বিক্রমপুরের ইতিহাস শুধু একটি পরগনার ইতিহাস নহে, ইহা বঙ্গেরই ইতিহাস...
Saturday, August 01, 2009
Monday, July 27, 2009
মুন্সীগঞ্জে ফুটবল মাঠে সংঘর্ষে খেলোয়াড়সহ আহত ২০
মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার শান্তিনগর গ্রামে ফুটবল খেলার সময় সংঘর্ষে একজন বিদেশি খেলোয়াড়সহ উভয়পক্ষের অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে আছেন- রিয়াজ ও সুদানি ফুটবলার রিচি মরিস। তারা দুজনই পূর্ব নয়াকান্দি শান্তি সংঘ ক্লাবের হয়ে খেলছিলেন।
আহতরা বিভিন্ন চিকিৎসা কেন্দ্র থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন।
গজারিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোজাম্মেল হোসেন জানান, পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এনেছে। তবে এখনও পর্যন্ত এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে তিনি জানান, শান্তিনগর গ্রামে ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনালে চরবাউশিয়া বড়কান্দি ফ্রেন্ডস ক্লাব এবং পূর্ব নয়াকান্দি শান্তি সংঘ ক্লাব খেলছিল।
খেলার ৫৫ মিনিটের সময় রিচি মরিসের গোল করে শান্তি সংঘ এগিয়ে যায়। পরে রিয়াজ আরেকটি গোল করার মুহূর্তে বিপক্ষ দলের খেলোয়ারা তাকে টেনে ধরে। এ নিয়ে দুদলের খেলোয়াড়দের মধ্যে সংষর্ঘ বেধে যায়।
রিচি মরিস দুপক্ষকে শান্ত করতে গেলে বিপক্ষের খেলোয়াড়রা তার উপরও হামলা চালায়। পরে দু’দলের সমর্থকদের মধ্যেও সংঘর্ষ বেধে যায়।
সংঘর্ষকারীরা গোলবার উপড়ে ফেলে এবং পুরস্কার বিতরণের মঞ্চ তছনছ করে বলে ওসি জানান।
ঘটনাস্থল থেকে রাত পৌনে ১০ টায় উপ-পরিদর্শক (এসআই) নাসিম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, খেলাপণ্ড হওয়ায় দু’গ্রামবাসীর মধ্যে এখনও উত্তেজনা বিরাজ করছে। তবে পরিস্থিতি মোকাবেলায় পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।
সাকুরা ফুলের দেশে - ইমদাদুল হক মিলন
ইমদাদুল হক মিলন
প্রথমবার
পি আর প্লাসিড সাহিত্যপ্রেমী যুবক। বহুদিন হয় সে জাপানে থাকে। বিবেকবার্তা নামে ছোট্ট একটা কাগজ করে। ২০০৪ সালের শুরুর দিকে সে আমার ফ্ল্যাটে এল। সঙ্গে অতি লম্বা, বয়স্ক এক জাপানি ভদ্রলোক আর প্লাসিডের অতি ক্ষুদ্র ছেলেটি। নাম থাইয়ো। তখন থাইয়োর বয়স তিন সাড়ে তিন হবে। কিন্তু চঞ্চলতায় তার বয়স হাজার খানেক। সেদিনের আগে এত চঞ্চল বাচ্চা আমি আর দেখিনি। আধাঘণ্টা খানেকের মধ্যে সমস্ত ফ্ল্যাট তছনছ করে ফেলল। একদিকে থাইয়ো আমার ফ্ল্যাট তছনছ করছে, অন্যদিকে খুবই নির্বিকার ভঙ্গিতে বসে প্লাসিড আমার সঙ্গে কথা বলছে। এপ্রিলে টোকিওতে বৈশাখী মেলা হচ্ছে কয়েক বছর ধরে। জাপানপ্রবাসী বাঙালিরা একত্র হয়ে করে। সেখানে সে একটা বইয়ের স্টল করবে এবং বিবেকবার্তার পক্ষ থেকে আমাকে একটা পুরস্কার দেবে। আমি যেতে রাজি আছি কি না, পুরস্কার গ্রহণে রাজি আছি কি না এটা জানার জন্য তার সপুত্র দেশে আগমন। আমার রাজি না হওয়ার কোনো কারণ নেই।
এপ্রিলের ১৫ তারিখে টোকিও পৌঁছে গেলাম। প্লাসিড আমাকে নিয়ে তুলল টুলুর বাড়িতে। সে থাকে মিকুরা এলাকায়। জাপানি স্ত্রীর নাম ওগাহারা আখিকো। পাঁচ বছর বয়সী ছেলেটির নাম হিরোকি। না, এই বাচ্চাটি শান্ত।
বৈশাখী মেলা ১৭ তারিখে। মাঝখানে একটা ফাঁকা দিন। টুলু আমাকে অমিয়া এলাকায় নিয়ে বিখ্যাত হিকাওয়া জিনজা (টেম্পল) দেখাল। সাকুরা বাগানে নিয়ে গেল। তখনো কোনো কোনো গাছে ফুটে আছে সাকুরা, জাপানের বিখ্যাত ফুল। ছোট এবং বড় করা যায়, সাইতামা এলাকার সিনথোসি স্টেডিয়ামটি হচ্ছে তেমন। টুলু আমাকে সেই স্টেডিয়াম দেখাল। পুরোটা দিন আমরা ঘুরেই কাটালাম। বিকেলের দিকে প্লাসিড এসে যোগ দিয়েছিল।
পরদিন বৈশাখী মেলা। মেলা হচ্ছে ইকেবুকোরো এলাকার নিশিগুচি পার্কে। প্লাসিডের জাপানি বউ ইউকি আমাদের নিয়ে গেল। সঙ্গে থাইয়ো আছে। ছেলেটি এত শার্প, আমার চেহারা মনে রেখেছে। দৌড়ে এসে আমার প্যান্ট টেনে ধরল। ধরল এত আন্তরিক ভঙ্গিতে কিন্তু আমি ভয় পেয়ে গেলাম। যাব্বাবা, টেনে খুলে ফেলবে নাকি!
নিশিগুচি পার্কে বৈশাখী মেলাটি সেবার বিশাল আয়োজনে হলো। জাপানের বিভিন্ন এলাকা থেকে বাঙালিরা এসেছে। টোকিওর মেয়র আছেন। তাঁর সঙ্গে আছে অনেক জাপানি গণ্যমান্য ব্যক্তি। আমাদের রাষ্ট্রদুত আছেন। পরিচয় হলো, কিন্তু তিনি আমাকে পাত্তাই দিলেন না। মনটা একটু খারাপই হলো।
সেবার দুই সপ্তাহ থাকলাম জাপানে। জাপানপ্রবাসী কবি, লেখক, সাংবাদিক, শিক্ষক−অনেকের সঙ্গে পরিচয় হলো। সেবারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো, যেখানে বৈশাখী মেলা হয়, সেই পার্কে একটা শহীদ মিনার তৈরির প্ল্যান করেছে বাঙালিরা। মেয়রের অনুমতির চেষ্টা চলছে। শহীদ মিনারের একটা মডেলও তৈরি করেছেন একজন বাঙালি আর্কিটেক্ট। শহীদ মিনারসংক্রান্ত একটা মিটিংয়ে আমি একদিন ছিলাম। ভাবতে ভালো লাগছিল যে আমাদের ভাষাশহীদদের স্নৃতির উদ্দেশে শহীদ মিনার হবে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম এক শহর টোকিওতে। স্বপ্ন শেষপর্যন্ত স্বপ্নই থেকে যাবে কি না কে জানে। না, আমাদের সেই স্বপ্ন স্বপ্ন থাকেনি। বাস্তবায়িত হয়েছে। টোকিওর ইকেবুকোরো এলাকার নিশিগুচি পার্কে শহীদ মিনার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেই শহীদ মিনারের সামনে গিয়ে দাঁড়ালে নিজেদের জন্য গর্ব হয়।
সেবার ‘বিবেকবার্তা পুরস্কার’ দেওয়া হলো দুপুরবেলা টোকিওর এক রেস্টুরেন্টে। মনজুরুল হকের হাত থেকে নিলাম। একদিন বিকেলবেলা এনএইচকেতে গেলাম। এনএইচকে রেডিওর জন্য মনজু ভাই আমার একটা সাক্ষাৎকার নিলেন। ফেরার সময় প্লাসিড আর আমি হাঁটছি। হেঁটে হেঁটে টোকিওর বিকেল দেখছি। বিশাল এক হোটেলের সামনের ফুটপাত দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি। হোটেলের নাম অ্যানা (অঘঅ)। কেন যে হোটেলটার দিকে তাকিয়ে মনে হলো, এই হোটেলে যদি একটা রাত অন্তত কাটানো যেত! কোনো কারণ নেই, তবু মনে হলো। দ্বিতীয়বার জাপানে গিয়ে এই হোটেলেই আমাকে উঠতে হয়েছিল। আশ্চর্য এক স্বপ্নপূরণ।
তাকেশি কাইকো স্নারক বক্তৃতা
১৯৩০ সালে পশ্চিম জাপানের ওসাকা শহরে জন্েনছিলেন তাকেশি কাইকো। এই লেখক তাঁর লেখালেখির জন্য যতটা বিখ্যাত, তাঁর বলিষ্ঠ রাজনৈতিক অবস্থানের জন্যও ততটাই বিখ্যাত। জাপানি সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ দুই স্বীকৃতি আকুতাগাওয়া সাহিত্য পুরস্কার এবং মায়নিচি সাহিত্য পুরস্কার−দুটোই তিনি বেঁচে থাকা অবস্থায় পেয়েছেন। সমকালীন জাপানি সাহিত্যের তিনি এক সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব। ইয়ুকিউ মিশিমার পরবর্তী প্রজন্েনর ঔপন্যাসিকদের মধ্যে অন্যতম প্রধান হিসেবে তাকেশি কাইকোকে গণ্য করা হয়। ষাটের দশকে সাংবাদিকতার দায়িত্ব পালনের জন্য তিনি ভিয়েতনামে অবস্থান করছিলেন। সে সময় এশীয় ভুখন্ডে মার্কিন আগ্রাসনের যে নগ্ন ছবি দেখেছিলেন তা তাঁকে মার্কিনবিরোধী অবস্থানের দিকে নিয়ে যায়। ভিয়েতনামের সেই অভিজ্ঞতার আলোকে অনবদ্য এক উপন্যাস রচনা করেন। উপন্যাসের নাম ওঘঞঙ অ ইখঅঈক ঝটঘ. এ উপন্যাস পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় অনুদিত হয়ে বোদ্ধা পাঠকের ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করে। তাকেশি কাইকো মৃত্যুবরণ করেন ১৯৮৯ সালে। ঔপন্যাসিক, গল্পকার, সমালোচক ও টিভিব্যক্তিত্ব কাইকো ওসাকা ইউনিভার্সিটি থেকে আইনশাস্ত্রে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন। শুরুর জীবনে কিছুকাল আইনের পেশায় যোগ দিলেও এই পেশায় তিনি থাকেননি। পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন সাংবাদিকতা। সাংবাদিকতা এবং সৃজনশীল সাহিত্য রচনাই ছিল মৃত্যুপর্যন্ত তাঁর প্রধান কাজ। পৃথিবীর ৪০টির মতো দেশ তিনি ভ্রমণ করেছেন। সেসব দেশের অধিকাংশই এশিয়া মহাদেশের। জাপানের বাইরে ওই সব দেশের পটভুমিতে তিনি রচনা করেন বেশ কিছু উপন্যাস। ফলে দেশগুলোর সঙ্গে গড়ে ওঠে তাঁর নিবিড় সম্পর্ক।
জাপান ফাউন্ডেশন জাপানের খুবই গুরুত্বপূর্ণ এক প্রতিষ্ঠান। তাকেশি কাইকোর মৃত্যুর পর তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে জাপান ফাউন্ডেশনকে বড় রকমের একটা অঙ্কের টাকা দেওয়া হয়। সেই টাকা থেকে বছরে একবার জাপান ফাউন্ডেশন আয়োজন করে ‘তাকেশি কাইকো মেমোরিয়াল এশিয়ান রাইটার্স লেকচার সিরিজ’। এশিয়ার কোনো এক দেশের একজন লেখককে আমন্ত্রণ জানায় জাপান ফাউন্ডেশন। সেই লেখক জাপানে গিয়ে তাঁর দেশের সাহিত্য এবং নিজের লেখা নিয়ে চারটা বক্তব্য দেন। বক্তব্যগুলো তিনি তাঁর নিজের ভাষায় লিখে জাপান ফাউন্ডেশনকে পাঠিয়ে দেন। ফাউন্ডেশন সেই বক্তব্য জাপানি ভাষায় অনুবাদ করে। লেখক তাঁর নিজের ভাষায় বক্তৃতা করেন, পাশে বসে একজন জাপানি ভাষার এক্সপার্ট সেই বক্তৃতার জাপানি অনুবাদ পাঠ করেন। ২০০৫ সালের জন্য বাংলাদেশকে নির্বাচন করে জাপান ফাউন্ডেশন। আর লেখক হিসেবে নির্বাচন করে আমাকে। ঢাকায় আমাকে আমন্ত্রণ জানাতে এলেন প্রফেসর কিউকো নিওয়া এবং মিস্টার মাসাকি হিরানো। ২০০৫ সালের বক্তব্য দিতে আমি জাপানে গেলাম ২০০৬-এর মার্চে। প্রথম বক্তৃতা হলো হিরোশিমা ইন্টারন্যাশনাল সেন্টারে। সেন্টারের পাশেই অ্যানা (অঘঅ) হোটেল। সেই হোটেলেই তোলা হলো আমাকে। ফাউন্ডেশন থেকে আমাকে একজন গাইড দিয়েছে। কচুর ডগার মতো নরম এক বাঙালি যুবক। নাম সুমন্ত ঘোষ। আরেক বাঙালি যুবক এবং শান্তিনিকেতনে পড়াশোনা করা প্রায় বাঙালি এক জাপানি ভদ্রমহিলাকে নিয়ে সুমন্ত আমাকে হিরোশিমা এয়ারপোর্টে রিসিভ করতে এল। তারিখ ১০ মার্চ ২০০৬।
হিরোশিমায় নেমে আমার গা কাঁটা দিয়ে উঠেছিল। এই সেই হিরোশিমা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে, ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট সকাল আটটা ১৫ মিনিটে পৃথিবীর প্রথম আণবিক বোমা নিক্ষিপ্ত হয় এই শহরে। মুহুর্তে পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল শহরের অধিকাংশ দালানকোঠা, নিহত হয় এক লাখ ২০ হাজার লোক, পরে প্রাণ হারায় তার দ্বিগুণ।
অ্যানা হোটেলের খুব কাছে সেই জায়গা, যেখানে নিক্ষিপ্ত হয়েছিল আণবিক বোমা। হেঁটে যেতে কয়েক মিনিট লাগে। হোটেলে লাগেজ রেখেই বেরিয়ে গিয়েছিলাম। এলাকাজুড়ে ‘পিস মেমোরিয়াল পার্ক’। ১৯৫৫ সালে এখানে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে ‘হিরোশিমা পিস মেমোরিয়াল মিউজিয়াম’। পৃথিবীর লাখ লাখ মানুষ এই মিউজিয়াম দেখতে আসে, আণবিক বোমার ভয়াবহতার কথা মনে করে হিরোশিমা ট্র্যাজেডির জন্য এখনো চোখের পানি ফেলে। শিশুরা পিস মনুমেন্টের সামনে দাঁড়িয়ে স্তব্ধ হয়ে থাকে। হিরোশিমা পিস মেমোরিয়াল পার্কে ঘুরতে ঘুরতে আমার মনে পড়েছিল আমার দেশের কথা। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের কথা। স্বজন হারানোর বেদনায় আমার বুক ভারী হয়েছিল।
পিস মেমোরিয়াল পার্কের এক পাশে দাঁড়িয়ে আছে চারতলা এক পুরোনো বাড়ির কঙ্কাল। সুমন্ত বলল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বাড়িটা ছিল পাবলিক লাইব্রেরি। আণবিক বোমার আঘাতে পুরো এলাকা ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর শুধু এই বাড়িটা এভাবে দাঁড়িয়ে ছিল। গা থেকে খসে পড়েছে আস্তরণ, দাঁড়িয়ে আছে শুধু কঙ্কাল। আমি সেই বাড়ির সামনে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকি।
পরদিন বক্তৃতা। প্রফেসর কিউকো নিওয়া এবং মিস্টার মাসাকি হিরানোর সঙ্গে টোকিও থেকে এসেছেন আনোয়ার জাহিদ। তিনি এনএইচকেতে কাজ করেন। আমার বক্তৃতার জাপানি অনুবাদ করেছেন। অসম্ভব সুন্দর কন্ঠের অধিকারী। স্টেজে বসে আমি এক প্যারা করে বক্তৃব্য পাঠ করি, আনোয়ার জাহিদ সঙ্গে সঙ্গে সেই এক প্যারার জাপানি অনুবাদ পড়েন। মিলনায়তন ভর্তি জাপানি লেখক, প্রকাশক, প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিক এবং হিরোশিমার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহিত্যের ছাত্রছাত্রী। বক্তৃতার আগে মাসাকি হিরানো আমার হাতে একগাদা টাকা ধরিয়ে দিয়েছেন। প্লেনের টিকিট আগেই আমাকে ঢাকায় পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। হোটেলের খরচ ইত্যাদি সবই বহন করছে জাপান ফাউন্ডেশন। এর বাইরে প্রতিদিনকার হাতখরচের টাকা দিচ্ছে, বক্তৃতার জন্য দিচ্ছে। প্রতিটি বক্তৃতার জন্য আমাকে একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দেওয়ার কথা। কিন্তু চারটি বক্তৃতা আমি লিখিনি। লিখেছি একটি। যেহেতু বক্তৃতার জায়গা ভিন্ন ভিন্ন, শ্রোতা ভিন্ন ভিন্ন, সুতরাং একটি বক্তৃতাই আমি পাঠ করব। এদিক দিয়ে আমার কিছুটা লস হয়ে গেল। চারটি ভিন্ন বক্তৃতা লিখলে তিন গুণ বেশি টাকা পাওয়া যেত। আর জাপানে থাকা অবস্থায় মারাটারা গেলে আমার পরিবার পেত বিশাল অঙ্কের টাকা। জাপান ফাউন্ডেশন আমার ইন্স্যুরেন্স দিয়েছিল ৩০ মিলিয়ন ইয়েনের। আর চমৎকার একটা স্যুভেনির বের করেছিল আমাকে নিয়ে।
চার দিন ছিলাম হিরোশিমায়। এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছি আর আমার শুধু মনে পড়ছে এই শহরের সেই ভয়ঙ্কর ট্র্যাজেডির কথা। এখনো সেই ভয়াবহ স্নৃতি নিয়ে বেঁচে আছেন কিছু মানুষ। আণবিক বোমার হাত থেকে বেঁচে যাওয়া সেসব মানুষকে বলা হয় ‘হিবাকুশা’। আণবিক বোমা হামলার সময় হিরোশিমা শহরের লোকসংখ্যা ছিল দুই লাখ ৫৫ হাজার। বোমাটির ওজন ছিল ৬০ কেজি। যে বিমানটি বোমা বহন করছিল তার নাম ‘এনোলা গে’। বোমাটির নাম ‘লিটল বয়’। বিমানের কমান্ডার কর্নেল পল টিবেটস। ১৯৪৫ সালের ৫ আগস্ট টিবেটস আনুষ্ঠানিকভাবে ৪৪-৮৬২৯২ নম্বরের বোমারু বিমানটির নামকরণ করেন ‘এনোলা গে’। ‘এনোলা গে’ ছিল তাঁর মায়ের নাম। টিবেটসের নানার একটি প্রিয় উপন্যাসের নায়িকার নাম ছিল ‘এনোলা গে’। উপন্যাসের নায়িকার নামে মেয়ের নাম রেখেছিলেন ভদ্রলোক। ভুপৃষ্ঠ থেকে দুই হাজার ফুট উঁচুতে ১৩ কিলোটন শক্তিতে বিস্কোরিত হয় ‘লিটল বয়’। হিরোশিমা শহরের কেন্দ্রস্থলে, যেখানে বিস্কোরিত হয় বোমা, সেই জায়গাটিকে বলা হয় ‘এ বোম্ব ডোম’। বোমা বিস্কোরণের পর ‘এনোলা গে’র কো-পাইলট রবার্ট লুই দেখতে পেলেন একটি বিশাল ছাতার মতো ভয়ঙ্কর ঘন মেঘে হিরোশিমা ঢাকা পড়ে গেছে। শহরটি ফুটছে, ঝলসে যাচ্ছে। এই দৃশ্য দেখে তিনি আপন মনে বলে উঠলেন, ‘হায় ঈশ্বর, আমরা এ কী করলাম!’
সাওরির সঙ্গে দেখা হলো ১৪ মার্চ ২০০৬। টোকিওর হানেদা এয়ারপোর্টে সে আমাকে রিসিভ করতে এসেছে। পুরো নাম সাওরি তাকাহাসি। বয়স ২৭ বছর। জাপান থেকে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য পড়তে এসেছিল। ফজিলাতুন্নেসা মুজিব হলে থাকত। পড়াশোনা শেষ না করেই জাপানে ফিরে গিয়েছিল। চমৎকার বাংলা বলে, চমৎকার রবীন্দ্রসংগীত গায়। সামান্য আনন্দেই শিশুর মতো হাততালি দেয়। আমার বাকি তিনটি বক্তৃতা হবে টোকিও, ওসাকা ও সেন্দাইতে। হাতে সময় ১০ দিন। এই ১০ দিন ২৪ ঘণ্টা সাওরি আমার সঙ্গে। এই তিন জায়গায় সে আমার গাইড। সাওরি এনএইচকেতে কাজ করে। দেখা হওয়ার মুহুর্তেই সাওরির সঙ্গে আমার ভাব হয়ে গেল। হানেদা থেকে ট্রেনে করে টোকিওর সেই আনা হোটেলে যাচ্ছি। ফাঁকা কামরায় আমি আর সাওরি; সাওরি আমাকে রবীন্দ্রসংগীত গেয়ে শোনাল−‘বড় আশা করে এসেছি গো কাছে ডেকে লও’।
প্রথমবার টোকিওতে এসে আমি অনেক কিছুই দেখেছিলাম। যেমন ‘টোকিও টাওয়ার’ ‘রূপপুঙ্গি হিলস’। সাওরি আমাকে দেখাল ‘মুরি আর্ট মিউজিয়াম’ ‘মেইজি জিইনগু’ (মন্দির)। ১৫ মার্চ বেলা তিনটায় জাপান ফাউন্ডেশন ভবনের নিজস্ব অডিটরিয়ামে বক্তৃতা। মিলনায়তন ভর্তি দর্শক-শ্রোতার মধ্যে তিন-চারজন মাত্র বাঙালি। মনজু ভাই, প্লাসিড, এমদাদ। কিন্তু সেদিন জাপানি রীতিনীতি ভেঙে বক্তৃতা শুরু করতে হলো পাঁচ মিনিট দেরিতে। কী কারণ? মাসাকি হিরানো হাসিমুখে বললেন, ‘তোমাদের রাষ্ট্রদুত সাহেব আসবেন। তিনি অনুরোধ করেছেন, পাঁচ মিনিটের মধ্যে এসে পৌঁছাবেন। তিনি এলে যেন বক্তৃতা শুরু হয়।’ আমি একটু বিরক্তই হলাম। এই সেই ভদ্রলোক, বৈশাখী মেলায় আমাকে পাত্তাই দেননি। ভদ্রতা করেও একটি কথা বলেননি। যা হোক, পাঁচ মিনিট পরে আমি মিলনায়তনে ঢুকলাম। সঙ্গে সঙ্গে আমার সম্মানে উঠে দাঁড়ালেন মিলনায়তন ভর্তি মানুষ। প্রথম সারিতে দাঁড়িয়ে আছেন আমাদের রাষ্ট্রদুত। তাঁর পাশে পরবর্তীকালে বাংলাদেশে যিনি জাপানি রাষ্ট্রদুত সেই ভদ্রলোক। আমি দুজনকেই অভিবাদন জানালাম। বলতে লজ্জা লাগছে, তবু বলি, পরবর্তীকালে বাংলাদেশে জাপানি রাষ্ট্রদুত ভদ্রলোক আমার বক্তব্য শুনে এতটা মুগ্ধ হলেন, আমার সঙ্গে হ্যান্ডশেক করার সময় উচ্ছ্বসিত গলায় বললেন, ‘আরে, তোমার তো… প্রাইজ পাওয়া উচিত।’ সাওরি আমার পাশে দাঁড়িয়ে হাততালি দিচ্ছিল।
সাওরি আমাকে টোকিওর এক সাকুরা বাগানে নিয়ে গিয়েছিল। তিন-চার ঘণ্টা সেই ফুলের বনে আমরা ঘুরে বেড়ালাম। একদিন জাপানের ঐতিহ্যবাহী কাভুকি নাটক দেখাল। সেই রাতে বসন্তের হাওয়া বইছিল পুব দিক থেকে। সাওরি বলল, এই হাওয়াকে জাপানি ভাষায় বলে ‘সুমপু’।
টোকিও থেকে ওসাকা গিয়েছিলাম ‘সিনকেনসেন’-এ। মানে বুলেট ট্রেনে। সেই পথে দেখা হলো ‘ফুজি মাউনটেন’। জাপানিরা শ্রদ্ধা করে বলে ‘ফুজি সান’। তারিখ ১৭ মার্চ ২০০৬। আমার শেষ বক্তৃতা ছিল ‘সেনদাই’তে। সেনদাই লিটারারি মিউজিয়ামে। সেখানে ঢুকেই দেখি নুরজাহানসহ আমার অনেক বই সাজিয়ে রাখা। আর দেয়ালে রবীন্দ্রনাথের বিশাল এক ছবি। আমাকে দেখে বেশ একটা সাড়া পড়ল দর্শক-শ্রোতাদের মধ্যে। একজনও বাঙালি নেই, সবাই জাপানি। আমার সঙ্গে ছবি তোলার জন্য ভালো রকম ব্যগ্র দেখলাম তাদের। সাওরি দুরে দাঁড়িয়ে শুধু মিটিমিটি হাসে। এই মেয়ে আমাকে ‘কিয়োটো’ নিয়ে গিয়েছিল। কিয়োটো জাপানের প্রাচীনতম এক শহর। মন্দিরের শহর। ওই শহরে দার্শনিকদের হাঁটার জন্য আলাদা একটা রাস্তা আছে, রুপার মন্দির আছে, সোনার মন্দির আছে। সাওরি আমাকে ঘুরে ঘুরে সব দেখাল। সেবার জাপানে সাওরির সঙ্গে ১০টি দিন আমার জীবনের শ্রেষ্ঠতম সময়।
তৃতীয়বার
২০০৮ সালের আগস্টে আবার গিয়েছি জাপানে। সেবার শুধু টোকিওতেই। জাপানে প্রচুর বিক্রমপুরের লোক। বিক্রমপুর সোসাইটি খুবই নামকরা সংগঠন। তাদের অভিষেক অনুষ্ঠানের পাশাপাশি আমাকে ‘রাইটার্স অ্যাওয়ার্ড’ দেওয়া হবে। সেই অ্যাওয়ার্ড নিতে গেছি। এমদাদ নামে আমার এক প্রিয়ভাজন অন্য একটি মেলার আয়োজন করেছে। সেই মেলায়ও আমি প্রধান অতিথি। প্রথমে এমদাদের অনুষ্ঠান। তার সঙ্গে থাকলাম চার দিন। তারপর বিক্রমপুর সোসাইটির অনুষ্ঠান। সোসাইটির সভাপতি নুর আলী আমাকে নিয়ে তুলল অন্য হোটেলে। ঢাকা থেকে কিছু নাচ-গানের শিল্পী, অভিনয়শিল্পীও এসেছেন এই অনুষ্ঠান উপলক্ষে। দেলোয়ার নামে আমার অতিপ্রিয় একটি ছেলে সারাক্ষণ আমার সঙ্গে। সেবারের ভ্রমণে দিনগুলো কেটেছিল বিক্রমপুরের ছেলেদের সঙ্গেই, খুব আনন্দে।
আপাতত শেষবার
আবার সেই পি আর প্লাসিড। ২০০৯ সালের বৈশাখী মেলা উপলক্ষে প্লাসিড প্রথমবারের মতোই আমার একক বইয়ের স্টল করল। দ্বিতীয়বারের মতো ‘বিবেকবার্তা পুরস্কার’ দিল আমাকে। আমার হাতে পুরস্কার তুলে দিলেন মিসেস ক্যাথরিন মারিনো। ‘ফরেন করেসপনডেন্টস ক্লাব অব জাপান’-এর প্রেসিডেন্ট তিনি। ইকেবুকোরো নিশিগুচি পার্কের যেখানটায় আমাদের শহীদ মিনার, তার প্রায় লাগোয়া একটি মিলনায়তনে এক মনোরম সন্ধ্যায় ক্যাথরিন আমার হাতে এই পুরস্কার তুলে দিলেন। তিনি আমেরিকান, স্বামী জাপানিজ। ভদ্রমহিলা যতটা জাঁদরেল, ভদ্রলোকটি ততটাই নম্র। স্ত্রীর প্রতিভায় খুবই মুগ্ধ ভদ্রলোক। দেশে ফিরে দেখি প্রতিটি ইংরেজি দৈনিকে ক্যাথরিন আমার হাতে পুরস্কার তুলে দিচ্ছেন এই ছবি ছাপা হয়েছে।
জাপানে এক বক্তৃতায় দেশটিকে বলেছিলাম ‘আমার দ্বিতীয় দেশ’। বলার কারণ হচ্ছে, বাংলাদেশের বাইরে এই একটি মাত্র দেশ, চারবার গিয়েছি সেই দেশে, চারবারই সাহিত্যের জন্য কোনো না কোনোভাবে সম্মানিত হয়েছি আমি। তাকেশি কাইকো স্নারক বক্তৃতার মতো বিশাল সম্মান জুটেছে। সুতরাং জাপানের কাছে আমার ঋণ অনেক।
এবার সাওরির সঙ্গে দেখা হয়নি। সাওরির বিয়ে হয়ে গেছে। স্বামীর সঙ্গে সে এখন ওসাকায়। ফোনে কথা হয়েছে। ফেরার সময় খুব মনে পড়ছিল তার কথা। কিয়োটোর সোনার মন্দিরে সে আমাকে নিয়ে গিয়েছিল। মন্দিরের সামনে দাঁড়িয়ে আমার মনে পড়েছিল রবীন্দ্রনাথের সেই বিখ্যাত গান−
আজি বাংলাদেশের হূদয় হতে কখন আপনি
তুমি এই অপরূপ রূপে বাহির হলে জননী!
ওগো মা, তোমায় দেখে দেখে আঁখি না ফিরে! তোমার দুয়ার আজি খুলে গেছে সোনার মন্দিরেু
http://www.munshigonj.com/MGarticles/Milon/2009/SakuraMilon.html
মাওয়ায় যানজটে যাত্রীর মর্মান্তিক মৃত্যু
মুন্সীগঞ্জ ফুটবল লীগে সমাবেশ জয়ী
‘ভালোটাই টিকে থাকবে’ আশাবাদী একজন মানুষ আব্দুল কাদের
বাংলা নাটকের স্বর্ণযুগ বলতে আসলে কোন সময়টাকে বোঝায় এখনই তা বলা কঠিন। তবুও একটা সময় ছিল যখন ঘরে ঘরে টেলিভিশন ছিল না, গ্রামেগঞ্জে বিদ্যুৎ ছিল না, তবুও মফস্বলের মানুষ ব্যাটারি জোগাড় করে, একটা সাদাকালো টেলিভিশনের সামনে মাদুর পেতে জটলা করে বসে দেখত বাংলা নাটক। মনে পড়ে সেই দিনগুলোর কথা যখন বাকের ভাই আর বদি ভাইকে ঘিরে চলতো তুমুল আড্ডা আর আলোচনা। আলোচিত সেই বদি ভাই বর্তমান, অতীত আর ভবিষ্যতের নাটক ও ব্যাক্তিগত জীবনের কথা বলেছেন জলছবির কাছে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আব্দুল্লাহ্ নূহ
নাটকে আপনার বর্তমান ব্যস্ততা দিয়েই শুরু করি…
আব্দুল কাদের : আসলে ব্যস্ততার ব্যাপারটা ব্যক্তির ওপর নির্ভর করে। কম-বেশি ব্যাপারটা আমি হিসাবে ধরি না। আমার তিরিশটা নাটক যদি এক মাসে যায় এবং সেগুলো একটাও মনে রাখার মতো না হয় তবে কোনো ভালো কিছু হলো বলে আমি মনে করি না। আবার মাসে যদি মাত্র একটা নাটক যায় এবং সেটি হিট হয় তবে আমি মনে করি ওই একটি কাজই আমি হিসাবের মধ্যে ধরি। সংখ্যা নয়, আমি মানে বিশ্বাস করি।
এখন নাটকের ব্যাপারটা আমার কাছে কেমন যেন এলোমেলো মনে হয়। অসংখ্য নাটক হচ্ছে। এর মধ্যে পজেটিভ নাটক যে হচ্ছে না, তা নয়। কিন্তু একশটার মধ্যে সেই সংখ্যা দশটা হয়। তবে সেই দশটা কখন হয় তা অনেকে জানে না। তবে আমি ভালো নাটক করার মানসিকতা রাখি, করছি এবং সামনে আরও করব।
আপনি বলছিলেন যে, নাটকে আসার সময়টা জানতে চায় সবাই। কিন্তু এই বিষয়টিই আমি যদি একটু ভিন্নভাবে জানতে চাই যে, নাটকে আসার গল্পটা যদি বলেন?
আব্দুল কাদের : স্কুলজীবনে নাটক করেছি। সেটা অনেকেই করে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই আমার আসলে নাটক করা শুরু। এবং আমরা নাটক আসলে পেশাগতভাবেই শুরু করেছিলাম। আমরা নাট্যচক্র করেছি। আমি মহসীন হলের নাট্যসম্পাদক ছিলাম। সব হল মিলে আমরা নাট্যচক্র করি এবং স্বাধীনতাউত্তর খুব ভালো নাটক করি। সেলিম আল দ্বীন, আল মনসুর তখন লিখতেন। তারপর থিয়েটারে জয়েন করি। আব্দুল্লাহ্ আল মামুন, রামেন্দু মজুমদার তাদের সঙ্গে কাজ শুরু করি। এবং আমি একেবারে ছোট চরিত্র ভূমিকা থেকে শুরু করেছি। সেখান থেকে কাজ শুরু করে ধীরে ধীরে নিজের উত্তরণ ঘটিয়েছি। পরিচালক আব্দুল্লাহ্ আল মামুনের চোখে পড়ি। তখন এমন হয়েছে যে, আমাকে হিসাবে রেখে নাটকের স্ক্রিপ্ট করা হতো। সেভাবে আমি মঞ্চে কাজ করতে করতে এসেছি। আমি শিখে এসেছি। আর নাটকের শিক্ষা তো মঞ্চেই হয়।
আমার নাটকে আসার গল্প বলতে এটাই যে, অন্তরের তীব্র আকাক্সক্ষা। নাটকের প্রতি আকর্ষণ, সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধ। নাটক তো শুধু বিনোদন নয়, নাটক সমাজের দর্পণ। নাটকের মাধ্যমে সমাজে মেসেজ পৌঁছে দেয়া হয়।
এখানে একটা কথা এসেছে যে, আপনাকে ধরে নাটকের স্ক্রিপ্ট লেখা হতো। এ ব্যাপারটা আসলে কেন? অর্থাৎ ঠিক কোন চরিত্রটায় আপনাকে বিবেচনা করা হতো?
আব্দুল কাদের : আমার মনে হয় একটা জিনিস নাট্যকাররা আমার মধ্যে খুঁজে পান। সেটা হলো যে, আমি নাটকে কখনো অভিনয় করি না। আমি চরিত্রটাকে চিত্রায়ণ করি। এই যেমন এখন আপনার সঙ্গে কথা বলছি, এটাও একটা চরিত্র। এখানে আমি যদি অভিনয় করি বাস্তবতা বাদ দিয়ে, সেটা মেকি হয়ে যাবে। এভাবে আমি সব সময় রাস্তায় চলতে চলতে সমাজের বিভিন্ন চরিত্র অবলোকন করি। বিভিন্ন জায়গায় যাচ্ছি, বিভিন্ন রকম মানুষের সঙ্গে মিশছি। সব চরিত্র লক্ষ্য করি এবং সময়মতো কাজে লাগিয়ে দিই।
এবারে একটু ব্যক্তিগত প্রসঙ্গে আসি। পরিবারের সদস্য কয়জন?
আব্দুল কাদের : আমার স্ত্রী খায়রুন কাদের। তিনি গৃহিণী, বিউটিশিয়ান ও অভিনেত্রী । আমার এক পুত্র, এক কন্যা। পুত্রের নাম শফিউল আজম, কন্যার নাম মেহেরুন নাহার। পুত্র-কন্যা দুজনেই নিজ নিজ পেশায় নিয়োজিত।
আপনার পরিবারের সদস্যরা আপনার নাটকগুলোর চরিত্র নিয়ে কি মন্তব্য করে?
আব্দুল কাদের : ওরা খুব মজা পায়। বসে বসে দেখে আর হাসে। কারণ আমার তো দুইটা ভূমিকা। একটা হচ্ছে অফিসে আমার একটা রোল। এখানে একজন এক্সিকিউটিভ আমি। গম্ভীর হয়ে থাকতে হয়। আর অভিনয়ে আরেকরকম। এটা আসলেই মজার ব্যাপার।
এখানে অফিসের অর্থাৎ আপনার চাকরিজীবনের প্রসঙ্গ এলো। সেটা নিয়ে একটু কথা বলি, বাটাতেও তো অনেক বড় দায়িত্ব পালন করছেন, এ সম্পর্কে যদি কিছু বলেন…
আব্দুল কাদের : বাটাতে আমি যোগ দিই ১৯৭৯ সালে। তারপর ধাপে ধাপে আমি ওপরে উঠি। রিটেইল জোন ম্যানেজার, রিটেইল ম্যানেজার এভাবে মার্কেটিং ম্যানেজার, তারপর এখন কনসালট্যান্ট বিজনেস ডেভেলপমেন্ট। এমনকি আমার অবসর হয়ে গেছে ৩০ মার্চ ২০০৯তে। তারপরও ওরা আমাকে অনেক সম্মান দিয়ে রেখেছে। আমি একদিনও অবসর নিতে পারিনি। যেদিন রিটায়ারমেন্ট হয়েছে তারপর দিন থেকেই আবার অফিস করছি।
বাংলাদেশে এই কোম্পানিটাকে যে অনেকটা আমিই গড়ে তুলেছি। বাটা বাজার, বাটা শপÑ এগুলো সব আমার লিডারশিপে করা। সব মিলিয়ে আমি আমার অফিসিয়াল কাজটিকে খুব এনজয় করি। এবং আমি চাই আমার কোম্পানি আরও ভালো করুক।
আগে কোনটা হয়েছিল? চাকরি না নাটক?
আব্দুল কাদের : আমি ১৯৭৩ সাল থেকে নাটক করি। ১৯৭৬ সালে বিটপিতে জয়েন করি। ১৯৭৯ তে বাটাতে আসি। কাজেই সবার আগে আমি নাটক শুরু করি। কিন্তু আমি দুটোই চালিয়ে গেছি এবং যাচ্ছি। এ ব্যাপারে অনেকেই অনেক সময় প্রশ্ন করে যে, আপনি সময় পান কখন?
এখানে আমি আসলে যেটা করি তা হলো, আমি অনেক পরিকল্পনা করে কাজ করি। যেটা আমার পরিকল্পনার ছকের মধ্যে পড়ে না সেটা আমি করি না। যেমন শুটিংয়ের কাজ করি শুক্র-শনিবারে। আর অন্য সময় যদি বিশেষ দরকার হয় তবে আমি ছুটি নিই কোম্পানি থেকে। কোম্পানি আমাকে সেই সহযোগিতা করে।
আবার পরিচালক ও অভিনেতা-অভিনেত্রীরা আমাকে খুব সহযোগিতা করে। তারা জানে যে, আমার সময় কম। তাই তারা আমার শটগুলো আগে নিয়ে সহযোগিতা করে।
আপনাকে তো বাটা ছাড়ছে না। বাটার জন্য তাহলে আপনারও নিশ্চয় বিশেষ পরিকল্পনা আছে?
আব্দুল কাদের : বাটার জন্য আমি যেটা করছি যে, ব্যবসার সমৃদ্ধিতে কাজ করা, আরও বাটা বাজার এবং বড় বড় বাটার দোকান করা, তারপর হাশ পাপিস। বাংলাদেশে বিশেষভাবে মার্কেটিং করছি আমরা। এমনিতে বাটার দোকানে বিক্রি করতামই আমরা, এখন হাশ পাপিসের আলাদা এক্সক্লুসিভ শোরুম করছি। গুলশানে একটা করেছি, বসুন্ধরা মলে একটা করেছি এবং ২০১১ সালের মধ্যে ২০টা হাশ পাপিস স্টোর করার পরিকল্পনা করেছি। আমরা বড় আকারের দোকান করব। বসুন্ধরা মলে যেমন করেছি ৭তলায় ১২ হাজার বর্গফুট জায়গা নিয়ে। যমুনা মলে চেষ্টা করছি। এভাবে বড় আকারের দোকান করার চেষ্টা করছি। যাতে ভালো ইমেজটা ধরে রাখা যায়। ব্র্যান্ড নিয়ে কাজ করছি। এগুলো প্রফেশনাল মার্কেটিং এপ্রোচ।
হাশ পাপিস তো ইন্টারন্যাশনাল ব্র্যান্ড?
আব্দুল কাদের : হ্যাঁ, এটা আমেরিকান কোম্পানি। বিশ্বের প্রায় ১০০টি দেশে তারা মার্কেটিং করে। বাংলাদেশে আমরা লাইসেন্সপ্রাপ্ত।
আবার একটু নাটকে আসি। নাটক নিয়ে আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
আব্দুল কাদের : ভালো নাটক করার মানসিকতা তো আছেই। তবে আমার একটা পরিকল্পনা আছে। এমন একটা সিরিয়াল করতে চাই যেটা মানুষকে খুব আনন্দ দেবে। কারণ আনন্দ দেয়াটা খুব কঠিন কাজ। আমি অনেক নাটকেই দেখেছি আনন্দ দেয়ার চেষ্টা করা হয় কিন্তু হয় না। কারণ এটা একটা বিশেষায়িত ব্যাপার, যা সবাই পারে না। সে জায়গাটায় আমার যে অভিজ্ঞতা ও পরিচিতি আছে তার মাধ্যমে আমি জানি যে, আমার নিজস্ব উদ্যোগে নিজের প্রোডাকশনে আমাকেই করতে হবে। এ রকম একটা পরিকল্পনা আমার আছে।
এ যাবৎ আপনার অভিনীত চরিত্রগুলোর মধ্যে আপনার কাছে কোন চরিত্রটা সেরা বলে মনে হয়?
আব্দুল কাদের : আমি চোখ বন্ধ করে বলতে পারি, টেলিভিশনে ‘কোথাও কেউ নেই’-এর বদি ভাই। এ ছাড়াও আমি অনেক ভালো নাটক করেছি। যেমন, আব্দুল্লাহ আল মামুনের অনেক নাটক, হুমায়ূন আহমেদের, ফেরদৌস হাসান, ডিএ তায়েব, ইমদাদুল হক মিলন ও আরও অনেক নাট্যকারের নাটক করেছি। কিন্তু ওই নাটকটা মানুষের মনে দাগ কেটে গেছে আরকি।
মঞ্চেও আমি অনেক নাটকই করেছি কিন্তু মেরাজ ফকিরের মা নাটকটা আমার কাছে মনে হয়েছে বেশি ইম্প্যাক্ট ফেলেছে। চলচ্চিত্র আমি বেশি করিনি। কিন্তু রং নাম্বার নামে একটা সিনেমায় অভিনয় করেছি। সেখানে আমার চরিত্রটা ছিল ‘বড় ভাই’-এর। কিছু বড় ভাই থাকে না যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকে। কখনো বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে যায় না। সবার সহযোগিতায় এগিয়ে যায় এবং সহযোগিতা করতে গিয়ে নানারকম মজার ঝামেলা সৃষ্টি করে ফেলে। সেটা ছিল একটা মজার চরিত্র। এ রকম অনেক ভালো কাজ করেছি।
এমন কিছু মুখ থাকে যা দেখলেই মনের মধ্যে এক ধরনের প্রশান্তি চলে আসে, এমন কিছু মুখ থাকে যেগুলো এমনিতেই যেন মনের মধ্যে খুশি ছড়িয়ে দেয়, আনন্দ লাগে। দর্শক আপনার মধ্যে সে রকম একটি মুখ দেখে। আপনি সেই জায়গাটিতে কাজও করছেন। আপনার কি মনে হয় এ রকম মুখ আমাদের মিডিয়াতে যথেষ্ট আছে?
আব্দুল কাদের : এটা একটা দারুণ ব্যাপার। আমাদের মাঝে কিছু কিছু এ রকম আছেন। তবে আমাদের অভিনয়ের মধ্যে একটা নিয়ন্ত্রণ রাখতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে যে, হাসির নাটক মানেই জোর করে হাসানোর চেষ্টা নয়। খুব একটা রঙিন পোশাক পরে ফেললাম, কিছুটা চিৎকার করে অভিনয় করলাম, একটু লাফালাফি করলাম এতে লোক হাসে না। একটু নিয়ন্ত্রিত অভিনয় করতে হবে।
আমি জানি এ রকম ভালো প্রতিভা আমাদের মধ্যে আছে এবং আমি তাদের দিয়ে কাজ করাতে পারব। আমার প্রতি তাদের শ্রদ্ধাও আছে যথেষ্ট।
আপনি বর্তমান নাটকে অস্থির সময়ের কথা বলছিলেন, আপনাদের সময়ের সঙ্গে এখনকার সময়ের পার্থক্যটা কী?
আব্দুল কাদের : এখন প্রচুর নাটক হচ্ছে। এর মধ্যে ভালো নাটকও কিন্তু হচ্ছে। যেহেতু অনেক নাটক হচ্ছে সেহেতু যেগুলো খুব ভালো সেগুলো অনেকেই মিস করছে। এখানে আমাদের টিভি চ্যানেলগুলোও বিজ্ঞাপন প্রচার করছে বেশি। করতে হচ্ছে। আমাকে যদি এর সমাধানের কথা বলেন তবে বলব যে, এত নাটক হওয়া উচিত না। নাটক করা উচিত স্ক্রিপ্ট দেখে বাছাই করে। একজন অভিনেতা-অভিনেত্রী কত অভিনয় করবে? সকালে একটা চরিত্রে অভিনয় করছে, রাতে আরেকটা চরিত্রে অভিনয় করছে। একদিনে দুটা চরিত্রে অভিনয় করা সম্ভব না। ক্লান্তির একটা ব্যাপার আছে। এর পরের ব্যাপারটি হলো, ভালো স্ক্রিপ্ট। এমনকি অতীতের হিট করা ভালো নাট্যকারেরা এখন সিনে নাই। তাদেরকে ব্যবহার করতে হবে। আগে দেখতাম প্রোডিউসাররা গিয়ে একটা ভালো নাট্যকারের কাছে বসত ভালো স্ক্রিপ্টের জন্য। তাদের অনুরোধে নাট্যকাররা লিখতেন সুন্দর করে। কিন্তু এখন যেন কিছুটা এলোমেলো। এখন যেহেতু সংখ্যা বেড়েছে, সেহেতু মান একটু মার খাচ্ছে। সমাধানটা একপর্যায়ে এমনিতেই বের হয়ে আসবে। ভালোটাই টিকে থাকবে।
ইয়াজ উদ্দিনকে মামলায় জড়ানোর কোনো পথ পাচ্ছে না বিএনপি
পদ্মা বহুমুখী সেতুর সঙ্গে রেলের গুরুত্ব
এস.এম গোলাম মুস্তফা
দেশ ও জাতির আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন সুষ্ঠু ও সমন্বিত সকল ধরনের যোগাযোগ ব্যবস্থা, কিন্তু পদ্মা নদী বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে রাজধানীসহ মূল ভূখণ্ড হতে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। ফলে এ অঞ্চলে প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ আধুনিক যোগাযোগের আশানুরূপ উন্নয়নের ছোঁয়া পায়নি, যেমন রেললাইনসহ উন্নত সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা। অথচ, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে রয়েছে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সামুদ্রিক বন্দর (মংলা) এবং সর্ববৃহৎ বেনাপোল স্থল বন্দর। তাই এই অঞ্চলের সাথে রাজধানীসহ অন্যান্য অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নের জন্য ঢাকা-মাওয়া-খুলনা এবং বরিশাল মহাসড়কের উন্নয়ন যদি ব্যাপকভাবে করা হয় এবং পদ্মা নদীর উপর রেললাইনসহ বহুমুখী সেতু নির্মিত হলে রাজধানী ঢাকাসহ মূল
মুন্সীগঞ্জে সালিশি বৈঠকে হামলা : নিহত ১
সংগ্রামী জীবনশিল্পী মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
এ ম এ আ জি জ মি য়া
বাংলা সাহিত্যে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯০৮-১৯৫৬) এক বিস্ময়কর প্রতিভা, অনন্য কথাশিল্পী। শোষিত, বঞ্চিত ও নিপীড়িত মানুষের জীবনযাত্রা ও লড়াই-সংগ্রাম তিনি সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন এবং নিপুণ শিল্পীর ন্যায় কলমের অাঁচড়ে তা জীবন্ত করে তুলেছেন। সেখানে তাঁর মানবপ্রেম, সামাজিক অঙ্গীকারবোধ এবং শ্রেণী দৃষ্টি ভঙ্গি সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। লেখক জীবনের শুরুতে তার মধ্যে ফ্রয়েডীয় রেখাপাত দেখা গেলেও অচিরেই তিনি তা কাটিয়ে ওঠেন। নিছক শিল্পের জন্য শিল্প নয়, তিনি বিশ্বাসী ছিলেন মানুষের জন্য শিল্প বা জীবনের জন্য শিল্প অভিধায়। এক্ষেত্রে মানুষ বলতে তিনি মেহনতী গণমানুষকে বুঝিয়েছেন। তার এ মানসগঠনে ছাত্রজীবনে বিজ্ঞান অধ্যয়ন এবং পরে দেশী-বিদেশেী সাহিত্য ও দর্শন পাঠ বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল। এজন্য কল্লোল যুগের (১৯২৩-১৯৩০) হয়েও তিনি কল্লোলীয় তরঙ্গে আন্দোলিত হননি, স্পন্দিত হননি পূর্ব-দিগন্তের প্রখর রবিরশ্মি দ্বারা। প্রথমদিকে তিনি প্রগতি লেখক সংঘের আন্দোলনে সম্পৃক্ত না হলেও চলি্লশের দশকে প্রগতি লেখক ও শিল্পী সংঘের কর্মকান্ডে ব্যাপকভাবে জড়িয়ে পড়েন। তিনি যোগ দেন কম্যুনিস্ট পার্টিতে। তখন লেখালেখির পাশাপাশি পার্টির সমাজবদলের কর্মকান্ডই তার জীবনের প্রধান অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে। আর এজন্য তাকে বরণ করে নিতে হয়েছিল চরম দারিদ্র্যক্লিষ্ট জীবন। গণমানুষের জীবনের শরিক হয়ে একজন কলমপেশা শ্রমিকের ন্যায় তিনি সারাটি জীবন অর্থকষ্টে কাটিয়েছেন; তবুও কোনো মোহ বা প্রলোভনের পঙ্কিল পথে পা বাড়াননি। ব্যতিক্রম মানিক জীবনের বৈশিষ্ট্য এখানেই। আর এজন্যই বাংলা সাহিত্যে মানিক, মানিক রতন হয়ে রয়েছেন। শত বছরের মানিক মারাও গেছেন অর্ধশত বছরের বেশি হয়ে গেল। কিন্তু আজও তার দীপ্তি ছড়িয়ে পড়ছে অবিশ্রান্ত ধারায়। তিনি জন্মেছিলেন ১৯০৮ সালের ১৯ মে সাঁওতাল পরগনার দুমকা শহরে এবং মারা যান ১৯৫৬ সালের ৩ ডিসেম্বর কলকাতায়। তার সাড়ে ৪৮ বছরের স্বল্পায়ু জীবনে তিনি সাহিত্যচর্চা করেছেন ৩২ বছর। তার মধ্যে কিশোর বয়সে ৪ বছর নীরব কাব্যচর্চা (১৯২৪-১৯২৮), কলেজ জীবনে ৪ বছর শৌখিন সাহিত্যচর্চা (১৯২৮-১৯৩২) এবং অবশিষ্ট ২৪ বছর তিনি নিরবচ্ছিন্ন সাহিত্যচর্চা (১৯৩২-১৯৫৬) করেছেন। এ সময়কালে তিনি বাংলা সাহিত্যে যে অবদান রেখে গেছেন গুণ, মান ও সংখ্যায় তা অভাবনীয় ও বিস্ময়কর। তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ৮৩। তার মধ্যে উপন্যাস-৪০ (অসম্পূর্ণ-৩), গল্পগ্রন্থ-২২, প্রবন্ধ সংকলন-৩, নাটক-১, কাব্যগ্রন্থ-১ এবং অন্যান্য-১৬।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পৈতৃক বাড়ি ছিল বিক্রমপুর (মুন্সিগঞ্জ)-এর মালপদিয়া গ্রামে। তার পূর্বপুরুষরা ছিলেন সিমুলিয়া গ্রামের অধিবাসী। তার পিতার নাম হরিহর বন্দ্যোপাধ্যায় ও মা নীরদাদেবী। তার মাও ছিলেন বিক্রমপুরের গাওদিয়া গ্রামের মেয়ে। তাই মানিকের শেকড় গ্রথিত ছিল প্রাচীন বাংলার ইতিহাসখ্যাত শত ঐতিহ্যমণ্ডিত বিক্রমপুরে এবং এখানকার মাটি থেকেই তার জীবনরস সিঞ্চিত হয়েছে; আত্মপ্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে তা ফুলে ফলে সুশোভিত হয়েছে। অাঁতুর ঘরে কালো গায়ের রং-এর মধ্যেও তার ঔজ্জ্বল্য প্রকাশ পেয়েছিল। তাই তার নামকরণ হয়েছিল ‘কালো মানিক’। কিন্তু পিতৃপ্রদত্ত নাম ছিল প্রবোধ কুমার। ডাক নাম মানিক হলেও লেখক নাম মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। বিশ বছর বয়সে কলেজে পড়াকালে বন্ধুদের সঙ্গে বাজি ধরে লিখে ফেলেন ‘অতসী মামী’ গল্পটি। তা ১৩৩৫ সালের পৌষ সংখ্যা ‘বিচিত্রা’য় প্রকাশিত হলে সকলে চমকে ওঠেন। লেখালেখির জগতে মানিকের এই যে অগ্রযাত্রা প্রাণস্পন্দন থেমে না যাওয়া পর্যন্ত তা অব্যাহত ছিল। যেসব পত্রপত্রিকায় তার লেখা প্রকাশিত হয়েছে তার মধ্যে বিচিত্রা, বঙ্গশ্রী, পূর্বাশা, ভারতবর্ষ, পরিচয়, যুগান্তর, প্রভাতী, আনন্দবাজার, স্বাধীনতা, বসুমতী, ছোটদের রংমশাল, অভিদারা, অনন্যা, এলোমেলো, এখন, আগামী প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। তার প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ (উপন্যাস) ‘জননী’ এবং গল্পগ্রন্থ ‘অতসী মামী ও অন্যান্য গল্প’। তার অসম্পূর্ণ উপন্যাস ‘মাটি ঘেঁষা মানুষ’ সম্পূর্ণ করেন সুধীর রঞ্জন মুখোপাধ্যায়। কিশোর উপন্যাস ‘মশাল’ কে সম্পূর্ণ করেছেন তা জানা যায়নি। তবে কিশোর উপন্যাস ‘মাটির কাছে কিশোর কবি’ সম্পূর্ণ করেছেন খগেন্দ্রনাথ মিত্র। তার লেখা দুটি উপন্যাসের ভূমিকা অসম্পূর্ণ ছিল, সম্পূর্ণ নয় অগ্রন্থিত রচনার তালিকা। কিছু লেখা হয়তো এখনও অনাবিষ্কৃত রয়ে গেছে।
চাকুরিজীবী পিতার কর্মস্থান পরিবর্তিত হওয়ায় তিনিও বিভিন্ন স্থানে লেখাপড়া করেছেন। ফলে লেখাপড়ায় অনেকটা বিঘ্ন ঘটলেও নানান অঞ্চলের মানুষের সাথে মেলামেশা করে যে বাস্তবজ্ঞান অর্জন করেছিলেন সে সব অভিজ্ঞতা তার পরবর্তীকালের লেখক জীবনে সহায়ক হয়েছিল। ছোটবেলা থেকে তিনি মেধাবী ছিলেন এবং পরীক্ষায় ভাল ফল করেছেন। ১৯২৪ সালে মা মারা গেলে তিনি অনেকটা শোকাচ্ছন্ন হয়ে পড়েন এবং সম্ভবত এ সময়ে নীরবে কাব্যচর্চা শুরু করেন। ১৯২৬ সালে মেদেনীপুর স্কুল থেকে তিনি প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করেন। নৈর্বাচনিক ও আবশ্যিক গণিতে লাভ করেন লেটার মার্ক। ১৯২৮ সালে বাঁকুরা ওয়েস লিয়ন মিশন কলেজ থেকে তিনি আইএসসি পাস করেন প্রথম বিভাগে। তিনি ভর্তি হলেন প্রেসিডেন্সি কলেজে গণিত বিষয়ে বিএসসি সম্মান শ্রেণীতে। কিন্তু এ সময়ে তিনি ধরাবাঁধা লেখাপড়ায় আগ্রহ হারিয়ে দেশ-বিদেশের সাহিত্য পাঠে মনোনিবেশ করেন। ফলে পরপর দু’বছর বিএসসি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হন। এ জন্য নিকট ছাত্ররাও তার প্রতি বিরাগভাজন হয়ে পড়েছিলেন। ইতোমধ্যে তার লেখালেখিও শুরু হয়ে গিয়েছিল পুরোদমে। জীবনধারণের জন্য চাকুরি করেন নবারুন (১৯৩৪) ও বঙ্গশ্রী (১৯৩৭-১৯৩৯) পত্রিকায় সহকারী সম্পাদক হিসেবে। কিন্তু মৃগী রোগাক্রান্ত মানিককে ডা. বিধানচন্দ্র রায় বিয়ে করার পরামর্শ দিলেন। ১৯৩৮ সালের ১১ মে বিক্রমপুরের পঞ্চসার গ্রামের সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কন্যা কমলা দেবীর সঙ্গে তার বিয়ে হয়। শরীরও অনেকটা সুস্থ হয়ে এলো। ইতোমধ্যে তার লেখক খ্যাতি দেশময় ছড়িয়ে পড়েছে। পেশা হিসেবে লেখালেখিকেই বেছে নিয়েছেন। আর্থিক অসচ্ছলতা ঘোচাতে ১৯৩৯ সালে তিনি একবার প্রেসব্যবসা শুরু করেছিলেন। উদ্দেশ্য সেখান থেকেই বই ও একটি পত্রিকা প্রকাশ করবেন। কিন্তু এক বছর না যেতেই প্রেস ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায়। লেখালেখির অর্থে সংসার চলে না। অবসরপ্রাপ্ত বৃদ্ধ পিতাও স্বেচ্ছায় আশ্রয় নিয়েছেন। পিতার সেবাযত্নেও এতটুকু অবহেলা তিনি করেননি। ১৯৪৩ সালে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের সময় কিছুকাল তিনি ওয়ার ফ্রন্টের প্রভিন্সিয়াল অর্গানাইজার এবং বেঙ্গল দফতরে পাবলিসিটি এসিস্যান্ট হিসেবে চাকরি করেছেন। আকাশ বাণী কলকাতা কেন্দ্রে যুদ্ধ বিষয়ক প্রচার ও নানাবিধ বেতার অনুষ্ঠানে যোগদান করেছেন। কিন্তু সে সময় ফরমায়েসি কাজে তার পোষায়নি। তিনি স্বেচ্ছায় কেটে পড়েছেন। লেখালেখি করে অধিক অর্থ উপার্জনের চেষ্টা করেছেন। তার লেখায় যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ, দুর্ভিক্ষ, কালোবাজারী, মুনাফালোভীর চিত্র ফুটে ওঠে। তাছাড়া ফ্যাসিবাদ, উগ্র জাতীয়তাবাদ ও সামপ্রদায়িকতার বিষবাষ্পে ভূলুণ্ঠিত মানবতা বিশেষ করে কৃষক-শ্রমিক মেহনতী মানুষের জীবন সংগ্রাম মূর্তমান হয়ে ওঠে। তার সাহিত্যখ্যাতিও দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে।
১৯৪২ সালের ৮ মার্চ ঢাকাতে ফ্যাসিবিরোধী সমাবেশে যোগদানের জন্য তরুণ লেখক ও কম্যুনিস্টকর্মী সৌমেন চন্দ (১৯২০-১৯৪৮) মিছিল নিয়ে আসার পথে ফরোয়ার্ড ব্লকের গু াদের হাতে রাজপথে নৃশংসভাবে নিহত হয়। সে প্রেক্ষাপটে কলকাতায় গঠিত হয়েছিল ফ্যাসিবিরোধী লেখক ও শিল্পীগোষ্ঠী। প্রথম দিকে প্রগতি লেখক সংঘের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা না থাকলেও পরবর্তীকালে এ সব সংগঠনের সঙ্গে নিজকে সম্পৃক্ত করে নেন। বুখারিনের বস্তুবাদ ও লিয়েনতিয়েনের মার্কসীয় অর্থনীতি পাঠ করে মার্কসীয় দর্শনের প্রতি তিনি আস্থাশীল হয়ে ওঠেন। ১৯৪৪ সালে তিনি কম্যুনিস্ট পার্টিতে যোগদান করেন। মার্কসীয় দর্শনের বইপত্র পড়ে তিনি সম্পূর্ণ বদলে যান। ‘সাহিত্য করার আগে’ শীর্ষক লেখায় তিনি বলেছেন, মার্কসবাদ যতটুকু বুঝেছি তাতেই আমার কাছে ধরা পড়ে গিয়েছে যে, আমার সৃষ্টিতে কত মিথ্যা বিভ্রান্তি আর আবর্জনা আমি আমদানী করেছি জীবন ও সাহিত্যকে একান্ত নিষ্ঠার সঙ্গে ভালবেসে ও জীবন ও সাহিত্যকে এগিয়ে নেয়ার উদ্দেশ্য থাকা সত্ত্বেও। ১৯৪৪ সালের ১৪-১৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত ফ্যাসিবিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘের দ্বিতীয় বার্ষিক সম্মেলনে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তার সভাপতিম লীর অন্যতম সদস্য নির্বাচিত হন। সে বছর ২৫-২৭ আগস্ট অনুষ্ঠিত পূর্ববঙ্গ প্রগতি লেখক ও শিল্পী সম্মেলনে তিনি যোগদান করেন। ১৯৪৫ সালের ৩-৮ মার্চ ভারতীয় প্রগতি লেখক সংঘের অন্যতম যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৪৬ সালে ভয়াবহ দাঙ্গা প্রতিরোধে তিনি অসুস্থ শরীর নিয়ে এগিয়ে যান এবং বহু সভা সমাবেশে যোগদান করেন। ১৯৪৯ সালের ২২ এপ্রিল প্রগতি লেখক সংঘের চতুর্থ বার্ষিক সম্মেলনে পুলিশী হানার মধ্যেও তিনি ডেলিগেট অধিবেশনে যোগদান করেন। ২২ নভেম্বর ট্রাম বাড়িতে অনুষ্ঠিত প্রগতি লেখক সংঘের শান্তি সম্মেলনে তিনি সভাপতিত্ব করেন। সভাপতিত্ব করেছিলেন ১৯৫৩ সালে অনুষ্ঠিত প্রগতি লেখক সংঘের পঞ্চম বার্ষিকী সম্মেলনে। লেখার চাপ ছাড়াও পার্টি এবং অন্যান্য সাগংঠনিক কাজে বেশি বেশি পরিশ্রম করার ফলে তার শরীর ভাঙতে শুরু করে। পার্টির পক্ষ থেকে তাকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি করে দেয়া হয়। কিন্তু হাসপাতালে তিনি কখনও স্বস্তিবোধ করেননি। নিজ দায়িত্বেই তিনি বাসায় ফিরে এসেছেন। তারপর ১৯৫৬ সালের ৩০ নভেম্বর তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়েন। অসহায় পারিবারিক পরিবেশে দুই দিন থাকার পর ২ ডিসেম্বর রাত ১০টায় নীলরতন সরকার হাসপাতালে তাকে ভর্তি করা হয়। না সেখানে আর তাকে বেশি সময় কাটাতে হয়নি। ৩ ডিসেম্বর ভোর চারটায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। সময় পেলেন না কাকা বাবুর (কমরেড মুজাফফর আহমদ) জীবনী লেখার।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে সাহিত্য চর্চার বয়স হল ৩০ বছর। এ সম্পর্কে তিনি বলেছেন, ‘তিরশ বছর বয়সের আগে কারো লেখা উচিত নয়। আমি সেই বয়সে লিখবো। এর মধ্যে তৈরি হয়ে নিতে হবে সব দিক দিয়ে। কেবল অভিজ্ঞতা সঞ্চয় নয়। নিশ্চিত মনে যাতে সাহিত্যচর্চা করতে পারি তার বাস্তব ব্যবস্থাগুলো ঠিক করে ফেলবো।’ কিন্তু সে সুযোগ তিনি পাননি। অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে ত্রিশ বছরের বহু পূর্বেই তিনি লেখালেখিকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। কিশোর বয়সে কবিতা ও গল্প লিখেছেন। কিন্তু ঔপন্যাসিক হওয়ার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছেন তার ‘উপন্যাসের ধারা’_ লেখায় ‘… সাধ করলে কবি হয়তো আমি হতে পারি; কিন্তু ঔপন্যাসিক হওয়াটাই আমার পক্ষে হবে উচিত ও স্বাভাবিক।’ তার স্বপ্ন সত্যে পরিণত হয়েছে ঔপন্যাসিক হিসেবে তিনি সুখ্যাতি অর্জন করেছেন। বিজ্ঞানের ছাত্র মানিকের বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি উপন্যাস রচনায় সহায়ক ভূমিকা সম্পর্কে তিনি বলেছেন, উপন্যাস লেখার জন্য দরকার খানিকটা বৈজ্ঞানিক বিচারবোধ, বিজ্ঞানচর্চা না করলেও সম্পূর্ণভাবে নিজের অজ্ঞাতসারে হলেও ঔপন্যাসিক খানিকটা বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করবেন, তাতে বিস্ময়ের কিছু নেই।
মানবতাবাদী মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সামপ্রদায়িকতা, ফ্যাসিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধকে অন্তর থেকে ঘৃণা করেছেন। অসুস্থ শরীরে জীবনের ঝুঁকি নিয়েও তিনি সামপ্রদায়িক দাঙ্গার বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। তিনি ডায়েরিতে লিখেছেন, ‘দাঙ্গার কথা শুনে মনটা খারাপ হয়ে গেল। … বিকালে এ অঞ্চলে শান্তিসভা হবে শুনলাম। খুশি হয়ে নিজে রাজি হলাম যতটা পারি সাহায্য করতে। যাকে দেখছি তাকে বলছি মিটমাটের জন্য সভায় যেতে। মসজিদের কাছে আনোয়ারশা রোডের একদল মুসলিম স্বীকার করলেন মিটমাট দরকার_ কয়েকজন উত্তেজিতভাবে বললেন মেরে পুড়িয়ে এখন মিটমাটের কথা কেন? অন্যরা তাদের থামালেন। ফাঁড়ি পেরিয়ে পুলের নিচে যেতে এল বিরোধিতা_ হিন্দুদের কাছ থেকে। কিসের মিটমাট মুসলমানরা এই করেছে ঐ করেছে। ব্যাটা কম্যুনিস্ট বলে আমায় মারে আর কি। প্রায় দেড়শ লোক মিলে ধরেছিল।’ ভারত ভাগের পর ১৯৫০ সালেও কলকাতায় সামপ্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছে। এ ব্যাপারে তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল খুবই স্পষ্ট। তিনি ডায়েরিতে লিখেছেন, সামপ্রদায়িকতার উপরটাই লোকে দেখছে। পিছনে কি গভীর ও ব্যাপক ষড়যন্ত্র, চোখে পড়ে না। যে উদ্দেশ্যে ভারত বিভাগ, সেই উদ্দেশ্যেই ভারত পাকিস্তানের বিবাদ বাড়িয়ে চলা বৃটিশ আমেরিকান সামপ্রাজ্যবাদ দুই রাষ্ট্রের ঘাড়ে চেপে থাকতে পারে। সামপ্রদায়িকতার ভিত্তিতে দেশ ভাগ ছিল তার অসহ্য। তার লেখায় তা সুস্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে : ‘কানাই বলে মাঠে একটা ফ্লাগ উড়াই? আমি বলি ব্লাক ফ্লাগ উড়াও। কানাইয়ের ভাই বলাই বলে ঠিক। উদ্বাস্তুরা কি স্বাধীনতা পেয়েছে? সাত আট বছরের ছেলে। ফ্লাগ কিছু কিছু উড়েছে_ কিন্তু চার দিক ঝিমানো।’
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাদাসিধে জীবনযাপন সম্পর্কে অনেকেই লিখেছেন। রথীন্দ্রকান্ত ঘটক চৌধুরী তার ‘একটি গল্পের জন্মকথা’য় লিখেছেন, ‘ছোট একটা পুরাতন একতলা দালান। সামনের দিকে অল্প পরিসর একটা কোঠা মানিক বাবুর লেখার ঘর। মাদুর বিছানো সাধারণ একটা তক্তপোষ ঘরের এক পাশে। মান্দাতার আমলের হতশ্রী লেখার টেবিল একটা_ তার একটিমাত্র বসার চেয়ারের অবস্থাও একই রকমের। গোটা তিনেক বইয়ের আলমারী পিছনটাতে। বইয়ের সংখ্যা সামান্য। বাঁধাই ‘প্রবাসী’, ‘ভারতবর্ষে’র সংখ্যাই বেশি।
বাজার থেকে ফিরে এলেন মানিক বাবু অল্প কিছুক্ষণ বাদে। গায়ে আধময়লা গেঞ্জি, পরনে লুঙ্গি। এক হাতে আট-নয় বছরের মেয়ের হাত ধরেছেন আর এক হাতে বাজারের চটের থলে। লম্বা প্রায় ছয় ফুট, বলিষ্ঠ কালো কুঁদানো শরীর, চাষাভূষাদের মতন। খোঁচা খোঁচা দাড়ি-গোঁফে মুখম ল আবৃত্ত তবে কুশ্রীতা নেই কোথাও প্রাণোচ্ছল সাজিবতায় ভরপুর। কালো ফ্রেমের চশমা ভেদকরা এক জোড়া নিবিষ্ট চোখ। অনাবৃত বাহুযুগলের পেশিতে যৌবনোচিত দৃঢ়তা। বেশভূষা, চেহারা সবটাই মিলিয়ে আবার নতুন করে যেন দেখলাম মানিক বাবুকে। খারাপ লাগেনি তবুও বাজারের থলেটাকে বাংলাদেশের প্রথম সারির একজন কথাশিল্পীর হাতে কেমন যেন বেমানান মনে হয়েছিল। … তার অনাড়ম্বর জীবনযাত্রার পরিচয় পেয়ে প্রকৃতই অন্তরঙ্গতা অনুভব করেছিলাম সেদিন।’
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সারা জীবন অর্থকষ্টে ভুগেছেন। অনেক সময় অসুখ হলে নিজের বা পরিবারের সদস্যদের সুচিকিৎসারও ব্যবস্থা করতে পারেননি। কোনো কোনো সময় পার্টি, কবি-সাহিত্যিক বন্ধু বা শুভানুধ্যায়ীরা সহায়তার হাত প্রসারিত করেছেন। তারপরও এককালীন কিছু টাকা পেলে পুরোটাই পার্টি ফান্ডে জমা করে দিতেন। পৈতৃক বাড়ি বিক্রির টাকা তিনি পারিবারিক সদস্যদের অজ্ঞাতেই পার্টিকে দিয়েছিলেন। পার্টির প্রতি তিনি এতটাই অনুরক্ত ছিলেন। অন্যদিকে যে কোনভাবে টাকাপয়সা আয় করা তার রুচিবোধের বাইরে ছিল। রথীন্দ্রকান্ত ঘটক চৌধুরীর সঙ্গে আলাপকালে তার এ দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ পেয়েছে : ‘এখন সংসার চালাতে হয় শুধু এই দিয়েই। আর তো পেশা নেই কোন। তাছাড়া সব কাগজে লিখিনে এখন আর, কারণ তাতে লেখক সম্বন্ধে পাঠকের ধারণা নিচু হয়ে যায়_ সম্ভাবনা থাকে ভুল বুঝবার। তা যদি লিখতাম তা হলে অনেক টাকা রোজগার করতে পারতাম। অভাব থাকতো না কোন, দেখলেন তো কত সাহিত্যিক বাড়ি করলেন, গাড়ি করলেন_ আমি গরিবই রয়ে গেলাম সারা জীবন। অনেক সময় তিনি পয়সার অভাবে ওষুধ কিনে খেতে পারেননি। এমনকি একটি অসহায় অবস্থা নিজ ডায়েরিতে উলি্লখিত হয়েছে। ক’দিন থেকে শরীর খুব খারাপ, … কি যে দুর্বল বলা যায় না, বিছানা থেকে উঠবারও শক্তি নেই_ এদিকে ঘরে পয়সা নেই। জোর করে তো বেরোলাম ফিরবো কিনা না জেনে।’ তারপর সর্বশেষ যখন আর্থিক অসহায়ত্বের কারণে দুই দিন নিজ বাড়িতে অজ্ঞান হয়ে থাকবার পর হাসপাতালে ভর্তির সংবাদ পেয়ে কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় তাকে দেখতে গিয়েছিলেন। এমন অবস্থায় টেলিফোন না করার কারণ জিজ্ঞাসা করায় মানিক পত্নী অস্ফুট স্বরে হেসেই উত্তর দিয়েছিলেন, ‘তাতে যে পাঁচআনা পয়সা লাগে ভাই।’
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন শ্রেণী-সংগ্রামে বিশ্বাসী লেখক। তার অনেক লেখায় তা পরিলক্ষিত হয়। শ্রেণী-সংগ্রামের বিজয়ে প্রত্যয়ী মানিক বন্দোপাধ্যায় তার ‘নেতা’ গল্পে লিখেছেন, ‘… আমরা কোন দাবি ছাড়বো না। আমরা কি শুধু রুজির জন্য লড়ি? আমাদের দাবির পিছনে_’ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহিত্যকর্মের মূল্যায়ন করেছেন অনেকেই। তবে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সাহিত্য সমালোচক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, ‘মানিক প্রান্তিক মানুষের অর্থনৈতিক জীবনকে জানতেন এবং তাদের সামাজিক অবস্থা সম্বন্ধে প্রচ্ছন্ন জ্ঞান রাখতেন। এই বাস্তবতাকে তিনি তার কথাসাহিত্যে উপস্থিত করেছেন। তিনি তা কেবল বাস্তবতাকে উপস্থিত করার প্রয়োজনে উপস্থিত করেননি করেছেন বাস্তবতাকে বদলাবার প্রয়োজনেও।’
মুন্সীগঞ্জে বাস খাদে পড়ে একজন নিহত
ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কের শ্রীনগর উপজেলার উমপাড়া নামকস্থানে শুক্রবার সকালে বাস খাদে পড়ে একজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও ৩০ যাত্রী। নিহতের নাম- জালাল ব্যাপারী (৪৫)। তার বাড়ি মাদারীপুরের গাছবাড়িয়ায়। আহতদের ঢাকা ও স্থানীয় বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। শ্রীনগর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আলমগীর ঘটনাস্থল থেকে জানান, সার্বিক পরিবহনের বাসটি ৪০ যাত্রী নিয়ে ঢাকা থেকে মাদারীপুর যাচ্ছিল। হঠাৎ সামনের চাকা ফেটে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে পানিতে তলিয়ে যায়। স্থানীয় লোকজন যাত্রীদের উদ্ধার করে। তিনি জানান, চালক পলাতক রয়েছে।পদ্মার পানি আজ কমতে পারে : নদী ভাঙন বৃদ্ধি
এ বছরও থেমে নেই পদ্মার ভাঙন। ভাঙন রোধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না নেয়ায় ক্রমেই বিলীন হচ্ছে প্রাচীন জনপদ বিক্রমপুর তথা মুন্সীগঞ্জের বিস্তীর্ণ এলাকা। ইতোমধ্যে জেলার তিনটি উপজেলা টঙ্গিবাড়ী, লৌহজং ও শ্রীনগরের শতাধিক গ্রাম নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। বদলে গেছে গোটা জেলার মানচিত্র। এদিকে টঙ্গিবাড়ী হাসাইল বানারী এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের ১৩ কোটি টাকার নামমাত্র বাঁধটি নির্মাণের কয়েক মাসের মধ্যেই নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। একই এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ড ৭২ কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন করে বাঁধ নির্মাণ করেছে। তবে এ বাঁধেরও টিকে থাকার গ্যারান্টি নেই। এ ছাড়া শ্রীনগরেও এ বোর্ডের লাখ লাখ টাকার প্রকল্প বিলীন হয়ে যাচ্ছে। পদ্মার প্রবল স্রোতে কোনো কিছুই যেন বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। এ ক্ষেত্রে সরকারের কোটি কোটি টাকার প্রকল্প শুধু কিছু মানুষের ভাগ্য বদলে দেয়। কিন্তু নদীভাঙনের শিকার হাজার হাজার মানুষ বসতভিটা হারিয়ে অর্ধাহারে অনাহারে জীবন কাটালেও তাদের ভাগ্যের বদল হচ্ছে না। এটাই তাদের নিয়তি।
এ বছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। টঙ্গিবাড়ী, লৌহজং ও শ্রীনগর উপজেলার বিভিন্ন এলাকা সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে বাঁধ নির্মাণে টঙ্গিবাড়ীর হাসাইল-বানারী এলাকায় নদীভাঙন কিছুটা স্তিমিত হলেও শ্রীনগর উপজেলার ভাগ্যকুল, উত্তর কামারগাঁও, পূর্ব বাঘরা, বাঘরা, কেদারপুর, মাগডাল, মান্দ্রা, কবুতরখোলা গ্রামের শতাধিক বাড়িঘর নদীভাঙনের মুখে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। হুমকির মুখে পড়েছে ভাগ্যকুল ও বাঘরা বাজারের সাত শতাধিক দোকানঘর-সহস্রাধিক বাড়িঘর। এ ছাড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, ভাগ্যকুল হরেন্দ্রলাল উচ্চবিদ্যালয়, বাঘরা বাসুদেব মন্দির, স্বরূপ চন্দ্র উচ্চবিদ্যালয়, কামারগাঁও রাধা গোবিন্দ মন্দিরসহ বেশ কয়েকটি মসজিদ, প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ঢাকা-দোহারের দুই কিলোমিটার সড়ক ভাঙনের মুখে। ভাগ্যকুল ও বাঘরা বাজার রক্ষায় সরকারিভাবে ১০ লাখ টাকার বরাদ্দ পেলেও ভাঙনকবলিত গ্রামগুলো রক্ষায় কোনো ব্যবস্খা করা হয়নি।
লৌহজং উপজেলায় গত এক সপ্তাহে পদ্মা গ্রাস করেছে বিস্তীর্ণ এলাকা। লৌহজং থানা, সাবরেজিস্ট্রি অফিস, সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিস ভাঙনের মুখে রয়েছে। ডহুরী, কলমা, সামুরবাড়ি এলাকায় নতুন করে ভাঙন দেখা দিয়েছে। স্খানীয় প্রশাসন কোনো ব্যবস্খা না নেয়ায় নদীতীরবর্তী বাসিন্দারা নানা পন্থায় ও বাঁশের বেড়া দিয়ে ভাঙন রোধের চেষ্টা চালাচ্ছে। গত ১৫ বছরে এ উপজেলার ৩৮টি গ্রাম পদ্মায় বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙনকবলিত ইউনিয়নগুলো হচ্ছেন্ধ ধাইদা, তেওটিয়া, লৌহজং, গাওদিয়া, কনকসার ও কুমারভোগ।
মুন্সীগঞ্জ-১ (শ্রীনগর-সিরাজদিখান) আসনের সংসদ সদস্য সুকুমার রঞ্জন ঘোষ নয়া দিগন্তকে জানান শ্রীনগরের নদীতীরবর্তী কবুতরখোলা-ভাগ্যকুল-বাঘরা এলাকায় ৪৮৭ কোটি টাকা ব্যয়ে বাঁধ নির্মাণ করার একটি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। প্রকল্পটি বর্তমানে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য রয়েছে। শিগগিরই তা একনেকে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। আশা করি এ বাঁধ নির্মাণ হলে পদ্মার ভাঙন থেকে এলাকার জনগণকে রক্ষা করা আরো সহজ হবে।
মুন্সীগঞ্জে রাক্ষুসি পদ্মা এখন রুদ্র মূর্তি ধারণ করেছে
পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় মুন্সীগঞ্জে রাক্ষুসি পদ্মা এখন রুদ্র মূর্তি ধারণ করেছে। গত এক সপ্তাহে লৌহজং, শ্রীনগর ও টঙ্গিবাড়ি উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।
ভাঙ্গঙের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় নদীতীরবর্তী ২০টি গ্রামের দুই সহস্রাধিক পরিবারে চরম আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। বর্তমানে বসতভিটা, ব্যবসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি স্থাপনা ভাঙনের গর্জন নিয়ে ধেয়ে আসছে নদীতীরবর্তী গ্রামগুলোর দিকে। লৌহজংয়ের কনকসার এলাকার শত বছরের ব্রাহ্মনগাওঁ উচ্চ বিদ্যালয়ের একটি অংশ ইতোমধ্যে বিলীন হয়ে গেছে এবং অপর অংশটি ভাঙনের মুখে পড়েছে। এছাড়া আরো হুমকির মুখে পড়েছে লৌহজং থানা ভবন, সাবরেজিস্ট্রি অফিস, ভূমি অফিস, টঙ্গিবাড়ীর হাসাইল বাজার, দিঘিরপাড় বাজারসহ শতশত ঘরবাড়ি ও বিস্তীর্ণ ফসলি জমি।
স্থানীয় প্রশাসন নদী ভাঙনরোধে এখনও কোন ব্যবস্থা না নেয়ায় তীরবর্তী ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তরা বাঁশের বেড়াসহ নানা পন্থায় ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা চালাচ্ছে। তারা অবিলম্বে ভাঙ্গন প্রতিরোধে সরকারের আশু পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন।
কিংবদন্তির রাজধানী বিক্রমপুর
দু’হাজার বছর আগের বাংলা। রাজা বিক্রমাদিত্যের হাত ধরে প্রাচীন বাংলার রাজধানী বিক্রমপুরের জন্ম। সেটা যিশুর জন্মের প্রায় শতাব্দী আগের কথা। এরপরে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী পাল রাজারা বসেন সিংহাসনে। প্রায় হাজার বছর আগে এ অঞ্চল জ্ঞান-বিজ্ঞানে ছিল অনন্য। শীলরক্ষিত এবং মহাপণ্ডিত অতীশ দীপঙ্কর জন্ম নেন। এক হাজার বছর আগে দুর্ভেদ্য হিমালয় পাড়ি দিয়ে অতীশ দীপঙ্কর জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেন তিব্বতে, দূরপ্রাচ্যে বৌদ্ধধর্মের প্রসার শুরু হয়। তার জন্মস্থান বজ্রযোগিনী গ্রামটি আজ অজপাড়াগাঁ। তবে চৈনিক সরকারের অর্থায়নে প্রতিষ্ঠিত সৌধ এবং নির্মীয়মাণ বিশ্ববিদ্যালয় এই মহামানবের প্রতি শ্রদ্ধার নিদর্শন। পালবংশের পর রাজা আদিশুরের হাত ধরে ফিরে আসে হিন্দু শাসন।
রাজা আদিশুর তার মহারানীকে সন্দেহবশত ঘন জঙ্গলে নির্বাসনে পাঠান। কিংবদন্তি বলে, সেখানেই গর্ভবতী রানী এক পুত্রসন্তান বল্লাল সেনের জন্ম দেন। বল্লাল সেন এই গহিন অরণ্যে ঢাকাপড়া ঈশ্বরীর মূর্তি পেয়ে জঙ্গলে ঢাকা ঈশ্বরী বা ঢাকেশ্বরী মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। অরণ্যের মাঝে ছোট্ট একটি গ্রাম হয় মন্দির ঘিরে, জন্ম নেয় ঢাকা।
যা হোক, রাজা বল্লাল সেন সেন রাজত্ব শুরু করেন। তার সম্পর্কে কিংবদন্তির সংখ্যা এত বেশি যে, অনেক পণ্ডিতের ধারণা, সেন বংশে একাধিক রাজা বল্লাল সেন ছিলেন। স্থানীয়রা সবকিছুতেই বল্লাল সেনের কাজ খুঁজে পান। যেমন বল্লাল সেনের দিঘি। বল্লাল সেন প্রজাদের দুর্দশা লাঘবে দিঘি প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু করেন। মাতৃভক্ত বল্লাল সেনের জননী এক রাতে যতটুকু হাঁটবেন, ততটা জায়গাজুড়ে দিঘি হবে। রাজা ভেবেছেন অন্তপুরবাসিনী বৃদ্ধা আর কতটাই-বা হাঁটবেন! কিন্তু তাকে হতভম্ভ করে দিল রাজমাতার হাঁটা। বুদ্ধি করে বল্লাল সেন মায়ের পায়ে সিঁদুরের দাগ দিয়ে রক্ত বুঝিয়ে থামালেন। কিন্তু মায়ের সঙ্গে মিথ্যাচার ঘোর অধর্ম। তাই রাজার দিঘিতে পানি আসে না।
রাজা নিজেকে আত্মোৎসর্গ করার প্রস্তুতি নিতে থাকেন। কিন্তু বন্ধু এবং প্রধানমন্ত্রী রামপাল রাজাকে বাঁচাতে দিঘির স্থানে নিজেকে সঁপে দিলেন। তৈরি হলো বল্লাল সেনের দিঘি (অথবা রামপালের দিঘি)। রামপালের আত্মদানের ফল যা-ই হোক না কেন, আজ দিঘিটিতে পানি নেই কিন্তু বিশাল এলাকাজুড়ে নিচু অঞ্চল আর এলাকায় প্রচলিত কিংবদন্তি আজও বল্লাল সেন আর রামপালের বন্ধুত্ব অটুট রেখেছে।
সেন বংশের শেষ রাজার নামও বলল্গাল সেন। প্রজাদের ওপর তার নিপীড়নের কথা শুনে সদলবলে আরব থেকে এদেশে আসেন বাবা আদম নামের এক ধর্মনেতা। প্রতিষ্ঠা করেন এ অঞ্চলের প্রথম মসজিদ। এজন্য বাবা আদমকে যুদ্ধের ময়দানে দাঁড়াতে হয় বল্লাল সেনের সঙ্গে। বল্লাল সেন যুদ্ধে যাওয়ার আগে প্রাসাদের সব রমণীকে বলে গেলেন, তিনি যুদ্ধে হেরে গেলে পোশাকের নিচে লুকানো পায়রা উড়ে আসবে। আর সম্মান রক্ষার্থে তারা যেন সবাই আগুনে আত্মাহুতি দেন। যুদ্ধে মুসলিম যোদ্ধারা পরাজিত হন; কিন্তু বাবা আদমকে কোনো অস্ত্র দিয়েই ঘায়েল করা যাচ্ছে না। তিনি বললেন, মহান আলল্গাহর ইচ্ছায় আমি প্রতিপক্ষের তলোয়ারে মারা যাব না। তিনি নিজ তরবারি বল্লাল সেনের হাতে তুলে দেন। এই তলোয়ারের আঘাতে তিনি শাহাদাত বরণ করেন। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে হঠাৎ অসাবধানে পায়রাটি পোশাকের ভেতরে থেকে পালিয়ে বল্লাল সেনের প্রাসাদে চলে আসে। ফলে বল্লাল সেনের পুরো পরিবার ভুল বুঝে আগুনে ঝাঁপিয়ে আত্মহত্যা করে। শোকে পাগল বল্লাল সেনও একই অগি্নকুণ্ডে লাফিয়ে পড়ে সেন বংশের অবসান ঘটান। স্থানীয়রা বিশ্বাস করেন সিপাহিপাড়ায় প্রতিষ্ঠিত বাবা আদমের মসজিদ বাংলায় প্রথম মসজিদ। মসজিদের পাশেই বাবা আদমের মাজার।
হাজার বছর আগের ভ্রমণ শেষে ফিরে আসি আজকের ঢাকা শহরের বাস্তব জগতে। সত্যি সত্যি বাংলার প্রাচীন রাজধানীতে যেতে চান? ঢাকার স্টেডিয়াম/গুলিস্তান বা পোস্তগোলা থেকে বাসে করে যাবেন মুন্সীগঞ্জের দিকে। সুখবাসপুর বা সুবাসপুরে নেমে পড়বেন। এখানে ঘণ্টা হিসাবে রিকশা নিতেন পারেন। সিপাহিপাড়ার দিকে যেতে পথে পড়বে কিংবদন্তির দিঘি রাজা হরিশ চন্দ্রের দিঘি। এরপর বল্লাল সেনের দিঘি, বাবা আদমের মসজিদ এবং মাজার। এরপর চলে যান বজ্রযোগিনী গ্রামে। অতীশ দীপঙ্করের বাস্তুভিটায়। পুরো এলাকাতেই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে সেন রাজবংশ এবং পরে বার ভূঁইয়াদের সময়কালের অনেক স্মৃতিচিহ্ন। খুব সহজেই ঘুরে আসুন প্রাচীন বাংলার গৌরবের নগরের পথে-প্রান্তরে।
হ সাঈদ সৌম্য
ফখরুদ্দীন আহমদকে তলবের চিন্তাভাবনা
মিজান মালিকবিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ফখরুদ্দীন আহমদকে সংসদীয় কমিটির সামনে তলব করে জিজ্ঞাসাবাদ করার বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা চলছে বলে জানা গেছে। ৯০ দিনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মেয়াদকাল অসাংবিধানিকভাবে প্রায় ২ বছর ধরে রাখা, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং আমেরিকায় সম্পদ অর্জন ও সেদেশের স্থায়ী আবাসিক কার্ডের তথ্য গোপনের অভিযোগের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাকে তলব করা হতে পারে। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।
সূত্রমতে, আমেরিকায় ড. ফখরুদ্দীনের নামে দুটি বাড়ি ও পৃথক দুটি ব্যাংক হিসাবে কোটি কোটি টাকার লেনদেনের চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে সংসদীয় কমিটি। সেসব তথ্য এখন পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও যাচাই-বাছাই করে দেখা হচ্ছে। কমিটি জানতে পেরেছে, ড. ফখরুদ্দীন আহমদ আমেরিকার স্থায়ী আবাসিক কার্ডধারী। তার এসএসএন নম্বর (সোশ্যাল সিকিউরিটি নম্বর) ১৪৮৫২৮৯৯২। এ কার্ডের আওতায় তিনি আমেরিকায় নাগরিকের যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন বলে জানা যায়। তার বাড়ি দুটি আমেরিকার ভার্জিনিয়া ও মেরিল্যান্ডে। ১০৮০৮ ব্রিক ইয়ার্ড কোর্ট ফটোম্যাক মেরিল্যান্ডে ২০৮৫৪ নং হোল্ডিংয়ের কেনা বাড়ির মূল্য ১৫ লাখ ৪ হাজার ৬১০ ইউএস ডলার, যা বাংলাদেশী মুদ্রায় ১০ কোটি ৫৩ লাখ ২২ হাজার টাকা। ৭৬০৭ নিউ মার্কেট ড্রাইভে কেনা বাড়ির মূল্য ৭ লাখ ৫৪ হাজার ৭১০ ইউএস ডলার, যা বাংলাদেশী মুদ্রায় ৫ কোটি ২৮ লাখ ২৯ হাজার টাকা। এছাড়া তার নামে সেদেশের ওয়াস্যুভিয়া ব্যাংকে ২০৯৪৮৯৫৩৬১২৪ নং সেভিংস অ্যাকাউন্ট এবং ৪৪০২৫৮৩২৫ নং সিডি অ্যাকাউন্টে আরও প্রায় কোটি টাকার সঞ্চয় রয়েছে বলে তথ্য পেয়েছে কমিটি। সূত্রমতে, কমিটি জানতে পেরেছে, আমেরিকায় সম্পদ অর্জনের তথ্য এবং স্থায়ী আবাসিক কার্ড গ্রহণের তথ্যটি গোপন করেছেন ড. ফখরুদ্দীন আহমদ। সরকারি প্রতিষ্ঠান সংক্রান্ত জাতীয় সংসদের স্থায়ী কমিটির সভাপতি ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর এ প্রসঙ্গে যুগান্তরকে বলেন, ফখরুদ্দীন আহমদ বিদেশে অর্থ-বৈভব করেছেন কিভাবে তা তিনি বাংলাদেশকে জানাননি। এছাড়া তিনি আমেরিকার স্থায়ী আবাসিক কার্ড অর্জনের বিষয়টিও গোপন করে বাংলাদেশের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হয়েছেন।
এসব বিষয়ে অভিযোগ আসায় তার সম্পর্কে খোঁজ-খবর নেয়া হচ্ছে বলে জানা যায়। সূত্রমতে, ড. ফখরুদ্দীন আহমদের বিরুদ্ধে সংবিধান লংঘন ও ক্ষমতার অপব্যবহারেরও অভিযোগ উঠেছে। সাংবিধানিকভাবে ৯০ দিন বা ৩ মাসের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার দেশের অন্তর্বর্তীকালীন দায়িত্ব নিয়ে জাতিকে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দিয়ে চলে যাওয়ার কথা। কিন্তু ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রায় ২ বছর ক্ষমতায় ছিল। এ সময়ে তিনি তার সরকারের সামনে এবং পেছনের ক্ষমতাধর লোকজনের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আইন উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ওঠায় তিনি একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে সাক্ষাৎকার দিয়ে বলেছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ভালো-মন্দ সব কাজের দায়-দায়িত্ব প্রধান উপদেষ্টার। দুদক চেয়ারম্যানের অনুপস্থিতিতে তদানীন্তন সচিব দেলোয়ার হোসেনের স্বাক্ষরে দেশের ৫০ জন বিশিষ্ট ব্যক্তির সম্পদের হিসাব চেয়ে নোটিশ দেয়ার বিষয়ে সংসদীয় কমিটি জানতে চাইলে তিনি (দেলোয়ার হোসেন) কমিটিকে বলেছেন, প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশে সে সময় দুদকের কাজ পরিচালিত হতো।
সূত্র জানায়, ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন ও দুদক সচিব দেলোয়ার হোসেনের বক্তব্যের সূত্র ধরে তাদের আনীত অভিযোগের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্যও ফখরুদ্দীন আহমদকে সংসদীয় কমিটির সামনে তলব করার চিন্তা-ভাবনা চলছে। একই সঙ্গে তিনি কিভাবে কখন দেশের বাইরে থেকে এসে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হলেন, কে তাকে মনোনয়ন দিয়েছে সেসব বিষয়েও তার কাছ থেকে জানা হবে। তার ঘনিষ্ঠদের অনেকে মনে করেন, ফখরুদ্দীন আহমদ আমেরিকার নাগরিকত্ব পেয়েছেন। যদিও এ বিষয়ে কারও কাছেই কোন সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। অবশ্য তার স্থায়ী আবাসিক কার্ড বা এসএসএন কার্ডপ্রাপ্তির বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। কেউ কেউ মনে করেন, বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধি থাকাকালীন ফখরুদ্দীন আহমদ আমেরিকায় বাড়ি-গাড়ি করেছেন।
এদিকে সংসদীয় কমিটির একজন সদস্য ড. ফখরুদ্দীন আহমদের বিষয়ে তথ্যপ্রাপ্তির প্রসঙ্গটি উল্লেখ করে বলেন, অন্য দেশের স্থায়ী রেসিডেন্ট হয়ে তিনি বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা হতে পারেন না। এটি আইনবহির্ভূত। এছাড়া তার দেশের বাইরে সম্পদের বিষয় এনবিআরকে জানানোও নৈতিকতার পর্যায়ে পড়ে বলে জানান তিনি।
সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. ফখরুদ্দীন আহমদ ৩১ মে সরকারি বাড়ি তš§য় ছেড়ে দেন। এরপর তিনি ২ মাসের জন্য আমেরিকায় পাড়ি জমান। সেখানে রয়েছে তার পুরো পরিবার। তিনি সহসাই দেশে ফিরছেন না বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর আগে তিনি ২০০১ সালে বাংলাদেশে আসেন। তখন জোট সরকারের অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার কাছে ড. ফখরুদ্দীনকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর করার জন্য প্রস্তাব করেন। কথামতো কাজ। গভর্নর হিসেবে একদিনেই তার নিয়োগ হয়ে যায় বলে জানা যায়। সাইফুর রহমান তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীকে বোঝাতে চেষ্টা করেন, ফখরুদ্দীন আহমদ বিশ্বব্যাংকের কর্মকর্তা হিসেবে ভালোভাবেই বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবেন। গভর্নর হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর জোট সরকারের সময় তিন বছর দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এরপর ২০০৫ সালে তাকে পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) চেয়ারম্যান নিয়োগ দেয় তৎকালীন সরকার। এ প্রতিষ্ঠানটি এনজিও খাতে ঋণ সহায়তার কার্যক্রম পরিচালনা করে। জোট সরকারের সময় সুবিধাভোগী ফখরুদ্দীন আহমদ প্রধান উপদেষ্টা হন কাকতালীয়ভাবে। তার ঘনিষ্ঠরা জানান, প্রস্তাবটি ছিল ড. মোহাম্মদ ইউনূসের জন্য। কিন্তু তিনি নিজে রাজি না হয়ে বন্ধু ফখরুদ্দীনের নাম প্রস্তাব করলে ওয়ান-ইলেভেনের নায়করা রাজি হয়ে যান।
সূত্রমতে, সংসদীয় কমিটি পর্যাপ্ত তথ্যপ্রমাণ পেলে ড. ফখরুদ্দীনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে সুপারিশ করতে পারে। এছাড়া বিএনপি ও আওয়ামী লীগের কারানির্যাতিত নেতারা ফখরুদ্দীন আহমদসহ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অনেকের বিরুদ্ধেই নানা অভিযোগে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। যদিও এসব প্রস্তুতির সঙ্গে সরকারের কোন ধরনের যোগাযোগ নেই বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। কিন্তু ভুক্তভোগীরা থেমে নেই। তারা শুধু ফখরুদ্দীন আহমদই নন, রাষ্ট্রপতি প্রফেসর ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ ও সাবেক সেনাপ্রধান মইন উ আহমেদসহ তত্ত্বাবধায়ক সরকার পরিচালনায় যুক্ত অনেকের বিরুদ্ধেই মামলা করবেন বলে ইতিমধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন।
পপুলার লাইফের মুন্সীগঞ্জ জেলার বার্ষিক সম্মেলন
সম্প্রতি মুন্সীগঞ্জ জেলা শিল্পকলা একাডেমী মিলনায়তনে পপুলার লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের মুন্সীগঞ্জ জেলার বার্ষিক সম্মেলন ২০০৮ অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া ওই অনুষ্ঠানে আটজন বীমা গ্রাহকের নমিনিদের কাছে মৃত্যুদাবির চেক হস্তান্তর করা হয়
সম্প্রতি মুন্সীগঞ্জ জেলা শিল্পকলা একাডেমী মিলনায়তনে পপুলার লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের মুন্সীগঞ্জ জেলার বার্ষিক সম্মেলন ২০০৮ অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া ওই অনুষ্ঠানে আটজন বীমা গ্রাহকের নমিনিদের কাছে মৃত্যুদাবির চেক হস্তান্তর করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য এম ইদ্রিস আলী। ওই অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মুন্সীগঞ্জ সদর সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার নাঈমা সুলতানা, সদর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান মনসুর আহমেদ কালাম, কনসালট্যান্ট মো. আনিস উদ্দিন মিয়া। বিজ্ঞপ্তি
পদ্মায় পানি বৃদ্ধিতে মুন্সীগঞ্জে দেখা দিয়েছে নদী ভাঙ্গন
মুন্সীগঞ্জের ভাগ্যকুল পয়েন্ট গত ৪ দিনে পদ্মা নদীর পানি ১০ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে উপজেলার বাঘরা, ভাগ্যকুল, চারিপাড়া, কামারগাও, মান্ডা ও কবুতরখোলাসহ নদীর তীরর্বতী ৩ কিলোমিটার এলাকায় ভাঙ্গন শুরু হয়েছে। এছাড়া ঝুকির মধ্যে রয়েছে ভাগ্যকুল পানি উন্নয়ন বোর্ড, বাঘরা স্বরূপ উচ্চ বিদ্যালয়, হরেন্দ্রলাল উচ্চ বিদ্যালয়, কামারগাও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ৪ টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৯ টি মসজিদসহ বাঘরা ও ভাগ্যকুল বাজারের ৪ শতাধিক দোকানপাট। এদিকে ভাঙ্গনরোধে ২ মাস আগে ৫ লাখ টাকা বরাদ্ধ হলেও সেই কাজ চলছে ঢিমেতালে বলে জানান এলাকাবাসী।
মুন্সীগঞ্জে এক হিন্দু পরিবারের বাড়ি দখল করেছে আওয়ামী লীগ সমর্থকরা
ক্ষমতাশীন আওয়ামী লীগ দলের সন্ত্রাসীরা একটি হিন্দু পরিবারের সহায়-সম্বল লুট করেই খ্যান্ত হয়নি, তাদের মারধর করে ভিটেমাটি থেকেও তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এ ঘটনা কাউকে জানালে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দেয়া হয়েছে। মুন্সীগঞ্জের মিরকাদিম পৌরসভার কমলা ঘাটে এ ঘটনা ঘটে। ভিটেমাটি হারিয়ে হিন্দু পরিবারটি প্রাণ বাঁচাতে বর্তমানে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। স্খানীয় পুলিশের কোনো সহায়তা না পেয়ে আইনের আশ্রয় নিতে ঢাকায় ছুটে এসেছেন পরিবারের সদস্যরা।
ক্ষতিগ্রস্ত এই পরিবারটি বিচারের দাবিতে গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববìধন করে। এ সময় তারা সাংবাদিকদের কাছেও হামলাকারী ও দখলবাজ আওয়ামী সন্ত্রাসীদের নাম প্রকাশ করতে ভয় পাচ্ছিলেন।
হামলার শিকার সুনিল চন্দ্র দে অভিযোগ করেন, স্খানীয় আওয়ামী লীগের এক প্রভাবশালী ব্যক্তি দীর্ঘ দিন ধরে তাদের বাড়ি দখলের পাঁয়তারা চালিয়ে আসছিল। তাদের পেছনে সন্ত্রাসী লেলিয়ে দিয়ে বিভিন্নভাবে হয়রানি করতে থাকে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ওই ব্যক্তি আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠে। এরই জেরে গত ২৯ জুন রাত সাড়ে ৯টায় হঠাৎ তার বাড়িতে হানা দেয় স্খানীয় আওয়ামী লীগ সমর্থক অমর চাঁন সাহা, তপন পাল, ভাগবত পালসহ ৪০-৫০ জনের একদল সন্ত্রাসী। সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা ঘরে ঢুকে তাকে এবং তার বৃদ্ধা মা, স্ত্রী ও সন্তানদের মারধর করে। সন্ত্রাসীরা বাসার আলমিরা ভেঙে স্বর্ণালঙ্কার, টাকা ও মূল্যবান মালামাল লুট করে। প্রায় এক ঘন্টা ধরে সন্ত্রাসীরা তাণ্ডব চালালেও প্রতিবেশীদের কেউই ভয়ে এগিয়ে আসার সাহস পাননি। সন্ত্রাসীরা এক পর্যায়ে তাদের মারধর করে রাতের অìধকারে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়। থানায় মামলা করলে এবং কারো কাছে আওয়ামী লীগের নাম প্রকাশ করলে প্রাণে মেরে ফেলা হবে বলে হুমকি দেয়। এ অবস্খায় তিনি আইনের আশ্রয় পেতে পরিবার-পরিজন নিয়ে থানায় ছুটে যান। কিন্তু পুলিশ মামলা না নিয়ে উল্টো তাদের থানা থেকে বের করে দেয়। গভীর রাতে তারা এলাকায় এক আত্মীয়ের বাসায় আশ্রয় নেন। পর দিন তিনি পরিবার নিয়ে ঢাকায় পালিয়ে আসেন। বর্তমানে সন্ত্রাসীদের অব্যাহত হুমকির কারণে তিনি এলাকায় যেতে পারছেন না বলে জানান।
যানজট নিয়ন্ত্রণে ১ কনস্টেবল
ট্রাফিক পুলিশের জনবল সংকটের কারণে ঢাকানারায়ণগঞ্জমুন্সীগঞ্জ সড়কে যানজটের সমস্যা দিন-দিন ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। এই গুরুত্বপূর্ণ সড়কটিতে মাত্র ১ জন কনস্টেবল দিয়ে যানজট নিয়ন্ত্রণের কাজ চালানো হচ্ছে। যেখানে প্রয়োজন ট্রাফিক পুলিশের ৪ জন সার্জেন্ট অফিসার ও ২০ জন কনস্টেবল। এদিকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটের কবলে পড়ে যাত্রীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। যানজটের কারণে কাঁচামালসহ বিভিন্ন মালামাল সঠিক সময়ে গন্থব্যে পৌঁছাতে না পারায় নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জের সহস্রাধিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
অন্যদিকে মুন্সীগঞ্জ জেলা থেকে গোলআলুসহ প্রায় সব ধরনের সবজির ২০০-৩০০ ট্রাক এ রুট দিয়ে রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় প্রতিদিন সরবরাহ করছে। কিন্তু যানজটের কারণে সঠিক সময়ে এসব ট্রাক হাটবাজারে যেতে না পারায় আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ব্যবসায়ী ও কৃষকরা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়া থেকে পাগলার মুন্সী খোলা পর্যন্ত রুটের বিভিন্নস্থানে সড়কের ওপর ট্রাকসহ অন্যান্য যানবাহন এলোপাতাড়ি করে রাখা হয়েছে। সড়ক দখল করে ফতুল্লা থানাসংলগ্ন সড়কের ওপর সবজির দোকান বসনো হয়েছে। বিশেষ করে পাগলা মুন্সী খোলা এলাকার সড়কে পাইকারি মার্কেটের ইট, বালু, সিমেন্ট ও রডভর্তি ট্রাকের মালামাল লোড-আনলোড করার সময় প্রচ- যানজটের সৃষ্টি
হয়। অপরদিকে মুক্তারপুর ব্রিজ সড়ক থেকে পঞ্চবটি হয়ে পাগলা মুন্সী খোলা পর্যন্ত সড়কের দুই পাশে সহস্রাধিক শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালামাল রাস্তার ওপর রেখে লোড-আনলোড করা হচ্ছেÑ এতে প্রচ-ভাবে যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। নারায়ণগঞ্জ থেকে পাগলা মুন্সী খোলা এবং মুক্তারপুর থেকে পাগলা মুন্সী খোলা পর্যন্ত এই দীর্ঘ গুরুত্বপূর্ণ সড়কটিতে ফতুল্লা থানার পঞ্চবটি এলাকার তিন রাস্তার মোড়ে মাত্র ১ জন ট্রাফিক পুলিশের কনস্টেবল যানজট নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পালন করেন। যে কারণে এ সড়কের যানজট কখনোই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
এ ব্যাপারে জেলা ট্রাফিক পুলিশ ইন্সপেক্টর আনিসুজ্জামান বলেন, জনবল কম থাকায় এ সড়কটিতে যানজট নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এ সড়কের জন্য ৪ জন সার্জেন্ট অফিসার ও ২০ জন কনস্টেবল প্রয়োজন।
জেলা পুলিশ সুপার বিশ্বাস আফজাল হোসেন বলেন, নারায়ণগঞ্জ ট্রফিক পুলিশের জনবল কম থাকায় যানজট নিয়ন্ত্রণ করতে সমস্যা পোহাতে হচ্ছে। তবে এ সমস্যা রোধ করার জন্য ট্রাফিক পুলিশের জনবল বাড়াতে আবেদন করা হয়েছে।
Wednesday, July 08, 2009
শাহ মোয়াজ্জেম হোসেনের স্ত্রী সালেহা হোসেনের ইন্তেকাল

বিএনপি নেতা শাহ মোয়াজ্জেমের স্ত্রী সালেহা হোসেনের ইন্তেকালের খবর পেয়ে দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ও দলীয় নেতৃবৃন্দ গতকাল তার বাসভবনে যান
সাবেক উপপ্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি নেতা শাহ মোয়াজ্জেম হোসেনের স্ত্রী বেগম সালেহা হোসেন (৬২) গতকাল বিকেল পৌনে ৬টায় গুলশানের নিজ বাসভবনে ইন্তেকাল করেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। তিনি স্বামী, এক ছেলে, এক মেয়ে ও নাতি-নাতনী রেখে গেছেন। তার মৃত্যুতে বিএনপি চেয়াপারসন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। বেগম জিয়া রাত ৯টা ১৫ মিনিটে শাহ মোয়াজ্জেম হোসেনের গুলশানের বাসভবনে যান। বেগম জিয়া সেখানে ৩০ মিনিট অবস্খান করে মরহুমার শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের সান্তবনা দেন। তিনি শাহ মোয়াজ্জেম হোসেনকে বলেন, আপনি একজন রাজনীতিক হিসেবে জীবনে বহুজনকে সান্তবনা দিয়েছেন। এখন নিজের পরিবারের শোকাহত সদস্যদের সান্তবনা দিন।
বেগম সালেহা হোসেন উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা ছিলেন। তিনি একজন সুসাহিত্যিক ছিলেন। তার রচিত গ্রন্থের সংখ্যা ২৩। আজ বাদ আসর গুলশানের আজাদ মসজিদে মরহুমার জানাজা শেষে বনানী কবরস্খানে তাকে দাফন করা হবে।
তার মৃত্যুতে এক শোকবার্তায় বেগম জিয়া বলেন, মরহুমা সালেহা হোসেন শিক্ষা বিস্তারে ব্যাপক অবদান রেখে গেছেন। তিনি মরহুমার রূহের মাগফিরাত কামনা করে শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেন।
অপর এক শোকবার্তায় বিএনপি মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনও গভীর শোক প্রকাশ করে মরহুমার রূহের মাগফিরাত কামনা করেন। তিনি মরহুমার শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানান।
গতকাল গুলশানের বাসভবনে গিয়ে মরহুমার শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান বিএনপি স্খায়ী কমিটি সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, দলের ভাইস চেয়ারম্যান এম কে আনোয়ার, আ স ম হান্নান শাহ, সাবেক প্রধানমন্ত্রী কাজী জাফর আহমদ, বিএনপি যুগ্ম মহাসচিব সেলিমা রহমান, ঢাকার মেয়র সাদেক হোসেন খোকা, বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ জয়নাল আবেদিন ফারুক, জাগপা সভাপতি শফিউল আলম প্রধান, জাপা মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদার, বিজেপি মহাসচিব শামিম আল মামুন, জাগপা সাধারণ সম্পাদক লুৎফর রহমান, বিএনপি সহপ্রচার সম্পাদক মহিউদ্দিন খান মোহন, চেয়ারপারসনের প্রেস সচিব মারুফ কামাল খান, ব্যবসায়ী নেতা ফজলুর রহমান, বিএনপি নেত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম, আশির দশকের ছাত্রনেতা সরওয়ার আজম খান, শাজাহান মিয়া সম্রাট, অ্যাডভোকেট আহসান হাবিব, আলী আকবর চুন্নু, আলী আহম্মদসহ বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনগুলোর বহু নেতাকর্মী। এ ছাড়া মুন্সীগঞ্জ থেকে হাজার হাজার লোক খবর পেয়ে মরহুমার বাসভবনে ছুটে আসেন।
বিএনপি নেতা মশিউর রহমানের চাচার ইন্তেকালে শোক : ঝিনাইদহ জেলার বিএনপি’র আহ্বায়ক মশিউর রহমানের চাচা ইনতাজ আলী বিশ্বাসের ইন্তেকালে বিএনপি মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার গভীর শোক প্রকাশ করে মরহুমের রূহের মাগফিরাত কামনা করেন। তিনি মরহুমের পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করেন।
জাসাস নেতার পিতার মৃত্যুতে শোক : জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্খা জাসাস ঢাকা মহানগর নেতা জাকির হোসেন রোকনের পিতা মুকুল হোসেনের মৃত্যুতে বিএনপি মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি মরহুমের রূহের মাগফিরাত কামনা করে তার শোকাহত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
তিনি ৬ মাসে ৩ বার ভারপ্রাপ্ত…
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সিভিল সার্জন মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে থাকেন। সিভিল সার্জন ডা. এনায়েত করিম ৩০ ডিসেম্বর ২০০৮-এ অবসরগ্রহণ করেন। ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের ইএনটি কনসালট্যান্ট ডা. আবদুর রশীদ। ২১ ফেব্রুয়ারি ডা. সাজেদুল ইসলাম সিভিল সার্জন হিসেবে মুন্সীগঞ্জে যোগ দেন। তিনি ২৮ মে অবসরে চলে গেলে আবার ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন হন ডা. আবদুর রশীদ। ২২ জুন ডা. সুদীপ কুমার বোস সিভিল সার্জন যোগ দেয়ার আটদিন পর এলপিয়ারে চলে যান। ৩০ জুন বিকাল থেকে ডা. আবদুুর রশীদ ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন।
সিভিল সার্জনের পিএ মো. মিজান জানান, তিনি (সিভিল সার্জন) ঘনঘন চলে যাওয়ায় সঠিক সময়ে বেতন তোলা যায় না। এতে কর্মচারীদের অসুবিধা হয়।
সারা বিশ্বের মানুষ যে কোনো বাঁধের বিরুদ্ধে অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
মুন্সীগঞ্জে গৃহবধূ নির্যাতন
Tuesday, July 07, 2009
ফুঁসে উঠেছে কীর্তিনাশা পদ্মা
একই গ্রামের সত্তরোর্ধ্ব উন্নত নেছা জীবিকার অবলম্বন গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি রক্ষায় অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার সময় সাংবাদিকদের বলেন, সবই তো গেল এখন অন্যের বাড়িতে ঠিকানা খুঁজতাছি। সমবয়সী ননী গোপাল জানান, জšে§র পর এরকম ভাঙন আর দেখিনি। বাপ-দাদার রেখে যাওয়া চার একর জমি, ২৫ শতাংশের বাড়িÑ সবই কেড়ে নিয়েছে পদ্মা।
উপজেলার ভাঙনকবলিত ভাগ্যকুল ও বাঘড়া ইউনিয়নের ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামবাসী জানান, গত কয়েকদিনের ব্যবধানে পদ্মার ভয়াবহ ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে শত শত বসতভিটাসহ বিস্তীর্ণ ফসলি জমি। প্রতি মুহূর্তেই পদ্মার প্রবল ঢেউয়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রচণ্ড ঘূর্ণাবর্তে বিলীন হয়ে যাচ্ছে একের পর এক গ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা। এরই মধ্যে পদ্মা কেড়ে নিয়েছে উপজেলার কবুতরখোলা থেকে বাঘড়াবাজার পর্যন্ত ৭ কিলোমিটার এলাকার ৩ হাজার একর বিস্তীর্ণ ফসলি জমি। গত কয়েকদিনের ব্যবধানে নদী তীরবর্তী উত্তর কামারগাঁও, ভাগ্যকুল, পূর্ব বাঘড়া, বাঘড়া, কেদারপুর, মাগডাল, মান্দ্রা, কবুতরখোলা গ্রামের শতাধিক বাড়িঘর অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হয়েছে। তীব্র হুমকির মুখে পড়েছে জেলার ঐতিহ্যবাহী ভাগ্যকুল ও বাঘড়া বাজারের ৭ শতাধিক দোকানপাট। হুমকির মুখে রয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউট, ভাগ্যকুল হরেন্দ্রলাল উচ্চ বিদ্যালয়, বাঘড়া বাসুদেব মন্দির, স্বরূপ চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়, কামারগাঁও রাধা গোবিন্দ মন্দির, ৯টি মসজিদ, একাধিক প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ঢাকা-দোহার সড়কসহ দুই সহস াধিক বাড়িঘর।
ভাগ্যকুল ও বাঘড়া বাজার রক্ষায় সরকারিভাবে ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ হলেও ভাঙনকবলিত গ্রামগুলো রক্ষায় স্থানীয় প্রশাসন থেকে এখন পর্যন্ত কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। গ্রামবাসী নানা পন্থায় বাঁশের বেড়া বেঁধে ভাঙন ঠেকাতে আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ভাগ্যকুল ও বাঘড়া বাজারের ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেন, নদীভাঙন রোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রস্তাবিত ৫০ লাখ টাকার জিও ব্যাগ ফেলার পরিবর্তে ১০ লাখ টাকার গজারি প্রোটেকশন প্রকল্প কোন কাজেই আসছে না।
অবিরাম বর্ষণ ও উজান নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে গত ২৪ ঘণ্টায় পদ্মার ভাগ্যকুল পয়েন্টে ৪০ সেন্টিমিটার পানি বৃদ্ধি পেয়ে গত ১ সপ্তাহের ব্যবধানে ২ মিটার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নদীরভাঙন প্রকট আকার ধারণ করেছে। ব্রিটিশ আমলের দেশের অন্যতম প্রখ্যাত নৌবন্দর ঐতিহ্যবাহী ভাগ্যকুলের মানুষের ভাগ্য এখন বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছে। তাদের ভাগ্য বিপর্যয়ের কারণ হয়েছে রাক্ষুসী পদ্মা।
লৌহজং থেকে যুগান্তর প্রতিনিধি শেখ সাইদুর রহমান টুটুল জানান, পদ্মার পানি বাড়তে শুরু করার পর এবং বর্ষা মৌসুম শুরু হতেই পদ্মা রুদ্রমূর্তি ধারণ করেছে। গত এক সপ্তাহে পদ্মা গ্রাস করেছে লৌহজংয়ের বিস্তীর্ণ এলাকা। বসতভিটা, ব্যবসা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সরকারি স্থাপনা ভাঙনের গর্জন নিয়ে পদ্মা ধেয়ে আসছে মাওয়া-কবুতরখোলার দিকে। ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে মুন্সীগঞ্জ তথা বিক্রমপুরের মানচিত্র। সম্প্রতি মাওয়া-ভাগ্যকুল, কবুতরখোলা, বাগড়া এলাকায় প্রায় ৭ কিমি. এলাকাজুড়ে ভাঙনের খেলা চলছে। এভাবে ভাঙন চলতে থাকলে কিছুদিনের মধ্যেই মাওয়া-কবুতরখোলা-ভাগ্যকুল প্রকল্প বাঁধ রক্ষা করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
ভাঙনের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় নদীর তীরবর্তী মান্দ্রা, কবুতরখোলা, কামারগাঁও, মাঘঢার, মাওয়াকান্দিপাড়া, যশলদিয়া গ্রামের দেড় সহস াধিক পরিবারে চরম আতংক দেখা দেয়। গত ১৫ বছরে লৌহজং উপজেলার ৩টি ইউনিয়নের ৩৮টি গ্রাম পদ্মা নদীর ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙনকবলিত ইউনিয়নগুলো হচ্ছেÑ ধাইদা, তেউটিয়া, লৌহজং, গাওদিয়া ইউনিয়নের আংশিক ও কনকসার ইউনিয়নের আংশিক, কুমারভোগ ইউনিয়নের আংশিক। এসব ইউনিয়নের ৭টি সম্পূর্ণ এবং সদর ইউনিয়নের ১৪টি গ্রাম চলে গেছে নদীগর্ভে। এসব এলাকার হাজার হাজার পরিবার সহায়-সম্বলহীন হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে।
গাওদিয়ায় ছাত্তার মিয়া (৭০) সঙ্গে আলাপকালে তিনি জানান, পরপর চারবার ভাঙনের পর এবার এসে উঠেছি গাওদিয়া গ্রামে। এই ইউনিয়নের ৬টি গ্রাম পদ্মায় বিলীন হয়ে গেছে।
পদ্মা পাড়ের শত শত বাসিন্দা ভাঙনের কবলে পড়ে সহায়-সম্বলহীন হয়েছে। বর্তমানে কনকসারের শত বছরের ঐতিহ্যবাহী ব্রাহ্মণগাঁও উচ্চ বিদ্যালয়ের একটি অংশ ইতিমধ্যে পদ্মায় বিলীন হয়ে গেছে। অপর অংশটি ভাঙনের মুখে পড়েছে। অপরদিকে লৌহজং থানা ভবন, সাবরেজিস্ট্রি অফিস, সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিস হুমকির মুখে রয়েছে। ডহরী, কলমা, সামুরবাড়ি এলাকায় নতুন করে ভাঙন দেখা দিয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন নদীভাঙন রোধে এখনও কোন ব্যবস্থা না নেয়ায় তীরবর্তী বাসিন্দারা নানা পন্থায় এবং বাঁশের বেড়া দিয়ে ভাঙন ঠেকাতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
পদ্মার ভাগ্যকুল পয়েন্টে পানি বৃদ্ধি
মুন্সিগঞ্জ ফুটবল লীগে সমাবেশ ক্লাব জয়ী
Monday, July 06, 2009
গ্যাসসহ বিভিন্ন দাবিতে মুন্সীগঞ্জে মানববন্ধন
সকাল ১১ টার দিকে শহরের পুরনো কাছারী এলাকা থেকে প্রেসক্লাব চত্বর পর্যন্ত প্রায় আধা কিলোমিটার জুড়ে এ মানববন্ধনে রাজনীতিক, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থীসহ সর্বস্তরের মানুষ অংশ নেন।
কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) এর মুন্সীগঞ্জ শাখা আয়োজিত মানববন্ধনে অংশ গ্রহণকারীরা বিভিন্ন দাবি সংবলিত ব্যানার বহন করেন।
গ্যাস সংকট নিরসন ছাড়া অন্য দাবিগুলো হল- নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়া-মুক্তারপুর সংযোগ সড়ক নির্মাণ, পল্লী বিদ্যুতের অতিরিক্ত মিটার ভাড়া বাতিল, শহরের জলবদ্ধতা নিরসন এবং দ্রুত রাস্তা-ঘাট মেরামত।
প্রায় এক ঘণ্টাব্যাপী এ কর্মসূচির শেষ পর্যায়ে থানা প্রাঙ্গণে বক্তব্য রাখেন- জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. জামাল হোসেন ও মুন্সীগঞ্জ শাখা ক্যাব এর সভাপতি জাহাঙ্গীর সরকার।
++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++
মুন্সীগঞ্জে গ্যাস সঙ্কট
শিল্পকারখানা বìধ : বাসাবাড়িতে রান্না বিঘিíত
আবুসাঈদ সোহান মুন্সীগঞ্জ
মুন্সীগঞ্জে গ্যাস সঙ্কট চরম আকার ধারণ করেছে। এতে গ্যাসচালিত শিল্পকারখানা বìধ হয়ে গেছে। অনেক বাসাবাড়ির রান্না বিঘিíত হচ্ছে। খড়ি দিয়ে কিছু পরিবার রান্না করলেও অনেকে বাইরে থেকে খাবার এনে জীবনধারণ করছেন। গ্যাস সঙ্কটের ব্যাপারে তিতাস গ্যাস আঞ্চলিক ব্যবস্খাপক অজিত চন্দ্র দেব জানান, মুন্সীগঞ্জ সংযোগ পাইপলাইন সরু থাকায় এবং প্রয়োজনের তুলনায় গ্যাস সরবরাহ কম হওয়ায় এ অবস্খার সৃষ্টি হয়েছে। তবে শিগগিরই এর সমাধানে নারায়ণগঞ্জের পঞ্চবটি থেকে মুক্তারপুর পর্যন্ত সাড়ে সাত কিলোমিটার ১২ ইঞ্চি প্যারালাল গ্যাস লাইনের কাজ শেষ হবে বলে তিনি জানান।
প্রায় আট হাজার সংযোগ রয়েছে মুন্সীগঞ্জ শহর ও আশপাশের এলাকায়। এর মধ্যে ৩৭টি শিল্পকারখানা গ্যাসচালিত। প্রায় এক কোটি ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে মাত্র ২০-২৫ শতাংশ সরবরাহ হচ্ছে। সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন এবং নারায়ণগঞ্জ হয়ে ধলেশ্বরী নদীর তলদেশ দিয়ে মুন্সীগঞ্জে গ্যাস আসে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রে সরবরাহ বাড়িয়ে দেয়ায় এবং নারায়ণগঞ্জে চাহিদা অনেক বেশি থাকায় মুন্সীগঞ্জের এ অবস্খা বলে তিনি জানান।
শহরের শ্রীপল্লী বাসিন্দা জাহানারা বেগম জানান, কিছু দিন ধরেই গ্যাসের সঙ্কট চলছে। তবে রাতে কিছু গ্যাস পাওয়া যেত। রাতের রান্না করা খাবারে সারা দিন চলত। কিন্তু এখন গ্যাস একবারেই আসছে না। তাই চুলা কিনে এখন খড়ি দিয়ে কোনোমতে রান্না চলছে। একই অবস্খার কথা জানান নয়াপাড়ার গৃহবধূ সুবিতা রানী। মধ্য কোর্টগাঁও বাসিন্দা হামিদা খাতুন জানান, গ্যাসের জন্য প্রহর গুনতে হয়। সময় সময় গ্যাস যখন আসে, তখনই রান্না সেরে নিতে হয়। নতুবা বাইরের পাউরুটি, পরোটা বা বিþুকট খেয়ে ছেলেমেয়ে নিয়ে দিন কাটাতে হয়।
শহরের খালইস্ট, মাঠপাড়া, ইসলামপুর, দেওভোগ, শিলমন্দি, কাটাখালী, রনছ, মালপাড়া, গোয়ালপাড়া, কোর্টগাঁও, গণকপাড়া, হাটলক্ষ্মীগঞ্জ, ইদ্রাকপুর, মানিকপুর, থানা কাউন্সিল, জমিদারপাড়ায়ও একই অবস্খা। এ পরিস্খিতিতে মুক্তারপুরের গ্যাসচালিত শিল্পকারখানর উৎপাদন বìধপ্রায়। এশিয়ান গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের পরিচালক শাহ আলম জানান, গ্যাস না থাকায় তার ফ্যাক্টরির উৎপাদন এখন বìধই বলা চলে। এ ছাড়া ক্রাউন, শাহ সিমেন্ট, প্রিমিয়ার ও এমিরাত সিমেন্ট ফ্যাক্টরিতে গ্যাসচালিত জেনারেটর বìধ হয়ে গেছে। তাই এখন ডেসার বিদ্যুতের ওপর নির্ভর করে এখানকার সিমেন্ট কারখানাগুলো চলছে।
স্বাভাবিক অবস্খা থাকতেও শহরের শ্রীপল্লীতে গ্যাস সরবরাহ বিঘিíত হচ্ছিল। এ পরিস্খিতি নিরসনে এম ইদ্রিস আলী উদ্যোগ নেন। এখানে নতুন পাইপলাইন স্খাপনের প্রক্রিয়া শুরু হলেও পদ্ধতিগত কারণে বিলম্বিত হচ্ছে।
গ্যাসের পরিস্খিতির কথা স্বীকার করে জেলা প্রশাসক মোশারফ হোসেন জানান, সমস্যা সমাধানে তিতাস গ্যাসের এমডি’র সাথে তার দফায় দফায় আলোচনা হচ্ছে। পঞ্চবটি থেকে মুক্তারপুর পর্যন্ত ৬৩ লাখ টাকা ব্যয়ে নতুন পাইপলাইন স্খাপনের ওয়ার্ক অর্ডার হয়ে গেছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে সব রকম চেষ্টা চলছে।
গ্যাস সংকটে মুন্সীগঞ্জের অর্ধশতাধিক শিল্প-কারখানার উৎপাদন বন্ধ
ব্যবসায়ীরা জানান, মুক্তারপুরে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়া গ্যাসচালিত শিল্পকারখানার মধ্যে ক্রাউন, প্রিমিয়ার ও শাহ সিমেন্ট, এমিরাত সিমেন্ট ফ্যাক্টরি ও মাস্টার ইন্ডাস্ট্রিজ উল্লেখযোগ্য। তাই বিদ্যুৎই এখন এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদনের ভরসা।
সূত্র জানায়, প্রায় ৮ হাজার গ্যাস সংযোগ রয়েছে মুন্সীগঞ্জ শহর ও আশপাশ এলাকায়। এরমধ্যে ৩৭টি শিল্পকারখানা রয়েছে গ্যাসচালিত। এখানে এক কোটি ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে মাত্র ২০/২৫ শতাংশ সরবরাহ করা হচ্ছে। সূত্র আরো জানায়, বিদ্যুৎকেন্দ্রে সরবরাহ বাড়িয়ে দেয়া ও নারায়ণগঞ্জে অনেক বেশি চাহিদা থাকায় মুন্সীগঞ্জের এই অবস্থা।
গ্যাস সংকট প্রসঙ্গে তিতাস গ্যাসের কর্মকর্তারা জানান, মুন্সীগঞ্জের সংযোগ পাইপলাইন সরু হওয়ায় এবং প্রয়োজনের তুলনায় গ্যাস সরবরাহ কম হওয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। তবে শিগগিরই নারায়ণগঞ্জের পঞ্চবটি থেকে মুক্তারপুর পর্যন্ত সাত কিলোমিটার ১২ ইঞ্চি প্যারালাল গ্যাসলাইনের কাজ সম্পন্ন হবে। এ লক্ষ্যে ৬৩ লাখ টাকা ব্যয়ে নতুন পাইপ লাইন স্থাপনের ওয়ার্ক অর্ডার হয়ে গেছে।
