার পরিচায়ক। সেটা না করে তিনি পাঠককে বিভ্রান্তিতে ভোগার সুযোগ করে দিয়েছেন।
আজাদ প্রথাগত রচনাশৈলীকেই তার কথাসাহিত্যে কাজে লাগিয়েছেন নিজের মতো করে। তার যা কিছু অর্জন তা প্রধানত বিষয়বস্তুভিত্তিক জীবনদর্শন ও শিল্পবিশ্বাসভিত্তিক।
পাঁচের দশকের কথাসাহিত্য প্রসঙ্গে দুটি দিক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এক. বাঙালি মুসলমান লেখকের আগমন। আর্থ-সামাজিক, ধর্মীয় ও শিক্ষাগত কারণে এ আগমন যথেষ্ট বিলম্বিত হয়েছিল। দুই. পাশ্চাত্যের ভাবধারা প্রভাবিত আধুনিক সাহিত্যের শক্ত ভিত স্থাপন। ভিত অবশ্য কিছুটা তৈরি হয়েছিল মুখ্যত সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, শওকত ওসমান, গৌনত আবু রুশদ, মাহবুবুল আলম, শাহেদ আলী প্রমুখের হাতে। পঞ্চাশের কথাকাররা তাতে বলিষ্ঠতা যোগ করেন। আলাউদ্দিন আল আজাদসহ তার প্রজন্মের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য ঔপন্যাসিকের বোঝার স্বার্থে, তাদের রচনাকর্মের উৎকর্ষ অনুধাবন এবং রস গ্রহণের সুবিধার্থে উপরের কথাগুলো মনে রাখা প্রয়োজন।
পাশাপাশি এটাও বিস্মৃত হলে চলবে না যে, সদ্য স্থাপিত পাকিস্তানের মুসলিম জাগরণবাদের যুগের আজাদ নৌকা বেয়েছেন স্রোতের উজানে। বাইরে থেকে চাপিয়ে দেয়া সস্তা ভাববাদ দ্বারা প্ররোচিত না হয়ে তিনি শিক্ষা নিয়েছেন জীবনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে। ওই নতুন অভিজ্ঞতা রসদ জুগিয়েছে নতুন যুগের বার্তাবহ নতুন সাহিত্যের। সে সময় মুক্তমনা আধুনিক ভাবুকদের মিছিলে শামিল হয়েছিলেন অনেকেই। কিন্তু আজাদ তাদের ভেতরেও ব্যতিক্রমী। কেননা সৃষ্টিশীল লেখালেখি ছাড়াও সাহিত্যের রূপ নির্মাণ ও রসনিষ্পত্তি বিষয়ে এবং নান্দনিকতার ব্যাখ্যার ওপর বেশকিছু প্রবন্ধ তিনি লিখেছেন। সেগুলো ‘শিল্পীর সাধনা’, ‘সাহিত্যের আগন্তুক ঋতু’ প্রভৃতি বইয়ে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
পঞ্চাশের দশকের শেষদিকে আজাদের শিল্পচেতনা উল্লেখযোগ্য মোড় নেয়। ফলে পাল্টে যায় তার লেখার বিষয় ও ভাবনারীতি। আর্তবিপন্ন মানুষের জীবনসংগ্রাম, মনোবিশ্লেষণ, ফ্রয়েডীয় যৌনতত্ত্ব, আত্মহনন, সুবিধাবাদী রাজনীতি, মানুষের নাছোড় উচ্চাশা, স্বপ্ন আর স্বপ্নভঙ্গের বেদনা বেশি করে জায়গা পায় তার গল্প-উপন্যাসে। উত্তরকালে শওকত আলী, হাসান আজিজুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, কায়েস আহমেদ, শহীদুল জহির প্রমুখ লেখক তাদের শিল্পরুচি ও সামর্থ্য দিয়ে বাংলা কথাসাহিত্যের যে উঁচু মান তৈরি করেছেন, তার পথনির্দেশক তো আজাদের মতো অগ্রজ লেখকরাই। পরের প্রজন্মের শক্তিমান লেখকরা যেমন তাদের শক্তিমত্তা দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়েছেন, তেমনি তাদের ভ্রান্তি থেকেও শিখেছেন অনেক কিছু।
বাংলাদেশের সামগ্রিক সাহিত্যরুচির বিচারে আলাউদ্দিন আল আজাদ একজন অগ্রণী লেখক। বলা উচিত, ষাটের দশকের প্রাগ্রসর গদ্যশিল্পীদের কাছাকাছি তার অবস্থান। গল্প-উপন্যাসে কবিত্বময় ভাষা, বাকনির্মাণের চমৎকারিত্ব যুগোপযোগী ভাবুকতা তাকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। খুঁটিয়ে পড়লে দেখা যাবে, তার কথাসাহিত্যে নানারকম ত্রুটি আছে। ত্রুটি-বিচ্যুতি কার লেখায় নেই? কিন্তু জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা, বিষয়ভাবনা আর লিপিকুশলতার সমন্বয়েই গড়ে উঠেছে তার ভাবমূর্তি। সেটা বহুদিন পর্যন্ত উজ্জ্বল থাকবে বলেই মনে হয়।


http://www.munshigonj.com/MGarticles/2009/SarkarAzad.html

পদ্মায় পানি বাড়ায় ৩ ফেরি ঘাট প্লাবিত

গত ২৪ ঘণ্টায় পদ্মায় ২০ সে. মিটার পানি বৃদ্ধি পেয়ে মাওয়া-কাওড়াকান্দির ৩টি ফেরি ঘাট প্লাবিত হয়েছে। টানা বর্ষণে ডাম্ব ফেরি রানীক্ষেত ও রানীগঞ্জ বিকল হয়ে পড়ায় সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করছে। এতে করে মাওয়া-কাওড়াকান্দি ঘাটে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। গতকাল উভয় ঘাটে যাত্রীবাহী পরিবহনসহ প্রায় আড়াই শতাধিক যানবাহন আটকে পড়েছে বলে বিআইডব্লিউটিএ সূত্র জানায়।

বিআইডব্লিউটিএ কাওড়াকান্দি ঘাট সূত্র জানায়, টানা বর্ষণে পদ্মায় গত ২৪ ঘণ্টায় ২০ সে. মিটার পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। এ নিয়ে গত ৪৮ ঘণ্টায় পদ্মায় ৩৮ সেন্টিমিটার পানি বেড়ে কাওড়াকান্দি ৩নং ফেরিঘাট ও মাওয়ার ১নং ও ৩নং ফেরিঘাট প্লাবিত হয়। ঘাট তিনটি বিকল হয়ে পড়ায় গতকাল বিকেলে পন্টুনগুলো লো ল্যান্ড থেকে হাই ল্যান্ডে স্থানান্তর করা হয়েছে। এসময় ফেরি লোড আনলোডে মারাত্মক অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়। এদিকে পদ্মায় স্রোত থাকায় এবং ফেরি পন্টুনের র‌্যাম সংযোগ কর্দমাক্ত হয়ে পড়ায় ফেরি পারাপার ও লোড আনলোডের ক্ষেত্রে দেড় ঘণ্টার স্থলে আড়াই ঘণ্টার উপরে সময় লাগছে বলে ফেরি চালকরা জানান।

Thursday, July 02, 2009

শ্রীনগর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে কলম বিরতি

রেজিস্ট্রি খরচের বাইরে দলিল প্রতি অতিরিক্ত টাকা দাবি করায় শ্রীনগর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে অনির্দিষ্টকালের জন্য কলম বিরতি শুরু করেছেন দলিল লেখকরা। জানা গেছে, শ্রীনগর সাব-রেজিস্ট্রার আঃ আজিজ সম্প্রতি বদলি হওয়ায় লৌহজং সাব-রেজিস্ট্রার আঃ মজিদ শেখ অতিরিক্ত দায়িত্ব নিয়ে গতকাল প্রথম কর্মদিবসে শ্রীনগরে আসেন। সকাল ৯টায় কয়েকজন দলিল লেখককে তার বাসায় ডেকে দলিল প্রতি রেজিস্ট্রি খরচের বাইরে অতিরিক্ত টাকা দাবি করেন। অন্যথায় দলিল না করার হুমকি দেন। দলিল লেখকদের পাল্টা জবাবে তিনি অকথ্য ভাষায় গালমন্দ করেন এবং নিজের প্রভাব প্রতিপত্তির দাপট দেখিয়ে শুধুমাত্র হাজিরা খাতায় সই করেই অফিস ত্যাগ করবেন বলে সাফ জানিয়ে দেন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে শ্রীনগর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সকল দলিল লেখকগণ একযোগে কলম বিরতি শুরু করেন। এ বিষয়ে অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত সাব-রেজিস্ট্রার আঃ মজিদ শেখ বলেন, ঘটনাটি অনাকাক্সিক্ষত। পরে এজলাসে এসে তিনি রেজিস্ট্রি করবেন বলে জানান। উৎকোচ চাওয়ার বিষয়টি সুকৌশলে এড়িয়ে যান তিনি। এজলাসে বসার পূর্বেই দলিল লেখকদের সঙ্গে প্রাইভেট বৈঠকের সমঝোতার বিষয়েও তিনি কোন সদুত্তর দিতে পারেননি। বেলা পৌনে ৩টা পর্যন্ত খবর নিয়ে জানা যায়, কোন দলিল এজলাসে জমা পড়েনি।

গজারিয়ায় মাতৃভাতা ও বিধবা ভাতা বিতরণ

গজারিয়ায় মায়েদের মাতৃভাতা ও বিধবা মহিলাদের মধ্যে ভাতার টাকা বিতরণ করা হয়েছে। উপজেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের অধীনে ৮টি ইউনিয়নে ১২০ জন দরিদ্র মা মাতৃভাতা ও ১০৫৪ জন মহিলা বিধবা ভাতা পাচ্ছেন। গতকাল উপজেলা মহিলা বিষয়ক অফিসার নিবিদিতা দাস প্রতি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডে গিয়ে ভাতার টাকা বিতরণ করেন। ভাতার টাকা বিতরণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. ভিখারুদ্দৌলা চৌধুরী। উল্লেখ্য, মাতৃভাতা প্রতি দরিদ্র মা প্রতি মাসে ৩০০ টাকা এবং বিধবা মহিলা প্রতি মাসে ২৫০ টাকা করে ভাতা পাচ্ছেন।

পদ্মা সেতু নির্মাণে পাবলিক শেয়ার ছাড়ছে সরকার

পদ্মা সেতু নির্মাণে অর্থ সংগ্রহের জন্য সরকার পাবলিক শেয়ার ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রাথমিকভাবে এ শেয়ারের মাধ্যমে ৮০০ কোটি টাকা সংগ্রহকরা হবে। প্রতিটি শেয়ারের সম্ভাব্য মূল্য ধরা হয়েছে ১০০ টাকা। এসব শেয়ারের লভ্যাংশ দেয়া হবে ত্রৈমাসিক হিসাবে। লভাংশের হার হবে সাধারণ ব্যাংকের সঞ্চয়ী হিসাবের চেয়ে কিছু বেশি। শেয়ারবাজারে এসব শেয়ার ক্রয় বিক্রয় করা যাবে।

সাধারণ শেয়ারের চেয়ে এ শেয়ারের পার্থক্য হলো এটি বন্ডের মতো নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য বাজারে থাকবে।

উল্লেখ্য, সরকার আগে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বিভিন্ন সেবা ও পরিবহন সেক্টরে সারচার্জ আরোপের মাধ্যমে এ টাকা সংগ্রহ করা হবে। কিন্তু সরকার এ পদ্ধতি বাতিল করে পাবলিক শেয়ারের মাধ্যমে টাকা সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে।

১০ দিনব্যাপী বৃক্ষমেলা শুরু

মুন্সীগঞ্জে ১০ দিনব্যাপী বৃক্ষমেলা শুরু হয়েছে। কালেক্টরেট ভবন প্রাঙ্গণে বুধবার দুপুরে ফিতা কেটে এই মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি এম. ইদ্রিস আলী। মেলায় এবার ৩০টি স্টল বসেছে। এর আগে সকালে শহরে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের হয়। এই উপলক্ষে আলোচনাসভাও হয়েছে। এতে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন এম. ইদ্রিস আলী। বিশেষ অতিথি ছিলেন আলহাজ্ব মমতাজ বেগম এমপি।

মুন্সীগঞ্জ আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত প্যানেল অধিকাংশ পদে জয়ী

মুন্সীগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত আফসার-বাসার পরিষদ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ ১৫টি পদের মধ্যে ১২টি পদে বিজয়ী হয়েছে। গত মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে বিজয়ীরা হলেন সভাপতি পদে কাজী আফসার হোসেন (নিমু কাজী), সাধারণ সম্পাদক পদে আবুল বাসার। আফসার-বাসার পরিষদের নির্বাচিত অপর সদস্যরা হলেন: সহ-সভপতি সাইফুল ইসলাম মাহমুদ, জাকারিয়া মোল্লা, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান হিরু, কোষাধ্যক্ষ সালাউদ্দিন ঢালী, দপ্তর সম্পাদক আমীর হোসেন খান, লাইব্রেরী সম্পাদক মাসুদ আলম, ক্রীড়া সম্পাদক মিল্টন বসু, কার্যনির্বাহী সদস্য পারভেজ আলম, জসিম উদ্দিন খান, দেলোয়ার হোসেন খান বিজয়ী হন। বাকি ৩টি পদে আওয়ামী লীগ সমর্থিত সলিল সরকার-নাসিমা আক্তার পরিষদের ধর্মবিষয়ক সম্পাদক পদে হাবিবুর রহমান এবং আনোয়ার হোসেন ও আক্তার হোসেন কার্যনির্বাহী সদস্য পদে জয়লাভ করেন। নির্বাচনে রিটার্নিং অফিসারের দায়িত্ব পালন করেন এডভোকেট নজরুল ইসলাম খান। ১৭০ জন ভোটারের মধ্যে ১৬৮ জন ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন।

Wednesday, July 01, 2009

ভেঙে পড়েছে মুন্সীগঞ্জের স্বাস্থ্যসেবা

কাজী দীপু, মুন্সীগঞ্জ: মুন্সীগঞ্জে নতুন সিভিল সার্জন যোগদান না করায় ৬ মাসে ৫ জন ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন দিয়ে স্বাস্থ্য বিভাগের কার্যক্রম পরিচালিত হওয়ায় ভেঙে পড়েছে জেলার স্বাস্থ্য সেবা। এতে জেলার ১৫ লক্ষাধিক মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। এমনকি সিভিল সার্জন না থাকায় ডাক্তার ও কর্মকর্তা কর্মচারীরাও সঠিক সময়ে তাদেরও বেতন উত্তোলন করতে পারছে না।

সূত্র জানায়, মুন্সীগঞ্জে সিভিল সার্জন হিসেবে এনায়েত করিম ২০০৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর বদলি হলে তার স্থলে ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন আব্দুর রশীদ নামের নাক, কান, গলা বিভাগের এক কনসালটেন্ট। তিনি চলতি বছরের ২১ ফেব্র“য়ারি দায়িত্ব ছেড়ে দিলে তারস্থলে ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব গ্রহণ করেন ডা. সাজেদুল ইসলাম। তিনি ২৮ মে দায়িত্ব ছেড়ে দেয়ার পর আবার দায়িত্ব নেন ডা. আব্দুর রশীদ। তিনি ২৮ মে দায়িত্ব গ্রহণ করলে ২৫ দিন পর তাকে পরির্বতন করে ২২ জুন ডা. সুদীপ কুমার বোসকে ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জনের দায়িত্ব দেয়া হয়। তিনিও গতকাল সোমবার এলপিআরে চলে গেছেন। এখন আবার আব্দুর রশীদকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। জানা গেছে, গত ৬ মাসে নতুন সিভিল সার্জন যোগদান না করায় ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন দিয়ে মুন্সীগঞ্জ স্বাস্থ্য বিভাগ পরিচালিত হওয়ায় ভেঙে পড়েছে স্বাস্থ্য বিভাগের কার্যক্রম। এমনকি এখানে কর্মরত ডাক্তার ও কর্মকর্তা কর্মচারীরা তাদের বেতন উত্তোলন করতে পারছে না। কর্মকর্তারা জানায়, সঠিক সময়ে বেতন তুলতে না পারায় প্রতিটি পরিবারে আর্থিক সংকট দেখা দিয়েছে। এ কারণে কর্মকর্তা কর্মচারীরা মনোযোগ দিয়ে তাদের দায়িত্ব পালন করছে না।

মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরে টেন্ডার ছাড়াই প্রতœ নিদর্শন বিক্রি!

কাজী দীপু, মুন্সীগঞ্জ থেকে: শ্রীনগর উপজেলায় ভারতবর্ষের বিখ্যাত জমিদার হরেন্দ্রলাল রায় বাহাদুরের কাঁচারি প্রাসাদটি টেন্ডার ছাড়াই বিক্রি করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রায় দুশ বছরের প্রাচীন এই প্রাসাদটির প্রতœ নিদর্শন হিসেবে গুরুত্ব রয়েছে বলে সচেতনমহল জানিয়েছেন। ইতোমধ্যে ক্রেতা ভবনটি ভেঙেও ফেলেছেন বলে জানা গেছে। লোহার ভিম, দরজা জানালা ও ইট বিক্রি করা হয়েছে। জানা গেছে ভবনটির প্রতœতাত্ত্বিক মূল্য ছাড়াও প্রকৃত মূল্য প্রায় ৫ লক্ষাধিক টাকা। জানা যায়, কয়েক বছর আগে এই অনিন্দ্যসুন্দর প্রতœ নিদর্শনটি রক্ষার জন্য স্থানীয় ভাগ্যকুল হরেন্দ্রলাল উচ্চবিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ লক্ষাধিক টাকা ব্যয় করে।

অভিযোগে জানা গেছে, ১৮৮৭ সালে হরেন্দ্রলাল কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত এই কাঁচারি প্রাসাদটি ১৯০০ সালে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হয়। বিক্রির আগ পর্যন্ত এটি ছিল অর্পিত সম্পত্তি। ভাগ্যকুল হরেন্দ্রলাল উচ্চবিদ্যালয়ের দক্ষিণে অবস্থিত এ স্থাপনা সম্প্রতি টেন্ডার ছাড়াই মাত্র ৮০ হাজার টাকায় আওয়ামী লীগ কর্মী নাজিম সরদারের কাছে বিক্রি করে দেয়া হয়।

কলকাতা বেঙ্গল মহাজন সভার সভাপতি, মিডফোর্ট হাসপাতালের লাইফ গভর্নর, মুন্সীগঞ্জ হরেন্দ্রলাল পাঠাগারের প্রতিষ্ঠাতা, মুন্সীগঞ্জ-বিক্রমপুরের প্রথম কলেজের প্রতিষ্ঠাতা, দানবীর, জমিদার হরেন্দ্রলাল রায়ের অনন্য কীর্তি ছিল এই কাঁচার প্রাসাদ। এ ব্যাপারে বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির চেয়ারম্যান মনির হোসেন বলেন, স্থানীয় সংসদ সদস্য ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে অবগত করেই ভবনটি বিক্রি করা হয়েছে।

Tuesday, June 30, 2009

মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসকের কাছে অভিযোগ

মেঘনা নদীর তীর ঘেঁষে অবৈধভাবে মাটি কাটছে দুর্বৃত্তরা, বিলীন হচ্ছে গ্রাম
কাজী দীপু, মুন্সীগঞ্জ থেকে: মুন্সীগঞ্জের আধারা ইউনিয়নের কালিরচর গ্রাম সংলগ্ন মেঘনা নদীর তীর ঘেঁষে অবৈধভাবে মাটি কেটে নিয়ে যাচ্ছে দুর্বৃত্তরা। বালু মহালের সীমানা অতিক্রম করে গ্রাম ঘেঁষে মাটি কাটায় এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। এর প্রতিবাদে কালিরচর গ্রামবাসী সম্প্রতি জেলা প্রশাসকের কাছে অভিযোগ দাখিল করে। জেলা প্রশাসক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পুলিশ সুপারকে অনুরোধ জানিয়েছেন।

গ্রামবাসীর অভিযোগÑ কালিরচর গ্রামে আট হাজার জনগোষ্ঠীর বসবাস। বর্তমান সরকার সমর্থক দুর্বৃত্তরা নদীর তীর ঘেঁষে ড্রেজার দিয়ে মাটি খনন করছে- এর ফলে যেভাবে ভাঙন শুরু হয়েছে তাতে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই গ্রামটি সম্পূর্ণ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাবে।

Monday, June 29, 2009

ডান কানের মহিমা

কারো অনুরোধে সরাসরি না বলতে চাইলে ডান কান চেপে ধরুন। একইভাবে কারো কাছে কিছু চাওয়ার সময়ও ডান কান বরাবর ছুড়ে দিন আপনার আবদার। রাজি হওয়ার সম্ভাবনা অনেক। কারণ ব্যাখ্যায় ইতালীয় গবেষকরা জানালেন, হুট করে কোনো তথ্য প্রক্রিয়াকরণ করে মগজের বাঁ দিকটাই। আর বাঁ দিকের প্রসেসিংয়ের ইনপুট হচ্ছে ডান কান। একটি ক্লাবে ২৮৬ ক্লাবারের ওপর পরীক্ষা চালিয়ে এ ব্যাপারে প্রায় নিশ্চিত হয়েছেন তারা। এ সময় তাদের কাছে সিগারেটসহ আরো কিছু ছোটখাট জিনিস চাওয়া হলে ৭২ ভাগই ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে। ক্লাবে হাই ভল্যুমে গান বাজতে থাকায় গবেষকরা ইচ্ছে করেই ক্লাবারদের ডান কানে মুখ রেখে জানিয়েছিলেন তাদের অনুরোধ। বিবিসি

মিরকাদিম পৌরসভায় উন্মুক্ত বাজেট ঘোষণা

মুন্সীগঞ্জের মিরকাদিম পৌরসভায় গত শনিবার বিকালে প্রথমবারের মতো উন্মুক্ত বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে। এতে দখলদারদের কাছ থেকে ১ মাসের মধ্যে খাল উদ্ধারের শপথ নেয়া হয়। পৌর মেয়র মোহাম্মদ হোসেন রেনু ১৬ কোটি ১৭ লাখ ৪২ হাজার ৩১৭ টাকার এই বাজেট ঘোষণা করেন। তৃণমূল পর্যায় সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য সর্বস্তরের জনসাধারণের উপস্থিতিতে উম্মুক্ত বাজেট অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন সুজন-সুশানের জন্য নাগরিক কেন্দ্রীয় কমিটির সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার, বিশেষ অতিথি ছিলেন সুজনের জেলা সভাপতি হাফিজ আহম্মেদ। শহিদুল ইসলাম শাহিনের সভাপতিত্বে কাউন্সিলরসহ অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন মঞ্জুর মোর্শেদ, মীর নাসির উদ্দিন উজ্জ্বল, রাসেল মাহমুদ, তানভীর হাসান আব্দুল মজিদ কমিশনার, ফারহানা মির্জা প্রমুখ।

শ্রীনগরে এতিমখানা উদ্বোধন


মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার সুফীগঞ্জ গ্রামে শুক্রবার সকালে কুয়েত জয়েন্ট রিলিফ কমিটির অর্থায়নে এবং সোসাইটি ফর ইসলামিক ট্রেনিং সেন্টার বাংলাদেশের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) একাডেমি কমপ্লেক্সে ‘আল হানান এতিমখানা’র উদ্বোধন করা হয়েছে। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আবদুল মান্নান খান। অনুষ্ঠানে এতিমখানার পরিচালক আবদুল কুদ্দুসের সভাপতিত্বে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ কুয়েত দূতাবাসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স নায়েফ ওয়াই জে আলড্রেস, স্থানীয় সংসদ সদস্য সুকুমার রঞ্জন ঘোষ, কেজেআরসির উপমহাপরিচালক গাজী মো. জহিরুল ইসলাম প্রমুখ।

ঐতিহাসিক মধুর ক্যান্টিন নিয়ে প্রিয়ন্তির নতুন ধারাবাহিক

নির্মিত হচ্ছে নতুন ধারাবাহিক নাটক মধুর ক্যান্টিন। শাখাওয়াত আল মামুনের রচনা ও পরিচালনায় নাটকটি প্রযোজনা করেছে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান প্রিয়ন্তি । ধারাবাহিক নাটকটি মধুর ক্যান্টিন-কেন্দ্রিক একটি ডকুফিকশন ড্রামা। ধারাবাহিক নাটক প্রসঙ্গে নাটকের পরিচালক শাখাওয়াত আল মামুন বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে যার নাম, সেই আমাদের ঐতিহাসিক মধুর ক্যান্টিন। এখনো গতিময় সমানতালে জনপ্রিয় একটি রেস্তরাঁর নাম মধুর ক্যান্টিন। হাজারো হাসি-কান্না, সুখ-দু:খ এবং আন্দোলনের নীরব সাক্ষী মধুর ক্যান্টিন। নির্বোধ, জড়াজীর্ণ মধুর দেয়াল, চেয়ার, টেবিল সব কিছুতেই রয়েছে অনেক স্মৃতি, অনেক ইতিহাস। চলমান শিল্প, সাহিত্য, রাজনীতির গতিময় ঘটনা ঘটার প্রয়োজনে, অনেক প্রবীণ ও নবীন রাজনৈতিক ব্যক্তি এই নাটকে কাজ করবেন। দেশের প্রথম সারির খ্যাতিমান অনেক অভিনেতা-অভিনেত্রী মধুর ক্যান্টিন নাটকে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করবেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বহুল আলোচিত, মুখরিত একটি রেস্তরাঁর নাম মধুর ক্যান্টিন। ’৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে শহীদ হন সবার প্রিয় মধুদা। এরপর তারই সুযোগ্য সন্তান অরুণদা মধুর ক্যান্টিন এখনো পর্যন্ত গতিময় করে রেখেছেন। এই নাটকে অরুণদাও স্বচরিত্রে অভিনয় করবেন। অনেক প্রতিষ্ঠিত সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীরা এই নাটকের বিশেষ চরিত্রে অভিনয় করবেন। বর্তমান সময়ের নিয়মিত অভিনেতা-অভিনেত্রী যারা এই নাটকে কাজ করবেন তাদের মধ্যে শংকর শাওজাল, বন্যা মির্জা, সমু চৌধুরী, রুনা খান, ডা. এজাজ, সুইটি, নাফিজা, তিন্নী, সিমন্তী, পিংকী, আসলাম সানী, শাহাদাত হোসেন নিপু, সাইফ বাবু, তমাল, বাপ্পী আশরাফ ও শরিফ সারোয়ার অন্যতম। নাটকটির শুটিং শুরু হয়েছে। ধারাবাহিক নাটকটি দেশের যেকোনো একটি স্যাটেলাইট চ্যানেলে সম্প্রচার করা হবে। এই নাটকের নাট্যকার ও পরিচালক শাখাওয়াত আল মামুন বলেন, নাটকটি দর্শক দেখলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারবে। আশা করি, নাটকটি দর্শকদের ভালো লাগবে। এ ছাড়া আমি ইতোমধ্যে ট্রিপল জিরো নামে আরো একটি মেঘা ধারাবাহিক নাটকের কাজ শুরু করতে যাচ্ছি।

মুন্সিগঞ্জ বিএনপির কমিটি গঠন নিয়ে বিরোধ

কেন্দ্রে পাল্টাপাল্টি কমিটি জমা পড়েছে
মুন্সিগঞ্জে বিএনপির দুই পক্ষ পাল্টাপাল্টি কমিটি কেন্দ্রে জমা দিয়েছে। এতে দুই পক্ষের বিরোধ আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। গত শনিবার ছয় যুগ্ম আহ্বায়ক ৫১ সদস্যের কমিটি দলীয় চেয়ারপারসনের বরাবরে জমা দিয়েছেন। এর আগে আহ্বায়ক মিজানুর রহমান সিনহা একটি কমিটি জমা দিয়েছিলেন।

Saturday, June 20, 2009

ছোটবেলায়, বড়বেলায়

সরকার মাসুদ

ছোটবেলায় বড় ছুটি ছিল; আমকাঁঠালের ছুটি, ঝড়-বাদলের ছুটি
গোলসার টুঁটি চিপে তোলা মাছ বড়শিতে
ছোটবেলায় গোল আগুন, মিস্টি আলু সিদ্ধ
গোয়ালঘরের চাল-ফুঁড়ে-ওঠা-ধোঁয়া প্রাথমিক শীতে
রঙের কৌটা খুলে গেছে ছোট ছোট ঢেউয়ের পানিতে,
শান্ত প্রেমালাপ হাসি-মশকরার ডোঙা
ভেসে গেছে; দিন ভালোয় ভালোয় কেটেছে রঙিন।

ছোটবেলায় দিনগুলো বেশি লম্বা ছিল। দিনের ভেতর থেকে
বিকেলবেলা বেরিয়ে এসেছে আরো একটা দিন!
দীর্ঘ দীর্ঘ গ্রীষ্মদিন লম্বা সময় ধরে আটকা থাকতো দাদিমা’র কাঠের সিন্দুকে
প্রতিবিকেল খেলা হতো, ফড়িংমারির মাঠে রঙ-তামাশার মেলা
কিন্তু বেলা কাটতো না; ওহো, বেলা কিছুতেই নামতে চাইতো না
শ্যাওলাধরা পাথর!

বড়বেলায় সূর্যের চাকা বড়। দৌড়ায় বড়।
বড়বেলায় বড় আগুন আছে; গোল-হয়ে-পোড়া তুষের বেদনা নেই,
চালের লাউপাতা-ফুঁড়ে-ওঠা নীল ধোঁয়া নেই
বড়বেলায় বড় নদী আছে নৌকা নেই যখন তখন
হঠাৎ হঠাৎ ভারি হয়ে থাকে মন
চৈত্র বাতাসে দোল খাওয়া সোনালু ফুল ভালো করে দেয় না বিষাদ
আর খালি পাতায় ঢাকা ফাঁদ স্থলে-জঙ্গলে।

বড়বেলায় এই দ্যাখো দৌড়ের ওপর আছি
দৌড়ের ওপর থাকি ট্রেন আর বাসের জানালায়
আমার সাথে-সাথে চাঁদ দৌড়ে-দৌড়ে যায় অশান্ত ইছাপুরায়;
বড়বেলায় বড়দিনও বেশি বড় নয়
চোখের পলকে বাদুড়েরা সব নেমে আসে
পাতার আগুন ধীরে ধীরে একদম ক্ষয়ে আসে
বড়বেলায় এক-একটি দিন এক-একটি লিলিপুট!

এলিস ওয়াকার উপন্যাসের নতুন ভুবন

সরকার মাসুদ
আফ্রো-আমেরিকান লেখা এলিস ওয়াকারকে কি আমরা নারীবাদী বলবো? তা হয়তো বলবো না। কিন্তু তিনি নারীর এমন কিছু সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে উপন্যাস লিখেছেন যা অনেক নারীবাদী লেখকেরও দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে। এলিস দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছেন কথাসাহিত্যের মাধ্যমে Mutilation (বিক্ষতকরণ)-এর বিরোধিতা করে। শুধু তাই না, আফ্রিকান নারীরা আরো যত রকমভাবে নিগৃহীত-নির্যাতিত হয়ে থাকে সেসবও উপজীব্য হয়েছে তার উপন্যাসে। বিষয়টি একটু পরিষ্কার করে বলা দরকার। আফ্রিকার আদিবাসীদের মধ্যে এই শতাব্দীতেও প্রাচীন বিশ্বাস এখনো অটুট যে, কাদার পি- থেকে মানুষরূপে প্রাণীর উদ্ভব। আদি পিতা বা বিধাতা কাদার পি- ছুড়ে মেরেছিলেন বিভিন্ন দিকে। এভাবে পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর ও দক্ষিণের সৃষ্টি হয়। সৃষ্টিকর্তা ‘আম্মা’ প্রথমে যে মানুষের শরীর সৃষ্টি করলেন তা একটি নারীর দেহ। দেহটি পিঠ মাটিতে রেখে চিৎ হয়ে শুয়ে থাকলো। ‘আম্মা’ দীর্ঘ দীর্ঘকাল একা ছিলেন। নিঃসঙ্গতা দূর করার জন্য তিনি রমণী শরীর সৃষ্টি করে তার সঙ্গে মিলিত হওয়ার চেষ্টা করেন। সঙ্গমের কাজে তিনি বাধাপ্রাপ্ত হন। তার কারণ নারীর যৌনাঙ্গে পুরুষসুলভ কিছু শক্ত ব্যাপার ছিল। ‘আম্মা’ তখন রমণীর যোনি থেকে কিছু কঠিন অংশ ছেঁটে ফেলে দেন। এভাবে নারীর যৌনাঙ্গ বিক্ষত করার প্রথাটি চালু হয়।

আফ্রিকার আদিবাসীরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে, কোনো পুরুষ অথবা নারী একসঙ্গে নারী-পুরুষ হতে পারে না। পুরুষকে পুরুষই হতে হবে এবং নারীকে তার সব বৈশিষ্ট্য নিয়ে নারী। ফলে পুরুষাঙ্গের অগ্রভাগের চামড়া এবং নারীর ভগাঙ্কুর ছেঁটে ফেলার প্রয়োজন দেখা দেয়। এভাবে পুরুষ যৌনতার ক্ষেত্রে তার নিজত্ব প্রতিষ্ঠিত করে। সুদীর্ঘকাল প্রথাটি চালু আছে আফ্রিকায়। কেবল সাধারণ মহিলাদের বেলায় নয়, এটি প্রযোজ্য হয়েছিল ক্লিওপেট্রা, নেফারতিতি প্রমুখ কুলীন নারীদের বেলায়ও। আজ যারা আফ্রো-আমেরিকান তাদের মধ্যেও প্রথাটি অস্তিমান। আফ্রিকা ও আমেরিকা ছাড়াও মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরোপের অসংখ্য নারী এই প্রথার কবলে পড়ে বিক্ষতযোনি হয়েছে। এর ফলে মাত্রাতিরিক্ত রক্তক্ষরণ কিংবা ইনফেকশনের কারণে লাখ লাখ নারী প্রাণ হারিয়েছে; হারাচ্ছে এখনো। গত শতাব্দীর আশির দশকে প্রথাটির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ অঙ্কুরিত হয়। ইউরোপে এখন এর প্রতিবাদ সোচ্চার। জাতিসংঘের বক্তব্যের সঙ্গে গলা মিলিয়ে সে অঞ্চলের মানুষ বলছে, নারী শরীরের নিজস্বতার ভেতর দিয়েই তার ব্যক্তিসত্তার ও আনন্দের প্রকাশ ঘটে থাকে। এটা তার একান্ত নিজের বিষয়। তার ওই নিজস্বতাকে বিকৃত করার অধিকার নেই কারো। ইউরোপের বাইরেও অগ্রসর মানবগোষ্ঠীর মধ্যে এই মত দ্রুত প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। Mutilation ইতিপূর্বেই প্রবন্ধের বিষয়বস্তু হয়েছে। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে কথাসাহিত্য প্রথম রচিত হয়েছে এলিস ওয়াকারের হাতে। এ বিষয়ে এলিস একাধিক উপন্যাস লিখেছেন। আমি তিনটির নাম বলবো
১. Possessing the secret of joy
২. The Color Purple
৩.The Temple of my Familiar.
প্রথম উপন্যাস ‘দ্য কালার পারপল’ দুটি পুরস্কার জিতে নেয়। একটি হচ্ছেÑ ‘আমেরিকান বুক অ্যাওয়ার্ড’ অন্যটি ‘পুলিৎজার প্রাইজ’।
Possessing the secret of joy সম্বন্ধে আলোচনা করা যাক প্রথমে। ইংরেজি নামটির বাংলা করলে দাঁড়াবে ‘আনন্দের রহস্যের অধিকার লাভ’। কথাটির দ্বারা লেখক কি বুঝিয়েছেন? দেহসম্পর্কিত পূর্ণ অধিকার থেকে একজন নারী যে অপরিসীম আনন্দ পায়, অন্য কোনো উপায়ে সে তা পায় না। নারীর আনন্দের এই অধিকার জন্মগত। সৃষ্টি প্রক্রিয়ার কারণে ঈশ্বর তাকে যেসব বিশিষ্ট অঙ্গের এবং রমণীসুলভ যেসব অনুভূতির অধিকারী করে তুলেছে তাকে বিকৃত বা নষ্ট করতে পারে না কেউ। নারীসুলভ সজীবতা আর রহস্য তার একান্ত নিজের জিনিস। এটাকে সংরক্ষণ করার অধিকার আছে বিশ্বের প্রতিটি নারীর। কিন্তু পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় পুরুষ যখনই তার নিজস্ব যৌনতার রূপ নির্মাণ করতে চাইলো, গোলমালটা লাগলো তখনই। কেননা নারী অঙ্গ বিক্ষত করার ভেতর দিয়ে নারীকে শারীরিকভাবে উপভোগের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। `Possessing the secret of joy’’ উপন্যাসে এলিস ওয়াকার তাশি নামের এক আফ্রিকান নারীর জীবন কাহিনীর ভেতর দিয়ে রমণীর এই অধিকারের কথা ব্যক্ত করেছেন। লেখক তাশিকে আফ্রিকা এবং ইউরোপের বিপরীতধর্মী দুই ধরনের সংস্কৃতি-সংস্কারের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন। তাশির শৈশব-কৈশোর অতিবাহিত হয় আফ্রিকার সংস্কারাচ্ছন্ন আদিম সমাজে। যৌবনের বেশিরভাগ সময় সে কাটিয়েছে উত্তর আমেরিকায়। জীবনের গোড়ার দিকে আফ্রিকায় থাকার ফলে সে দেশের সংস্কার ও প্রথার প্রতি তার অনুগত্য জন্মেছিল। সুতরাং যৌনাঙ্গ বিক্ষত করার বিষয়টি সহজভাবে মেনে নিয়েছিল সে। সে জন্য পরে অবশ্য তাকে অনেক ভুগতে হয়।

আফ্রিকায় যৌনি বিকৃত করার কাজে নিয়োজিত মহিলাদের বলা হয় ‘সুঙ্গা’। সুঙ্গার ধারালো চাকুর কাজটিকে মেনে নিলেও তাশির শরীরে ও মনে যে ভীতির সঞ্চার হয়েছিল তা থেকে সে নিষ্কৃতি পায়নি। `trauma’’-এর (দীর্ঘস্থায়ী মানসিক আঘাত) অভিজ্ঞতা তাকে বিপর্যস্ত করে তোলে। মাঝে মাঝে তাশি ভাবে, সে উন্মাদ হয়ে যাবে যদিও সে মানসিক ভারসাম্য শেষ পর্যন্ত হারায়নি। ইউরোপের উন্নত চিকিৎসা পদ্ধতির সুযোগ কাজে লাগিয়ে সে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে গেছে। এ ক্ষেত্রে মনঃসমীক্ষণ পদ্ধতিটি তার খুব কাজে লেগেছিল।

সুস্থ হওয়ার পর তাশি একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজেফেরে। কি কারণে নারীর যৌনাঙ্গ বিকৃত করার নিষ্ঠুর প্রথাটি প্রবর্তিত হয়েছিল আফ্রিকার আদিম সমাজে? সে প্রাচীন আফ্রিকার নানারকম মিথ-এর সন্ধান করতে থাকে। তাশির মন থেকে অবশেষে ভীতি দূর হয়, যখন সে এই প্রথার পেছনের কারণটি জানতে পারে। তার মধ্যে দার্শনিকসুলভ একটি বোধ জাগে। জীবন ও মৃত্যু সম্বন্ধে সে সচেতন হয়ে ওঠে। মৃত্যুচেতনা তার মধ্যে বরাভয়ের জন্ম দেয়। তাছাড়া তার নিজের ভাগ্যে এবং হাজার হাজার আফ্রিকান নারীর ভাগ্য অভিন্ন এমনটা ভেবে তাশি সান্ত¡না খুঁজে পায়। মৃত্যুর কাছাকাছি পৌঁছে যে উপলব্ধি করে তার মনে ভয়ের লেশমাত্র নেই।

তাশির শৈশব-কৈশরের শান্তি নিরুদ্বেগ ও মধুর ছবি এঁকেছেন এলিস। তার যৌবনকালের একটি বড় অংশ জিজ্ঞাসাদীর্ণ এবং বেদনাময়। জীবনের শেষ অধ্যায়টি শঙ্কামুক্ত ও প্রবোধনিবিড়। ছেলেবেলায় তাশির মা তাকে খুচরা পয়সা দিয়ে মহল্লার দোকানে পাঠাতো দিয়াশলাই কিনতে। কিন্তু প্রতিবারই সে দিয়াশলাই আনতে ব্যর্থ হতো, কারণ পয়সা হারিয়ে ফেলতো। আর মায়ের প্রহারের হাত থেকে বাঁচার জন্য পয়সা হারানোর রূপকথাসুলভ একটি গল্প বলতো। ক্রুদ্ধ মায়ের তিরস্কার থেকে অবশ্য সে রেহাই পেতো না। বকাঝকা খেয়ে তাশি কান্না শুরু করে দিতো। তার দুগাল বেয়ে ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু ঝরে পড়তো। দিয়াশলাই এবং অশ্রু এই উপন্যাসের দুটি শক্তিশালী প্রতীক বলে মনে হয়। তাশি আগুন জ্বালাতে পারেনি, বরঞ্চ নিজেই নিভে গেছে। সে কি পুরোপুরি নিভে গিয়েছিল, নাকি নিভু-নিভু অবস্থায় ছিল, এই প্রশ্নটি করা যায়। কেননা, ভেতরে যদি আগুন না-ই থাকবে, তাহলে সুঙ্গা মহিলাটিকে (যে তার ভগাঙ্কুর উচ্ছেদ করেছিল) খুন করলো কীভাবে? শৈশবের ওই যে কান্না, সেটাই যেন তাশির সারাজীবনের দুর্ভাগ্যের প্রতীক।

আমৃত্যু বঞ্চনার তিক্ত অভিজ্ঞতা বয়ে বেড়িয়েছে সে, তা সত্ত্বেও হাল ছাড়েনি; স্বপ্ন দেখার চেষ্টা করে গেছে।
পাঠকের মনে হতে পারে, তাশি খুন করতে গেল কেন। কিন্তু সংবেদি পাঠকের এও মনে হতে পারে যে, এছাড়া তার অন্য কোনো উপায় ছিল না। প্রতিশোধের উদ্দেশ্যে খুন করা অথবা উন্মাদ হয়ে যাওয়া, এর মাঝখানে আর কোনো বিকল্প ছিল না। গভীর মনোবেদনার জটিল আবর্তে ঘুরপাক খেতে খেতে তাশি এক সময় সুঙ্গা রমণীটিকে হত্যাই করে বসে। আসামি হিসেবে যে যখন বিচারের কাঠগড়ায় তখন সে বুঝতে পেরেছিল, তাকে মৃত্যুদ- দেয়া হবে। তাশি কিন্তু মৃত্যুভয়ে কাতর ছিল না আদৌ, বরং মনে মনে তৈরিই ছিল। এই প্রস্তুতির কথা সে কাউকে বলতে চাচ্ছিল, অথচ জীবিত কোনো ব্যক্তিকে তা জানাতেও পারছিল না। সে তাই একজন প্রয়াত ব্যক্তিকে বেছে নেয় যার উদ্দেশ্যে সে চিঠি লিখবে। এই মৃত ব্যক্তিটি তাশির বান্ধবী একমাত্র বান্ধবী লিসেথ। তার সম্বন্ধে তাশি চিঠির গোড়াতেই লিখেছে যে, মৃত্যুর পরে পরলোকে তার একজন সঙ্গীনীর প্রয়োজন পড়বে। সে জন্য সে আশা করে, লিসেথের সঙ্গেই তার দেখা হবে সেখানে। লিসেথই তো একমাত্র মেয়ে যার সঙ্গে তার প্রকৃত ঘনিষ্ঠতা ছিল এবং যাকে সে গভীরভাবে ভালোবাসতো।

মাধুর্য, বেদনা, স্বপ্ন ও কল্পনা এই চারটি জিনিস দিয়ে তৈরি হয়েছে তাশির প্রতিমা। শেষের দিকে স্বপ্ন-কল্পনাই হয়েছিল তার একমাত্র আশ্রয়। সে যে তার আহূত-বেদনার্ত মনের গোপন কথা খুলে বলার জন্য জীবিত কাউকে নয়, বরং মৃত একজনকে নির্বাচন করেছিল এবং তাকে লক্ষ্য করে চিঠি লিখেছে সেটা তো প্রচ- কল্পনাপ্রবণ মনের বহিঃপ্রকাশ ছাড়া অন্যকিছু নয়। চিঠিতে তাশি ইনিয়েবিনিয়ে অনেক কথাই বলেছে। সে লিখেছে ‘… আমার মায়ের নিজস্ব জিনিস যেভাবে বিকৃত করা হয়েছিল, আমার বেলায়ও তাই করা হয়েছিল। আমার বোন দুরা একজন সুুঙ্গার ছুরির ঘায়ে মারা গেছে, তার রক্তপাত বন্ধ করা যায়নি। মায়ের কষ্টটা আমি বুঝতাম। সে জন্য আমি সুঙ্গা নারীকে খুন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। সুঙ্গারা বিশ্বাস করে যে, তাদের ছুরির আঘাতে যেসব মেয়ের নিজস্বতা ক্ষুণœ হয় তাদের মধ্যে কেউ না কেউ তাদের (সুঙ্গা) মেরে ফেলবে। সে জন্য যে সুঙ্গার অস্ত্রাঘাতে আমার বোন মারা পড়েছিল এবং আমি চিরকালের জন্য নিঃসঙ্গ হয়ে গিয়েছিলাম তাকে আমি খুন করেছি। আমি অস্ত্র দিয়ে তাকে হত্যা করিনি। ঘুমন্ত অবস্থায় মুখে বালিশ চাপা দিয়ে শ্বাসরুদ্ধ করে মেরেছি। আমি যে তাকে শুধু আমার জন্য খুন করেছি তা নয়। বহু যুগ ধরে যেসব নারী তাদের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য হারিয়ে আনন্দের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছে তাদের সবার পক্ষ থেকে আমি এ কাজ করেছি। সে জন্য আমার অপরাধবোধ নেই। আমি জানি, আফ্রিকার নারীরা এক সময় কত স্বাধীন ছিল। তাদের দেহের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ওপর তাদের পূর্ণ অধিকার ছিল, নিজেদের শরীরকে তারা জানতো। কিন্তু পশ্চিমা জগৎ তাদের দাসিতে রূপান্তর করে আর তখনই নেমে আসে অভিশাপ। আমার বিশ্বাস আফ্রিকার নারীরাই বিশ্বের তাবৎ নারীর মাতা। রমণী হিসেবে যদি কোনো জাতির নারী খুব কষ্ট পেয়ে থাকে এবং অসম্ভব অসহায়তার শিকার হয়ে থাকে তাহলে তারা হচ্ছে আফ্রিকার নারী। আমাকে ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে নিয়ে যাওয়া হবে যখন, আমি আমার চোখ দুটি বাঁধতে দেবো না। জীবনের শেষ মুহূর্তে চারপাশটা তাকিয়ে দেখবো অনেক দূরে যে পাহাড়টা নীল মনে হবে তার সৌন্দর্য উপভোগ করবো আর সেই মুহূর্তটিই হবে আমার অনন্ত মুহূর্ত।’ (অনুবাদ : লেখক)।

উপন্যাস লেখার ক্ষেত্রে এলিস ওয়াকার বেশ কায়দা-কৌশল অবলম্বন করেছেন। কখনো ধারাবাহিকভাবে গল্প বলে গেছেন, কখনো আবার পারম্পর্য ভেঙে দিয়েছেন। আবার ভাঙা জায়গাগুলো জোড়া লাগিয়েছেন। একটি কথা বলতে বলতে এসে যাচ্ছে অনেক কথা। কাহিনীর ভেতর নানা অনুসঙ্গ এসে ভিড় করেছে। একবার স্মৃতিকথা, একবার সংলাপ, একবার মানসিক যন্ত্রণার ব্যাখ্যা-বয়ান, আবার লেখকের বিশ্বাসজাত প্রতিবেদনও আছে। সব মিলে উপন্যাসের যে রূপকথা নির্মিত হয়েছে এক কথায় তা অসাধারণ।
`The Color purple’ উপন্যাসটি বের হয় ১৯৮২ সালে। এলিস ওয়াকার প্রধানত এই বইটির জন্য ‘পুলিৎজার প্রাইজ’ পেয়েছিলেন। এটাই তার খ্যাতি দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেয়। বাংলা করলে বইটির নাম দাঁড়ায় ‘বেগুনি-লাল রঙ’। একজন বঞ্চিত-নির্যাতিত নারীর জীবনযন্ত্রণা এবং তা অতিক্রম করে যাওয়ার চেষ্টাই হচ্ছে এই উপন্যাসের প্রধান থিম। মহিলাটির নাম চেলি। অত্যন্ত কুশলতার সঙ্গে চেলির ভাগ্যবিড়ম্বিত জীবনের কথা বয়ান করেছেন লেখক। নানারকম বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছে সে। কৈশরের (১৪ বছর বয়সে) পিতা তাকে ধর্ষণ করে। এই দুর্ঘটনাটি তার কোমল মনে দূরবিসারী প্রভাব ফেলেছিল। সেই দুঃসহ স্মৃতি সে কোনোভাবেই মন থেকে মুছে ফেলতে পারেনি।

‘দ্য কালার পারপল’ পড়ার সময় একই সঙ্গে বেদনার ও আনন্দের অনুভূতি হয়। তিক্ততার অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে আছে এর পাতায় পাতায়। কিন্তু শত নিগ্রহ-অবমাননার পরেও লেখক জীবনকে অস্বীকার করেননি। উপন্যাসটি চিঠির আকারে রচিত। একটি নয়, একাধিক চিঠি পাওয়া যায়। বেশিরভাগই ঈশ্বরের উদ্দেশে লেখা। ঈশ্বরের উদ্দেশে কেন? কারণ ধর্ষিতা নারী তার মনোকষ্টের কথা পৃথিবীর মানুষের কাছে জানাতে পারেনি। পৃথিবীতে যা কিছু ঘটছে সবই ঈশ্বরের নখদর্পণে। কাজেই অসহায় রমণীরা কতটা বিড়ম্বনা ও আত্মগ্লানির মধ্যে দিনাতিপাত করছে তাও তার ভালো করেই জানা। তাছাড়া ঈশ্বরই তো সেই অস্তিত্বের নাম যার কাছে একান্তে প্রার্থনা করা যায়, নালিশ জানানো যায় এবং যার ওপর নির্ভর করা যায়। চেলি জানতো তার একটি চিঠিও ঈশ্বর মহাশয় পাবেন না; পাওয়া সম্ভব নয়। তা সত্ত্বেও সে চিঠিগুলো লিখেছে। এসব চিঠি সে পুরুষ তো দূরের কথা, কোনো নারীর কাছেও লিখতে পারতো না। কেননা সে এমন এক হতভাগ্য মেয়ে, যে তার পিতার দ্বারা ধর্ষিত হয়েছে। চিঠিগুলো লেখার ফলে চেলি অবশ্য একটা বড় উপকার পেয়েছে। আত্মদুর্দশার কথা প্রকাশ করতে পারায় মনোবেদনা লাঘব হয়েছে অনেকখানি।

সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশে চিঠি লিখতে লিখতে একটা পর্যায়ে চেলি শঙ্কামুক্ত হয়; সান্ত¡নার অনূভূতি জন্ম নেয় তার মনে। সেই সঙ্গে পৃথিবীর মানুষের ওপর আস্থা রাখতে শেখে ধীরে ধীরে। বোন নেটটিকে সে বিশ্বাস করতে শুরু করে। নেটটি তাকে চিঠি লেখে। সেই চিঠি তার বিক্ষিপ্ত মনে সান্ত¡না ও শান্তির সুবাতাস বইয়ে দেয়। সবকিছু স্বাভাবিক হতে আরম্ভ করে। নেটটির পাঠানো চিঠিগুলো কেবল সান্ত¡না আর বরাভয়ই তুলে ধরেনি, আদিম আফ্রিকার ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্কিত নানা তথ্যও পরিবেশন করেছে। ইউরোপ যখন নগর সভ্যতার পত্তন হয়নি তখন, হাজার বছর আগে, আফ্রিকায় গড়ে উঠেছিল বড় বড় শহর। মিসরের প্রাচীন মানুষদের দ্বারাই নির্মিত হয়েছে পিরামিড। সে সময় দাস হিসেবে কাজ করতো কৃষ্ণবর্ণ ইসরায়েলরা। ইথিওপিয়া আফ্রিকার একটি বড় দেশ। কিন্তু সেই প্রাচীন যুগে ইথিওপিয়া বলতে সাধারণভাবে আফ্রিকাকেই বোঝাতো। এরকম আরো অনেককিছু আমরা জানতে পারি ওইসব চিঠির মাধ্যমে।

‘দ্য কালার পারপল’ উপন্যাসের ভেতর দিয়ে এলিস ওয়াকার ঈশ্বরের প্রতি প্রগাঢ় আস্থা এবং গভীর জীবনবাদিতা ফুটিয়ে তুলেছেন। অন্তর্লীন বেদনা আর উত্তরণ-উন্মুখ আত্মজিজ্ঞাসার পাশাপাশি পরিপক্ব এক আধুনিক লিপিকৌশল বইটিকে দিয়েছে উচ্চ স্তরের সাহিত্যকর্মের মর্যাদা। শুধু বিষয়বস্তু নয়, আঙ্গিক নিয়েও এবং প্রকাশ ভঙ্গির বৈচিত্র্য নিয়েও এলিস চিন্তাভাবনা করেন মনে হয়। উপন্যাসে স্থান পাওয়া সর্বশেষ চিঠিটি কেবল ঈশ্বরকে লক্ষ্য করে রচিত নয়। আরো নানাকিছুকে উদ্দেশ্য করে তা লেখা হয়েছে; সম্বোধনও করা হয়েছে সেভাবেই ‘হে প্রিয় ঈশ্বর প্রিয় তারাম-লী, প্রিয় গাছপালা, প্রিয় আকাশ, প্রিয় মানবজাতি …।’ বইটি পড়া শেষ করলে সব দুঃখ-দুর্দশাবোধের পাশাপাশি পাঠকের মনে গভীর সহানুভূতি ও ভালোলাগার অনুভূতি জাগবে। অন্য একটি চিঠিতে চেলির উদ্দেশে নেটটি লিখেছেÑ ‘পৃথিবীর মানুষ আমাদের জানতে চায়, সব দেশের কালো মানুষরা চায় আমরা আলো-বাতাসের মধ্যে থাকি, আমরা যেন বড় হই। তাদের ইচ্ছা, আমরা অতীতের দাসত্বের অনুভব অতিক্রম করে যাবো। আমাদের যে সন্তানরা আছে, তাদের আমরা যেভাবেই পাই না কেন, তারা তো ঈশ্বরেরই সন্তান আবার আমাদেরও সন্তান। এখন তাদের স্বার্থেই আমাদের মনে রাখতে হবে যে, আমেরিকায় থাকলেও আমরা আফ্রিকার অন্তরে অবস্থান করছি’। (অনুবাদ : লেখক)

এই উপন্যাসে আমরা যেসব চরিত্রের মুখোমুখি হই তারা খুব জীবন্ত। কোনো সন্দেহ নেই, এলিস রূপ নির্মাণে সুদক্ষ শিল্পী। এমনভাবে, এমনই মুন্সিআনার সঙ্গে তিনি চরিত্র সব সৃষ্টি করছেন যেন আমাদের সামনে তারা হেঁটে বেড়াচ্ছে। কেন্দ্রীয় চরিত্র চেলি তো আছেই, তাছাড়া নেটটি, হাজেরা, দুরা, লম্পট আলবার্ট যে কি না চেলি ও নেটটি দুই বোনের কাছে সাক্ষাৎ আতঙ্কের নাম, প্রভৃতি চরিত্র খুব সফলভাবে চিত্রিত হয়েছে উপন্যাসে। এলিসের গদ্য উল্লেখ করার মতো চরিত্রপাত্রের ছবি আঁকতে আঁকতে কিংবা কোনো পরিস্থিতি বর্ণনা করতে করতে লেখক নিজের কথা বলার জন্য ঢুকে পড়েন। এবং এমন ভঙ্গিতে কথা বলেন যে, অনায়াসে সেসব কথা কাহিনীর মূল স্রোতের সঙ্গে মিশে যায়।

এলিস ওয়াকার পরিশ্রমী লেখক। প্রায় গবেষকের সন্ধিৎসা নিয়ে তিনি কথাসাহিত্য রচনা করছেন। `Possessing the secret of joy’ সম্বন্ধে এ কথা বেশি প্রযোজ্য। তার কারণ আফ্রিকার আদিবাসীদের ভেতর সৃষ্টিতত্ত্ব সম্পর্কিত ধারণার ঐক্য নেই। তাদের মধ্যে অসংখ্য গোষ্ঠী, উপগোষ্ঠী এবং এক জাতিসত্তার ভাবনা-কল্পনার সঙ্গে অন্য জাতিসত্তার চিন্তাধারার খুব কমই মিল আছে। যে কারণে নারীর যৌনাঙ্গ বিকৃত করার বিষয়টি সম্বন্ধে বিস্তারিত জানার জন্য লেখককে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। `The color purple’ উপন্যাসে চেলিকে লেখা চিঠির এক জায়গায় নেটটি লিখেছিল … ‘আমেরিকায় থাকলেও আমরা বাস করছি আফ্রিকার অন্তরে।’ এটা তো আসলে ঔপন্যাসিকেরই মনের কথা। তার লেখকসত্তা আফ্রিকার হৃদয়ে বাস করে বলেই এ জাতীয় উপন্যাস তিনি লিখতে পেরেছেন।