গোলাম রাব্বানীঃ সম্ভাবনার এক নতুন সূর্য উঠছে পদ্মায়। সেতুর দুই অংশে হংকংয়ের মতো টাউনশিপ গড়তে মহাপরিকল্পনা হাতে নিচ্ছে সরকার। সেখানে গড়ে তোলা হবে আধুনিক শিল্পনগরী। হবে বিশ্বমানের আবাসিক স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়। থাকবে মসজিদ-মাদ্রাসা। বিনোদন কেন্দ্রসহ আধুনিক নগরীর সব সুযোগ-সুবিধা নিয়ে গড়ে উঠবে এই শহর। নির্মাণ করা হবে একটি আন্তর্জাতিক মানের কনভেনশন সেন্টার। ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলাও অনুষ্ঠিত হবে পদ্মাপাড়ে। টাউনশিপে বহু মানুষের আবাসনের ব্যবস্থা যেমন হবে, আবার সৃষ্টি হবে বিপুল কর্মসংস্থানের। সেতু এলাকায় দ্রুত যাতায়াতের জন্য দেশের দীর্ঘতম ফ্লাইওভার নির্মাণের প্রক্রিয়াও এগোচ্ছে। রাজধানীর জিরো পয়েন্ট বা শান্তিনগর থেকে ঝিলমিল আবাসিক প্রকল্পসহ নতুন শহরবাসীকে মূল ঢাকার সঙ্গে যুক্ত রাখা হবে ফ্লাইওভারের মাধ্যমে। বহুল প্রত্যাশিত ৬.১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে পদ্মা সেতুর কাজ শেষ হলে দক্ষিণাঞ্চলের ১৯ জেলা সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাবে। অসংখ্য মানুষের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি দূর হবে। কারণ ঢাকার সঙ্গে তাদের যোগাযোগ হবে অত্যন্ত সহজ ও সময় সাশ্রয়ী। থাকছে রেল যোগাযোগের ব্যবস্থাও। যোগাযোগ ক্ষেত্রে এই আমূল পরিবর্তনে বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মানুষের কৃষি, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও জীবিকার ধারা বদলাবে; যা অর্থনীতিতে সরাসরি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। অর্থনীতিবিদদের মতে, জিডিপি ২ ডিজিট ছুঁতে পদ্মা সেতু ব্যাপক ভূমিকা রাখবে। পদ্মাপাড়ে এখন সেতু নির্মাণে চলছে তুমুল কর্মযজ্ঞ। আশা করা হচ্ছে, ২০১৮ সাল থেকেই এই সেতুতে গাড়ি চলবে। টাউনশিপের মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন সরকারের চলতি মেয়াদেই শুরুর কথা জানিয়েছেন পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। বাংলাদেশ প্রতিদিনকে তিনি বলেন, ‘আমরা হংকংয়ের মতো টাউনশিপ গড়ে তুলব। এতে কৃষি জমি বাঁচবে। আর এখন থেকে নগরায়ণ হবে ভার্টিক্যাল স্ট্রাকচার ভিত্তিতে। ফলে দেখা যাবে, কিশোরগঞ্জের মতো এলাকায়ও ১৫ তলার একটি ভবন নির্মিত হচ্ছে।’মন্ত্রী বলেন, ‘প্রথম কাজ হচ্ছে পদ্মা সেতু করা। আর পদ্মাপাড়ে অসংখ্য ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন হবে। আলাদা আলাদা টাউনশিপ গড়ে উঠবে। মসজিদ থেকে শুরু করে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা থাকবে সেখানে। বিনোদন কেন্দ্রসহ পুকুর-লেক থাকবে। নগরায়ণ ও শিল্পায়ন শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক থাকবে না। বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া হবে।’ মুস্তফা কামাল বলেন, ‘অনেক দেশ আছে যাদের জমি কম। যেমন সাউথ কোরিয়া, হংকংয়ে তেমন জায়গা নেই। কম জমিতে বেশি লোক থাকার ব্যবস্থা করছে তারা। আমরা পদ্মাপাড়কে ডেভেলপ করছি। সেখানে রেল লাইন হবে। ঢাকা থেকে ফ্লাইওভার করা হচ্ছে। তখন অতি দ্রুত ওই এলাকায় যেতে পারবে সবাই।’ তিনি বলেন, ‘পদ্মাপাড় ঘিরে বহুমুখী উন্নয়নের পথ প্রসারিত হবে। ওই এলাকায়ও আমরা ভার্টিক্যাল কনস্ট্রাকশন করব। দেশের বিশাল অংশের জনশক্তি পদ্মাপাড়ে কাজে সম্পৃক্ত হবে। তারা সেখানেই থাকতে পারবেন। ঢাকা শহর থেকে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ওখানে নেওয়া হবে। আজ ঢাকায় শতভাগ বিশ্ববিদ্যালয়, এক তলা-দুই তলা নিয়ে অনেক ক্যাম্পাস। একটি বিশ্ববিদ্যালয় হতে হলে মিনিমাম চাহিদা পূরণ করতে হবে।’ পরিকল্পনামন্ত্রী আরও বলেন, ‘আমরা চাই পদ্মাপাড়ে একদিকে যেমন বাড়িঘর হবে। অন্যদিকে আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও গড়ে উঠবে। ছেলেমেয়েদের জন্য হোস্টেল থাকবে। কপিশপ থেকে শুরু করে সবকিছুই সেখানে থাকবে।’ পদ্মাপাড়ের পাশাপাশি মংলা সমুদ্রবন্দরেরও উন্নয়নের কথা জানান মন্ত্রী।

পদ্মাপাড়ে বদলের হাওয়া : দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের বহু কাক্সিক্ষত পদ্মা সেতুর কাজ শুরু হতে না হতেই বদলাতে শুরু করেছে জীবনযাত্রা। সব আলোচনা-সমালোচনা, জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে পুরোদমে চলছে প্রাথমিক পর্যায়ের কাজ। সেতুর জন্য মাওয়া-জাজিরা এলাকায় জমি অধিগ্রহণ শেষ হয়েছে অনেক আগেই। বৃহত্তর স্বার্থে ত্যাগ স্বীকার করেছেন চরাঞ্চলের কয়েক হাজার মানুষ। ভুলে যেতে শুরু করেছেন তাদের সদ্য অতীত হওয়া কঠিন জীবনচিত্র। সামনে শুধু আলোর হাতছানি। ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ের মাওয়া প্রান্তে চারটি ও অন্য প্রান্তে শরীয়তপুরের জাজিরায় দুটি এবং মাদারীপুরের শিবচরে একটি পুনর্বাসন কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। এখানে আছে বিদ্যুৎ সাবস্টেশন, বাজার, শপিং মল, স্কুল, মসজিদ, সুপেয় পানি, ড্রেনেজ ব্যবস্থা, পুকুরসহ নানা সুবিধা। চরাঞ্চলের বহু মানুষের অনিশ্চয়তার জীবনে সঞ্চারিত হয়েছে আশার। পদ্মায় ভাঙা-গড়ার খেলায় তাদের ভাগ্য আর পেন্ডুলামের মতো দুলবে না। এখন তাদের সবকিছুই নতুন।
পদ্মাপাড়ের যে কৃষক একসময় শুধুই জমি চাষ, ফসল ফলানো নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন, আজ তারাই হয়ে উঠেছেন পুরোদস্তুর ব্যবসায়ী। ছোটখাটো ব্যবসা নয়, কেউ কেউ ঘটা করে শুরু করেছেন পরিবহনের ব্যবসা। কেউ বা ব্যবসা করছেন স্বর্ণালঙ্কারের। যিনি দিনমজুরের কাজ করতেন, এখন ব্যবসা খুলেছেন মাওয়া ঘাটে। অনেকেরই আবার ব্যাংকে জমা পড়েছে লাখ লাখ টাকা। আর এসবই সম্ভব হয়েছে পদ্মা সেতুর কারণে।
বাংলাদেশ প্রতিদিন